অলক কাপালি হতে পারতেন বিশ্বের অন্যতম সেরা অলরাউন্ডার। দূর করতে পারতেন লেগ স্পিনারের অভাব। কিন্তু কিছুই পারেননি। এক আক্ষেপের নাম হয়ে আছেন তিনি। প্রতিভা ছিল, সামর্থ্য ছিল, বাংলাদেশের অনেক কিছু পাওয়ার ছিল তার কাছ থেকে, অথবা বাংলাদেশের ক্রিকেটকে অনেক দেওয়ার ছিল তার। কিন্তু হয়নি নানা কারণে।
২০০০ সালে বাংলাদেশের প্রথম শ্রেণি ক্রিকেটের শুরু থেকে সঙ্গী ছিলেন। সোমবার হুট করেই লাল বলকে বিদায় জানালেন। ২০০৩ সালের ২৯ আগস্ট পাকিস্তানের বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করার দিনেই লংগার ভার্সন ক্রিকেটকে বিদায় জানিয়েছেন। প্রথম শ্রেণি ক্রিকেটকে ঠিক কী কারণে বিদায় বললেন, ক্রিকেট নিয়ে নিজের বর্তমান ভাবনাসহ প্রাসঙ্গিক অনেক কিছু নিয়েই বিস্তারিত বলেছেন বাংলা ট্রিবিউনের কাছে-
বাংলা ট্রিবিউন: ২০০৩ সালের ২৯ আগস্ট পেশাওয়ারে পাকিস্তানের বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করেছিলেন। ওই দিনেই প্রথম শ্রেণি ছাড়ার ঘোষণা দিলেন। বিশেষ কোনও কারণ?
অলক কাপালি: টেস্টে হ্যাটট্রিক তো বিশাল ব্যাপার। আর এই কীর্তি তো আমার সারা জীবন থাকবে। আমার ক্যারিয়ারে এটাই হচ্ছে সেরা দিন। তবে এই সময়টাতে জাতীয় লিগ হলে মাঠ থেকেই বিদায় নিতাম। যেহেতু সেই সুযোগটা নেই, এই কারণে গৌরবের দিনটিকেই আমি বেছে নিয়েছি। এই তারিখটাও আমার মনে থাকবে।
বাংলা ট্রিবিউন: আপনি বলেছেন, তরুণদের সুযোগ দিতেই প্রথম শ্রেণি ক্রিকেট থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। এটাই কি একমাত্র কারণ?
অলক: সত্যি কথা বলতে আমার আসলে কোনও আক্ষেপ নেই। আমি যখন সিলেট বিভাগের হয়ে খেলেছি, সবসময় চেষ্টা করেছি আমার সেরাটা দেওয়ার। এটা শুধু আমার ব্যাটিং-বোলিং দিয়ে নয়, বড় বড় সিদ্ধান্ত দিয়েও সিলেট বিভাগকে সাহায্য করার চেষ্টা করেছি। যাই হোক কোনও আক্ষেপ কিংবা হতাশা নেই- আমি মূলত তরুণ ক্রিকেটারদের সুযোগ করে দিতেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। গত বছর আমি অনুভব করেছি আমাদের দলে বেশ কিছু নতুন খেলোয়াড় আছে। আমি সরে না দাঁড়ালে তারা খেলার সুযোগ পাচ্ছে না। গত মৌসুমে ওরা বসে থেকেছে, খেলতে পারেনি। আমি চাই না ওদের ক্যারিয়ার ছোট হয়ে যাক।
বাংলা ট্রিবিউন: ২০০০ সালে বাংলাদেশের প্রথম শ্রেণি ক্রিকেট শুরু। শুরুর সময় থেকে সঙ্গী, দুই দশকের বেশি সময়ের লম্বা জার্নির অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?
অলক: জাতীয় দলের ব্যর্থতা কিংবা ক্রিকেটাররা কেউ ব্যর্থ হলেই জাতীয় লিগকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়। এটাকে পিকনিক ক্রিকেট হিসেবে অবহিত করা হয়। আমার কাছে কখনোই এটা মনে হয়নি যে এটা পিকনিক ক্রিকেট, এখানে আমরা পিকনিক করতে এসেছি! প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেটের মধ্যে টেস্টের পরই এর অবস্থান। গত ৭-৮ বছর ধরে যদি খেয়াল করে দেখেন জাতীয় লিগে কত প্রতিযোগিতা হচ্ছে। কেউই বলতে পারছে না কে চ্যাম্পিয়ন হবে! সিনিয়ররা লংগার ভার্সন খেলতে জুনিয়রদের সঙ্গে টেক্কা দিয়ে ফিটনেসের উন্নতি করে।
বাংলা ট্রিবিউন: দুই দশকের বেশি সময়ের এই জার্নিতে সবচেয়ে বেশি কী মিস করবেন?
অলক: সবচেয়ে বেশি তো মিস করবো টিমমেটদের। আমাদের সিলেটের খেলোয়াড়রা এত আন্তরিক। সিনিয়র-জুনিয়রদের সম্পর্ক খুব ভালোভাবে মেইনটেইন করতে পারে। সবার সঙ্গে আমি ফ্রি এবং আমার সঙ্গে সবাই ফ্রি। আমরা মাঠের মধ্যে প্রচুর মজা করতাম। জুনিয়রদের সবসময় বলতাম- আমরা তোদের সঙ্গে ফাইট করবো, তোরা আমাদের নিয়ে চিন্তা করিস না। লিগের শেষের দিন আমরা যখন বাসায় ফিরে আসি, তখন সবার মধ্যে ব্যাড ফিলিংস কাজ করে। সবাই মিলে দারুণ সময় কাটাতাম, এগুলো এখন মিস করবো; ইতিমধ্যে করছিও।
বাংলা ট্রিবিউন: ১০ হাজার রান করতে পারলেন না। ৯ হাজার ১৩৮ রান নিয়ে বিদায় নিলেন। আক্ষেপ লাগছে না?
অলক: একসময় ইচ্ছে ছিল ১০ হাজার রান করবো। আমি এবং তুষার ভাই (তুষার ইমরান) একসঙ্গেই প্রতিযোগিতা করে রান করতাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমি পারিনি। ৮৬২ রান পিছিয়ে আমি। আসন্ন মৌসুম খেললেও এই রান ছোঁয়া বেশ কঠিন হতো। ১০ হাজার রানের কথা চিন্তা করলে আমাকে স্বার্থপর হতে হবে। আমি আরেকটা ছেলের জায়গা নষ্ট করতে চাইনি। আমার মনে হয়েছে, ১০ হাজার রানের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, একজন তরুণকে সুযোগ তৈরি করে দেওয়া। হয়তো আমার জায়গায় সুযোগ পাওয়া ছেলেটি জাতীয় দলকে একদিন প্রতিনিধিত্ব করবে।
বাংলা ট্রিবিউন: ২০০৮ সালের জুনে করাচিতে সেঞ্চুরি করলেন। হুট করেই এমন কি হলো ভারতের বিদ্রোহী লিগ আইসিএলে যোগ দিলেন?
অলক: সত্যি কথা বলতে আমার কোনও ইচ্ছা ছিল না আইসিএলে যাওয়ার। অনেকটা বাধ্য হয়েই আমাকে যেতে হয়েছে। ২০০৮ সালের আগস্টে অস্ট্রেলিয়া সিরিজেই আমার ক্যারিয়ার শেষ হয়ে গিয়েছিল! অস্ট্রেলিয়া সিরিজ চলাকালে আমাকে বলা হয়েছিল পরবর্তী সিরিজগুলোতে আমাকে আর বিবেচনা করা হবে না। একটা সিরিজ চলাকালে কীভাবে একজন নির্বাচক এরকম বলেন!
বাংলা ট্রিবিউন: নির্বাচক এমনটা কেন বলেছিলেন?
অলক: প্রধান নির্বাচক রফিকুল আলম আমাকে ম্যাচ চলাকালে ডেকে বললেন- শুনলাম ‘তুমি নাকি আইসিএলে যাচ্ছো?’ আমি বললাম এ ব্যাপারে এখনও কনফার্ম কিছু হয়নি। তারপরও উনি আমাকে অনেক উল্টোপাল্টা কথা বলেন। অস্ট্রেলিয়া সিরিজ শেষে দেশে ফিরে টিম ম্যানেজমেন্ট মিটিং করে সিদ্ধান্ত নিলো আমাকে আর দলে নেওয়া হবে না। তখনকার টিম ম্যানেজার আমাকে ডেকে বলেন, ‘তোমার যদি আইসিএলে অফার থাকে, চলে যাও। তোমার মতো অনেক খেলোয়াড় আমাদের একাডেমিতে আছে।’ আমি পাল্টা প্রশ্ন করেছি, কেন যাবো? আমি তো দেশের হয়ে খেলতে চাই। তখন ম্যানেজার আমাকে স্পষ্ট বলেছেন, ‘তুমি গেলে যাও, তোমার ইচ্ছে। কিন্তু তোমাকে পরবর্তী সিরিজ থেকে বিবেচনা করা হবে না।’ এরপরই আমি আইসিএলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। আমি এই সিদ্ধান্তের পেছনে ভুল খুঁজে পাই না।
বাংলা ট্রিবিউন: ২০১১ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে সর্বশেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছিলেন। কখনও কি মনে হয়েছিল আপনি এই দলটিতে খেলার যোগ্য, কিন্তু সুযোগ পাচ্ছেন না?
অলক: আইসিএল থেকে আসার পর আমি তিনটি সিরিজ খেলছিলাম। প্রতিটি সিরিজে আমি একটি করে ম্যাচ খেলেছি। তখন আমি একটা বিবৃতি দিয়েছিলাম, এভাবে আসলে পারফরম্যান্স করা যায় না। প্রতি সিরিজে আমি জানিই একটা করে ম্যাচ সুযোগ পাবে, যত ভালো মানসিকতার লোকই হোক, তার জন্য এভাবে খেলা কঠিন হবে। শেষ ম্যাচেও আমাকে ৭ নম্বরে ব্যাটিং করতে হয়েছে। ওই সময়টাতে একটা সিরিজে যদি আমাকে টানা তিনটা ম্যাচ খেলানো হতো, তাহলে এই গল্পটা ভিন্ন কিছু হতে পারতো। আইসিএল থেকে ফেরার পর আমি ওভাবে সুযোগ পাইনি, পেলে অন্তত দেশের হয়ে আরও কিছু ম্যাচ খেলতে পারতাম। অথচ ভারতের বিপক্ষে আমি সেঞ্চুরি করেছিলাম। তার পরের সিরিজে অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে সবাই খারাপ করেছে। তবে কোপটা পড়েছে আমার ওপর।
বাংলা ট্রিবিউন: ২০০২ সালে বাংলাদেশ-দক্ষিণ আফ্রিকা দ্বিতীয় ওয়ানডের কথা মনে আছে নিশ্চয়? হার্শেল গিবসকে সেঞ্চুরি করতে দিলেন না!
অলক: মনে আছে। আমাকে অধিনায়ক বললেন, ওকে রেকর্ড গড়তে দেওয়া যাবে না। গিবস তখন ৯৭ রানে, আর ৩ রান করতে পারলেই ওয়ানডেতে টানা চার সেঞ্চুরি করার রেকর্ড গড়তো (২০১৫ বিশ্বকাপে সাঙ্গাকারা ৪ সেঞ্চুরি করে রেকর্ড করেছেন)। আমার হাতে বোলিং দিয়ে অধিনায়ক আমাকে বলেছিল, ‘তুই ওয়াইড দিবি।’ শুরুতে না করলেও যেহেতু আমি জুনিয়র আমাকে করতেই হতো। ওই ওয়াইডের পর দক্ষিণ আফ্রিকার সবাই তো আমার ওপর অনেক ক্ষ্যাপা। মিডিয়ায় অনেক লেখালেখি হলো আমার ছবি দিয়ে। পরে আমার খুব খারাপ লেগেছে, কাজটা আমরা মোটেও ঠিক করিনি। আমি তখন জুনিয়র ছিলাম, অধিনায়ক যেটা বলেছে সেটাই করতে হয়েছে।
বাংলা ট্রিবিউন: মারকুটে ব্যাটার হিসেবে আপনার খ্যাতি ছিল। আপনাকে ‘আলোর কুপি’ বলা হতো। বতর্মান ক্রিকেটারের ব্যাটিং দেখে আফসোস হয় কিনা?
অলক: আফসোস তো অবশ্যই হয়। তবে আমি আমার দেশে খুব বেশি সুযোগ পাইনি। আইসিএলে যখন গিয়েছিলাম, তখন কিন্তু আমি চার নম্বরে ব্যাটিং করেছি। ওখানে অনেক রান করেছিলাম। আইসিএল থেকে ফেরত আসার পর কিন্তু আমি সেভাবে সুযোগ পাইনি। এর জন্যই বেশি আফসোস লাগে। দলের প্রয়োজন যখন যেভাবে ছিল, আমি সেটা পূরণ করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু রিটার্ন কিছুই পাইনি।
বাংলা ট্রিবিউন: আর কতদিন ক্রিকেট খেলতে চান। ক্রিকেট ছাড়ার পর আপনার পরিকল্পনা কী?
অলক: আপাতত প্রিমিয়ার লিগ খেলবো। যদি বিপিএলে সুযোগ পাই খেলবো। গত মৌসুমে ঢাকা লিগে প্রাইম ব্যাংকের হয়ে পারফরম্যান্স করেছি। এবারও তাদের হয়েই খেলবো। এক বছর পর আমি আমার ক্যারিয়ার নিয়ে ভাববো। তবে ক্রিকেটের সঙ্গেই থাকবো। বিসিবি কিংবা সিলেট আঞ্চলিক ক্রিকেট সংস্থা যদি কোনোভাবে আমাকে কাজে লাগাতে চায়, আমি সেই দায়িত্ব নিতেও প্রস্তুত আছি। সিলেটে কিছুদিন আগে স্কিল ক্যাম্প হয়েছিল, সেখানে আমাকে ডেকেছিল। আমি গিয়েছিলাম, চেষ্টা করেছি ওদের দুর্বলতাগুলো দূর করার।









