এক ম্যাচ হেরেও দাপটের সঙ্গে ওয়ানডে সিরিজ জিতেছিল বাংলাদেশ। কিন্তু লাল বলের ক্রিকেটে ফিরতেই যেন খেই হারিয়েছেন সাকিব-মুশফিকরা। চট্টগ্রাম টেস্টে হেরেছেন ১৮৮ রানের ব্যবধানে। মূলত প্রথম ইনিংসে ব্যাটিং ব্যর্থতার পরই ম্যাচ থেকে ছিটকে যায় বাংলাদেশ। ঢাকায় এই ভুল করতে চান না স্বাগতিকরা। আগে ব্যাটিং হোক কিংবা বোলিং, প্রথম ইনিংসেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চান সাকিব আল হাসানরা। বৃহস্পতিবার আগের ম্যাচের ভুল শুধরে ঢাকা টেস্টে জিততে মুখিয়ে আছে বাংলাদেশ।
মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে সর্বশেষ তিন ম্যাচে বাংলাদেশ জিততে পারেনি। গত ডিসেম্বরে তো পাকিস্তানের বিপক্ষে ইনিংস ব্যবধানেই হেরেছিল। মিরপুরের এই রহস্যময় উইকেটে রহস্য উন্মোচন করে ভারতের বিপক্ষে টেস্ট জিততে মরিয়া বাংলাদেশ। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার দ্বিতীয় টেস্ট শুরু হবে বৃহস্পতিবার (২২ ডিসেম্বর) সকাল সাড়ে ৯টায়। ম্যাচটি গাজী টেলিভিশন ও টি-স্পোর্টস সরাসরি সম্প্রচার করবে।
চট্টগ্রামের চেয়ে মিরপুরে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে দুই দলকেই। কেননা, মিরপুরে উইকেটের রহস্য উন্মোচন করা বেশ কঠিন! চট্টগ্রামে এবারকার উইকেট পুরো ব্যাটিংবান্ধব না হলেও ব্যাটিং করা খুব একটা কঠিন ছিল না। উইকেটে ব্যাটারদের পাশাপাশি বোলারদের সাহায্যও ছিল যথেষ্ট। কিন্তু মিরপুরে বরাবরই ব্যাটারদের কঠিন সংগ্রাম করতে হয়। মিরপুরের স্লো উইকেটে পেসারদের আধিপত্য বিস্তার করা খুব কঠিন। এখানে বরাবরই স্পিনারদের আধিপত্য বেশি! এমন উইকেটে অবশ্য ভারতের খেলার অভিজ্ঞতাও কম নয়। তবু বুধবার মিরপুরে উইকেট দেখে বেশ বিরক্তি প্রকাশ করতে দেখা গেছে ভারতীয় কোচ রাহুল দ্রাবিড়কে।
বুধবার ভারতীয় প্রধান কোচকে দেখা গেছে বেশ কয়েকবার উইকেটের কাছে যেতে। কিছুক্ষণ পর পরই উইকেট পরখ করছিলেন দ্রাবিড়। কখনও দূর থেকে দাঁড়িয়ে দেখেছেন, কখনও কাছে গিয়ে আঙুল দিয়ে টিপে উইকেট পরখ করেছেন। যতবারই উইকেট দেখেছেন, তার চোখেমুখে বিরক্তি স্পষ্ট ফুটে উঠেছে। শুধু তাই নয়, উইকেট নিয়ে কথা বলতে দ্রাবিড় ছুটে গিয়েছিলেন মিরপুরের কিউরেটর গামিনি ডি সিলভার রুম পর্যন্ত! তবে ঠিক কী কথা হয়েছে তা জানা যায়নি।
সংবাদ সম্মেলনে ব্যাটিং কোচ বিক্রম রাঠোর এ ব্যাপারে জানিয়েছেন, ‘আপনারা দ্রাবিড় বা পিচ কিউরেটরকে জিজ্ঞেস করতে পারেন। আমি নিশ্চিত নই তাদের মধ্যে কী কথা হয়েছে। আমরা ঠিক আছি। যে ধরনের উইকেটই দেওয়া হয়, সব ঠিকঠাক। আমাদের পক্ষ থেকে কোনও ইস্যু নেই।’
মিরপুরে সফরকারী দলগুলোর বিপক্ষে স্পিন সহায়ক উইকেটে খেলে থাকে বাংলাদেশ। ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়ার মতো দলকে এমন ফাঁদে ফেলেই আউট করেছে বাংলাদেশ দল। তবে উল্টো ফলও পেয়েছে। স্পিন উইকেটের ফাঁদ পেতে পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ম্যাচ হারতেও হয়েছে। ভারতের বিপক্ষে স্পিন সহায়ক উইকেট বানিয়ে কতটা সফল হওয়া যাবে সেটি নিয়ে প্রশ্ন আছে।
তবে ম্যাচের আগের দিন পর্যন্ত বোঝা যাচ্ছে না, ঠিক কেমন উইকেটে টেস্টটি মাঠে গড়াচ্ছে। বাংলাদেশের পেস বোলিং কোচ স্পষ্ট করে কিছু জানাতে পারলেন না, ‘ধারণা করে বলতে পারি তিন জন স্পিনার যারা খেলেছিল এবং তাসকিন ফিরে এসেছে, সঙ্গে খালেদ তো আছে। নির্বাচন নিয়ে কাজটা নির্বাচকদের। তবে আমি দেখতে পাচ্ছি এমন কিছুই হতে যাচ্ছে।’
তবে উইকেট নিয়ে না ভেবে প্রসেস ঠিক রেখে ঢাকায় জিততে মরিয়া বাংলাদেশ। ডোনাল্ড তেমনটাই জানিয়ে গেছেন, ‘আমরা ভারতের বিপক্ষে খেলছি, নাকি অন্য কারও সঙ্গে সেটা আসলে আমাদের সাফল্যের পরিকল্পনা স্থির করবে না। জানি ১৫০ রান করে ম্যাচ জেতা সম্ভব নয়। দলের ভেতরে জুটির গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে কথা বলেছি। আমাদের আরও স্থির হতে হবে, যেমনটা চট্টগ্রামে দ্বিতীয় ইনিংসে দেখিয়েছি। আমরা জিততে মুখিয়ে আছি। আমিসহ দলের অনেকেই জয় নিয়ে বাড়ি ফিরে বিলম্বিত ক্রিসমাস পালন করতে চাই।’
এদিকে চট্টগ্রামের মতো ঢাকাতেও ফলের আশায় রয়েছে ভারত। বিক্রম রাঠোর বলেছেন, ‘উইকেট যেমনই হোক, আমরা খেলবো এবং জিতবো। এই উইকেট, ওয়ানডেতেও দেখেছি বোলারদের সাহায্য করেছে। আমি নিশ্চিত এই ম্যাচেও ফল পাওয়া যাবে। ম্যাচটা খেলতে এবং জিততে মুখিয়ে আছি।’
চট্টগ্রামে টেস্টে বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের পারফরম্যান্স ছিল বলতে গেলে হতাশাজনক। অভিষিক্ত জাকির হাসান ছাড়া কোনও ব্যাটারই টেস্টসুলভ ব্যাটিং করতে পারেননি। মুশফিকুর রহিম, ইয়াসির আলী চৌধুরী, লিটন দাস, নুরুল হাসান সোহান হয়েছেন ব্যর্থ। চট্টগ্রামে টেস্ট হেরে ব্যাটারদের মানসিকতা নিয়ে প্রশ্নও তুলেছিলেন প্রধান কোচ রাসেল ডমিঙ্গো।
বোলাররা ভালো করলেও দ্বিতীয় ইনিংসে ইনজুরির কারণে এবাদত হোসেনের সার্ভিস পায়নি বিসিবি। সাকিব তো পুরো ম্যাচে মাত্র ১২ ওভার বোলিং করেছেন। সেই জায়গা থেকে কিছুটা স্বস্তির খবর বাংলাদেশের ড্রেসিংরুমে। সাকিব পুরোপুরি ফিট আছেন, ঢাকা টেস্টে ব্যাটিং-বোলিং-ফিল্ডিং সব বিভাগেই সাকিবের সার্ভিস পাওয়া যাবে। এদিকে ইনজুরি আক্রান্ত এবাদত ছিটকে গেলেও স্কোয়াডে আছেন খালেদ আহমেদ ও তাসকিন আহমেদ। দুই পেসার নিয়ে বোলিং আক্রমণ সাজালেই দুই জনকেই দেখা যাবে একাদশে। মিরপুরে খেলা সর্বশেষ দুই টেস্টে অবশ্য তিন স্পিনারের সঙ্গে দুই পেসারকে নিয়েই একাদশ সাজিয়েছিল বাংলাদেশ।
দুই পেসারের সঙ্গে তিন স্পিনারকে বোলিং আক্রমণে দেখা যেতে পারে। সেক্ষেত্রে সাকিব আল হাসানের সঙ্গে থাকবেন মেহেদী হাসান মিরাজ ও তাইজুল ইসলাম। এছাড়া ইয়াসির আলীকে বিশ্রাম দিয়ে দীর্ঘসময় ফর্মের বাইরে থাকা মুমিনুল হককে দেখা যেতে পারে স্কোয়াডে। শেষ মুহূর্তে কিপিংয়ের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হতে পারে সোহানকে। সেক্ষেত্রে লিটন উইকেটের পেছনে দায়িত্ব সামলাবেন। সোহানকে বিশ্রাম দিলে ওখানে একজন বাড়তি বোলার কিংবা বাড়তি ব্যাটারকে দেখা যাবে।
এদিকে ভারতীয় শিবিরে ফের ইনজুরি হানা দিয়েছে। রোহিত শর্মার অনুপস্থিতিতে চট্টগ্রামে প্রথম টেস্টে ভারতকে নেতৃত্ব দেওয়া লোকেশ রাহুল এবার চোটে পড়েছেন। বুধবার নেটে ব্যাটিং করতে গিয়ে ইনজুরিতে পড়েন তিনি। তবে এখনও নিশ্চিত নন রাহুলকে ছাড়াই মাঠে নামবে কিনা ভারত। শেষ পর্যন্ত রাহুল খেলতে না পারলে অধিনায়কের দায়িত্ব সামলাতে হতে পারে সহ-অধিনায়ক চেতেশ্বর পূজারাকে। পাশাপাশি ভারত 'এ' দলের হয়ে দারুণ পারফর্ম করা ওপেনার অভিমন্যু ঈশ্বরনেরও হয়ে যেতে পারে টেস্ট অভিষেক। কিছু দিন আগে বাংলাদেশ 'এ' দলের বিপক্ষে দুটি আনঅফিসিয়াল টেস্টেই সেঞ্চুরি হাঁকিয়েছিলেন ভারতীয় এই ব্যাটার।








