দুই বছরের চুক্তিতে তিন ফরম্যাটের কোচ হয়ে ঢাকায় পৌঁছেছেন চন্ডিকা হাথুরুসিংহে। সোমবার (২০ ফেব্রুয়ারি) রাত ১০টা ২৬ মিনিটে সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সের একটি বিমানে ঢাকায় পা রাখেন বাংলাদেশের হয়ে দ্বিতীয় অধ্যায় শুরু করতে যাওয়া এই কোচ।
বাংলাদেশে হাথুরুসিংহের নতুন অধ্যায় শুরু হচ্ছে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজ দিয়েই। মঙ্গলবার (২১ ফেব্রুয়ারি) থেকে অনানুষ্ঠানিকভাবে শুরু হচ্ছে সেই প্রস্তুতি। এর আগে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) দায়িত্বশীল কর্তা, প্রোগ্রাম হেড ডেভিড মুরস ও কোচদের সঙ্গে বৈঠক করার কথা রয়েছে তার। এদিন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের কারণে সরকারি ছুটি। যার ফলে ঐচ্ছিক অনুশীলন রেখেছে বিসিবি। ঢাকায় যারা আছেন, তারাই কেবল যোগ দেবেন অনুশীলনে।
শ্রীলঙ্কার সাবেক এ ক্রিকেটার ২০১৪ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত মোট তিন বছর জাতীয় দলের প্রধান কোচের দায়িত্বে ছিলেন তিনি। তবে ২০১৭ সালে বাংলাদেশের দক্ষিণ আফ্রিকা সফর শেষে চাকরি থেকে ইস্তফা দেন হাথুরুসিংহে।
আগের অধ্যায়ে বেশ সাফল্য ছিল হাথুরুসিংহের। সে সময়ে ভারত, পাকিস্তান ও দক্ষিণ আফ্রিকাকে প্রথমবার ওয়ানডে সিরিজ হারায় বাংলাদেশ। ২০১৫ সালে বিশ্বকাপে বাংলাদেশ প্রথমবার কোয়ার্টার ফাইনাল খেলে তার কোচিংয়ে। ২০১৭ সালের চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতেও খেলেছিল সেমিফাইনাল। এছাড়া অস্ট্রেলিয়া, শ্রীলঙ্কা ও ইংল্যান্ডের মতো বড় দলের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজ জেতে টাইগাররা। তবুও তার প্রথম অধ্যায় শেষ হয়েছিল তিক্ততায়। বোর্ডের কাছে সিনিয়র ক্রিকেটারদের নিয়ে নানা অভিযোগ করেছিলেন তিনি। ৫৪ বছর বয়সী এ কোচ দ্বিতীয় মেয়াদে ঢাকায় থাকবেন আরও দুই বছর। বাংলাদেশে তার নতুন মিশনে সামাল দিতে হবে অনেক নতুন চ্যালেঞ্জ।
প্রথম মেয়াদের সিনিয়র ক্রিকেটারদের সঙ্গে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল সেটা কমাতে উদ্যোগি হতে হবে হাথুরুসিংহকে। যেহেতু ২০১৭ সালে চাকরি থেকে ইস্তফা দেওয়ার আগে সিনিয়র ক্রিকেটারদের নিয়ে একগাদা অভিযোগ করেছিলেন তিনি, সিনিয়র ক্রিকেটারদের মানসিকতা ও নিবেদনের ঘাটতি নিয়ে বিরক্ত ছিলেন। সেই তাকেই আবার সিনিয়র ক্রিকেটার তামিম ইকবাল, মুশফিকুর রহিম, সাকিব আল হাসান ও মাহমুদউল্লাহদের কোচ করে এনেছে বিসিবি। শুরুতেই সিনিয়রদের সঙ্গে মানসিক যে দূরত্ব সেটি কমাতে উদ্যোগী হতে হবে কড়া হেডমাস্টার খ্যাত হাথুরুসিংহে।
২০১৫ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত হাথুরুসিংহে বাংলাদেশকে অনেক সাফল্য এনে দিয়েছেন। তার হাত ধরে বদলে যাওয়া বাংলাদেশ এখন বিশ্ব ক্রিকেটে অন্যতম পরাশক্তি। দ্বিতীয় মেয়াদে সেই সাফল্যকে চূড়ায় নিয়ে যেতে হবে। এটাই হচ্ছে হাথুরুসিংহের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। সামনেই ওয়ানডে বিশ্বকাপ। উপমহাদেশের কন্ডিশনে এই বিশ্বকাপকে ঘিরে বাংলাদেশের প্রত্যাশার পারদ চূড়াতে। নতুন মেয়াদে হাথুরুসিংহকে প্রমাণ করতে হবে, তার কাছে সত্যিই কোনও ম্যাজিক আছে!
সাবেক ক্রিকেটার খালেদ মাহমুদ সুজন অবশ্য হাথুরুসিংহের দ্বিতীয় অধ্যায় দারুণ ভাবে শুরু হবে বলে আত্মবিশ্বাসী, ‘অবশ্যই আমরা চাইব সে (হাথুরুসিংহে) নিজেকে ছাড়িয়ে যাক। তখনকার সাকিব-মাহমুদউল্লাহ... দুজন মিলে যে ম্যাচ জিতিয়েছিল, এখন তো তারা আরও অনেক পরিপক্ব, ঠিক না? এখন তরুণরাও অনেক পরিণত হয়েছে, ভালো দল হয়েছে। আমরা অবশ্যই চাই। তবে আমি জানি যে, হাথুরু যেমন মানুষ, ও নিজেই চাইবে। ও আসার আগেই সেভাবে প্ল্যান করে আসছে, কীভাবে ও বাংলাদেশকে গোছাবে।’
লিটন, মোস্তাফিজ, মিরাজরা যখন তরুণ ছিলেন, তখন দায়িত্বে ছিলেন হাথুরুসিংহে। গত কয়েক বছরে নানা অভিজ্ঞতায় সিক্ত তারা। সেই নবীনদের কিভাবে সামলান, সেটাও দেখার। পুরনো হাথুরুসিংহে আগের কড়া হেডমাস্টার চরিত্রে থাকলে দুই পক্ষের মধ্যে ব্যক্তিত্বের সংঘাত হতে পারে! সেই দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে হাথুরুসিংহকে।
অধিনায়ক আর হাথুরুসিংহের মিল না হলে ক্ষতি হবে বাংলাদেশ দলের। আগের মেয়াদে ওয়ানডে ফরম্যাটে বাংলাদেশের যে উন্নতি সেখানে হাথুরুসিংহের পাশাপাশি অধিনায়ক মাশরাফিরও ভূমিকা প্রবল। মাশরাফি ব্যক্তিত্বের সংঘাতে না গিয়ে অনেক কিছুই মেনে নিয়েছেন। যদিও নিজের চিন্তার সঙ্গে কোনও আপোষ করেননি। অন্যদিকে সাকিব-মুশফিকের সঙ্গে ব্যক্তিত্বের সংঘাত তৈরি হয়েছিলে হাথুরসিংহের। টেস্ট ও টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক সাকিব আল হাসানের সঙ্গে ব্যক্তিত্বের সংঘাত না এড়াতে পারলে এই দুই ফরম্যাটে সাফল্য পাওয়া কঠিন হবে। পাশাপাশি ওয়ানডে ফরম্যাটে অধিনায়ক তামিম ইকবালের সঙ্গে মিলিয়ে চলতে না পারলেও আসন্ন ওয়ানডে বিশ্বকাপে প্রত্যাশা-বাস্তবের পার্থক্য থাকবে অনেক।
সবমিলিয়ে তাই হাথুরুসিংহের দ্বিতীয় অধ্যায়ের শুরুটা বেশ চ্যালেঞ্জিংই হচ্ছে। এখন দেখার অপেক্ষা হাথুরুসিংহে সেই চ্যালেঞ্জ জিততে পারে কিনা?









