ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি ‘পরীক্ষায়’ ভালোভাবে পাশ করার পর এখন বাংলাদেশের সামনে টেস্ট পরীক্ষা। মিরপুর শেরে বাংলা স্টেডিয়ামে মঙ্গলবার সকাল দশটায় শুরু হবে এই পরীক্ষা। কিন্তু কঠিন এই পরীক্ষার আগে বাংলাদেশ শিবির নানা সমস্যায় জর্জরিত! পুরো সিরিজে ছন্দময় বোলিং করা তাসকিন আহমেদ এই ম্যাচের আগে ছিটকে গেছেন। এদিকে অভিজ্ঞ ক্রিকেটার তামিম ইকবালকে পারিবারিক কারণে পাওয়া নিয়ে সংশয় আছে। সবকিছু মিলিয়ে টেস্ট পরীক্ষার আগে বেশ জটিল সময় পার করছে বাংলাদেশের টিম ম্যানেজমেন্ট।
টেস্ট ক্রিকেটে হারের বৃত্ত থেকে বের হওয়ার মিশন নিয়ে মিরপুর সকাল দশটায় নবীন টেস্ট খেলুড়ে সদস্য আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে মাঠে নামবে বাংলাদেশ। ম্যাচটি সরাসরি সম্প্রচার করবে গাজী টেলিভিশন ও টি স্পোর্টস।
২০২২ সালের শুরুতে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সবশেষ টেস্টে জয়ের দেখা পেয়েছিল বাংলাদেশ। এরপর ৮টি টেস্ট খেলে একটিতেও জিততে পারেনি বাংলাদেশ, কেবল একটি ম্যাচ ড্র করেছে। ঘরের মাঠে ২০২০ সালের পর কোনও ম্যাচ জিততে পারেনি বাংলাদেশ। অন্য দুই ফরম্যাটে দারুণ ক্রিকেট খেললেও টেস্ট বলেই ভয় আর শঙ্কা উঁকি দিচ্ছে। যদিও আইরিশরা এই ফরম্যাটের সবচেয়ে নবীনতম দল। ২০১৭ সালে টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার পর এখন পর্যন্ত মাত্র ৩টি টেস্ট খেলে যার সবগুলোতেই হেরেছে তারা।
টেস্ট ক্রিকেটের নবীনতম দলের বিপক্ষে মাঠে নামার আগে পুরোনো একটি পরিসংখ্যান ভয় ধরিয়ে দিতে যথেষ্ট। টেস্ট খেলুড়ে দেশগুলোর বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে বাংলাদেশের জেতার কোনও রেকর্ড নেই! আফগানিস্তানের মতো টেস্টের নবীন সদস্য দেশটির বিপক্ষেও ঘরের মাঠে পরাজয়ের স্বাদ পেয়েছে। বাকি দলগুলোর বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে হার ওতটা অস্বস্তিকর না হলেও আফগানদের বিপক্ষে হারটি ছিল ভীষণ অস্বস্তিকর। ২০১৯ সালে চট্টগ্রামে হওয়া ম্যাচটিতে বাংলাদেশ দল যেন হয়ে উঠেছিল সফরকারী দল। পুরো ম্যাচেই দাপট দেখিয়ে রশিদ খানের দল ২২৪ রানের জয় তুলে নেয়। ওই ম্যাচের অস্বস্তির কাঁটা নিয়ে নবীন আরও একটি দলের বিপক্ষে টেস্ট খেলতে নামছে বাংলাদেশ।
নবীনতম টেস্ট দল হলেও আগের তিন ম্যাচে আইরিশদের পারফরম্যান্স কিন্তু একবারেই খারাপ ছিল না। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে শেষ ম্যাচে দারুণ পারফরম্যান্স করেও হারতে হয় আয়ারল্যান্ডকে। ইংল্যান্ডকে ৮৫ রানে গুটিয়ে দিয়ে ২০৭ রানের লিড নেয় আয়ারল্যান্ড। দ্বিতীয় ইনিংসে ভালো ব্যাটিং করে ১৮২ রানের লক্ষ্য দেয় ইংলিশরা। কিন্তু ৩৮ রানে অলআউট হলে ১৪৩ রানে ম্যাচ জিতেছিল ইংল্যান্ড। এর আগে পাকিস্তানের বিপক্ষে প্রথম টেস্টে ৫ উইকেটে এবং আফগানিস্তানের বিপক্ষে দ্বিতীয় টেস্টে ৭ উইকেটে হারে আয়ারল্যান্ড। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটি ছাড়া সেই অর্থে লাল বলের ক্রিকেটে দাপট দেখাতে পারেনি আইরিশরা।
আয়ারল্যান্ডের ১৫ জনের স্কোয়াডে ৯ জনই আছেন টেস্ট অভিষেকের অপেক্ষায়। এরমধ্যে দুজন আছে যাদের নেই কোনও প্রথম শ্রেণি ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতাও। আরও দুজন প্রথম শ্রেণির ম্যাচ খেলেছেন একটা করে। বাংলাদেশের বিপক্ষে টেস্টে নামার আগে তাই রীতিমতো অচেনা ভুবনের হাতছানি আয়ারল্যান্ডের ক্রিকেটারদের। যদিও আইরিশদের প্রধান অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে জিম্বাবুয়ের জার্সিতে ৮ টেস্ট খেলা পিটার মুর।
বাংলাদেশের বিপক্ষে চতুর্থ টেস্ট খেলার কারণে ভীষণ চ্যালেঞ্জের মুখে আইরিশরা। আয়ারল্যান্ডের অধিনায়ক অ্যান্ড্রু বালবির্নি ম্যাচ পূর্ব সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, 'বাংলাদেশ চতুর্থ কোনও দেশ যাদের বিপক্ষে আমরা টেস্ট খেলবো। ইংল্যান্ডের মাঠে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে খেলাটা ছিল কঠিন। পাকিস্তানের বিপক্ষে আমরা প্রথম টেস্ট খেলেছি, আফগানিস্তানের বিপক্ষে অ্যাওয়ে খেলেছি। নতুন জাতির সঙ্গে টেস্ট খেলা বরাবরই দারুণ। এটা ইতিহাসে ঢুকে গেলো। তাদের খুব ভালো কিছু খেলোয়াড় আছে। তাদের কিছু টেস্ট বিশেষজ্ঞ আছে। তাদের কিছু পেসার ও স্পিনারদের দেখে খেলতে হবে। আমরা জানি কী পেতে যাচ্ছি। টেস্ট ক্রিকেট ভিন্ন এক চ্যালেঞ্জ। আমরা সব মিলিয়ে রোমাঞ্চিত। আমরা সেরাটা খেলতে চাই।'
বাংলাদেশের বিপক্ষে একমাত্র টেস্ট নিয়ে সতীর্থদের প্রতি আইরিশ অধিনায়কের বার্তা একদম পরিষ্কার, ‘অনেক বড় দল এখানে এসে বিপাকে পড়েছে। দলের জন্য আমাদের বার্তা হলো, মাঠে নেমে ভয়ডরহীন খেলা এবং নিজেদের মেলে ধরা। একটিই টেস্ট ম্যাচ, আমরা তাই উপভোগ করতে চাই।’
এদিকে বাংলাদেশের জন্যও আইরিশদের বিপক্ষে একমাত্র টেস্ট ম্যাচটি বেশ চ্যালেঞ্জের হতে যাচ্ছে। তাসকিনকে হারিয়ে পেস শক্তি এমনিতেই কমে গেছে। শেষ পর্যন্ত তামিম না খেলতে পারলে ব্যাটিংয়ের শক্তিও কমে যাবে। সবকিছু মিলিয়ে টিম ম্যানেজমেন্টের ভেতর কিছুটা অস্বস্তি আছে। যদিও ম্যাচ পূর্ববর্তী সংবাদ সম্মেলনে আসা মিরাজ জানিয়ে গেছেন আইরিশদের মোটেও হালকাভাবে নিচ্ছেন না তারা, ‘এই মাঠেই ভারতের বিপক্ষে আমাদের সর্বশেষ টেস্টে প্রায় জিতেই গিয়েছিলাম। এই মাঠটি আমাদের জন্য লাকি গ্রাউন্ড। আমরা এর আগেও এখানে টেস্ট জিতেছি। আমরা আয়ারল্যান্ডকে হালকাভাবে নিতে পারি না। আমরা তাদের সম্মান করি। আমরা আমাদের সেরাটা উজার করে দিবো।’
সবশেষ সিরিজে ভারতকে যতটা গুরুত্ব দিয়েছে বাংলাদেশ দল, ঠিক একইভাবে আইরিশদেরও গুরুত্ব দিচ্ছে তারা, ‘আমরা সবাই অনেক সিরিয়াস। ম্যাচ যখন খেলা হয় দেখবেন না যে, ভারতের সঙ্গে খেললে অনেক সিরিয়াস থাকে বা আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে খেললে ফোকাস কম থাকে। ফোকাস একই রকম থাকে। হয়তো আত্মবিশ্বাস অনেক বেশি কাজ করে অনেক সময়, অনেক সময় কম কাজ করে।’
দলের প্রতিনিধি হয়ে আসা মিরাজ জয়ের কথা বলে গেলেও বোর্ড প্রধান আইরিশদের বিপক্ষে কেবল জয় প্রত্যাশা করছেন না। সোমবার ম্যাচের আগের দিন ক্রিকেটারদের সঙ্গে বৈঠক শেষে নাজমুল হাসান পাপনের স্পষ্ট বার্তা ছিল আইরিশদের বিপক্ষে কেবল জয় নয়, দাপট দেখতে চান। বাস্তবিক অর্থে সেটাই হওয়া উচিত। এখন দেখার অপেক্ষা, মাঠের ক্রিকেট কতটা প্রভাব বিস্তার করতে পারে সাকিব আল হাসানের দল।









