পরিসংখ্যান ওলটপালট করে ৫৪৬ রানের বড় ব্যবধানে জিতেছে বাংলাদেশ। তাও আবার সিনিয়র দুই ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান ও তামিম ইকবালকে ছাড়াই। নিয়মিত অধিনায়ক সাকিবের চোটে দায়িত্ব নেন লিটন দাস। ২০১৯ সালে টেস্ট আঙিনার নতুন মুখ আফগানিস্তানের কাছে ২২৪ রানে হারের শোধ তার নেতৃত্বে সুদে আসলে মিটিয়ে নিয়েছে বাংলাদেশ। এমন জয়ের পর নিজের অধিনায়কত্বসহ ভবিষ্যৎ ক্রিকেট নিয়েও লিটন খোলামেলা কথা বলেছেন সংবাদ সম্মেলনে।
প্রশ্ন: অধিনায়কত্ব কেমন উপভোগ করলেন?
লিটন: অধিনায়কত্ব খুব উপভোগ করেছি। বোলাররা যেভাবে আমাকে সহায়তা করেছে... বিহাইন্ড দ্য বল দেখছি যে বোলাররা বল ক্যারি করাচ্ছে, স্লিপের দিকে বল যাচ্ছে। কিপিং করতেও মজা লেগেছে। যখন অধিনায়ক থাকি তখন ভালো লাগে যে, যে কোনও সময় উইকেট পাওয়ার সুযোগ থাকে। যখন প্রথম ইনিংসে শান্ত ও জয়ের সৌজন্যে আমরা ভালো স্কোর করলাম তখন থেকে আমরা বিশ্বাস করছিলাম প্রথম ইনিংসের ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। তাদের আমরা দেড়শর আগে অলআউট করেছি। কাজেই ব্যবধানটা তখনই বোঝা গেছে কোন পথে যেতে পারি। কিন্তু কঠিন উইকেট ছিল। দ্বিতীয় ইনিংসেও আমাদের ব্যাটাররা যেভাবে জাত চিনিয়েছে, এটার সম্পূর্ণ কৃতিত্ব আমাদের ব্যাটার ও বোলার পুরো দলের।
সাকিব না থাকায় কোনোদিক থেকে ভালো হয়েছে কি? কারণ যারা পারফর্ম করেছে এরকম একজন বোলারকে হয়তো বাদ দিতে হতো?
লিটন: দেখেন ম্যাচের আগে হয়তোবা এরকম ছিল সাকিব ভাই খেললে ভালো হতো। ম্যাচের পরে আসছে যে খেললে ভালো হতো কি না। জিনিসটা এমন না, আপনার হাতে যা অস্ত্র আছে, যখন একাদশ তৈরি করে দিয়েছি। কে থাকবে না থাকবে এটা নিয়ে চিন্তা করার সময় নেই। হয়তো দুই বা চার বছর পর এমন দিন আসবে যখন সাকিব ভাই থাকবেন না। বাংলাদেশ দলকে তো এগোতে হবে। যে দলটা খেলেছে সেটা বাংলাদেশের সেরা দল ছিল। তারা তাদের ভূমিকা পালন করেছে।
সাকিব-তামিম ছিলেন না, এই পরিবর্তন কীভাবে দেখেন, নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করতে যাচ্ছেন কি না?
লিটন: না, বদল না। নিউজিল্যান্ডে যে আমরা জিতেছি, একই কিন্তু। তামিম ভাই, সাকিব ভাই কেউই খেলেননি। আমরা তরুণ দল ছিলাম এবং দেশের বাইরে গিয়ে জিতেছি। আমরা যখন দেশের বাইরে গিয়ে জিতলাম আমাদের ভেতর একটা বিশ্বাস আসলো যে, কষ্টে সাফল্য পাওয়ার হার বাড়ে। সবাই এখন একটা ব্যাপারে মরিয়া যে কখন টেস্ট আসবে, কখন টেস্ট আসবে। সর্বোচ্চ দুই-তিন বছর পরে গিয়ে তিন-চারজন সিনিয়র খেলোয়াড়কে পাবেন না। এখন থেকে এটা যদি সামলাতে না পারেন তাহলে হুট করে বদল হয়ে গেলে কঠিন। তারা খেললে ভালো হতো, কিন্তু এমন না যে ওখান থেকে আমরা কামব্যাক করতে পারবো না। পাইপলাইনে, আমাদের ব্যাটিং অর্ডারে আস্তে আস্তে উন্নতি হচ্ছে। নতুন যারা আসছে তারা সামর্থ্যবান।
এই বড় জয়ের পর বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের পরের চক্রে নামার আগে কি আত্মবিশ্বাস বাড়লো?
লিটন: আপনি একটা বড় ব্যবধানে ম্যাচ জিতলে অনুভূতিটা খুব ভালো থাকে, খেলোয়াড়রা পরিপক্বতা দেখিয়েছে। এটা একদিনে হয় না, নিয়মিত ম্যাচ খেললে হয়। আমার মনে হয় এই অগ্রগতি কেউ ভুলবে না। চ্যাম্পিয়নশিপে একই দৃশ্যপটে, খেলোয়াড়রা একই প্রক্রিয়া মেনে এগোবে। ফলাফলটা আপনি হাতে পাবেন কি না, সেটা আপনি সেদিনই বুঝতে পারবেন, যে ওই দিন আপনি ভালো খেলবেন কি না। তবে ওটা অনেক দূরে। এখন আমাদের সাদা বলের ক্রিকেট আছে। এখন আসলে টেস্ট ক্রিকেট নিয়ে ভাবার খুব একটা সময় নেই, আর দায়িত্বটাও আরেকজনের হাতে। তো এটা নিয়ে আমি আর বলতে পারছি না।
এর আগে টি-টোয়েন্টি ও ওয়ানডেতে অধিনায়কত্ব করেছেন। এবার টেস্টেও করলেন। অধিনায়কত্ব করতে কোনটা বেশি চ্যালেঞ্জিং মনে হয়েছে? কাউকে অনুসরণ করেন কি না?
লিটন: চ্যালেঞ্জ না। যখন আপনার হাতে ভালো মানের ব্যাটার-বোলার থাকবে, তখন কাজটা সহজ হয়ে যায়। শান্ত আর জয় যেভাবে আক্রমণাত্মক মেজাজে ব্যাট করেছে সেটা খেলার ভিত অনেকটাই গড়ে দিয়েছিল, অধিনায়ক হিসেবে তখন আমার মনে হচ্ছিল আমরা শক্ত অবস্থানে চলে যাচ্ছি, যদিও আমাদের প্রথম ইনিংসে বড় রান করার কথা ছিল। আমরা দুর্ভাগ্যবশত সামান্য ভুলের কারণে সেটা করতে পারিনি। তাই চ্যালেঞ্জ ছিল না, ওরকম কিছুর সম্মুখীন হতে হয়নি। অধিনায়কত্ব তো করলামই কয়েকটা ম্যাচ, কাউকে অনুসরণ করি না এখনও।
এই টেস্টের আগে খবর বেরিয়েছিল, আপনি ভারপ্রাপ্ত অধিনায়কত্ব নিতে চাইছেন না। যদিও আপনি নিজে কিছু বলেননি। আগামীতে যদি সুযোগ থাকে অধিনায়কত্ব করার, তাহলে কী ভাবনা?
লিটন: দেখেন, এখন তো আপাতত একটার জন্য পেয়েছি (অধিনায়কত্ব)। আশা করবো সাকিব ভাই তাড়াতাড়ি ফিরে আসবেন। এবং তার কাছে হস্তান্তর করবো। আমি আগামীর কথা পরে ভাববো। দেখা যাক।
২০১৯ সালের তুলনায় আফগানিস্তানের এই দলকে দুর্বল মনে হয়েছে কি?
লিটন: এই জিনিসটা তুলনা করা কঠিন। কারণ অবশ্যই তাদের কিছু কিছু ভালো বোলার ছিল, তারা আসেনি। আসলেও যে খুব একটা বড় তফাৎ হতো তাও না। বিষয়টা হচ্ছে আমরা অনেক দিন ধরে টেস্ট খেলছি, তারা অনেক কম খেলে। তাদের জন্য কঠিন ছিল। অন্তত আমরা গেমের দিক থেকে এগিয়ে ছিলাম।
৮৯ বছরের মধ্যে টেস্টে সবচেয়ে বড় ব্যবধানে জেতার রেকর্ড গড়েছেন। সাফল্যের বাইরে জয়ের ধরন কতটা আনন্দ দিচ্ছে?
লিটন: অবশ্যই, এটা তো যখন চাইবেন তখনই হবে না- এরকম একটা ব্যবধান। এটার জন্য কৃতিত্ব ব্যাটারদের কারণ উইকেটটা এত সহজ ছিল না। প্রতিটা ব্যাটারকে কৃতিত্ব দিতে হবে। সত্যি কথা আমাদের বোলাররাও খুবই ভালো বল করেছে, লাইন লেন্থ মেনে বল করেছে। এটা টেস্ট ক্রিকেটে বড় অর্জন। এরকম জিততে পারলে এর থেকে বড় কিছু চাওয়ার থাকতে পারে না। অধিনায়ক হিসেবে আপনি এর থেকে বড় ব্যবধানে জয় চাইতে পারেন না কখনও।
২০১৯ সালে আফগানিস্তানের কাছে হারটা খুব বিব্রতকর ছিল। এই টেস্টের আগে কি মনে হয়েছে, তাদের বড় ব্যবধানে হারিয়ে সেটা ফিরিয়ে দেবেন?
লিটন: আমি ওভাবে অনুভব করি না। আমি জেতার জন্য খেলতে চাই। অবশ্যই জেতার জন্য তো খেলতে গেলে একটা জিনিস চিন্তায় থাকে, বড় ব্যবধানে জেতা, ভালোভাবে জেতা। জেতা মানে জেতা। অবশ্যই আপনি যখন বড় ব্যবধানে জিতবেন, তখন মনে হবে বড় দল হওয়ার একটা পথে যাচ্ছি। ২০১৯ আমাদের জন্য অন্যরকম ছিল। তারা যে লেভেলের খেলতো আর আমরা যেমন খেলতাম হয়তো একটু ম্যাচিংয়ে গড়মিল ছিল। ২০২৩ সালে এসে অনেক টেস্ট খেলেছি, সেদিক থেকে পাকাপোক্ত যে জানি কীভাবে খেলতে হয়। আরেকটা জিনিস ২০১৯ সালে হয়তো আমাদের পেস আক্রমণ এতটা ভালো ছিল না, ২০২৩ সালে যতটা হয়েছে। তুলনা করলে অনেক ভিন্নতা পাবেন। এই ম্যাচ জেতাতে আমরা খুশি সবাই।








