আতাহার আলী খান। সাবেক জাতীয় ক্রিকেটার ও বর্তমান ধারাভাষ্যকার। তার মুখ থেকেই সর্বপ্রথম ‘বাংলাওয়াশ’ প্রতিধ্বনি উচ্চারিত হয়েছিল। দেশের ক্রিকেটাঙ্গনে ধারাভাষ্যের অচেনা পথ তিনিই উন্মুক্ত করেছেন। সেই পথের পথিক হচ্ছে নতুন প্রজন্ম। বিশ্বকাপে বাংলাদেশকে নিয়ে নিজের স্বপ্নের পাশাপাশি আরও অনেক কিছু নিয়ে কথা বলেছেন তিনি। বিশ্বকাপ উপলক্ষে বাংলা ট্রিবিউনের মুখোমুখি হয়েছেন এই তারকা ধারাভাষ্যকার।
আপনি ক্রিকেট ক্যারিয়ার নিয়ে হতাশ ছিলেন। খেলোয়াড়ি জীবনের ইতি টেনে সফলতার সঙ্গে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ধারাভাষ্য দিয়ে যাচ্ছেন। ধারাভাষ্যকার হিসেবে শেখ কামাল পুরস্কার পেয়েছেন। এমন প্রাপ্তিতে কতখানি তৃপ্ত?
আতাহার আলী খান: আমার স্বপ্ন ছিল, সেই স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। শেখ কামাল পুরস্কারের তালিকা হওয়ার পর যখন ফোন পাই, বিশ্বাসই হচ্ছিল না। মনে হচ্ছিল স্বপ্ন। প্রধানমন্ত্রীকে অনেক শ্রদ্ধা করি। ক্রিকেটের প্রতি তার ভালো লাগা অন্যরকম। ১৯৯৭ সালে আমরা যখন আইসিসি ট্রফি জিতে আসি, আমাদের বিশেষ সংবর্ধনা দিয়েছিলেন তিনি। তার হাত থেকে পুরস্কারটি পাবো, সেটা এখনও বিশ্বাস হচ্ছে না। এই পুরস্কার পেয়ে সত্যিই আমি আনন্দিত, গর্বিত। যারা আমাকে মনোনীত করেছেন তাদের ধন্যবাদ জানাই।
আপনাকে ‘ভয়েস অব বাংলাদেশ’ বলা হয়। এটা, নাকি সাবেক ক্রিকেটার, কোন পরিচয় বেশি উপভোগ করেন?
আতাহার: দেখুন, এখানে তুলনা করতে চাই না। আমি হয়তো এখন ধারাভাষ্যকার। কিন্তু এখানেও ক্রিকেট জড়িত। ক্রিকেট ছাড়া তো আমার ধারাভাষ্যকার হওয়ার সুযোগ থাকতো না। ২৩ বছর ধারাভাষ্য দেওয়ার পর এই পুরস্কার পেয়েছি। বাংলাদেশের হয়ে যখন আন্তর্জাতিক ক্যাপ পরি, সেটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়া। আমাদের সময়ে তো এত ম্যাচ খেলার সুযোগ ছিল না। ১৯৮৮ থেকে ১৯৯৮ পর্যন্ত আমার ক্যারিয়ার। এই দশ বছরে ১৯টি ওয়ানডে ম্যাচ খেলেছি। ২৪ বছর ঘরোয়া ক্রিকেট খেলেছি। ক্রিকেট ছাড়ার আগে থেকেই আমার ইচ্ছে ছিল যেভাবেই হোক ক্রিকেটের সঙ্গে থাকবো। ২০০৪ পর্যন্ত ঘরোয়া ক্রিকেট খেলি, তার আগেই ২০০০ সালে ধারাভাষ্যকার হিসেবে সুযোগ পাই।
ধারাভাষ্যের শুরুটা কীভাবে?
আতাহার: ১৯৯৮ সালে বাংলাদেশের হয়ে আমরা ইউরোপের তিনটি দেশ ইংল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড ও স্কটল্যান্ড সফরে যাই। পরের বছর প্রথম বিশ্বকাপ খেলবো। বিশ্বকাপে বাংলাদেশ ভালো কিছু করতে পারে, এটা ভেবেই হয়তো যুক্তরাজ্যের একটি প্রাইভেট টেলিভিশন চ্যানেল আমাদের নিয়মিত অনুসরণ করতো। প্রতিটি ম্যাচ শেষেই আমাদের একজনের ইন্টারভিউ করতো ওরা। ইংরেজি বলার দক্ষতার কারণেই ম্যানেজার লিপু (গাজী আশরাফ) বেশিরভাগ সময় আমাকেই ক্যামেরার সামনে পাঠাতেন। চ্যানেলের ক্যামেরা পারসন মার্ক ওডয়্যারের সঙ্গে পরিচয়টা তখনই। এরপর খুব বেশি দিন অপেক্ষা করতে হয়নি, আমার ধারাভাষ্যকার হিসেবে অভিষেক হয় তার মাধ্যমেই।
সেই গল্পটা শুনতে চাই...
আতাহার: ২০০০ সালের কথা। ভারতের বিপক্ষে অভিষেক টেস্টের আগের দিন (৯ নভেম্বর) হোটেল শেরাটনে যাই, আমাদের ক্রিকেটারদের শুভেচ্ছা জানাতে। ওই সময় দেখা ওডয়্যারের সঙ্গে। আমাকে দেখেই জিজ্ঞেস করলো, কী কারণে ওখানে গেছি? আমি সুযোগ বুঝে বলি, ‘কমেন্ট্রি করতে চাই। কার সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে, জানা নেই।’ ও বললো, ‘আরে, আমিই তো প্রোডিউসার। কালকে চলে এসো।’ কমেন্ট্রি বক্সে গিয়ে দেখি ইয়ান চ্যাপেল, সুনীল গাভাস্কার, মাইকেল হোল্ডিং ও টনি গ্রেগরা। উত্তেজনায় হাত পা ঠান্ডা হয়ে গেলো।
ধারাভাষ্যের প্রথম দিনের অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?
আতাহার: অভিষেকের দিনে দুই দফায় আধঘণ্টা করে মোট এক ঘণ্টা কমেন্ট্রি করার সুযোগ পাই। প্রথমবার যখন মাইক্রোফোন হাতে নিয়েছি, আমার শরীর ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল। আমার পাশে তখন কমেন্টেটর ইয়ান চ্যাপেল! তাকে দেখে মনে হচ্ছিল, ভয়ংকর কোনও ফাস্ট বোলারের বিপক্ষে ব্যাটিংয়ের জন্য দাঁড়িয়ে আছি। প্রথম কয়েক মিনিট তো মুখ দিয়ে কথাই বের হচ্ছিল না! পরে অবশ্য ধীরে ধীরে অস্বস্তি কেটে যায়।
মুলতান টেস্টে তো রমিজ রাজার সঙ্গে কথা কাটাকাটি হয়েছিল...
আতাহার: মুলতান টেস্টে অলক কাপালির ক্যাচ নিয়ে রশিদ খান প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছিল। উইকেটের পেছনে ক্যাচ নিয়ে রশিদ যখন ড্রাইভ দিলেন, তখন ক্যাচটা পড়ে গিয়েছিল। বলটা ইনজামামের (ইনজামাম-উল-হক) সামনে থেকে তুলে আউটের আবেদন করে রশিদ লতিফ। এই আউট নিয়েই রমিজের সঙ্গে তর্কে লিপ্ত হই। তখন চিটার বলি রশিদকে, রমিজ তখন আমাকে উত্তর দেয় ‘টিপিক্যাল বাংলাদেশি কমেন্ট’। পরে আমি রিপ্লাই দেই ‘অ্যান্ড রশিদ ডিড হোয়াট ইজ টিপিক্যাল পাকিস্তানি স্টাইল’। এটা নিয়ে কিন্তু অনেক আলোচনা হয়। যখন আমরা ধারভাষ্য দেই, তখন প্রোডিউসারদের কথা শুনতে পাই। ওখান থেকে আমাকে বলা হয়, ‘আতাহার ইউ আর রাইট, গো ফর ইট’। আমি সত্যকে সত্যই বলবো, সত্যকে মিথ্যা বানাতে চাই না। ম্যাচ শেষেও আম্পায়ারিং নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলাম। আমরা আনুষ্ঠানিকভাবেও অভিযোগ করেছিলাম। এরপর রশিদ লতিফ আর কোনও ম্যাচ খেলেনি।
ক্রিকেটারদের মতো আপনাদেরও তাহলে কঠিন সময় পার করতে হয়েছে?
আতাহার: অবশ্যই। ২০০৪ সালে এভাবে কথা বলাটা আমার জন্য সহজ ছিল না। কিন্তু সেই সাহসটা দেখাতে পেরেছি। ধারাভাষ্য দেওয়ার সময় মনে হতো প্রতিটি ধারাভাষ্যকার আমার দিকে তাকিয়ে আছে। তাদের তাকানো দেখে মনে হতো, তারা মনে মনে বলছে, ‘এখানে কী করতে আসছো?’ নিজেও কষ্ট পেতাম ম্যাচ জিততে পারছি না, ফাইট করতে পারছি না। কিন্তু আমি সবসময় বিশ্বাস করেছি, বাংলাদেশ একসময় দাপট দেখাবে। তখন আমাদের সম্মানটা বেড়ে যাবে। মুলতান টেস্টে সত্যকে সত্য বলার পরই আমার ফ্যানবেজ তৈরি হয়।
ওই তর্কের পর রমিজ রাজার সঙ্গে পরে আর আলাপ হয়েছিল?
আতাহার: হয়েছিল। রমিজ বাধ্য হয়ে আমাকে সরি বলেছিল!
তারপর?
আতাহার: কথা কাটাকাটি হয়ে যাওয়ার পর দুজনই একে অন্যের ওপর বিরক্ত ছিলাম। তার স্ত্রী তাকে ফোন করে বলেছে, ‘আতাহার তো সঠিক ছিল। সিদ্ধান্ত ভুল ছিল, আতাহার সেই ব্যাপারে প্রতিবাদ করেছে।’ এরপর রমিজ আমাকে সরি বলে তার বাসায় আমন্ত্রণ জানায়। তারপর থেকে সে আমার সবচেয়ে ক্লোজ ফ্রেন্ড হয়ে গেছে। আমাদের এখন তেমন দেখা হয় না, কিন্তু নিয়মিত যোগাযোগ আছে। তাকে আমি অনেক সম্মান করি।
ধারাভাষ্য কক্ষে আপনার ভালো অভিজ্ঞতা শুনতে চাই।
আতাহার: ২০০৫ সালের কথা তো বলতে হবে, ‘ওই অস্ট্রেলিয়া দেখো’! জয়ের খুব কাছে ছিলাম আমরা। ওই মুহূর্তে আমি ধারাভাষ্যে ছিলাম না। পেছনে হাঁটাহাঁটি করছি টেনশন নিয়ে। তখন ক্যামেরটা আমার দিকে ধরা হয়। বব উইলিস মারা গেছেন, তিনি আমাকে বাতাস করছিলেন। এই দৃশ্যটাই স্ক্রিনে দেখানো হয়েছিল। খুব ভালো অভিজ্ঞতা। যখন আমরা ম্যাচটা জিতি তখন প্রোডিউসার এসে বলেন, তুমি কিছুক্ষণের জন্য জয়েন করো। আমি কেবল বলি, ‘লুক অ্যাট দ্যাট অস্ট্রেলিয়া।’ ২০০৭ বিশ্বকাপে আমরা ভারতকে হারিয়েছি। সেটাও ছিল বিশাল একটা অর্জন। মাঠে আমাদের ক্রিকেটারদের এমন সাফল্যের কথা গলা ফাটিয়ে বলতে পারাটা সৌভাগ্যের।
আপনার ধারাভাষ্য নিয়ে সমালোচনাও হয়। সেটাকে কীভাবে দেখেন?
আতাহার: আমি যখন ধারাভাষ্য দিতে যাই, আমার মন ও মুখ থেকে যা বের হয়, এগুলো নিয়ে চর্চা হলে ভালোই লাগে। তবে অনেক সময় ক্রিটিসিজম হয়, তখন খারাপ লাগে। আমরাও ভুল করতে পারি। অনেক সময় উত্তেজনাবশত কিছু ভুল হয়ে যেতে পারে। এটা স্বাভাবিক।
‘বাংলাওয়াশ’ শব্দের জনক আপনি, এটা নিয়ে দেশে-বিদেশে আলোচনা হয়। কেমন লাগে?
আতাহার: শব্দটা আমি কিন্তু হুট করে বলেছি। নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে আমাদের খেলা ছিল। ধারাভাষ্য কক্ষে আমার সঙ্গে ছিলেন ড্যানি মরিসন। যখন
নিজজিল্যান্ডের শেষ উইকেটটা পড়ে, কোনও পরিকল্পনা ছাড়াই আমার মুখ থেকে শব্দটা বেরিয়ে যায়। এর আগে হোয়াইটওয়াশ, বøাকওয়াশ শব্দগুলো ব্যবহার হয়েছে। সেদিন আমার মন থেকেই ‘বাংলাওয়াশ’ শব্দটা বেরিয়ে আসে।
বিশ্বকাপে কমেন্ট্রির জন্য কতটা প্রস্তুত?
আতাহার: কমেন্ট্রি বক্সে যুদ্ধ করে আসছি সেই ২০০০ সাল থেকে। আগে যেমন টেনশন হতো, চিন্তা করতাম কী বলবো, পাশে থাকা ধারাভাষ্যকার আমার কথা কীভাবে নেবে। এখন সেসব চিন্তা নেই। ক্রিকেটাররাই আমাদের সম্মান বাড়িয়ে দিয়েছেন। আজকে যখন কমেট্রি বক্সে যাই, আমার বুকটা ফোলা থাকে, আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি।
এই বিশ্বকাপে বাংলাদেশকে নিয়ে আপনার স্বপ্ন কী?
আতাহার: শুধু আমি না, আমাদের ১৭ কোটি মানুষের স্বপ্নই তো বিশ্বকাপ জেতা। বিশ্বকাপ ট্রফিটা শুধু এভাবে আসলে হবে না, আসলো, আমরা ছবি তুললাম, আবার চলে গেলো। আমরা দেখতে চাই আমাদের অধিনায়ক সাকিব আল হাসান ট্রফিটা হাতে তুলছে। আমি কমেন্ট্রি বক্সে কমেন্ট্রি করছি। এটাই স্বপ্ন। এই স্বপ্ন দেখতেই হবে, পূরণ হওয়ার আগ পর্যন্ত। আমি মনে করি এটাই সঠিক সময় বাংলাদেশের বিশ্বকাপের স্বপ্নপূরণের। এর আগেও আইসিসি ইভেন্টে আমরা ভালো করেছি। আমাদের প্লেয়াররা এখন বিশ্বাস করে, তাদের দিয়ে বিশ্বকাপ জেতা সম্ভব। কেন যেন মনে হয় নতুন যে কয়েকজন মুখ এসেছে তারাই ভাইটাল রোল প্লে করবে। বেশ কয়েকজন তরুণ আছে, যারা অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ ট্রফি জিতিয়েছে, তারা দলে আছে। আমি আগেও বলেছি এখনও বলবো, যে খেলোয়াড়রা অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ জিতিয়েছে তারাই হবে আমাদের ভবিষ্যৎ।
কী কারণে বাংলাদেশকে এগিয়ে রাখছেন?
আতাহার: এবারের ফরম্যাটটা ভালো। প্রতিটি দল প্রতিটা দলের সঙ্গে খেলবে। কোনও শর্টকাট নেই। ৪-৫টা ম্যাচ জিতেও না যেতে পারে, আবার জিতলেও চলে যেতে পারে। শুধু আমাদের জন্য নয়, সবার জন্যই একই ফরম্যাট। আমার বিশ্বাস, বাংলাদেশ যদি নিজেদের পরিকল্পনা মতো ক্রিকেট খেলতে পারে তাহলে অবশ্যই সম্ভব। তবে ২-১ জন ভালো খেললে হবে না, পুরো দলকেই ভালো খেলতে হবে। সম্মিলিত পারফরম্যান্সেই সাফল্য সম্ভব। আমাদের বোলিং আক্রমণ দুর্দান্ত। যদি ভালো ব্যাটিং করতে পারি, তাহলে প্রতিপক্ষের খবর আছে!
বিশ্বকাপের দল নিয়ে আপনার ভাবনা?
আতাহার: বিশ্বকাপের দল নিয়ে একেক জনের মন্তব্য একেক রকম হতে পারে। কিন্তু নির্বাচক, অধিনায়ক ও টিম ম্যানেজমেন্টের ভাবনাই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তারা যে টিমটাকে সেরা হিসেবে বিবেচিত করেছেন, ওটাই দিয়েছেন। সুতরাং এই দলটার ওপর আস্থা রাখতে হবে। আমরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কেউ দলে না থাকলে তাকে নিয়ে আলোচনা করি। বলার চেষ্টা করি ওকে নিলে ভালো হতো, তাকে নিলে ভালো হতো। এভাবে চিন্তার কিছু নেই। নির্বাচকদের জন্য এটা মোটেও সহজ সিদ্ধান্ত নয়। অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদের সঙ্গে তরুণদের যে সংমিশ্রণ ঘটেছে, তাতেই বাংলাদেশ দলের চেহারা পাল্টে গেছে।








