‘দাদা, পাওয়ার প্লে শেষ, বাইরে চার ফিল্ডার’ -লিটন দাসকে বলছিলেন মেহেদী হাসান মিরাজ। লিটন অবশ্য ওই চার ফিল্ডারকে ফাঁকি দিয়ে বাউন্ডারি মারতে পারেননি। বরং মিরাজের অফস্টাম্পের বলটাকে বেশ সমীহই করলেন! চট্টগ্রামে জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে ওয়ানডে সিরিজ সামনে রেখে ক্রিকেটারদের অনুশীলন শুরু হয়েছে। শীত বিদায় নিয়েছে বেশি দিন হয়নি, তারপরও চট্টগ্রামে তীব্র গরম। তপ্ত রোদে দুপুর দেড়টা থেকে প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে অনুশীলন করেছে পুরো দল। এই গরমের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে মোস্তাফিজ, লিটন, মুশফিকরা মাঠে কাটিয়েছেন লম্বা সময়। মোস্তাফিজের দারুণ এক ডেলিভারিতে তো সৌম্যর স্টাম্পটাই উপড়ে গেলো!
নিদাহাস ট্রফি থেকে বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কার লড়াই নতুন মাত্রা পায়। ‘নাগিন ড্যান্স’ বিতর্ক ছড়িয়ে পড়েছিল সবখানে। এরপর যতবার শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে মুখোমুখি হয়েছে বাংলাদেশ, ঘুরে ফিরে এসেছে ‘নাগিন ড্যান্স’ প্রসঙ্গ। তবে ‘নাগিন ড্যান্স’ বিতর্ক ঢাকা পড়ে যায় ‘টাইমড আউট’ বিতর্কের কাছে। সর্বশেষ গত ওয়ানডে বিশ্বকাপে অ্যাঞ্জেলো ম্যাথুজের ‘টাইমড আউট’ কাণ্ডে দুই দলের লড়াই রূপ নিয়েছে মহারণে। সিলেটে তিন ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজ বাংলাদেশের ব্যাটাররা আউট হলেই ম্যাথুজসহ অনেকেই ঘড়ি দেখিয়ে ‘টাইমড আউট’ প্রসঙ্গ টেনে এনেছেন। শুধু তাই নয়, ২-১ ব্যবধানে সিলেটে সিরিজ জেতার পর পুরো দল ট্রফি নিয়ে ‘টাইমড আউট’ উদযাপন করেছে শ্রীলঙ্কা।
সিলেটের সেই ঝাঁজ চট্টগ্রামেও যে থাকবে, সেটা অনুমান করাই যায়! নিজেদের গ্রাউন্ডে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে কুড়ি ওভারের সিরিজ হেরে যাওয়া মেনে নিতে পারছেন না কোনও ক্রিকেটার। চট্টগ্রামে টি-টোয়েন্টির বদলা ওয়ানডেতে নেওয়ার সুযোগ নাজমুল হাসান শান্তর দলের। কথা দিয়ে তো ‘প্রতিশোধ’ নেওয়া যায় না, তাই পুরো দলই নিজেদের সেরা পারফরম্যান্স দিতে মুখিয়ে। এই লক্ষ্যে সোমবার কড়া রোদে কঠোর অনুশীলন করেছেন মুশফিক-লিটন-সৌম্যরা।
দুপুর দুইটার বেশ আগেই পুরো দলকে নিয়ে মাঠে হাজির হন প্রধান কোচ চন্ডিকা হাথুরুসিংহে। বেশ সময় নিয়ে ওয়ার্মআপ করেন ক্রিকেটাররা। কিছুক্ষণ ফুটবলও খেলেন। এরপর শুরু হয় নেট সেশন। ড্রেসিংরুম প্রান্তের দুটি নেটে ব্যাটিংয়ে নামেন শান্তসহ টপ অর্ডার ব্যাটাররা। তাসকিন-শরিফুলদের বিপক্ষে ব্যাটিং শুরু করেন শান্ত। ব্যাটিং শেষ হওয়ার পর ফিল্ডিং কোচের সঙ্গে বিশেষ এক অনুশীলন পর্বও সারেন। মাঠের এক কোনায় দাঁড়িয়ে শান্তকে ভারসাম্য রাখা শেখাচ্ছিলেন কোচ। হাতে দুই বল নিয়ে শান্তর কাছে একটি বল থ্রো করছিলেন। চৌকস শান্ত অল্প কয়েকটা মিস করলেও বেশিরভাগই নিতে পেরেছেন। হয়তো এভাবে অনুশীলন করে মনোসংযোগ ঠিক রাখার চেষ্টা করেছেন অধিনায়ক।
এদিকে প্রধান কোচ হাথুরুসিংহে ও ব্যাটিং কোচ ডেভিড হেম্পের তত্ত্বাবধানে প্রেসবক্স প্রান্তের নেটে শুরু হয় লিটন ও সৌম্যর নেট সেশন। পাশাপাশি দুই নেটে লিটন শুরুতে মোকাবেলা করেন পেস বোলার মোস্তাফিজ ও তানজিম হাসান সাকিবকে। সঙ্গে ছিলেন ‘বেবি মালিঙ্গা’ খ্যাত সোহান নামের স্থানীয় এক নেট বোলার। মুশফিকই সোহানকে খুঁজে বের করেছেন। অনেকটা লাসিথ মালিঙ্গা ও নুয়ান থুসারার মতোই বোলিং অ্যাকশন তার। সিলেটে সিরিজ নির্ধারণী ম্যাচে থুসারার কাছেই পরাজিত হয়েছিল বাংলাদেশ। হয়তো থুসারার বিপক্ষে প্রস্তুতি নিতেই সোহানকে নেটে খেলেছেন লিটন-সৌম্য-মুশফিকরা! সোহানের বেশ কিছু বলে বিট হতে হয়েছে জাতীয় দলের ব্যাটারদের।
গত কিছুদিন ধরেই মোস্তাফিজের বোলিং ভালো হচ্ছে না। লঙ্কানদের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি সিরিজে বেশ ভুগতে হচ্ছে এই পেসারকে। টানা তিন ম্যাচেই ৪০ এর বেশি রান দিয়েছেন। সিলেটের উইকেটে ঘাস ছিল। ওই উইকেটে বাংলাদেশের পেসার সবাই কম বেশি সিম মুভমেন্ট পেয়েছেন। কিন্তু এমন উইকেটে মোস্তাফিজে একের পর এক করে গেছেন স্লোয়ার আর কাটার। ফলাফল খরুচে বোলার। কোনও ইমপ্যাক্টই রাখতে পারেননি তিনি টি-টোয়েন্টি সিরিজে। তবে সোমবার অনুশীলনে ভিন্ন মোস্তাফিজকে পাওয়া গেছে।
তার অফস্ট্যাম্পের ইনসুইং বলগুলো খেলতেই পারছিলেন না লিটন। মোস্তাফিজ টানা ৬ ওভারের মতো বোলিং করেছেন। তার বলে বাউন্ডারি তো দূরে থাক, কেউই ঠিকঠাক খেলতে পারেননি।
বাঁহাতি এই পেসার সৌম্যকে যেভাবে বোল্ড করলেন, এমন বল অনেকদিন ধরেই হচ্ছে না তার। মিডল স্টাম্পের ওপর পিচড করা বল খানিকটা সুইং করে ঢুকে গেলো ভেতরে। সৌম্য ব্যাট নামানোর আগেই বোল্ড! মোস্তাফিজ টানা বোলিংয়ে হয়তো বার্তা দিয়ে রাখলেন, ‘আমি ফুরিয়ে যাইনি!’ মোস্তাফিজের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তানজিম সাকিবও দারুণ বোলিং করেছেন।
একপাশে লিটনের বিপক্ষে পেসাররা, পাশের নেটে সৌম্যর বিপক্ষে মিরাজ, তাইজুল ইসলাম ও রিশাদ হোসেনরা বোলিং করেছেন। পরে অবশ্য নেট বদল করেছেন সৌম্য-লিটন। স্পিনারদের বিপক্ষে দুজনই সাবলীল ব্যাটিং করেছেন। পাওয়ার প্লেতে মিরাজ বড় পরীক্ষা নিয়েছেন সৌম্যকে। বেশ কিছু বল সুইপ করতে গিয়ে ব্যাটে-বলে সংযোগ করতে পারেননি সৌম্য-লিটন। তাইজুল অবশ্য বেশ কিছু বাউন্ডারি খেয়েছেন। রিশাদের বেশ কিছু বল নিশ্চিতভাবেই উইকেটকিপারের তালুবন্দি হবে। বোলারদের বোলিংয়ে কোনও ত্রুটি দেখলেই হাথুরুসিংহে এসে কথা বলেছেন কয়েক দফা।
মোস্তাফিজকে বেশ কয়েকবার বাহবা দিতে দেখা গেছে। রিশাদ, তাইজুল, মিরাজের সঙ্গে একাধিকবার কথা বলেছেন হাথুরুসিংহে। মিরাজকে তো কাছে ডেকে সিমের মুভমেন্ট বুঝিয়ে দিয়েছেন বাংলাদেশের প্রধান কোচ।
লিটন-সৌম্যর ব্যাটিং শেষে একই নেটে যোগ দেন অভিজ্ঞ দুই ক্রিকেটার মুশফিক ও মাহমুদউল্লাহ। তখনও বোলিং চালিয়ে যাচ্ছেন মোস্তাফিজ। আজ যেন পণ করে নেমেছেন নেটে বোলিং করে ইতিহাস গড়বেন! কিছুক্ষণ পর এই নেটে যুক্ত হন তাসকিন আহমেদ ও শরিফুল ইসলাম। ব্যাটিং শেষে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে বোলিংয়ে আসেন সৌম্যও। একই রকমভাবে প্রেসবক্সের প্রান্তের নেটে লম্বা সময় ব্যাটিং করেন মুশফিক ও মাহমুদউল্লাহ। মুশফিকের যেন এই ব্যাটিংয়ে কিছুই হয়নি। বিপরীতের পাশের নেটে গিয়ে থ্রো ডাউনের বিপরীতে কিছুক্ষণ আবার ব্যাটিং করলেন। এখানেই শেষ নয়, উইকেটে পাশে গিয়ে চললো হালকা নক। লিটনও তাই করেছেন। প্রেসবক্স প্রান্তের নেটে ব্যাটিং শেষে ড্রেসিংরুম প্রান্তের নেটেও ব্যাটিং অনুশীলন করেছেন।
লেগ স্পিনার রিশাদকেও আলাদাভাবে ব্যাটিং অনুশীলন করিয়েছেন হাথুরুসিংহে। সিলেটে শেষ ম্যাচে বিস্ফোরক এক ইনিংস খেলে নিজের ব্যাটিং সামর্থ্য জানান দিয়েছিলেন তিনি। স্বাভাবিকভাবেই লঙ্কানদের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজে তাকে ব্যবহার করতে চাইবে টিম ম্যানেজমেন্ট।









