কত যে অপেক্ষা। কত যে ক্ষণ গণনা। শুধু ব্রাজিল কিংবা আর্জেন্টিনা নয়, লাতিন অঞ্চল পেরিয়ে ম্যাচটির প্রতীক্ষায় থাকে গোটা বিশ্ব। যে ম্যাচ উত্তেজনার ঢেউ তোলে ফুটবল সাগরে, যে ম্যাচ রোমাঞ্চের মহাসাগরে ডুবিয়ে নিয়ে যায় গোটা বিশ্বকে। আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের এই দ্বৈরথ যুগ যুগ ধরে ফুটবল রোমান্টিকদের ভিজিয়ে যাচ্ছে উত্তেজনা-রোমাঞ্চের বৃষ্টিতে। আগামীকাল (শুক্রবার) বাংলাদেশ সময় ভোর ৫-৪৫ মিনিটে (ম্যাচটি দেখা যাবে সনি সিক্স চ্যানেলে) আরেকবার ফুটবল বিশ্বকে মাতাতে প্রস্তুত চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দুই দল। উপলক্ষ লাতিন আমেরিকার বিশ্বকাপ বাছাই। আর মঞ্চ বেলো হরিজোন্তের মিনেইরো স্টেডিয়াম।
এই সেই মাঠ, যেখানে ইতিহাসের দুঃখ ভুলতে এসে উল্টো নির্মমতার শিকার হয়েছিল ব্রাজিল। যেখানে কান্নার সাগরে বিষাদের ঢেউ উঠেছিল ব্রাজিলিয়ানদের আর্তনাদে। ‘মারাকানোজো’র পর নতুন করে কাঁটা হয়ে বিঁধেছিল ‘মিনেইরোজো’। বছর দুয়েক আগে এই মাঠেই জার্মানির বিষাক্ত ছুরিতে হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়েছিল ব্রাজিলিয়ানদের। ৭-১ গোলে বিধ্বস্ত হওয়ার যন্ত্রণা আজও বুকে বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে লাতিন দেশটির ফুটবলপ্রেমিরা। ওই ট্র্যাজিডির পর মিনেইরোর মাঠে বিশ্বকাপ বাছাইয়ের এই ম্যাচ দিয়েই ফিরছে ব্রাজিল। সামনে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনা।
ম্যাচটা অনেক কারণে গুরুত্বপূর্ণ। সেটা ব্রাজিলের মিনেইরোতে ফেরা যেমন, তেমনি আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ বাছাইয়ে টিকে থাকার লড়াইয়ের জন্যও। যদিও আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের দ্বৈরথে এই সব বিষয় এমনিতেই সরে যায় এক পাশে। পরিসংখ্যান, ইতিহাস এখানে আসল কোনও কথা নয়; মূল বিষয় একটাই-মর্যাদার। সেই মর্যাদার লড়াইটা নিঃসন্দেহে আরও বেশি উপভোগ্য করে তুলবে পয়েন্ট টেবিল, বিশ্বকাপ বাছাই ও লিওনেল মেসি-নেইমারের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যাওয়া।
ক্লাব ফুটবলে বার্সেলোনার জার্সিতে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেন দুজন। একজন অন্যজনকে বানিয়ে দেন গোল। সেই তারাই ভোরে একে অন্যের ‘শত্রু’। শত্রুতার কথা আগেই নেইমার উড়িয়ে দিলেও দেশের জার্সি গায়ের লড়াইয়ে যে বন্ধুত্বের কোনও জায়গা নেই, সেটা না বললেও তো চলে! আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের ম্যাচের আবহে তাই বাজছে দুই ‘সতীর্থের’ লড়াইয়ের সুরও।
বেলো হরিজোন্তের ম্যাচটা আর্জেন্টিনার জন্য ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। রাশিয়া বিশ্বকাপের লড়াইয়ে টিকে থাকতে হলে ব্রাজিল থেকে জিতে ফেরাটা খুব দরকার তাদের। এই মুহূর্তে পয়েন্ট টেবিলের ষষ্ঠ স্থানে যে আলবিসেলেস্তেরা। সরাসরি রাশিয়া যাওয়ার জায়গাতে তো নেই-ই, এমনকি প্লে অফ খেলার যোগ্যতার জায়গাতেও নেই মেসিরা! ব্রাজিল ম্যাচটা এই সমীকরণটা পাল্টে দিতে পারে তাদের। আর সেটা পাল্টানোর জন্য মেসির দিকেই তাকিয়ে গোটা আর্জেন্টিনা। অধিনায়ককে ছাড়া আসলে দুইবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের এই হাল। তাকে ছাড়া এবারের লাতিন আমেরিকার বিশ্বকাপ বাছাইয়ে জয়ের দেখা পায়নি আর্জেন্টিনা। চোটের কারণে সবশেষ তিন ম্যাচ খেলতে পারেননি বার্সেলোনা ফরোয়ার্ড, যার মধ্যে দুটিতে ড্র ও একটিতে হেরেছে আলবিসেলেস্তেরা।
ব্রাজিলের বিপক্ষে আর্জেন্টিনা কোচ এদগার্দো বাউসা দল সাজাবেন মেসিকে ঘিরেই। ফরোয়ার্ডে তার সঙ্গে গনসালো হিগুয়েইন যে থাকছেন, বাউসা সেটা একরকম নিশ্চিতই করে দিয়েছেন ‘শুরুর একাদশে থাকছে না সের্হিয়ো আগুয়েরো’ মন্তব্য করে। তাই ৪-৩-৩ ছকে মেসি-হিগুয়েইনের সঙ্গে প্রত্যাশামতই থাকবেন আনহেল দি মারিয়া। ব্রাজিলের একাদশও একরকম নিশ্চিত করে দিয়েছেন তিতে। বিশ্বকাপ বাছাইয়ের আগের ম্যাচের দলটাই রাখবেন তিনি। শুধু লেফট ব্যাকে ফিলিপে লুইসের জায়গায় খেলবেন চোট কাটিয়ে ফেরা মার্সেলো।
সব মিলিয়ে ‘সুপার ক্লাসিকো’তে দুই দল মুখোমুখি হয়েছে ৯৭বার। যেখানে উত্তেজনা-রোমাঞ্চের ফুলঝুড়ি ছড়ানো আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের ব্যবধান গায়ে গা লাগানো। ব্রাজিলের ৩৮ জয়ের বিপরীতে আর্জেন্টিনা জিতেছে ৩৭ ম্যাচ। ড্র হয়েছে ২২ ম্যাচ। বিশ্বকাপ বাছাইয়ের এই ম্যাচ জিততে পারলে তাই আর্জেন্টিনা জয়ের খাতায় ধরে ফেলবে ব্রাজিলকে।
শুধু সংখ্যা সমানের জন্য নয়, বিশ্বকাপ যাত্রায় গতি আনতে ব্রাজিল জয়টা ভীষণ দরকার আর্জেন্টিনার। পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষে থাকা ব্রাজিল কী আর তা হতে দেবে!
/কেআর/








