এক সময় আবাহনী-মোহামেডান ম্যাচের উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়তো সারা দেশে, বাংলাদেশ দু ভাগ হয়ে যেতো দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর লড়াইয়ের উত্তাপে। ম্যাচের দিন গলি থেকে রাজপথ সবখানে উড়তো দুই দলের পতাকা। ম্যাচের কয়েক দিন আগে থেকে কয়েক দিন পরেও আলোচনার বিষয় ছিল একটাই, আবাহনী-মোহামেডান লড়াই। কিন্তু এখন দেশের দুই জনপ্রিয় ক্লাবের খেলা হয় ফাঁকা গ্যালারিতে। গত ২২ নভেম্বর প্রিমিয়ার ফুটবল লিগে মুখোমুখি হয়েছিল আবাহনী-মোহামেডান। সেদিন বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে বড় জোর হাজার দুয়েক দর্শক হয়েছিল!
অথচ ঢাকার ঠিক বিপরীত চিত্র কলকাতায়। রবিবার কলকাতার যুব ভারতী ক্রীড়াঙ্গনে ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগান ম্যাচ উপভোগ করেছেন প্রায় ৬৮ হাজার দর্শক। ভারতের পেশাদার ফুটবল লিগ আই-লিগের এই ম্যাচে একমাত্র গোলে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীকে হারিয়ে শিরোপা লড়াইয়ে এগিয়ে গেছে মোহনবাগান।
প্রায় ৯ বছর আগে, ২০০৯ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি আবাহনী-মোহামেডান ম্যাচে সর্বশেষ গ্যালারি উপচে পড়া দর্শক হয়েছিল। সেদিন এক কোটি টাকা প্রাইজমানির সুপার কাপে দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর লড়াইয়ের সময় বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে তিল ধারণের জায়গা ছিল না। কিন্তু এখন আবাহনী-মোহামেডান ম্যাচ নিয়ে এমন আগ্রহ কল্পনা করাই কঠিন।
সৃষ্টিশীল ফুটবলারের অভাব, যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার ব্যর্থতা, শিরোপা লড়াইয়ে পিছিয়ে পড়া—দুই দলের ম্যাচ নিয়ে উত্তেজনা কমে যাওয়ার অনেক কারণ। আবাহনী তা-ও চ্যাম্পিয়ন হওয়ার মতো দল গড়ে। কিন্তু গত কয়েক মৌসুম ধরেই সাদামাটা দল গড়ছে মোহামেডান। ২০০৭ সালে পেশাদার লিগ চালু হলেও এখনও শিরোপা জিততে পারেনি ঐতিহ্যবাহী সাদা-কালো শিবির!
আবাহনী-মোহামেডান ম্যাচে উত্তেজনা নেই, তাই মাঠে দর্শকও নেই। এ নিয়ে বেশ ক্ষুব্ধ বাংলাদেশের একমাত্র উয়েফা ‘এ’ লাইসেন্স প্রাপ্ত কোচ মারুফুল হক। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বললেন, ‘ফুটবলকে ব্যক্তিগত সম্পত্তি মনে করা হচ্ছে। ফুটবল তো আমজনতার খেলা, কিন্তু এটাকে কুক্ষিগত করে রাখা হয়েছে। আমাদের এখানে ফুটবল সংস্কৃতিই গড়ে ওঠেনি।’
ভারতে ফুটবল ভীষণ জনপ্রিয়, অথচ বাংলাদেশে দিন দিন জনপ্রিয়তা কমছে। মারুফুলের মতে, ‘ভারতে সুনীল ছেত্রী, জেজের মতো তারকা ফুটবলার আছেন। তাদের খেলা দেখতে দর্শক মাঠে আসে। আমাদের তেমন তারকা ফুটবলার নেই, ভালো ফুটবলার কোথা থেকে আসবে? আমাদের কি ফুটবলার তৈরির কোনও পরিকল্পনা আছে? সব কিছুই চলছে নাম কা ওয়াস্তে।’
আবাহনীর সাবেক ফুটবলার ও বর্তমান ম্যানেজার সত্যজিত দাশ রুপুও ফুটবলের জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ায় চিন্তিত। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন, ‘আগে লোকে অফিস করে খেলা দেখে বাসায় ফিরতো। এখন আর তা সম্ভব নয়। গুলিস্তান থেকে মিরপুর যেতে লাগে তিন ঘণ্টা! তাছাড়া সমর্থকদের ক্লাবের প্রতি ভালোবাসাও কমে গেছে। তারকা খেলোয়াড় বেরিয়ে আসতে হবে, কারণ তারকাদের খেলা দেখতেও দর্শক মাঠে আসে। জাতীয় দলের পারফরম্যান্স ভালো হলেও ফুটবলের জনপ্রিয়তা বাড়তো। আসলে ক্লাব-খেলোয়াড় সব কিছুতেই পরিবর্তন আসা উচিত।’
চট্টগ্রাম আবাহনীর সহকারী কোচ জুলফিকার মাহমুদ মিন্টু বিষয়টি দেখছেন এভাবে, ‘দর্শক তো জোর করে আনা যায় না। ফুটবল থেকে মানুষ বিনোদন পায় না বলেই মাঠে আসে না। খেলাটাকে আগে উপভোগ্য করতে হবে, স্থানীয় ভালো খেলোয়াড়ের পাশাপাশি বিদেশ থেকে ভালো মানের খেলোয়াড় আনতে হবে। মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না থাকলে কিছুই হবে না, সব কিছুই হবে দায়সারাভাবে।’
মোহামেডানে দীর্ঘ দিন খেলেছিলেন কাজী জসিমউদ্দিন জোসি। জনপ্রিয় দলটির কোচের দায়িত্বেও ছিলেন তিনি। প্রিয় দলের একটানা ব্যর্থতায় জোসি ব্যথিত। ক্ষোভের সঙ্গে তিনি বললেন, ‘মোহামেডান এখন কাগুজে বাঘে পরিণত হয়েছে। সাফল্য না পেয়ে সমর্থকরা হতাশ। সবাই ধরেই নিয়েছে, মোহামেডান এখন ছোট দল। তাই মোহামেডানকে ঘিরে সমর্থকদের প্রত্যাশাও কম।’








