আজ হয়তো বেঁচে থাকলে আবাহনীই হতো তার ধ্যানজ্ঞান। বিশেষ করে ফুটবল দলের কীভাবে আরও উন্নতি করা যায়, সেদিকে থাকতো দৃষ্টি। কিন্তু নিয়তির খেলা কত নিষ্ঠুর! মাত্র ৩৬ বছর বয়সে নিভে যায় তার জীবন-প্রদীপ। কিডনিজনিত জটিলতার কারণে অকালেই পৃথিবী ছাড়তে হয়েছে দেশের এই ক্ষণজন্মা ফুটবলারকে। আজ তার প্রয়াণের এই দিনে স্ত্রী ইয়াসমিন মোনেম সুরভির হতাশা, ‘মোনেম মুন্নাকে অনেকেই ভুলে গেছে।’
১৯৬৮ সালের ৯ জুন নারায়ণগঞ্জে জন্মেছিলেন মোনেম মুন্না। ১৯৮০-৮১ মৌসুমে পাইওনিয়ার ফুটবল লিগ দিয়ে যাত্রা শুরু হয় ফুটবলে। মুক্তিযোদ্ধা হয়ে ১৯৮৬ সালে ব্রাদার্সে এক মৌসুম খেলেই আবাহনীতে ওই যে যোগ দিলেন, তারপর আর পেছনে ফিরে থাকাতে হয়নি। ক্যারিয়ার শেষ হয়েছে আকাশি-হলুদ জার্সি গায়েই। জাতীয় দলেও ১১ বছর ছিল তার আধিপত্য।
আবাহনীকে পাঁচবার লিগ ও তিনটি ফেডারেশন কাপ জিতিয়েছেন। আন্তর্জাতিক আসরে দেশের হয়ে প্রথম ট্রফি তার হাত ধরে। ১৯৯৫ সালে মিয়ানমারে চার জাতির আসরে চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ। জার্মান কোচ অটো ফিস্টার ছিলেন ওই দলের কোচ। দেশেই শুধু নয়, দেশের বাইরেও সুনাম কুড়িয়েছেন তিনি। ভারতের ইস্টবেঙ্গলে দুই মৌসুম রাজত্ব করেছেন। সেখানকার সমর্থকদের মনও জয় করেছিলেন।
খেলা ছাড়ার পর আবাহনীর ম্যানেজারের দায়িত্ব পালন করার সময় অসুস্থ হয়ে পড়েন মুন্না। কিডনি প্রতিস্থাপনের পর বেশ কিছুদিন ভালো ছিলেন এই ডিফেন্ডার। তারপর এক পর্যায়ে অসুস্থ হয়ে ২০০৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি সকালে চলে গেলেন না ফেরার দেশে।
মুন্নার মৃত্যুতে পুরো দেশ কেঁদেছে। ১৩তম মৃত্যুবার্ষিকীতে এসে অবশ্য তার স্ত্রী ইয়াসমিন মোনেম সুরভি হতাশ কণ্ঠে বলেছেন, ‘মুন্না চলে গেছে আজ ১৩ বছর হলো। এত দিনে অনেকেই তাকে ভুলে গেছে। কেউই এখন আর যোগাযোগ করে না। দুই-একজন তাও একটু যোগাযোগ রাখে। সংগঠক হারুন ভাই ও সাংবাদিক দিলু ভাইরা মনে রেখেছেন। তাদের মাধ্যমে বিভিন্ন সহযোগিতা পেয়েছি।’
মুন্নার স্মরণে ধানমন্ডির আট নম্বর সড়কের নামকরণ হয়েছে। কিন্তু সেই নামফলক আর নেই। তাই আফসোস ঝড়লো তার কন্ঠে, ‘ধানমন্ডির সেই সড়কে গেলে মুন্নার কোনও স্মৃতি দেখতে পাবেন না। ওটা যে ওর নামকরণে হয়েছে, তা বোঝা যাবে না। আমি চাই সেখানে একটি মনুমেন্ট হোক। সবাই জানুক মুন্না কে ছিলেন। এছাড়া নারায়ণগঞ্জে তো কিছুই হলো না।’
এক ছেলে আজমান সালিদ ও এক মেয়ে ইউসরা মোনেম। মেয়ে স্নাতক শেষে চাকরি করছেন। ছেলে ইউল্যাবে মিডিয়া ও জার্নালিজমে অনার্সে ভর্তি হয়েছেন। যেভাবেই হোক ছেলের লেখাপড়া শেষ করতে চাইছেন ইয়াসমিন সুরভী। এই জন্য তিনি প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আর্কষণ করতে চান, ‘সবার সহযোগিতায় ছেলে ও মেয়েকে এই পর্যন্ত নিয়ে এসেছি। মুন্না মারা যাওয়ার পর আমি চিন্তাও করতে পারিনি ছেলে-মেয়েকে এই পর্যন্ত নিয়ে আসতে পারবো। এখন মেয়েকে নিয়ে চিন্তা করি না। ছেলে যেন লেখাপড়া শেষ করতে পারে, সেটা নিয়ে চিন্তা। আমি এখন প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। তিনি যেন আমাদের দিকে একটু তাকান। ভবিষ্যতের জন্য কিছু একটা করে দেন।’
১২ ফেব্রুয়ারি মোনেম মুন্না ও ইয়াসমিন সুরভির বিবাহ বার্ষিকী। আর নিয়তির পরিহাস এমনই যে, এই দিনটিই তার গভীর শোকের!








