নেইমার ইনজুরি পেলেন প্যারিস সেন্ত জার্মেইয়ের জার্সিতে। অথচ চিন্তায় কপালে ভাঁজ ব্রাজিলিয়ানদের! বিশ্বকাপের বছরে অস্ত্রোপচারের পর দলের সেরা অস্ত্রকে রাশিয়ার টুর্নামেন্টে পাওয়া যাবে কিনা, সেই সংশয়ে এখনও লাতিন আমেরিকার দেশটি। পিএসজির চেয়ে তাই দুশ্চিন্তা বেশি ব্রাজিলের।
আর্জেন্টাইনদের দুশ্চিন্তা অত বেশি ছিল না। তবে বিশ্বকাপের আগে ইতালি ও স্পেনের মতো শক্তিশালী দুই প্রতিপক্ষের বিপক্ষে লিওনেল মেসির না খেলাটা কিছুটা হলেও ভাবিয়েছে তাদের। হোর্হে সাম্পাওলি যেহেতু তার দল সাজাচ্ছেন বার্সেলোনা ফরোয়ার্ডকে নিয়ে, তাই তার মাঠে না থাকাটা দলীয় সমন্বয়ে বড় ফাঁকই রেখে দিয়েছে বলে তাদের ধারণা।
হ্যামস্ট্রিং চোটে মেসি খেলতে পারেননি ওই ম্যাচ দুটিতে। অবশ্য সামান্য ঝুঁকি নিতে প্রস্তুতও ছিল না আর্জেন্টাইন টিম ম্যানেজমেন্ট। কিন্তু প্রীতি ম্যাচ শেষ করে বার্সেলোনায় যোগ দিয়ে প্রথম ম্যাচেই বদলি হয়ে মাঠে নেমে পড়লেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। কোনও অস্বস্তি ছাড়ায় দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে সেভিয়ার বিপক্ষে নিশ্চিত হারতে যাওয়া ম্যাচ শেষ করলেন ২-২ ড্রতে।
তবে মেসি যে পুরোপুরি ফিট নয়, তার প্রমাণ পাওয়া যায় রোমার বিপক্ষে চ্যাম্পিয়নস লিগ কোয়ার্টার ফাইনালের প্রথম লেগে। ইতালিয়ান এই দলের বিপক্ষে ঘরের মাঠের প্রথম লেগ ৪-১ গোলে জিতলেও মঙ্গলবার ফিরতি লেগে ৩-০ গোলের হারের সঙ্গে চ্যাম্পিয়নস লিগ থেকে বিদায় নিয়েছে বার্সেলোনা। আর এখানেই আসল লাভটা হয়েছে আর্জেন্টিনার!
চোট নিয়ে যে সামান্য দুশ্চিন্তা আছে পাঁচবারের ব্যালন ডি’অর জয়ীকে নিয়ে, সেটা কাটিয়ে উঠতে পর্যাপ্ত সময় পাবেন এখন মেসি। চ্যাম্পিয়নস লিগ থেকে ছিটকে যাওয়ায় বার্সেলোনার এখন আর চাপ নেই বললেই চলে। কোপা দেল রে’র ফাইনাল নিশ্চিত করে বসে আছে, লা লিগা শিরোপাও হাত ছোঁয়া দূরত্বে। বাকি থাকা ২১ পয়েন্টের মধ্যে ১০ পয়েন্ট পেলেই লিগ শিরোপা জয়ের উল্লাসে মাতবে কাতালানরা।
মেসির ওপর প্রত্যাশার চাপ আর সেভাবে নেই। চাইলে বার্সেলোনা কোচ এরনেস্তো ভালভারদে বিশ্রামেও রাখতে পারবেন দলের সেরা অস্ত্রকে। সেক্ষেত্রে বিশ্বকাপে সতেজ হয়েই নামার সুযোগ পাচ্ছেন ‘এলএমটেন’। মানসিক ও মাঠের ফুটবলের চাপ কমে যাওয়ায় হ্যামস্ট্রিংয়ের যে সমস্যায় ভুগছেন কত কিছুদিন হলো, তা থেকে সেরে উঠতে পাচ্ছেন লম্বা সময়। আর্জেন্টিনার জন্য তা খুশির খবরই বটে!
উৎসব কিন্তু একরকম শুরু হয়ে গেছে আর্জেন্টিনায়। চ্যাম্পিয়নস লিগ থেকে বার্সেলোনার বিদায়ে আর্জেন্টাইন সংবাদমাধ্যমে ছাপা হওয়া খবরে যা ধরা দিয়েছে স্পষ্টভাবে। লাতিন দেশটির নামি সব সংবাদমাধ্যমই বড় করে ছেপেছে মেসির চ্যাম্পিয়নস লিগ থেকে বিদায় নেওয়ার খবর। একই সঙ্গে তা আর্জেন্টিনার জন্য কতটা ‘মঙ্গলজনক’, তাও উল্লেখ করেছে তারা।
দেশটির সবচেয়ে বড় ক্রীড়া দৈনিক ‘ওলে’ যেমন ছেপেছে, ‘মেসি তার সেরাটা দেখাতে পারেননি, তাই ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ধাক্কা পেয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগ থেকে বিদায় নিয়েছে বার্সেলোনা। এখন মেসি তার শরীরের ওপর কম চাপ নিয়ে যেতে পাববেন রাশিয়ায়।’ একই সঙ্গে মনে করিয়ে দিয়েছে, ‘সম্ভবত সবচেয়ে বড় বিষয় হলো হ্যামস্ট্রিং সমস্যা থেকে সেরে উঠতে অনেকটা সময় পাবেন। এই সমস্যায় নিজের স্বাভাবিক খেলাটা খেলতে পারছিলেন না তিনি।’ আরেক সংবাদমাধ্যম ‘ক্লারিন’ তো সরাসরি লিখেই দিয়েছে, ‘মেসির চ্যাম্পিয়নস লিগে থেকে বিদায় নেওয়াটা দরকার ছিল (আর্জেন্টিনা) জাতীয় দলের।’ ‘লা নাসিওন’ আবার ছেপেছে, ‘চ্যাম্পিয়নস লিগ থেকে বিদায় নিয়েছে মেসির বার্সেলোনা। বিশ্বকাপের আগে তার শরীরের ওপর চাপের বোঝা কমে গেল, রাশিয়ায় পাওয়া যাবে সতেজ মেসিকে।’
বিশ্বকাপের আগে চ্যাম্পিয়নস লিগের মতো আসর থেকে এভাবে বিদায় নেওয়াটা যে ‘ভালো খবর না’ সেটাও ছেপেছে সংবাদমাধ্যমগুলো। আত্মবিশ্বাসের পারদ নিচে নেমে যাওয়ার একটা ব্যাপার তো থাকেই। তবে মেসির মতো খেলোয়াড়ের আত্মবিশ্বাস ফেরাতে যে সময় লাগে না, তার অসংখ্য প্রমাণ পেয়েছে ফুটবল বিশ্ব। এই ধাক্কা কাটিয়েও সত্যিকারের মেসিকে পাওয়া যাবে, তাতে কারও সন্দেহ থাকার কথা নয়।
থাকলেও ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য অনেকটা সময় পাচ্ছেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। বিশ্বকাপ আসতে এখনও অনেকটা সময় বাকি। এই সময়ে মেসির বিশ্রাম পাওয়াটা ছিল সব থেকে জরুরি। চোটের ব্যাপার তো আছেই, সঙ্গে চ্যাম্পিয়নস লিগের বড় ম্যাচের চাপটাও থাকছে। ইউরোপিয়ান প্রতিযোগিতাটির এবারের ফাইনাল ২৭ মে, বিশ্বকাপের ঠিক ১৭ দিন আগে। তার মানে বার্সেলোনা ফাইনালে খেললে বিশ্বকাপ শুরুর একেবারে শেষ মুহূর্তে আর্জেন্টিনার ক্যাম্পে যোগ দিতেন মেসি। তাতে দলীয় সমন্বয় ও পরিকল্পনায় কিছুটা ঘাটতি হয়তো থেকেই যেত। কিন্তু চ্যাম্পিয়নস লিগ থেকে বিদায় নেওয়ায় ১৯ মে’র শেষ লা লিগা ম্যাচ খেলেই আর্জেন্টিনা ক্যাম্পে যোগ দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন মেসি।
সবচেয়ে বড় কথা ক্লাব ফুটবলের বিশাল চাপ থেকে আপাতত মুক্তি মিলেছে আর্জেন্টাইন অধিনায়কের। বিশ্বকাপের আগে যা আর্জেন্টিনার জন্য বড় এক সুসংবাদই। চ্যাম্পিয়নস লিগ থেকে বিদায়ে মেসির হতাশা থাকলেও আর্জেন্টাইনরা খুশি। বার্সেলোনার বিদায়ে লাভটা হয়েছে যে তাদেরই!








