অবিশ্বাস্য! পার্ক দে প্রিন্সেসে শেষ বাঁশি বাজার পর ধারাভাষ্যকারের মুখে এই কথাটাই শোনা গেল বেশি। এবং অবশ্যই তা বিস্ময়ভরা কণ্ঠে। প্যারিসের এই মাঠেই যে নতুন রূপকথা লিখলো ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড। ঘুরে দাঁড়ানোর নতুন উদাহরণ তৈরি করে প্যারিস সেন্ত জার্মেইকে বিদায় করে চ্যাম্পিয়নস লিগের কোয়ার্টার ফাইনালে নাম লিখিয়েছে ইংলিশ ক্লাবটি।
শেষ ষোলোর দ্বিতীয় লেগে পিএসজিকে তাদেরই মাঠে ৩-১ গোলে হারিয়ে ইতিহাস লিখেছে ম্যানইউ। প্রথম লেগ ২-০ গোলে হেরে ঘুরে দাঁড়ানো জয়ে দুই লেগ মিলিয়ে রেড ডেভিলরা স্কোর করে ৩-৩, তবে প্রতিপক্ষের মাঠে বেশি গোল দেওয়ার সুবিধা নিয়ে ইংল্যান্ডের সবচেয়ে সফল ক্লাবটি উঠে যায় কোয়ার্টার ফাইনালে। বিপরীতে ওল্ড ট্র্যাফোর্ড থেকে প্রথম লেগ জিতে শেষ আটের ‘প্রস্তুতি’ নিতে থাকা পিএসজি থামলো শেষ ষোলোতেই।
আগের রাতে অঘটন ঘটিয়ে আয়াক্স বিদায় করে দিয়েছে রিয়াল মাদ্রিদকে। ম্যানইউয়ের পথটা ছিল ডাচ ক্লাবটির চেয়েও বেশি কঠিন। একে পিএসজি তাদের মাঠ থেকে জিতে ফিরেছিল ২-০ গোলে, এর ওপর আবার ফরাসি চ্যাম্পিয়নরা ছিল ফর্মের তুঙ্গে। তবে ভাগ্যদেবতা তাদের দুহাত ভরে দিয়েছেন, তাই প্রথম লেগের ব্যবধান ঘুচিয়ে অসম্ভবকে সম্ভব করে লিখেছে নতুন ইতিহাস।
কোচদের মুখে কথাটা খুব শোনা যায়- ‘এটাই ফুটবল’। কখনও কখনও তা জীবনের চেয়ে অনেক বেশি। তবে এবারের ম্যানইউয়ের হারানোর কিছু ছিল না। তাই ঘরের মাঠে ২-০ গোলের হারের পরও হতাশায় মুখ না লুকিয়ে ছন্দময় ফুটবলেই থাকে নজর। নিজেদের মেলে ধরার চেষ্টার সঙ্গে সৌভাগ্য আপন মনে জড়িয়ে ধরলে লেখা হয়ে যায় নতুন রূপকথা। যে রূপকথায় আরেকবার ইউরোর ঝনঝনানিতে গড়া পিএসজি ভেঙে হয় চুরমার।
বুধবারের ফুটবলের রাতটা লেখা ছিল ম্যানইউয়ের নামেই। নইলে পার্ক দে প্রিন্সেসের দর্শকরা নড়েচড়ে বসার আগেই কিভাবে অত বড় ভুল করে বসেন থিলো কেরের! পিএসজির এই তরুণ রাইটব্যাকের ব্যাক পাস দৌড়ে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে গোলরক্ষক জিয়ানলুইজি বুফনকে কাটিয়ে লক্ষ্যভেদ করেন রোমেলু লুকাকু।
যদিও সমতায় ফিরতে সময় নেয়নি একের পর এক আক্রমণ চালানো পিএসজি। ১২তম মিনিটে কাইলিয়ান এমবাপের চমৎকার ক্রস থেকে বল জালে জড়িয়ে স্কোরলাইন ১-১ করেন হুয়ান বের্নাত। ম্যানইউয়ের কোয়ার্টার ফাইনাল স্বপ্ন তখন একরকম শেষই হয়ে যায়। তবে ভাগ্যদেবতা আরেকবার সঙ্গী হন সফরকারীদের। পিএসজির আরেকটি ভুল কাজে লাগিয়ে ম্যানইউকে আবার এগিয়ে নেন লুকাকু।
এই ভুলটা হয়তো অনেকদিন বয়ে বেড়াবেন বুফন। মার্কাস রাশফোর্ডের দূর থেকে নেওয়া শটটা সহজেই নিজের নিয়ন্ত্রণে নিতে পারতেন ইতালির সর্বকালের অন্যতম সেরা এই গোলরক্ষক। কিন্তু বল তার হাত ফসকে যায়, ছুটে যাওয়া বলে পায়ের ছোঁয়ায় জালে জড়িয়ে দেন লুকাকু।
পরের সময়টা ম্যানইউ ২-১ গোলে এগিয়ে থাকলেও কোয়ার্টার ফাইনালে যাওয়ার পাল্লা ভারি থাকে পিএসজির। ইনজুরি টাইমের প্রথম মিনিটেও ফরাসি চ্যাম্পিয়নদের আশা ছিল, কিন্তু নিজেদের সীমানায় ফুলব্যাক প্রেসনেল কিম্পেম্বের হ্যান্ডবল হলে রেফারি বাজান পেনাল্টির বাঁশি। স্পট কিকে পাওয়া সুযোগটা কাজে লাগিয়ে রাশফোর্ড বল জালে লিখেন ইতিহাস। ভিএআর-এর (ভিডিও অ্যাসিস্টেন্ট রেফারি) সাহায্য নেওয়ায় দ্বিতীয়ার্ধের ইনজুরি টাইম ছিল ৯ মিনিট। এই সময়টা পিএসজিকে আটকে রেখে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার আনন্দে মাতে ম্যানইউ।
শেষ ষোলোর আরেক ম্যাচে রোমাকে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছে এফসি পোর্তো। দ্বিতীয় লেগে অতিরিক্ত সময়ের গোলে ইতালিয়ান জায়ান্টদের হারিয়েছে তারা, জিতেছে ৩-১ গোলে। দুই লেগে ৪-৩ গোলের অগ্রগামিতায় শেষ আটে পৌঁছেছে তারা।
২-১ গোলে প্রথম লেগ জিতে পর্তুগিজদের মাঠে নেমেছিল রোমা। ২৬ মিনিটে তিকুইনো সোরেসের গোলে পিছিয়ে পড়ে তারা। তবে দানিয়েল দে রসির ৩৭ মিনিটের পেনাল্টি গোলে ম্যাচে সমতা ফেরায় রোমান ক্লাব। ইনজুরি সময়ে রসি চোট নিয়ে মাঠ ছাড়লে দ্বিতীয়ার্ধে ঘুরে দাঁড়ায় পোর্তো। ৫২ মিনিটে মোসা মারেগা তাদের দ্বিতীয় গোল করে। বাকি সময়ে রোমা গোল করতে না পারায় দুই লেগের অগ্রগামিতায় ৩-৩ গোলে শেষ হয় নির্ধারিত সময়। অতিরিক্ত সময় শেষ হওয়ার তিন মিনিট বাকি থাকতে সৌভাগ্য ধরা দেয় পোর্তোর হাতে। ম্যাক্স পেরেইরার নিচু ক্রসে বল পায়ে নিয়ে রোমার চ্যালেঞ্জে ডিবক্সে পড়ে যান ফের্নান্দো। ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি প্রযুক্তি ব্যবহারে পেনাল্টি পায় স্বাগতিকরা। মাঠের পাশের মনিটরে দেখা গেছে আলেজান্দ্রো ফ্লোরেঞ্জি জার্সি টেনে ধরেছিলেন আক্রমণে যাওয়া পোর্তো খেলোয়াড়ের। ১১৭ মিনিটে অ্যালেক্স তেয়েসের পেনাল্টি থেকে দারুণ জয়ে পর্তুগিজ ক্লাব নিশ্চিত করে পরের পর্ব।








