কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরে গ্রামের বাড়িতে আনন্দের ঢেউ। বাসার ছোট ছেলে সারওয়ার জামান নিপু প্রথমবার বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলে জায়গা করে নিয়েছেন। তাই সাজ সাজ রব, অনেকটাই উৎসবমুখর পরিবেশ। যেই ফুটবলের জন্য এত পরিশ্রম-ত্যাগ, আজ লাল-সবুজ দলে জায়গা করে নিয়ে যেন সব কষ্ট সার্থক! তাই এখানেই থেমে থাকতে চাইছেন না ২৩ বছর বয়সী ফরোয়ার্ড। হাভিয়ের কাবরেরার মূল দলে স্থান পেলেই মুখের হাসি চওড়া হবে।
নিপুর ফুটবলের শুরুটা বেশ চড়াই-উৎরাইয়ের মধ্যে দিয়ে। আরেক উপজেলা পাকুন্দিয়ায় বোনের বাসায় বেড়াতে গিয়ে সেখানকার এক ফুটবল একাডেমিতে অনুশীলন করার সুযোগ পেয়ে যান। ততদিনে অবশ্য নিজের এলাকাতে ভালো খেলার জন্য নামডাকও হয়ে যায়।
শর্ত ছিল এক বছরের মাথায় কিছু করতে না পারলে মানে জাতীয় পর্যায়ে খেলার সুযোগ না পেলে দেশের বাইরে বড় ভাইয়ের কাছে চলে যেতে হবে! নিপু তা চ্যালেঞ্জ হিসেবেই নিয়ে নেন। এক বছর যাওয়ার আগে জাতীয় অনূর্ধ্ব-১৬ ফুটবলে ডাক পান। তারপর আর পেছনে ফিরে তাকাননি। সব বয়সভিত্তিক পর্যায়ে খেলে এখন সিনিয়র দলে নাম লিখিয়েছেন।
গ্রামের বাড়ি থেকে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বাংলা ট্রিবিউনকে নিপু বলেছেন, ‘জাতীয় দলে ডাক পেয়ে অনেক ভালো লাগছে। সবাই আশায় থাকে জাতীয় দলে ডাক পাওয়ার। আমারও তাই ছিল। এখন স্বপ্ন পূরণ হওয়াতে আনন্দটাই অন্যরকম।’
প্রিমিয়ার লিগে এফসি উত্তরা আজমপুর ক্লাবে খেলে একটি গোল ও চারটি অ্যাসিস্ট করে কোচের সুনজরে চলে আসেন। প্রাথমিক দলে ডাক পেয়েছেন। চূড়ান্ত দলে জায়গা করে নেওয়াটা বড় চ্যালেঞ্জ। এর জন্য অনুশীলনে কঠোর পরিশ্রম করতে পিছপা হবেন না নিপু, ‘আমি ফরোয়ার্ড পজিশনে খেলে থাকি। লেফট বা রাইট উইংয়ে খেলতে কোনও সমস্যা হয়নি। নাম্বার নাইন পজিশনও আমার পছন্দ। এখন লক্ষ্য একটাই মূল দলে জায়গা করে নেওয়া। জানি কাজটি কঠিন। তবে আমি সর্বোচ্চ চেষ্টাটা করবো।’
তিন ভাই, এক বোনের মধ্যে সবার ছোট নিপু। বাবা লিয়াকত আলী লেবু ভূঁইয়াকে দেড় বছর বয়সে হারান লিভার সংক্রান্ত জটিলতায়। বড় ভাই বিদেশে থাকতেন। কিছু দোকান ভাড়া পাওয়া যেতো। এছাড়া মা মিনা বেগম অনেক কষ্ট করেছেন।
নিপু স্মৃতি হাতড়ে বললেন, ‘বোনের বাসা পাকুন্দিয়াতে বেড়াতে গিয়ে তখন সেখানকার এক ফুটবল একাডেমিতে খেলার সুযোগ পাই। আমাকে বিদেশে পাঠানোর কথা ছিল। এক বছরের মধ্যে কিছু করতে না পারলে হয়তো এখন আমি বিদেশেই থাকতাম। ভাগ্য ভালো যে অল্প দিনের মধ্যে আমি অনূর্ধ্ব-১৬ ফুটবলে জায়গা করে নেই।’
শুধু তাই নয়, একাডেমিতে যেতে হতো ১৫-১৬ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে। অনেক সময় ভাড়াও ছিল না। নিপু নিজেই বললেন, ‘এরপর পেছনে তাকাতে হয়নি। বাড়ি থেকে বেশ দূরে একাডেমিতে অনুশীলন করতে কষ্ট হয়েছে। যাওয়ার ভাড়া ছিল না। একাডেমির মালিক টাকা দিতেন। এখন মনে হচ্ছে কষ্ট লাঘব হয়েছে।’
সবার শেষে প্রয়াত বাবার কথা স্মরণ করলেন, ‘বাবা মারা গেছেন। তার সঙ্গে আমার কোনও স্মৃতি সেভাবে নেই। আজ বাবা বেঁচে থাকলে অনেক খুশি হতেন। তার ছেলে বাংলাদেশ জাতীয় দলে জায়গা পেয়েছে। বাবার কথা এখন অনেক মনে পড়ছে।’









