শেখ মোরসালিন, জাতীয় দলের এই উদীয়মান ফুটবলারের নাম হঠাৎ করে জড়িয়ে পড়ে মদকাণ্ডে। পরিবারের বড় ছেলে এমন কিছুতে জড়াবেন, তা ঘুণাক্ষরে ভাবতে পারেননি মা শেফালি বেগম। অক্টোবরে এমন দুঃসহ পরিস্থিতিতে শেখ মজিবর রহমানের পরিবারের ঘুমই অনেকটা উধাও হয়ে গিয়েছিল। অনেকটাই ছিলেন চাপের মুখে। আশার কথা পরিস্থিতি পাল্টে যেতে সময় লাগেনি। জরিমানা দিয়ে দুই ম্যাচ পর জাতীয় দলে ফিরেই মোরসালিন এখন নয়নের মণি! ১৮ বছর বয়সী ফরোয়ার্ড বিশ্বকাপ বাছাইয়ের গ্রুপ পর্যায়ের ম্যাচে লেবাননের বিপক্ষে সমতাসূচক দারুণ গোলটি করে দলকে এক পয়েন্ট তো এনে দিয়েছেনই, সেই সঙ্গে তার নেওয়া বুলেট গতির দারুণ শট চারদিকে বেশ প্রশংসিত হচ্ছে।
ম্যাচের পর থেকে তাই ফরিদপুরের চরভদ্রাসনে মজিবর রহমানের বাসায় তাই আনন্দের ফল্গুধারা বইছে। ম্যাচের দিন বাবা-মা ভাইসহ বাসার সবাই টেলিভিশন সেটের সামনে চোখ রেখেছিলেন। কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করছিলেন যেন মোরসালিন ভালো পারফর্ম করার পাশাপাশি গোলও পায়। সৃষ্টিকর্তা তাদের প্রার্থনা শুনেছেন। মোরসালিন দারুণ খেললেন, গোলও পেলেন!
চরভদ্রাসন থেকে মুঠোফোনে বাংলা ট্রিবিউনকে শেফালি বেগম নিজেদের উচ্ছ্বাসের কথা আড়াল করেননি, ‘আমরা অনেক আশা নিয়ে সবাই টেলিভিশনে খেলা দেখেছি। সবাই চেয়েছিলাম দল যেন জেতে, মোরসালিনও গোল পায়। আমাদের দল জেতেনি। তবে ড্র করেছে। এতেই আমরা খুশি। এছাড়া ছেলে গোল পেয়েছে। এটাও কম নয়। এমন পরিস্থিতিতে অন্য সবার মতো আমাদেরও অনেক ভালো লাগা কাজ করছে।’
অক্টোবরে মদকাণ্ডে ছেলের খেলার বাইরে থাকার দিনগুলোর কথা মনে পড়লে এখনও আনমনা হয়ে যান শেফালি বেগম। ওই সময়ে মোরসালিন চরভদ্রাসনে এসে কিছুদিন বাড়িতে ছিলেন। তবে বাইরে তেমন বের হননি। এছাড়া তারা নিজেরাও ছিলেন নানামুখী চাপে। শেফালি বেগম নিজেই বলেছেন, ‘আমাদের ছেলে কখনও খারাপ কাজ করেছে বলে শুনিনি। বিকেএসপি থেকে শুরু করে সব জায়গায় ওর সুনাম। এবার এয়ারপোর্টে কী থেকে কী হয়ে গেলো বুঝতে পারেনি। আসলে ও তো এসবের মধ্যে নেই, পরিস্থিতির শিকার। এমন খারাপ সময়ে মোরসালিন অনেকটা ভেঙে পড়েছিল। টেনশনে ছিল। আমরাও তাই। ও গ্রামের বাড়িতে এসে বাইরে যেতো না। রুমের মধ্যেই বেশিরভাগ সময় কাটিয়েছে। আশপাশের লোকজন আবার কী না কী বলে! আসলে কেউই তো বিষয়টি ভালোচোখে দেখছিল না।’
মোরসালিন নিজেও সেই কথা বলেছেন তার মাকে। শেফালি বেগম বলেছেন, ‘এমন কাজ ও করতে চায়নি। কীভাবে যেন হয়ে গেলো।’
তবে এত অল্প সময়ে মোরসালিন ঘুরে দাঁড়িয়েছেন, মাঠে গোল করে অনেকটা প্রায়শ্চিত্ত করতে পেরেছেন, এতেই খুশি তার পরিবার। শেফালি বেগম বলেছেন, ‘আমার ছেলের ওপর দিয়ে ঝড় বয়ে গেছে। সেই খারাপ অবস্থা কাটিয়ে ও যে ঠিকঠাক মাঠে ফিরতে পেরেছে তাতেই আমরা খুশি।’
স্কুলে পড়ার সময়ে মোরসালিনের ফুটবলেই বেশি ঝোঁক। অনেকটা পরিবারের অনিচ্ছায় বিকেএসপিতে ভর্তি হয়েছিলেন। ভর্তির পর আস্তে আস্তে যখন সঠিক পথের দেখা পেতে লাগলেন, পরিবার থেকেও সহযোগিতা আসলে লাগলো। মোরসালিনের মা বললেন, ‘সবার বাবা-মা চায় ছেলে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হোক। কিন্তু আমার ছেলের ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা বেশি ছিল। পাশাপাশি সে লেখাপড়া চালিয়ে যাচ্ছে। ফলও ভালো করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির অপেক্ষায় আছে। এখন আমাদের মনে আর কোনও খেদ নেই।’
ছেলে একসময় বড় তারকা হবে। দেশের সম্মান আরও উজ্জ্বল করবে, সেটাই পরিবারের প্রার্থনা। তবে শুরুতেই খারাপ কাজ থেকে নিজেকে সংশোধন করতে পারছে বলে খুশি মা, ‘ও এখন বুঝতে পেরেছে কাজটি খারাপ হয়েছিল। আল্লাহর ইচ্ছায় এখন শুধরে নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। ওর সামনে লম্বা ক্যারিয়ার পড়ে আছে। আশা করছি একসময় দেশের ফুটবলে বড় তারকা হবে ও। দেশকে আরও সাফল্য এনে দেবে।’
বাবা প্রবাসী। তিনিও চাইছেন ছেলের আরও উন্নতি। মোরসালিনের সামনে এখন বড় তারকার হওয়ার হাতছানি!









