বিশ্বকাপ ফুটবলের ট্রফি নিছক একটি পুরস্কার নয়। এটি ফুটবলের সর্বোচ্চ গৌরব, জাতীয় অহংকার এবং অমরত্বের প্রতীক। চার বছর পরপর বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের স্বপ্ন, আবেগ ও প্রত্যাশা এসে মিশে যায় এই সোনালি ট্রফিকে কেন্দ্র করে। কিন্তু যে ট্রফিকে এক ঝলক দেখার জন্যও মানুষ উন্মুখ হয়ে থাকে, তার ইতিহাস কম রোমাঞ্চকর নয়।
বিশ্বকাপ ট্রফির যাত্রা শুরু ১৯৩০ সালে। সেবারই প্রথম ফিফার উদ্যোগে বিশ্বকাপ ফুটবল অনুষ্ঠিত হয়। ফিফার তৎকালীন সভাপতি জুলে রিমের নেতৃত্বে জন্ম নেয় বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ফুটবল আসর। উদ্বোধনী আসরের সময় ট্রফিটির নাম ছিল ‘ভিক্টরি’। পরে বিশ্ব ফুটবলে জুলে রিমের অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘জুলে রিমে ট্রফি’।
ফরাসি ভাস্কর আবেল লাফ্লিউরের নকশায় তৈরি ট্রফিটিতে ছিল প্রাচীন গ্রিক বিজয়ের দেবী নাইকির প্রতিকৃতি। যেখানে গ্রিক দেবীকে একটি পাত্র উঁচিয়ে ধরে থাকতে দেখা যায়। স্বর্ণপ্রলেপ দেওয়া রুপার তৈরি এই ট্রফির ভিত্তি ছিল গাঢ় নীলবর্ণ পাথর। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এটি বিশ্বের সবচেয়ে নামজাদা ক্রীড়া পুরস্কারে পরিণত হয়। আর সেই ট্রফি প্রথম জিতেছিল ১৯৩০ বিশ্বকাপের আয়োজক উরুগুয়ে।
পরবর্তী কয়েক দশকে জুলে রিমে ট্রফি শুধু ব্রাজিল, ইংল্যান্ড কিংবা ইতালির মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের হাতে ওঠা একটি পুরস্কারই ছিল না; এটি হয়ে ওঠে ইতিহাসের এক জীবন্ত সাক্ষী।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ট্রফিটি নাৎসি বাহিনীর হাতে চলে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল। তখন ইতালির ফুটবল কর্মকর্তা ওত্তোরিনো বারাসি ট্রফিটিকে রোমে নিজের বিছানার নিচে একটি জুতার বাক্সে লুকিয়ে রাখেন। সেই সাহসী উদ্যোগের কারণেই যুদ্ধের ভয়াবহতা থেকে রক্ষা পায় ফুটবলের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদগুলোর একটি। শেষরক্ষা হয়নি যদিও! ১৯৬৬ সালে ইংল্যান্ডে বিশ্বকাপ শুরুর কয়েক মাস আগে সর্বসাধারণের প্রদর্শনীর সময় ট্রফিটি চুরি হয়ে যায়। ঘটনাটি দ্রুত বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তোলে। শেষ পর্যন্ত দক্ষিণ লন্ডনের একটি বাগানের ঝোঁপের নিচে সংবাদপত্রে মোড়ানো অবস্থায় ট্রফিটি খুঁজে পায় ‘পিকলস’ নামের একটি কুকুর।
১৯৭০ সালে ব্রাজিল তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জিতে জুলে রিমে ট্রফির স্থায়ী মালিকানা অর্জন করে। কিন্তু সেই গল্পেও ছিল আরেকটি বেদনাদায়ক মোড়। ১৯৮৩ সালে রিও ডি জেনেইরোতে ব্রাজিলিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের সদর দপ্তর থেকে ট্রফিটি আবারও চুরি হয়ে যায়। এবার অবশ্য পিকলসের মতো উদ্ধারকারী ছিল না। তাই ট্রফিটিও আর উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। ধারণা করা হয়, সেটিকে গলিয়ে ফেলা হয়েছিল।
তবে এর আগেই ফিফা বিশ্বকাপের জন্য নতুন যুগের নতুন ট্রফি চালু করে। ইতালীয় শিল্পী সিলভিও গাজানিগার নকশায় তৈরি বর্তমান ট্রফিটির উচ্চতা ৩৬ সেন্টিমিটার এবং এটি ১৮ ক্যারেট সোনা দিয়ে নির্মিত। নকশায় দেখা যায়, দুই মানবাকৃতি তাদের কাঁধে পৃথিবীকে উঁচিয়ে ধরে আছে। ফুটবলের বৈশ্বিক আবেদন ও মানুষকে একসূত্রে বাঁধার শক্তিকে অসাধারণভাবে তুলে ধরে এই শিল্পকর্ম।
১৯৭৪ সালে নতুন এই ট্রফি প্রথমবারের মতো উঁচিয়ে ধরেছিল পশ্চিম জার্মানি। চার বছর পর স্বাগতিক আর্জেন্টিনা তাদের সিংহাসনচ্যুত করে। এরপর ব্রাজিল, জার্মানি ও ইতালি নিজেদের শিরোপার সংখ্যা বাড়িয়েছে। অন্যদিকে ফ্রান্স ও স্পেনও বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ পেয়েছে। এবারের গ্রীষ্মে আর্জেন্টিনা তাদের ২০২২ সালের শিরোপা রক্ষার মিশনে নামবে।
এখানে উল্লেখ্য জুলে রিমে ট্রফির মতো বর্তমান বিশ্বকাপ ট্রফি কোনো দেশকে স্থায়ীভাবে দেওয়া হয় না। চ্যাম্পিয়ন দল ফাইনালের পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে আসল ট্রফিটি হাতে নেওয়ার সুযোগ পায়। পরে তাদের দেওয়া হয় স্বর্ণপ্রলেপ দেওয়া রেপ্লিকা। যার নাম ‘ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপ উইনার্স ট্রফি’।
২০১০ বিশ্বকাপের আগে এই রেপ্লিকাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ব্যতিক্রমী একটি দেওয়া হয়েছিল দক্ষিণ আফ্রিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট নেলসন ম্যান্ডেলাকে। ইতিহাসে তিনিই একমাত্র ব্যক্তি, যিনি আনুষ্ঠানিকভাবে এমন একটি ট্রফি উপহার হিসেবে পেয়েছেন।








