কোরবানির পশু উদ্বৃত্ত থাকলেও আটকে আছে মাংস রফতানি

জামাল উদ্দিন
০৫ জুন ২০২৬, ১০:০০আপডেট : ০৫ জুন ২০২৬, ১০:০০

ঈদুল আজহা ঘিরে দেশের খামারিরা বরাবরই বিপুল সংখ্যক গরু, ছাগল ও অন্যান্য কোরবানির পশু প্রস্তুত করেন। কিন্তু প্রতিবছরই উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পশু বিক্রি না হয়ে খামারে ফিরে যায়। এ বছরও তার ব্যতিক্রম হয়নি। কোরবানি শেষে এবার সারা দেশে ২৯ লাখ ৬৬ হাজার ৪২২টি পশু উদ্বৃত্ত রয়ে গেছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এত বিপুল সংখ্যক পশু কেন অবিক্রীত থেকে যাচ্ছে? এটা কি কেবল বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, নাকি এর পেছনে দীর্ঘদিনের কোনও নীতিগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে?

অবিক্রীত থাকার মূল কারণ

পশুসম্পদ উৎপাদন সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, অবিক্রীত পশুর পেছনে একসঙ্গে কয়েকটি কারণ কাজ করছে। এর মধ্যে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতায় চাপ পড়েছে। ফলে অনেক পরিবার আগের তুলনায় ছোট পশু কিনেছে অথবা বাধ্য হয়ে যৌথভাবে কোরবানি দিয়েছে। খামারিরা ভালো দামের আশায় বেশি সংখ্যক পশু প্রস্তুত করলেও সেই অনুপাতে ক্রেতার সংখ্যা বাড়েনি। আধুনিক বিপণন ব্যবস্থার অভাবে বেশিরভাগ খামারি এখনও স্থানীয় হাটের ওপর নির্ভরশীল। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পশু বিক্রি না হলে তাদের পক্ষে বিকল্প বাজার খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। অবিক্রীত পশু থেকে মাংস প্রক্রিয়াজাত করে সংরক্ষণ ও রফতানির কার্যকর ব্যবস্থা না থাকা এই সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ।

খামারিদের সংকট ও আর্থিক ক্ষতি

অবিক্রীত পশু শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়– এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাজার হাজার খামারি ও প্রান্তিক পশু উৎপাদনকারীর জীবিকা। একটি গরু এক বছরের বেশি সময় ধরে লালন-পালন করতে খাদ্য, ওষুধ, শ্রমসহ বিপুল খরচ হয়। অনেকেই ঈদ সামনে রেখে ঋণ নিয়ে বিনিয়োগ করেন। কিন্তু পশু বিক্রি না হলে তাদের আর্থিক চাপ বহুগুণ বেড়ে যায়। বিশেষ করে ছোট খামারিরা মারাত্মক বিপদগ্রস্ত হন। অনেক ক্ষেত্রে লোকসান কমাতে ঈদের পর কম দামে পশু বিক্রি করতে বাধ্য হন তারা, যা তাদের পরবর্তী বছর পশু উৎপাদনে নিরুৎসাহিত করে।

অপরদিকে, বিশ্বের অন্যান্য মাংস রফতানিকারক দেশে পশু জবাইয়ের পর মাংস হিমায়িত করে সংরক্ষণ, ক্যানজাত করা বা বিদেশে রফতানির মাধ্যমে অতিরিক্ত সরবরাহ সামাল দেওয়া হয়। ফলে সেখানকার খামারিরা পুরোপুরি একটি নির্দিষ্ট মৌসুম বা বাজারের ওপর নির্ভরশীল থাকেন না।

রফতানির সম্ভাবনা ও বর্তমান অবস্থা

বাংলাদেশে কিছু মাংস প্রক্রিয়াজাত প্রতিষ্ঠান থাকলেও সেগুলো এখনও অত্যন্ত সীমিত পরিসরে কাজ করছে। অবিক্রীত পশুর মাংস সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও রফতানির মতো বৃহৎ অবকাঠামো এখনও গড়ে ওঠেনি। বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে ‘বেঙ্গল মিট’ নামে একটিমাত্র কোম্পানি সীমিত আকারে গরুর মাংস রফতানি করে। প্রক্রিয়াজাত ও হালাল মাংস হিসেবে মূলত মধ্যপ্রাচ্যের কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত (দুবাই), মালদ্বীপ ও বাহরাইনে এসব মাংস পাঠানো হয়, যার প্রধান ভোক্তা প্রবাসী বাংলাদেশিরাই।

সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও অন্যান্য সম্ভাবনাময় বাজারে মাংস রফতানির বিশাল সুযোগ রয়েছে। তবে এর জন্য আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন জবাইখানা, কোল্ডচেইন, হিমাগার, মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং রফতানি অবকাঠামো গড়ে তোলার পাশাপাশি সরকারি নীতিগত সহায়তা ও বেসরকারি বিনিয়োগ প্রয়োজন। জীবিত পশু বিক্রির বাইরে মাংসভিত্তিক শিল্প গড়ে উঠলে খামারিরা যেমন ন্যায্যমূল্য পাবেন, তেমনই বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের নতুন পথও তৈরি হবে।

সরকারি উদ্যোগ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে কোরবানির পশুর উৎপাদন দীর্ঘদিন ধরেই চাহিদার তুলনায় বেশি। সরকারের প্রণোদনা এবং খামারিদের বিনিয়োগে এ খাতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জিত হয়েছে।

প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের উপ-পরিচালক (খামার) মো. শরিফুল হক জানান, ভবিষ্যতে এই উৎপাদন আরও বাড়বে। এ জন্য সরকার এরই মধ্যে মাংস রফতানির বহুমুখী পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে।

বিদেশ থেকে পশু বা মাংস আমদানির সম্ভাবনা নিয়ে বৃহস্পতিবার (৪ জুন) সচিবালয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু সাংবাদিকদের বলেন, ‘‘দেশে কোরবানির পশু উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন স্বয়ংসম্পূর্ণ। আমদানি নয়, অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণের পর উদ্বৃত্ত পশু ও মাংস বিদেশে রফতানির লক্ষ্য নিয়ে সরকার কাজ করছে। এছাড়া সীমান্তপথে অবৈধভাবে পশু প্রবেশ ঠেকাতে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছে, যার ফলে খামারিরা ন্যায্যমূল্য পেয়েছেন।’’

তিনি আরও বলেন, ‘‘উদ্বৃত্ত উৎপাদনকে কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতে মাংস রফতানির উদ্যোগ নেওয়া হবে। এরই মধ্যে দেশে ১৩টি মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও সীমিত পরিসরে রফতানি করছে। সরকার এ খাতে বড় খামারিদের উৎসাহিত ও সহযোগিতা করছে।’’

কোরবানির পশুর পরিসংখ্যান

প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের আওতাধীন আটটি বিভাগ থেকে পাওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এ বছর মোট ৯৩ লাখ ৬৭ হাজার ৪১৮টি পশু কোরবানি হয়েছে। এর মধ্যে গরু ও মহিষ ৪৮ লাখ ৬৪ হাজার ১৫৮টি, ছাগল ও ভেড়া ৪৫ লাখ ২ হাজার ২৩৩টি এবং অন্যান্য পশু রয়েছে ১ হাজার ২৭টি।

অন্যদিকে, গত বছর (২০২৫ সালে) কোরবানির পশুর সম্ভাব্য চাহিদা ছিল ১ কোটি ৩ লাখ ৭৯ হাজার ২০২টি এবং প্রাপ্যতা ছিল ১ কোটি ২৪ লাখ ৪৭ হাজার ৩৩৭টি। ওই বছর দেশে মোট ৯১ লাখ ৩৬ হাজার পশু কোরবানি হয়েছিল এবং উদ্বৃত্ত ছিল ৩৩ লাখ ১১ হাজার ৩৩৭টি পশু। সে হিসাবে গত বছরের তুলনায় এ বছর ২ লাখ ৩১ হাজার ৪১৮টি বেশি পশু কোরবানি হয়েছে।

সরকারের সময়োপযোগী নীতি সহায়তা, খামারিদের কঠোর পরিশ্রম এবং উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগের ফলে প্রাণিসম্পদ খাত বর্তমানে একটি শক্তিশালী ও আত্মনির্ভরশীল অবস্থানে পৌঁছেছে। গ্রামীণ অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করতে এবং প্রাণিসম্পদ খাতের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে সরকার আধুনিক প্রযুক্তি ও খামারিবান্ধব নীতি বাস্তবায়নে কাজ করে যাচ্ছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

/এপিএইচ/এমওএফ/
সম্পর্কিত
দেশীয় খামারিদের পশুতেই শতভাগ কোরবানি হয়েছে: প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী
মে মাসে রফতানি আয় ৪৪০ কোটি ডলার
দিয়াবাড়ি অস্থায়ী পশুর হাটে ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে ডিএনসিসির কমিটি গঠন
সর্বশেষ খবর
মোজতবা খামেনির সঙ্গে বৈঠক করতে পারলে ‘সম্মানিত বোধ করব’: ট্রাম্প
মোজতবা খামেনির সঙ্গে বৈঠক করতে পারলে ‘সম্মানিত বোধ করব’: ট্রাম্প
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে তিন যানবাহনে লরির ধাক্কা
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে তিন যানবাহনে লরির ধাক্কা
পপগুরু আজম খান: বিদ্রোহ, গিটার আর এক অনন্ত সংগীতভাষা
স্মরণ ও শ্রদ্ধাঞ্জলিপপগুরু আজম খান: বিদ্রোহ, গিটার আর এক অনন্ত সংগীতভাষা
ভ্যাট রিটার্নে বড় পরিবর্তন আসছে 
ভ্যাট রিটার্নে বড় পরিবর্তন আসছে 
সর্বাধিক পঠিত
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
৩৮ বছর বাড়ি ফিরে বিপদে জবেদ, স্ত্রী বললেন স্বামী হিসেবে মেনে নেওয়া সম্ভব নয়
৩৮ বছর বাড়ি ফিরে বিপদে জবেদ, স্ত্রী বললেন স্বামী হিসেবে মেনে নেওয়া সম্ভব নয়
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের