বিশ্বকাপ শুধু ফুটবলের শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই নয়। প্রযুক্তি, নকশা ও উদ্ভাবনেরও নানা অনুষঙ্গ জড়িয়ে থাকে তাতে। ১৯৭০ সালে অ্যাডিডাস বিশ্বকাপের অফিসিয়াল ম্যাচ বল সরবরাহের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে প্রতিটি আসরে নতুন রূপে হাজির হয়েছে ম্যাচ বল। টেলস্টার থেকে ট্রিওন্ডা, পাঁচ দশকেরও বেশি সময়ে বিশ্বকাপের বলগুলো শুধু খেলার মানই বদলায়নি, আয়োজক দেশের সংস্কৃতি, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এবং ফুটবলে বিবর্তনের গল্পও ফুটিয়ে তুলেছে।
অবশ্য এখন অ্যাডিডাস যেভাবে প্রযুক্তির উৎকর্ষে বলগুলো প্রস্তুত করছে, শুরুতে কিন্তু গল্পটা সেরকম ছিল না। ১৯৩০ সালে প্রথম বিশ্বকাপ থেকে শুরুর দিকে প্রতিটি আয়োজক দেশ নিজেদের ম্যাচ বল সরবরাহ করতো। তাতে বলের মান ও পারফরম্যান্সে বড় ধরনের অসঙ্গতি দেখা দিতো। শুধু কি তাই? টেলিভিশন সম্প্রচারেও দেখা দিতো বিপত্তি! কারণ বেশিরভাগ বলই ছিল বাদামি চামড়ায় তৈরি, যা সাদাকালো টেলিভিশনের পর্দায় সহজে দেখা যেত না।
আকৃতির কারণে বিশ্বকাপের (১৯৩০) প্রথম বলটির নাম ছিল টি মডেল। তারপর যুগের চাহিদা বুঝে ১৯৭০ সাল থেকে খেলার মান উন্নত করতে ফিফা ম্যাচ বলের আনুষ্ঠানিক সরবরাহকারী হিসেবে অ্যাডিডাসকে নির্বাচন করে। সেখান থেকেই শুরু হয় ম্যাচ বল নিয়ে অ্যাডিডাসের অনন্য এক যাত্রা। যার সূচনা টেলস্টার দিয়ে।
১. ১৯৭০: টেলস্টার , মেক্সিকো
মূলত বিশ্বব্যাপী সম্প্রচারের কথা মাথায় রেখেই তৈরি এর নকশা। সহজে দৃশ্যমান করার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয় টেলস্টার নামের ম্যাচ বল। এর নাম এসেছে ‘টেলিভিশন’ ও ‘স্টার’ শব্দ দুটির সমন্বয়ে। ৩২ প্যানেলের এই নকশা এতই জনপ্রিয় যে এখনও ফুটবল আঁকতে বললে অধিকাংশ মানুষ এই ডিজাইনই অনুসরণ করেন।
১৯৭৪: টেলস্টার ডারলাস্ট, পশ্চিম জার্মানি
টেলস্টারের ধারাবাহিকতায় তৈরি টেলস্টার ডারলাস্টে যুক্ত করা হয় যুগান্তকারী জলরোধী আবরণ। যার মাধ্যমে সব ধরনের আবহাওয়ায় বলের স্থায়িত্ব ও নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।
১৯৭৮: ট্যাঙ্গো ডারলাস্ট, আর্জেন্টিনা
আর্জেন্টিনার ঐতিহ্যবাহী ক্ল্যাসিক ট্যাঙ্গো নাচ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তৈরি হয় এই বল। এতে ছিল ২০টি ষড়ভুজাকৃতির প্যানেল এবং ভেতরে বাঁকানো ত্রিমুখী নকশা। এর দৃশ্যমান ডিজাইন এতটাই সফল হয় যে পরবর্তী পাঁচটি বিশ্বকাপ বলেও এর প্রভাব দেখা যায়।
১৯৮২: ট্যাঙ্গো এস্পানা, স্পেন
এটি ছিল চামড়ার তৈরি সর্বশেষ বিশ্বকাপ বল। একই সঙ্গে বিশ্বকাপে ট্যাঙ্গো এস্পানায় প্রথমবারের মতো অ্যাডিডাসের লোগোও ব্যবহার করা হয়। এছাড়া রাবারযুক্ত সেলাইয়ের কারণে এটি আগের তুলনায় অনেক বেশি জলরোধী ছিল।
১৯৮৬: আজটেকা, মেক্সিকো
আজটেকা ছিল প্রথম বিশ্বকাপ বল, যা কৃত্রিম উপাদানে তৈরি করা হয়। কৃত্রিম উপাদান থাকায় পানি শোষণের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কম থাকে। আজটেক সভ্যতার মন্দির থেকে অনুপ্রাণিত গ্রাফিক্সের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো আয়োজক দেশের সংস্কৃতি বলের নকশায় ফুটিয়ে তোলা হয়।
১৯৯০: এত্রুসকো ইউনিকো, ইতালি
প্রাচীন এত্রুসকান শিল্পকলা থেকে অনুপ্রাণিত এত্রুসকো ইউনিকো বলের সঙ্গে প্রথমবারের মতো জুতা ও পোশাক উন্মোচন করা হয়। এছাড়া এতে প্রথমবারের মতো পানি প্রতিরোধক ফোমের অভ্যন্তরীণ স্তরও ব্যবহার করা হয়।
১৯৯৪: কুয়েস্ত্রা, যুক্তরাষ্ট্র
চাঁদে মানুষ অবতরণের ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে তৈরি করা হয় কুয়েস্ত্রা। এর নাম রাখা হয় মানুষের নক্ষত্র জয়ের অভিযানের কথা মাথায় রেখে। মহাকাশভিত্তিক নকশা মূলত উদ্ভাবনের চেতনাকে তুলে ধরে, আর ভেতরের ফোম স্তর রাখা হয় হেড করার সময় আঘাতের চাপ কমানোর লক্ষ্যে।
১৯৯৮: ট্রাইকোলোর, ফ্রান্স
নকশার এক যুগের সমাপ্তি ঘটায় ট্রাইকোলোর। এটি ছিল প্রথম বিশ্বকাপ বল, যা সাদা-কালোর সীমা ছাড়িয়ে রঙিন ডিজাইন গ্রহণ করে। একই সঙ্গে এটি ছিল সর্বশেষ বল, যেখানে ট্যাঙ্গো প্যাটার্ন ব্যবহার করা হয়। ভেতরে থাকা হাজারো ফোম মাইক্রোসেলের কারণে বলটি ছিল অনেক হালকা, শক্তিশালী ও দ্রুতগতির।
২০০২: ফিভারনোভা, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া
জাপানি ক্যালিগ্রাফি এবং দুই আয়োজক দেশের ঐতিহ্যবাহী টোমোয়ে প্রতীক থেকে অনুপ্রাণিত ছিল এর নকশা। উন্নত ফোম ব্যবহারের ফলে বলের গতিপথ আরও নির্ভুল ও অনুমানযোগ্য হয়।
২০০৬: +টিমগাইস্ট, জার্মানি
+টিমগাইস্ট বল নকশায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনে। প্রচলিত ৩২টি সেলাই করা প্যানেলের বদলে এতে ব্যবহার করা হয় ১৪টি তাপের সাহায্যে সংযুক্ত প্যানেল, যা বলের পৃষ্ঠকে আরও মসৃণ করে। এছাড়া বিশ্বকাপ ফাইনালের জন্য বিশেষ সংস্করণের বল প্রকাশের সূচনাও করা হয় এই আসরে।
২০১০: জাবুলানি, দক্ষিণ আফ্রিকা
জুলু ভাষায় ‘জাবুলানি’ শব্দের অর্থ ‘উদযাপন করা’। মাত্র আটটি প্যানেল এবং বিশেষভাবে নির্মিত প্রায় অমসৃণ পৃষ্ঠ নিয়ে এটি তৈরি করা হয়, যা গ্রিপ বাড়াতে সহায়তা করে। বলের ১১টি ভিন্ন রঙ প্রতিটি দলের ১১ জন খেলোয়াড়, দক্ষিণ আফ্রিকার ১১টি সরকারি ভাষা এবং দেশের ১১টি বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করে।
২০১৪: ব্রাজুকা, ব্রাজিল
‘ব্রাজুকা’ শব্দটি ব্রাজিলীয় জাতীয় গর্বের প্রতীক। এটি ছিল প্রথম বিশ্বকাপ বল, যার নাম জনভোটের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয়। এমনকি এর নিজস্ব টুইটার অ্যাকাউন্টও ছিল। বলের রঙিন ফিতা-আকৃতির নকশা ব্রাজিলজুড়ে জনপ্রিয় সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত ব্রেসলেটকে তুলে ধরে।
২০১৮: টেলস্টার ১৮, রাশিয়া
টেলস্টার ১৮ মূল ১৯৭০ সালের টেলস্টারের ঐতিহ্যবাহী নকশাকে ফিরিয়ে আনে, তবে আধুনিক ফুটবলের জন্য এতে যুক্ত করা হয় পিক্সেলভিত্তিক নতুন ডিজাইন। অতিরিক্ত অভ্যন্তরীণ স্তর বলকে আরও টেকসই করে তোলে। পাশাপাশি এতে সংযোজিত এনএফসি চিপ ভক্তদের বিশেষ ডিজিটাল কনটেন্টের সঙ্গে যুক্ত হতে সহায়তা করে।
২০২২: আল রিহলা, কাতার
আল রিহলার নকশা কাতারের দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্য ও সংস্কৃতি থেকে অনুপ্রাণিত। এতে নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়, যা বলের বায়ুগতিবিদ্যা সংক্রান্ত সক্ষমতা উন্নত করে। এছাড়া এটি পরিবেশবান্ধব নকশায় তৈরি।
২০২৬: ট্রিওন্ডা-কানাডা, মেক্সিকো ও যুক্তরাষ্ট্র
এবার বিশ্বকাপের অফিসিয়াল ম্যাচ বলের নাম হচ্ছে ‘ট্রিওন্ডা’। যেহেতু এবারের বিশ্বকাপের আয়োজক তিন দেশ। তাই ‘ট্রিওন্ডা’ বলের নকশাতেও তিন আয়োজক দেশকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে ডিজাইনে। এর রঙ ও ডিজাইনে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর ছাপ রয়েছে। আর ‘ট্রিওন্ডা’ নামটি এসেছে তিনটি ঢেউ বা তিন আয়োজক দেশের ধারণা থেকে। ট্রিওন্ডার ত্রিবর্ণ নকশায় উঠে এসেছে তিন স্বাগতিক দেশের পরিচয়। কানাডার প্রতীক হিসেবে রয়েছে লাল ম্যাপল পাতা, মেক্সিকোর প্রতিনিধিত্ব করছে সবুজ ঈগল এবং যুক্তরাষ্ট্রকে তুলে ধরা হয়েছে নীল তারকার মাধ্যমে।
ট্রিওন্ডা স্মার্টফোন বা স্মার্টওয়াচের মতোই। উন্নত সেন্সর প্রযুক্তিসম্পন্ন এই বলে যুক্ত করা হয়েছে অত্যাধুনিক ‘কানেক্টেড বল টেকনোলজি’, যা ম্যাচ পরিচালনায় রেফারিদের আরও দ্রুত ও নিখুঁত সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করবে। সেন্সরটি চালিত হবে রিচার্জেবল ব্যাটারিতে। একবার পূর্ণ চার্জে প্রায় ছয় ঘণ্টা চলবে বলটি, যা একটি ম্যাচ পরিচালনার জন্য যথেষ্ট। তবে ব্যবহারের আগে অন্য সরঞ্জামের মতো এটিকেও চার্জ দিতে হবে।
এই বলে রয়েছে ৫০০ হার্টজ গতির একটি মোশন সেন্সর চিপ। এটি প্রতি সেকেন্ডে ৫০০ বার তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। ফলে বলের স্পর্শ, গতি, ঘূর্ণন, দিক পরিবর্তন ও চলাচল রিয়েল টাইমে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে।
সংগৃহীত তথ্য সরাসরি ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর) সিস্টেমে পাঠানো হবে এবং স্টেডিয়ামের ট্র্যাকিং ক্যামেরার তথ্যের সঙ্গে সমন্বয়ও করা হবে। এতে অফসাইড, হ্যান্ডবল, ফাউল কিংবা বল মাঠের বাইরে গেছে কি না, এসব সূক্ষ্ণ সিদ্ধান্ত বিশ্লেষণে সুবিধা পাবেন ম্যাচ অফিসিয়ালরা। বিশেষ করে অফসাইডের ক্ষেত্রে বল স্পর্শের সুনির্দিষ্ট মুহূর্ত শনাক্ত করতে পারবে সেন্সরটি।
বলে ব্যবহৃত চিপটির ওজন প্রায় ১৪ গ্রাম। এটি এমনভাবে বলের ভেতরে স্থাপন করা হয়েছে যাতে বলের ভারসাম্য বা পারফরম্যান্সে কোনও প্রভাব পড়বে না। এমনকি এর উপস্থিতি টের পাবেন না খেলোয়াড়রাও।
বিশ্বকাপ ভেন্যুগুলোতে থাকা ট্র্যাকিং ক্যামেরার সঙ্গে সমন্বয় করে ম্যাচের ত্রিমাত্রিক মডেল তৈরি করবে এই প্রযুক্তি। এতে গোললাইন প্রযুক্তি, হক-আই ধরনের ট্র্যাকিং এবং কানেক্টেড বল ডেটা একসঙ্গে কাজ করবে।
এর আগেও ফুটবলে কানেক্টেড বল প্রযুক্তি ব্যবহার হয়েছে, যার মধ্যে ২০২২ বিশ্বকাপও রয়েছে। তবে ২০২৬ সালের সংস্করণটি আরও দ্রুত, নির্ভুল এবং ম্যাচ পরিচালনা ব্যবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত।









