মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ব্রাজিলের হাজারো সমর্থকদের স্তব্ধ করে দেন মরক্কোর ইসমাইল সাইবারি। মরক্কোকে এক পয়েন্ট এনে দেওয়ার নায়কও তিনি। তার ২১ মিনিটের গোলেই এগিয়ে যায় গত বিশ্বকাপের সেমিফাইনালিস্টরা। অথচ মরক্কোর জয়ের নায়কের ক্যারিয়ারের পেছনে রয়েছে নানা ঘটনা।
১৪ বছর বয়সেই শেষ হয়ে যেতে পারতো তার ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন। বেলজিয়ামের হয়ে খেলার প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়া ফরোয়ার্ড বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন গত আফ্রিকান কাপ অফ নেশনসের সময়।
২০১৮ সালের বিশ্বকাপে তৃতীয় স্থানে শেষ করেছিল বেলজিয়াম। সে বার খেতাব জয়ের অন্যতম দাবিদার ছিল রবার্তো মার্টিনেজ়ের দল। সেই মার্টিনেজ ২০২২ বিশ্বকাপের আগে সাইবারিকে বেলজিয়ামের হয়ে খেলার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। অন্য কোনও ফুটবলার হলে সেই প্রস্তাব হয়তো লুফে নিতেন। কিন্তু সাইবারি সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন!
কিশোর বয়সেই সাইবারির মনে বেলজিয়ামের প্রতি অভিমান তৈরি হয়েছিল। কারণ তার বয়স যখন ১৪, তখন ওজন কিছুটা বেড়ে যাওয়ায় বেলজিয়ামের ক্লাব আন্দ্রেলেখ্ত তাকে বাতিল করে দেয়। ধাক্কা খায় কিশোর ফুটবলারের স্বপ্ন। সাইবারি অবশ্য হাল ছাড়েননি। পরে যোগ দেন পিএসভি আইন্ডহোভেনের মতো ক্লাবে। সেখানে কোচ হিসাবে পান নেদারল্যান্ডসের প্রাক্তন ফুটবলার রুড ভ্যান নিস্তেলরুইকে। তার প্রশিক্ষণেই তৈরি হয়েছেন আজকের সাইবারি।
নিউজার্সি স্টেডিয়ামে সতীর্থ ব্রাহিম ডিয়াজ়ের কাছ থেকে বল পেয়ে গতিতে ব্রাজিলের দুই ডিফেন্ডারকে পরাস্ত করে গোল করেছেন সাইবারি। তার নিখুঁত চিপের নাগাল পাননি ব্রাজিলের গোলরক্ষক অ্যালিসন বেকার। এই গোলের জন্য মরক্কো শিবিরে তিনি এখন নায়ক। কিছু দিন আগে এক সাক্ষাৎকারে সাইবারি বলেছিলেন, ‘‘আন্দ্রেলেখ্তে থাকার সময় চোট পেয়েছিলাম। খুব বেশি খেলতে পারিনি। ক্লাব কর্তৃপক্ষ আমার সঙ্গে ওই সময় যে ব্যবহার করেছিলেন, তাতে কষ্ট পেয়েছিলাম। মৌসুমের শেষে আমাকে বলা হয়েছিল, দলে রাখা হবে। আমার ওপর কর্তাদের আস্থা রয়েছে। কিন্তু পরের মৌসুমের শুরুতেই সব বদলে যায়। অন্য ক্লাব খুঁজে নিতে বলা হয় আমাকে।’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘ওই কথা শোনার পর কয়েক মিনিটের জন্য দিশাহারা হয়ে পড়েছিলাম। মনে হয়েছিল আমার ভবিষ্যৎ অন্ধকার। সব শেষ হয়ে গেলো। তবে ওই ধাক্কাটাই আমায় ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করেছিল। উৎসাহিত করেছিল। কয়েক গুণ বেশি পরিশ্রম করতে অনুপ্রাণিত করেছিল। ছোট বয়সে সবাই খেলার জন্য ছটফট করে। প্রচুর উৎসাহ থাকে। হঠাৎ বাদ দিয়ে দেওয়াটা মেনে নিতে পারিনি। খুব কষ্ট পেয়েছিলাম। সেই কষ্ট লাঘব করা জন্যই নিজেকে অনুশীলনে ডুবিয়ে দিয়েছিলাম।’’
সাইবারির জন্ম স্পেনে। ৬ বছর বয়সে তার পরিবার চলে যায় বেলজিয়ামে। ১০ বছরের বেশি সেখানে ছিলেন। বেলজিয়ামেই ফুটবল শেখা শুরু। তিনি বলেছেন, ‘‘পাঁচ-ছ’বছর বয়সে রাস্তায় খেলা শুরু আমার। তখন ১০-১২ বছরের ছেলেদের সঙ্গে খেলতাম। কারণ আমার বয়সের কেউ ছিল না তেমন।’’
মার্টিনেজ়ের প্রস্তাব কেন ফিরিয়ে দিয়েছিলেন? সাইবারি বলেছেন, ‘‘জাতীয় দল নির্বাচন করাটা সহজ নয়। মনের টানের ব্যাপার থাকে। একটা দেশের প্রতিনিধিত্ব করার ব্যাপার। সেটা হৃদয় থেকে হওয়া গুরুত্বপূর্ণ। অন্য রকম অনুভূতি এটা। তাছাড়া কাদের হয়ে খেললে ফুটবলার হিসাবে লাভবান হতে পারবো, সেটাও ভাবিয়েছিল। মার্টিনেজ় আমায় বেলজিয়ামের হয়ে খেলার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। চাইলে স্পেনের হয়েও খেলতে পারতাম। তাও মরক্কোকে বেছে নিয়েছি। মরক্কোর যুব দলের হয়ে খেলেছি। তাই একটা টান তৈরি হয়ে গিয়েছিল। সিদ্ধান্ত নিতে খুব সমস্যা হয়নি।’’
কিছু দিন আগে একটি বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন সাইবারি। আফ্রিকান কাপ অফ নেশনসের ম্যাচে তাকে সেনেগালের গোলরক্ষক এডুয়ার্ড মেন্ডির তোয়ালে চুরি করতে দেখা যায়। টেলিভিশনের ক্যামেরায় ধরা পড়ে ঘটনাটি। বৃষ্টির মধ্যে মেন্ডি যাতে দস্তানা মুছতে না পারেন, তাই তোয়ালে সরিয়ে নেন সাইবারি। তার সঙ্গে ছিলেন আশরফ হাকিমিও। সেই ঘটনার জন্য তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন। ভুল বুঝতে পেরে তিনি মেন্ডি এবং গোটা সেনেগাল দলের কাছে গিয়ে ক্ষমা চান।
তবে এখন সাইবারি মরক্কোর অন্যতম আশা ভরসার প্রতীক হয়ে উঠেছেন।









