নিউইয়র্কের টাইমস স্কয়ার। বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত এই চত্বরে হঠাৎ করেই কয়েক শ মানুষ বসে পড়লেন সারি বেঁধে। তারপর শুরু হলো বৈঠা চালানোর ভঙ্গি। কেউ সামনে ঝুঁকছেন, কেউ পেছনে হেলছেন। দূর থেকে মনে হতে পারে, কোনো অদৃশ্য নৌকা বেয়ে চলেছেন তাঁরা।
এটা অবশ্য কোনো প্রতিবাদ কর্মসূচি নয়, কোনো শিল্প পরিবেশনাও নয়। এটি ‘ভাইকিং রো’—২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপের অন্যতম আলোচিত সমর্থক-উদযাপন।
নরওয়ের সমর্থকেরা বিশ্বকাপে নিজেদের দলকে সমর্থন জানাতে যে অভিনব উদযাপন শুরু করেছেন, সেটিই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। মাঠের গ্যালারি থেকে শুরু করে নিউইয়র্কের সাবওয়ে, এসকেলেটর, শহরের রাস্তা—সবখানেই দেখা যাচ্ছে এই দৃশ্য। এমনকি এর ঢেউ পৌঁছে গেছে নরওয়ের জাতীয় সংসদেও।
কী এই ‘ভাইকিং রো’
‘ভাইকিং রো’ মূলত বৈঠা চালানোর অনুকরণে করা একটি সমবেত উদযাপন। সমর্থকেরা একসঙ্গে বসে বা দাঁড়িয়ে শরীর দোলান এবং হাত দিয়ে বৈঠা চালানোর ভঙ্গি করেন। দেখতে অনেকটা ভাইকিংদের ঐতিহাসিক লংশিপে বৈঠা বাইবার দৃশ্যের মতো।
বিশ্বকাপ চলাকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলোতে দেখা গেছে, নরওয়ের সমর্থকেরা শুধু স্টেডিয়ামে নয়, ট্রেন স্টেশন, সাবওয়ে, সড়ক, এমনকি জনসমাগমস্থলেও এই উদযাপন করছেন। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গণমাধ্যম আইহার্টরেডিওর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, নিউইয়র্কের টাইমস স্কয়ার থেকে শুরু করে ম্যানহাটনের বিভিন্ন জায়গায় ‘ভাইকিং রো’ এখন এক ধরনের উৎসবে পরিণত হয়েছে।
ইতিহাসের শেকড়ে ভাইকিংরা
‘ভাইকিং রো’-এর পেছনে রয়েছে উত্তর ইউরোপের হাজার বছরের ইতিহাস। অষ্টম থেকে একাদশ শতক পর্যন্ত স্ক্যান্ডিনেভিয়া অঞ্চলের নাবিক ও যোদ্ধারা ‘ভাইকিং’ নামে পরিচিত ছিলেন। বর্তমান নরওয়ে, সুইডেন ও ডেনমার্কের এসব মানুষ সমুদ্রযাত্রা, বাণিজ্য ও অভিযানের জন্য বিখ্যাত ছিলেন। তাদের ব্যবহৃত দীর্ঘাকৃতির জাহাজ বা লংশিপ ছিল সেই যুগের অন্যতম প্রতীক।
এই লংশিপগুলো চলত বৈঠার শক্তিতে। কখনও ৩০, কখনও ৫০ জন পর্যন্ত নাবিক একসঙ্গে বৈঠা চালাতেন। সেই দৃশ্যই আধুনিক সময়ে নরওয়েজিয়ান সমর্থকদের কাছে জাতীয় ঐতিহ্যের প্রতীক হয়ে উঠেছে। ‘ভাইকিং রো’ মূলত সেই ইতিহাসেরই এক সাংস্কৃতিক পুনর্নির্মাণ।
বিশ্বকাপে কেন এত জনপ্রিয়তা পেলো
২৮ বছর পর বিশ্বকাপে ফিরেছে নরওয়ে। দলের হয়ে দুর্দান্ত খেলছেন তারকা স্ট্রাইকার আর্লিং হলান্ড। মাঠে দলের সাফল্যের পাশাপাশি সমর্থকদের এই অভিনব উদযাপনও বিশ্বজুড়ে আলোচনায় এসেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা যায়, নিউইয়র্ক-নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে সেনেগালের বিপক্ষে ম্যাচের আগে শত শত সমর্থক টাইমস স্কয়ারে একযোগে ‘ভাইকিং রো’ করছেন। কেউ আবার সাবওয়ের মেঝেতে বসে বৈঠা চালানোর অভিনয় করছেন। অনেক আমেরিকান দর্শকের কাছে বিষয়টি ছিল নতুন এবং বেশ মজার।
বিশ্বকাপের মতো বৈশ্বিক আসরে আলাদা পরিচয় তৈরি করার ক্ষেত্রে সমর্থকদের ভূমিকা সব সময়ই গুরুত্বপূর্ণ। নরওয়ের সমর্থকেরা এবার সেটিই করেছেন নিজেদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে সামনে এনে।
নরওয়ের সংসদেও ‘ভাইকিং রো’
উন্মাদনার সবচেয়ে চমকপ্রদ দিকটি দেখা গেছে নরওয়ের সংসদে। বিশ্বকাপে দলের প্রতি সমর্থন জানাতে এক পর্যায়ে সংসদের কার্যক্রমে বিরতি দিয়ে কয়েকজন আইনপ্রণেতা একসঙ্গে ‘ভাইকিং রো’ করেন। সেই ভিডিওও দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণত রাজনৈতিক বিতর্ক ও আইন প্রণয়নের জন্য পরিচিত সংসদ ভবনে এমন দৃশ্য খুব একটা দেখা যায় না।
ফলে ‘ভাইকিং রো’ শুধু ফুটবল সমর্থকদের উদযাপন হিসেবেই থাকেনি; এটি নরওয়ের জাতীয় গর্ব ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রতীক হিসেবেও আবির্ভূত হয়েছে।
‘ভাইকিং ক্ল্যাপ’ নয়, ‘ভাইকিং রো’
অনেকেই ‘ভাইকিং রো’-কে আইসল্যান্ডের বিখ্যাত ‘ভাইকিং ক্ল্যাপ’-এর সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেন। তবে দুটির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
২০১৬ ইউরোতে আইসল্যান্ডের সমর্থকেরা ধীরগতির তালি ও গর্জনের সমন্বয়ে ‘ভাইকিং ক্ল্যাপ’ জনপ্রিয় করেছিলেন। অন্যদিকে ‘ভাইকিং রো’ হলো বৈঠা চালানোর ভঙ্গিতে করা সমবেত উদযাপন, যা নরওয়ের সমর্থকদের মাধ্যমে আলোচনায় এসেছে।
বিশ্বকাপের প্রতিটি আসরই কিছু স্মরণীয় ছবি উপহার দেয়। ২০২৬ বিশ্বকাপের জন্য সেই তালিকায় হয়তো জায়গা করে নিয়েছে ‘ভাইকিং রো’। কারণ, এটি শুধু একটি উদযাপন নয়; এটি ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ফুটবল উন্মাদনার এক অনন্য মিশেল।
সূত্র: আইহার্টরেডিও, রয়টার্স, বিবিসি স্পোর্ট, হিস্টোরিডটকম








