মাঠের মহানাটকীয় লড়াইয়ে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠার আনন্দ ছাপিয়ে এবার বড় ধরনের আইনি ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে যাচ্ছে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। সেমিফাইনালে থমাস টুখেলের ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারানোর পর, মাঠের ভেতর ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের ওপর আর্জেন্টিনার রাজনৈতিক দাবির পক্ষে ব্যানার প্রদর্শন করায় বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা এই তদন্ত শুরু করতে যাচ্ছে।
আটলান্টায় অনুষ্ঠিত এই সেমিফাইনালে পিছিয়ে পড়েও শেষ মুহূর্তের জাদুতে ২-১ ব্যবধানে জয় ছিনিয়ে নেয় আলবিসেলেস্তেরা। এই জয়ের মাধ্যমে আগামী রবিবারের ফাইনালে স্পেনের মুখোমুখি হওয়া নিশ্চিত করেছে তারা। তবে ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজার পরপরই আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়েরা মাঠের ভেতর একটি ব্যানার হাতে উদযাপন করেন, যাতে লেখা ছিল ‘Las Malvinas son Argentinas’ (ফকল্যান্ডস আর্জেন্টিনার)।
দক্ষিণ-পশ্চিম আটলান্টিক মহাসাগরের একটি ব্রিটিশ ওভারসিজ টেরিটরি (ব্রিটিশ শাসিত অঞ্চল) ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে ব্রিটেন ও আর্জেন্টিনার মধ্যে সার্বভৌমত্বের ঐতিহাসিক বিরোধ এখনও অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়। আর্জেন্টিনার পূর্ব উপকূল থেকে মাত্র ৩০০ মাইল দূরে অবস্থিত এই দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে ১৯৮২ সালের এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত দেশ দুটি এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে জড়িয়েছিল। ৭৪ দিনের সেই ঐতিহাসিক যুদ্ধে ৬৫৫ জন আর্জেন্টাইন এবং ২৫৫ জন ব্রিটিশ সেনা নিহত হন; এছাড়া দ্বীপটির ৩ জন স্থানীয় বাসিন্দাও প্রাণ হারান।
বিশ্বকাপের মতো বৈশ্বিক মঞ্চে এই সংবেদনশীল রাজনৈতিক ইস্যু টেনে আনায় ফিফার শৃঙ্খলা কমিটি কঠোর অবস্থান নিতে যাচ্ছে। কারণ ফিফার নিয়ম অনুযায়ী মাঠের ভেতর যেকোনও ধরনের রাজনৈতিক, ধর্মীয় বা ব্যক্তিগত বার্তা প্রদর্শন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
রাজনৈতিক বার্তা প্রদর্শনের জন্য আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এএফএ) এর আগেও ফিফার তোপের মুখে পড়েছিল। এর আগে ২০১৪ সালে স্লোভেনিয়ার বিপক্ষে একটি প্রীতি ম্যাচের আগে আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা ঠিক একই বার্তা সম্বলিত ব্যানার প্রদর্শন করেছিলেন। সে সময় ফিফা এটিকে ‘রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও দলের অসদাচরণ সংক্রান্ত নিয়ম ভঙ্গ’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে আর্জেন্টাইন ফেডারেশনকে ২০,০০০ পাউন্ড জরিমানা করেছিল। এবার বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের মতো মঞ্চে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটায় শাস্তির মাত্রা আরও কঠোর হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
খেলোয়াড়দের মাঠের এই কাণ্ডকে আরও উসকে দিয়েছেন আর্জেন্টিনার ভাইস-প্রেসিডেন্ট ভিক্টোরিয়া ভিলারুয়েল। এই ঐতিহাসিক জয়ের পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘এক্স’-এ (সাবেক টুইটার) আর্জেন্টিনার সৈন্যদের একটি আবেগঘন ভিডিও পোস্ট করে তিনি লেখেন, “এটি কেবল সাধারণ কোনো ম্যাচ ছিল না।”
ভিলারুয়েল তার পোস্টে স্পষ্ট ভাষায় লেখেন, “ফকল্যান্ডস আর্জেন্টিনার। তারা স্টেডিয়ামে এগুলো (ব্যানার) নিয়ে আসা নিষিদ্ধ করেছে, কিন্তু ভুলে গেছে যে এগুলো আমরা আমাদের রক্তে ও হৃদয়ে বহন করি।”
উল্লেখ্য, এর আগে শেষ ১৬-এর ম্যাচে মিশরের বিপক্ষে নাটকীয় ৩-২ গোলের জয়ের পরও আর্জেন্টিনার ড্রেসিংরুমে খেলোয়াড়দের এমন কিছু গান গাইতে দেখা গিয়েছিল, যার কথায় ফকল্যান্ডস যুদ্ধ এবং আর্জেন্টিনার দুই ফুটবল কিংবদন্তি দিয়েগো ম্যারাডোনা ও লিওনেল মেসির উল্লেখ ছিল। মাঠের লড়াই জিতে ফাইনালে উঠলেও, এই ব্যানার বিতর্কের জেরে শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচের আগে আর্জেন্টাইন শিবিরে ফিফার শাস্তির খাঁড়া ঝুলছে।









