মায়ামির হার্ড রক স্টেডিয়ামে শনিবার রাতে যা হলো, তা স্রেফ একটি ব্রোঞ্জ মেডেল ম্যাচ নয়— এটি বিশ্বকাপের ইতিহাসের অন্যতম অবিশ্বাস্য ম্যাচ হিসেবে চিরকাল মনে থাকবে। প্রথমার্ধে ইংল্যান্ডের একচেটিয়া ৪-০ লিড, দ্বিতীয়ার্ধে এমবাপ্পে ঘূর্ণিঝড়ে ৪-৩, শেষ মিনিটে দেম্বেলের গোলে ৪-৫, তারপর বেলিংহামের শেষ লাথিতে ৪-৬। মোট ১০টি গোলের এই থ্রিলার শেষে ইংল্যান্ড তৃতীয় স্থান নিশ্চিত করলো, আর এমবাপ্পে লিখলেন বিশ্বকাপের সর্বকালের গোলের নতুন ইতিহাস।
১৯৬৬ সালে ঘরের মাঠে বিশ্বকাপ জয়ের পর এটাই ইংল্যান্ডের পুরুষ বিশ্বকাপে সেরা ফলাফল।
প্রথমার্ধ: ইংল্যান্ডের ঝড়, ফ্রান্স ছিন্নভিন্ন
মাত্র ৩ মিনিটে রাইসের বুলেট, তারপর কনসার হেডার, সাকার নাটকীয় তৃতীয় গোল। তবে সবচেয়ে অবিশ্বাস্য মুহূর্তটা এলো ৪৫+২ মিনিটে। এবেরেচি এজের ডিফেন্ডারের কাঁধের উপর দিয়ে নিখুঁত পাস পেয়ে সাকা শরীর ঘুরিয়ে ফরাসি গোলরক্ষককে পরাস্ত করে বল পাঠালেন জালের কোণায়। বিরতিতে ৪-০— বিশ্বকাপের ইতিহাসে এই পর্যায়ের ম্যাচে এত বড় ব্যবধান নজিরবিহীন।
দ্বিতীয়ার্ধ: এমবাপ্পের রুদ্রমূর্তি
বিরতির পর মাঠে নামলেন যেন অন্য এক এমবাপ্পে।
৪৮ মিনিটে ওয়াটকিন্সের বল হারানো থেকে ফরাসি কাউন্টার, অলিসের পাসে পেনাল্টি স্পটের কাছ থেকে সাইড-ফুট— ফ্রান্স ১-৪। এটি এমবাপ্পের এই বিশ্বকাপে নবম গোল, মেসিকে টপকে গোল্ডেন বুটে একক শীর্ষে।
৫৪ মিনিটে এমবাপ্পের পাস থেকে বারকোলার নিয়ার পোস্টে শট— ২-৪। হেন্ডারসন কিছু করার আগেই বল জালে। স্টেডিয়ামে হঠাৎ করেই পরিবেশ পাল্টে গেল।
আর ৬৬ মিনিটে এলো সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত। ডি-বক্সের বাইরে অলিসের সঙ্গে একের পর এক ওয়ান-টু খেলে রক্ষণ ভেঙে ভেতরে ঢুকলেন এমবাপ্পে, তারপর শরীর ঘুরিয়ে নিখুঁত ফিনিশে বল গেল নিচের কোণায়। ৩-৪।
মেসির ২১ বিশ্বকাপ গোলের রেকর্ড টপকে এমবাপ্পে এখন ২২ গোলে— বিশ্বকাপের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা।
মাঝমাঠের হাইড্রেশন ব্রেকে হাঁফ ছাড়লো ইংলিশ শিবির। টুখেলের সামনে প্রশ্ন— ‘বাস পার্ক’ করবেন, নাকি চাপে নাকাল হবেন?
শেষের নাটক
৮৭ মিনিটে সাকার হ্যাটট্রিক— ৫-৩। স্বস্তির নিঃশ্বাস ইংলিশ শিবিরে। কিন্তু ফুটবল কখনও শেষ হয় না শেষ বাঁশি বাজার আগ পর্যন্ত।
৯০+৬ মিনিটে দেম্বেলে বাঁ পায়ে কার্লড শটে ফার কর্নারে বল জড়ালেন— ৪-৫। স্টেডিয়ামে চিৎকার। ইংল্যান্ড ডিফেন্ডাররা একে অপরের দিকে তাকাচ্ছেন, ভরসা খুঁজছেন।
কিন্তু শেষ কথা বললেন বেলিংহাম। হাফলাইন থেকে এগিয়ে গেলেন একাই, বক্সে ঢুকলেন, লাক্রোয়াকে পরাজিত করে স্লট করলেন নিচের কোণায়— ৬-৪। সেটাই শেষ কিক, সেটাই শেষ বাঁশি।
বিবিসি রেডিওতে সাবেক ইংল্যান্ড ডিফেন্ডার ম্যাট আপসন বললেন, “এর চেয়ে ভালো সমাপ্তি ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপ অভিযানের হতে পারতো না। বেলিংহামের এই গোলটা বলে দিচ্ছে ম্যাচটা কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল খেলোয়াড়দের কাছে।”
ম্যাচের নায়করা
বুকায়ো সাকা— হ্যাটট্রিক ও একটি অ্যাসিস্ট। মায়ামির রাতে আর্সেনাল উইঙ্গার পরিণত হলেন ইংল্যান্ডের সুপারহিরোতে।
কিলিয়ান এমবাপ্পে— জোড়া গোল ও একটি অ্যাসিস্ট। হারের রাতেও ইতিহাস গড়লেন। বিশ্বকাপে ২২ গোল, গোল্ডেন বুট (১০ গোল), ফাইনাল ছাড়াও পূর্ণ কিংবদন্তি।
জুড বেলিংহাম— শেষ গোল ও মোট ছয়টি টুর্নামেন্ট গোল। তৃতীয় স্থানের ম্যাচে এই মনোবল ও সৃজনশীলতার প্রদর্শনী আগামী বিশ্বকাপের বার্তা দিয়ে গেলো।
১৯৬৬-এর পর সেরা ইংল্যান্ড
তৃতীয় স্থান। ১৯৬৬ সালে ঘরের মাঠে বিশ্বকাপ জয়ের পর এটাই ইংল্যান্ডের পুরুষ বিশ্বকাপে সেরা ফলাফল। সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনার কাছে হারের ব্যথা একটু হলেও কমলো এই বিধ্বংসী জয়ে।
আর ফ্রান্স? কোচ দিদিয়ে দেশমের বিদায়ী ম্যাচ শেষ হলো এই অবিশ্বাস্য ১০ গোলের থ্রিলারে। হারলেও, দেশম ও তার দল মাথা উঁচু রেখেই মাঠ ছাড়লেন।
মায়ামির এই রাতটা অনেকদিন মনে থাকবে।









