হকি ফেডারেশনের নির্বাহী কমিটি নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ঘরোয়া হকিতে ‘বিশৃঙ্খলার’ কারণে একযোগে ৩১ জন খেলোয়াড়,কোচ ও কর্মকর্তাকে বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তি দেওয়া হয়েছে। এরমধ্যে হকির পোস্টার বয় রাসেল মাহমুদ জিমি ১২ ম্যাচ নিষিদ্ধ হয়েছেন। এ ছাড়া মালয়েশিয়ান কোচ ইমান গোপিনাথনকে আজীবন বাংলাদেশের হকিতে নিষদ্ধ করা হয়েছে। ফেডারেশনের এমন কঠোর শাস্তি আরোপ ক্রীড়াঙ্গনে বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছে। মোহামেডান অধিনায়ক জিমির কাছে শাস্তি নতুন কিছু নয়। তবে যেভাবে এবার ফেডারেশন বড়সড় শাস্তি দিয়েছে তা মেনে নিতে পারছেন না ৩৬ বছর বয়সী স্ট্রাইকার। বাংলা ট্রিবিউনের কাছে নানান ব্যাখ্যাও দিয়েছেন…
আপনিসহ ৩১ জনকে ফেডারেশন শাস্তি দিয়েছে। নিশ্চয়ই এরই মধ্যে জানতে পেরেছেন?
রাসেল মাহমুদ জিমি: হ্যাঁ, সিদ্ধান্তটা জেনে হতাশ লাগছে। এমনটি আশা করিনি।
কেন আশা করেননি? অন্যায় করলে তো শাস্তি পেতেই হবে।
জিমি: অন্যায় করলে শাস্তি মাথায় পেতে নিতে কোনও আপত্তি নেই। কিন্তু যদি বলি এটা আসলে উনারা ব্যক্তি আক্রোশ মিটিয়েছেন তাহলে কি ভুল হবে?
সেটা কেমন?
জিমি: আসলে আমি মনে হয় বেশিদিন হকি খেলে ফেলেছি। তা নাহলে সেই যে কবে শুরু করেছি, ১৯৯৮ সাল থেকে। এখনও খেলে চলেছি। এটা হয়তো অনেকের পছন্দ হচ্ছে না। তাই হয়তো আমাকে কেউ কেউ থামাতে চাইছে।
কিন্তু প্রিমিয়ার লিগে তো আপনি মোহামেডানের হয়ে মাঠে নানান সময় আম্পায়ারিং নিয়ে সোচ্চার ছিলেন। যার কারণে খেলা বন্ধ ছিল। এই দায় আপনি এড়াতে পারবেন?
জিমি: দেখুন সবাই শুধু দেখছে আমি আম্পায়ারের সঙ্গে তর্ক করছি। খেলা বন্ধ ছিল। কিন্তু কেন করছি সেটা তো কেউ বলছে না। আমি মোহামেডানের অধিনায়ক। খেলার সময় যদি দলের বিপক্ষে অন্যায় কোনও কিছু ঘটে তাহলে আমাকেই তো এগিয়ে আসতে হবে। তাহলে কি আমি কিছু বলতে পারবো না? প্রতিবাদ জানাতে পারবো না? আরেকটা বিষয়, রিভিউ নিতে গেলে সময়ক্ষেপণ হয়। তা শুধু আমরা নই, প্রতিপক্ষ চাইলেও। তাই শুধু আমাদের দিকটা দেখলেই হবে না।
অবশ্যই প্রতিবাদ জানাতে পারবেন। নিশ্চয়ই সেটা হতে হবে আইনের মধ্যে থেকে। কর্মকর্তারা অন্তত তাই বলছেন।
জিমি: আমি যা করেছি আইনের মধ্যে থেকেই। প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে যদি খেলা বন্ধ থাকে তাহলে সেই দায় তো আমার নয়। আম্পায়ারিং যদি দুর্বল হয় তাহলে আমাদের মতো বড় দল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আমি একজন অধিনায়ক হয়ে মানতে পারবো না। আর অধিনায়ক হয়ে সবকিছুই আমাকে দেখতে হয়। তাই হয়তো আমার প্রতিবাদটা সবার চোখে পড়ে।
আপনি যখন প্রতিবাদ করেন, আপনার মধ্যে যুদ্ধাংদেহী মনোভাব ফুটে উঠে। বিশেষ করে আপনার হাত যেভাবে চলে, মনে হয় এই বুঝি সংঘর্ষ শুরু হলো!
জিমি: আসলে ভাই এটা আমার স্টাইল হয়ে গেছে (অনেকটা হেসে)। আপনারা যেমন কলম খাতা নিয়ে কাজ করেন, নোট নেন। এটা আপনাদের স্টাইল। আমারও তেমন কথা বলার সময় হাত দিয়ে বোঝাতে গিয়ে সবার চোখে পড়ে। এখানে অন্য কোনও বিষয় নেই।
আপনি এর আগেও বিভিন্ন মেয়াদে নিষিদ্ধ হয়েছিলেন। বার বারই আপনি কেন নিষিদ্ধ হবেন?
জিমি: ওই যে বললাম আপনি যদি কোনও দলের অধিনায়ক হন, তাহলে তো আপনাকে অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে হবে। আর সিনিয়র খেলোয়াড় হিসেবেও প্রতিবাদ করে থাকি। সেটা করতে গিয়ে অনেকের রোষানলে পড়ে যাই। এখানে অন্য কিছু ভাববার নেই।
এখন এই অবস্থায় কী করবেন?
জিমি: আমাদের ক্লাবের শুধু আমি নই, অনেকেই শাস্তি পেয়েছেন। কোচ, ম্যানেজার কর্মকর্তাসহ অনেকেই। সবাই বসে সিদ্ধান্ত নেবো আপিল করবো কিনা। কিংবা পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে!
কোচের সাসপেনশনের কথা বলছেন। এই প্রথম মনে হয় বাংলাদেশে কোনও বিদেশি কোচ আজীবন নিষিদ্ধ হলেন?
জিমি: আমার কাছে তাই মনে হয়। আগে কখনও বিদেশি কোচের আজীবন নিষিদ্ধের কথা শুনিনি। এই যে দেখুন মালয়েশিয়ার কোচ গোপিনাথন নানান সমস্যা তুলে ধরেছেন। তিনি এর আগে বাংলাদেশ জাতীয় দল ও বিকেএসপির কোচ ছিলেন। এই দেশের সবকিছু্ই ভালো করে চিনেন, জানেন। তাই সবকিছু দেখে অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছেন, নানান দিক তুলে ধরেছেন। তাতেই তাকে আজীবন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এর অর্থ কেউ প্রতিবাদ করলেই তাকে দমিয়ে রাখতে হবে। এর জন্য নিষেধাজ্ঞা হলো বড় মাধ্যম! এতে বাইরে কী বার্তা যাচ্ছে। আমাদের হকির বদনাম হচ্ছে।
কিন্তু হকি ফেডারেশনের ডিসিপ্লিনারি কমিটি তো এসব সিদ্ধান্ত তথ্য-উপাত্ত দেখে নিয়েছেন। এমনটাই বলা হয়েছে।
জিমি: ডিসপ্লিনারি কমিটির কথা বলছেন। এই কমিটিতে কারা আছেন, কারা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, সেটাই তো জানতে পারলাম না। কাল তো দেখলাম ফেডারেশন কমিটির নাম ‘সিক্রেট’ রেখেছেন! কিছুতেই বলতে চাননি। অথচ ফুটবল ও ক্রিকেটসহ সব জায়গায় কমিটির নাম থাকে। তাহলে কি বলবো ‘জিন’ আমাদের শাস্তি দিয়েছে!
এর আগেও হকিতে শাস্তি হয়েছে। তখনও ডিসিপ্লিনারি কমিটির নাম প্রকাশ্যে ছিল। এখন তাহলে নাম বলতে সমস্যা কোথায়। আমার মনে হয় আমাদের দমাতে কারও কারও আক্রোশ ছিল। তা নাহলে মোহামেডানের বিপক্ষে এত শাস্তি কেন!শুধু আমরাই খেলার সময় প্রতিবাদ জানিয়েছি? অন্য দল কি করেনি? অন্য দলের কোচও তো নিম্নমানের আম্পায়ারিং নিয়ে মিডিয়ার সঙ্গে কথা বলেছে। কোথায়, তাদের তো সেভাবে কিছু হয়নি।
আর একটি বিষয়। লিগ চলাকালে কেন আমাদের শাস্তি দেওয়া হলো না। ওই ম্যাচে যদি অন্যায় করে থাকি, তাহলে কেন সেসময় শাস্তি হয়নি। তা না করে লিগ শেষ হওয়ার প্রায় তিন মাস পর শাস্তি দেওয়া হলো। বুঝতে পারছি না।
যেখানে অনেক দিন পর লিগ হলো, সেখানে সবকিছু ইতিবাচক হলো না কেন? এই দায় কার?
জিমি: হকি ফেডারেশনে ‘শাস্তি শাস্তি খেলা’ অনেক পুরানো। যত দিন যাচ্ছে খেলাটা শুধু পেছনের দিকে হাঁটছে। এমনিতে ‘অলিম্পিকের’ মতো লিগ হয়ে থাকে। তার ওপর খেলা শুরু না হতেই নানান ঝামেলা। এই দায় আসলে আমার কাছে মনে হয় সবার।
প্রতিটা ম্যাচে তাহলে আপনাদের এভাবে প্রতিবাদ করতে হবে কেন? আবাহনীর বিপক্ষে তো মাঠ ছেড়েই চলে গেলেন!
জিমি: না করে উপায় নেই। আমরা রিভিউ চেয়েছিলাম। আম্পয়ার দিয়েছেও। এখন সমস্যা হলো রিভিউ নিতে গেলে সময় লাগে। আম্পায়াররা যদি সঠিক সিদ্ধান্ত না নিতে পারেন সমস্যা তো থাকবেই। কোনও অন্যায় কিছু চাপিয়ে দিলে তো মানা কঠিন। এতে করে দল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আর আপনি আমার জায়গায় থাকলে কী করতেন। আমরাও চাই সুষ্ঠ আম্পায়ারিং হোক। সবকিছু সুষ্ঠ হয় না বলেই আজ এত সমস্যা।
ক্যারিয়ারের শেষ দিকে আছেন। কী ভাবছেন?
জিমি: আগেই বলেছি আমি এতদিন খেলি, তা হয়তো কেউ কেউ চায় না। তবে আমি মাঠ থেকে বিদায় নিতে চাই, যখন নেবো। আর হকি তো এই বয়সে এসে দেখছি সেভাবে এগোয়নি। যেখানে থাকার দরকার ছিল, সেখানে নেই। তারপরও আশা দেখি সামনের দিকে কোনও একসময় খেলাটা সব সমস্যা এক পাশে রেখে আগের মতো জমে উঠবে, জনপ্রিয় হবে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সাফল্য পাবে।









