তিনি থাকেন নিউইয়র্কে। অ্যাথলেটিকস ছেড়ে সেখানেই থিতু হয়েছেন। কিন্তু চার বছর পর পর অলিম্পিক গেমস আসলেই স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েন তিনি। হওয়ারই কথা। সাইদুর রহমান ডন হলেন বাংলাদেশের প্রথম অলিম্পিয়ান। ১৯৮৪ সালে ২১ বছর বয়সে লস অ্যাঞ্জেলস অলিম্পিকে দেশের হয়ে অংশ নিয়ে ইতিহাসের পাতায় জায়গা করে নিয়েছেন দেশের একসময়ের দ্রুততম মানব। তাই এবারও প্যারিস অলিম্পিক শুরু হতে না হতে স্মৃতির সরণি বেয়ে অনেক কথাই শুনিয়েছেন। তাতে গোপন থাকেনি হতাশাও!
শুরুতে নিউইয়র্ক থেকে প্রথম অলিম্পিয়ান হওয়ার গল্পটা শোনালেন এভাবে, ‘তৎকালীন সরকার মনে করলেন আমাদের দেশ থেকে অলিম্পিকে অংশ নেওয়া উচিত। তাই সেবার আমার সামনে সুযোগ চলে আসে। দেশ থেকে শুধু আমি একাই অংশ নিয়েছিলাম। সেটারও কারণ আছে। সরকার চেয়েছিল দেশ থেকে প্রথমবার দ্রুততম মানব প্রতিনিধিত্ব করুক। তাতে করে সবার আকর্ষণ থাকবে।’
সেখানে গিয়ে বিচিত্র অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছিলেন ডন। বললেন, ‘এতো বছর আগের কথা। মনে হচ্ছে অনেকটা স্বপ্নের মতো। সেখানে গিয়ে প্রথম সিনথেটিক টার্ফে দৌড়াই। দেশে কিন্তু ঘাসের মাঠে দৌড়াতাম। সেখানে গিয়ে তো নানান অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে হয়েছে।’
প্রথম অলিম্পিয়ান হওয়ায় লস অ্যাঞ্জেলস পত্রিকারও নজর কাড়েন তিনি। তার কথায়, ‘বাংলাদেশ থেকে প্রথম কোনও ক্রীড়াবিদ অলিম্পিকে অংশ নিতে এসেছে। তাই আমার দিকে অনেকের দৃষ্টি ছিল। লস অ্যাঞ্জেলসের পত্রিকায় তো আমাকে নিয়ে বড় রিপোর্ট করলো। কার্ল লুইসের সঙ্গে একই ভিলেজে ছিলাম। একটি পত্রিকায় নিউজও হলো। আমিও পুলকিত অনুভব করলাম।’
লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিকে ১০০ মিটার স্প্রিন্টের হিটে ডনের টাইমিং ছিল ১১.২৫ সেকেন্ড। মোট ৮২ জনে ৭৮তম। আর ২০০ মিটারের হিটে টাইমিং ২২.৫৯ সেকেন্ড। তাতে ৮০ জনে ৬৮তম হয়েছিলেন তিনি।
নিজেকে সেবার নতুন করে আবিষ্কার করেছিলেন ডন, ‘সেখানে ১০০ মিটার স্প্রিন্টে অংশ নিয়ে আমার কাছে মনে হয়েছে আসলে আমরা কোথায় আছি। বিশ্বের অন্যদের সঙ্গে আমাদের অনেক পার্থক্য সেটা টের পেয়েছিলাম।’
১৯৮৪ সালের পর থেকে বাংলাদেশ থেকে নিয়মিত অলিম্পিকে ক্রীড়াবিদরা অংশ নিচ্ছে। তবে এখনও প্রায় সব ক্ষেত্রে ওয়াইল্ড কার্ডই ভরসা। ২০১৬ সালে গলফার সিদ্দিকুর ও ২০২০ সালে আর্চার রোমান সানার পর এবার ২০২৪ সালে সাগর ইসলাম সরাসরি খেলছেন।
এ নিয়ে হতাশা ঝরেছে তার, ‘এতো বছর অতিক্রম হলো এখনও আমরা গেমসের প্রধান খেলাগুলোতে সরাসরি খেলার যোগত্য অর্জন করতে পারছি না। আসলে করবো কীভাবে। করতে হলে তো আমাকে নির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হবে। আমি আমার অ্যাথলেটিকস নিয়ে বলতে পারি। কখনও শুনিনি অলিম্পিককে সামনে রেখে দীর্ঘমেয়াদে অনুশীলন হচ্ছে, বিদেশি কোচ এসেছে। অ্যাথলেটরা দারুণ কিছু সুবিধা পাচ্ছে। শুধু যাওয়ার আগে কিছুদিনের অনুশীলন করে অংশগ্রহণই বড় কথা হয়ে আছে। কর্মকর্তারা কী করছেন বোধগম্য হচ্ছে না।’
ডন বিদেশ বিভুঁইয়ে হলেও দেশের সব খেলার খবর ঠিকই রাখেন। সঠিক পরিকল্পনা করলে সাফল্য আসে তার প্রমাণ আর্চারি। ডন উদাহরণ দিয়ে বললেন, ‘আর্চারি কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে পরিকল্পনা করায় টানা দুবার সরাসরি খেলোয়াড়রা অলিম্পিকে অংশ নিচ্ছে। এটা তাদের পরিশ্রমের ফসল। যতদূর শুনেছি তাদের বিদেশি কোচের অধীনে সারা বছর অনুশীলন হয়ে থাকে। দেশের বাইরে একের পর এক টুর্নামেন্টে অংশ নিয়ে থাকে। আসলে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার সঙ্গে বাস্তবায়ন নাহলে অলিম্পিকের মতো বড় আসরে কিছু করা কঠিন।’
তার পরেও বাংলাদেশকে নিয়ে বড় স্বপ্ন দেখেন তিনি, ‘স্বপ্ন দেখি একসময় বাংলাদেশ থেকে কেউ সরাসরি খেলে পদক জিতবে। তবে জীবদ্দশায় দেখে যেতে পারবো কিনা জানি না...।’









