দেশের প্রথম মোবাইলফোন অপারেটর সিটিসেলকে নিয়ে ২০ অক্টোবর থেকে ১৬ নভেম্বর পর্যন্ত ১৬ দিনে কম নাটক হয়নি। অপারেটরটির তরঙ্গ ফিরিয়ে দিতে উচ্চ আদালতের নির্দেশ থাকলেও তা বাস্তবায়নে মন্ত্রণালয় ও বিটিআরসির গড়িমসি ও ধীরগতি ছিল। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সিটিসেলের বিরুদ্ধে যায় এমন কোনও কোনও সিদ্ধান্ত দ্রুততার সঙ্গে বাস্তবায়ন হয়েছে। ইতিবাচক সিদ্ধান্তের বেলায় দেখা গেছে ধীরগতি।
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বকেয়া টাকা সিটিসেল পরিশোধ করতে না পারায় হঠাৎ অপারেটরটির প্রধান কার্যালয়ে গিয়ে সুইচ রুম বন্ধ করে দেওয়া, উচ্চ আদালতের নির্দেশের পরও সিটিসেলের তরঙ্গ ফিরিয়ে না দেওয়া, কারিগরি সমস্যার কথা বলে সিটিসেল চালু না করা, উচ্চ আদালতের ব্যাখ্যা চাওয়ার পরে দ্রুততম সময়ের মধ্যে সিটিসেল চালুর উদ্যোগ গ্রহণে জরুরি কমিশন বৈঠক ডাকা এবং কমিশন বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরে দ্রুততম সময়ের মধ্যে সিটিসেল অফিসে গিয়ে সুইচ রুম খুলে দেওয়ার মতো ঘটনা দেখল দেশ। ততক্ষণে সর্বনাশ যা হওয়ার হয়ে গেছে। অপারেটরটির সুইচ রুম চালু হলেও হারিয়েছে তার সব গ্রাহক।
প্যাসিফিক বাংলাদেশ টেলিকম লিমিটেড (সিটিসেল) এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (পিবিটিএলইইউ) এর সভাপতি আশরাফুল করিম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমার ধারণা আমাদের কর্মীরা ছাড়া সিটিসেলের আর কোনও গ্রাহক এখন অবশিষ্ট নেই।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিটিআরসির কর্মকর্তারা এসে সুইচ রুম চালু করতে শুরু করেন রবিবার সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে। প্রায় আধ ঘণ্টা সময় লাগে সুইচ রুম চালু করতে। এরপর আমাদের পালা। সিটিসেল কর্তৃপক্ষের এই সংযোগ পুরোপুরি চালু করতে ২-৩ ঘণ্টা সময় লেগে যাবে। যদি কোনও গ্রাহক এখনও সিটিসেলে থেকে থাকেন তাহলে তারা ওই সময়ের পরে মোবাইলে কথা বলতে পারবেন।’
আশরাফুল করিম জানান, সিটিসেল বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং চালু হওয়ার পরও তাদের বকেয়া বেতন, ভাতাদি পরিশোধের কোনও উদ্যোগ নেয়নি সিটিসেল কর্তৃপক্ষ। গত ৫ মাস ধরে তারা বেতন পাচ্ছেন না।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সিটিসেল কর্তৃপক্ষ সুইচ রুম চালু করে দিয়ে পরীক্ষা করে দেখেন সংযোগ ঠিক আছে কিনা। তখন সিটিসেল মোবাইল থেকে সিটিসেলে কথা বলে সংযোগ চালুর বিষয়টি পরীক্ষা করে দেখা হয়।
এর আগে রবিবার দুপুরে এক অনুষ্ঠানে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, সিটিসেল খুলে দিতে টেকনিক্যাল কারণে (কয়েকটি পর্যায়ে তরঙ্গ খুলতে হয়) সময় লাগছে। যদিও বিটিআরসি সিটিসেলের তরঙ্গ খুলে দিতে কাজ করছে। তিনি তখন আদালতের আদেশের সার্টিফায়েড কপির জন্য তাদের অপেক্ষার কথাও জানান।
তবে রবিবার (৬ নভেম্বর) সন্ধ্যায় বিটিআরসির চেয়ারম্যান ড. শাহজাহান মাহমুদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছি। আজই খুলে দেওয়া হবে সিটিসেল।’
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, উচ্চ আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে বিটিআরসি রবিবার জরুরিভিত্তিতে কমিশন বৈঠক ডাকে। ওই বৈঠকেই সিদ্ধান্ত হয় সিটিসেলের তরঙ্গ ফিরিয়ে দেওয়ার।
রবিবার সকালে আদালতের নির্দেশনার পরও সিটিসেলের তরঙ্গ কেন খুলে দেওয়া হয়নি তা বিটিআরসির কাছে জানতে চান আপিল বিভাগ। প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহার নেতৃত্বে আপিল বিভাগের চার বিচারকের বেঞ্চ রবিবার এ ব্যাখ্যা চান। সিটিসেলের আইনজীবী তরঙ্গ না খোলার বিষয়টি নজরে আনলে আদালত এ ব্যাখ্যা চান। আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল খোন্দকার দিলিরুজ্জামান। সিটিসেলের পক্ষে ছিলেন এ এম আমিনুদ্দিন।
আপিল বিভাগের আদেশে বলা হয়, আগামী ১৯ নভেম্বরের মধ্যে সিটিসেল বকেয়ার ১০০ কোটি টাকা পরিশোধ না করলে আবারও তরঙ্গ বন্ধ করে দিতে পারবে বিটিআরসি। এর আগে বকেয়া টাকা শোধ না করায় ২০ অক্টোবর সিটিসেলের তরঙ্গ স্থগিত করা হয়। বিটিআরসির কর্মকর্তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তায় সিটিসেলের প্রধান কার্যালয়ে ঢুকে তরঙ্গ বন্ধের নির্দেশনা বাস্তবায়ন করেন।
অন্যদিকে সিটিসেল তরঙ্গ খুলে দেওয়ার আবেদন নিয়ে আপিল বিভাগে গেলে ৩ নভেম্বরে শর্ত সাপেক্ষে অবিলম্বে সিটিসেলের তরঙ্গ খুলে দেওয়ার নির্দেশ আসে সর্বোচ্চ আদালত থেকে। দুই দিন পেরিয়ে গেলেও তরঙ্গ ফিরে না পেয়ে ফের আদালতে যায় সিটিসেল।
প্রসঙ্গত, গত ৩১ জুলাই বিটিআরসি এক বিজ্ঞপ্তিতে সিটিসেলের গ্রাহকদের দুই সপ্তাহের মধ্যে বিকল্প সেবা গ্রহণ করতে অনুরোধ জানায়। সে হিসেবে ১৬ আগস্ট পর্যন্ত সময় পান গ্রাহকরা। যদিও ১৪ আগস্ট ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম জানান, বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সিটিসেলের গ্রাহকরা আরও সময় পাবেন।
এরপরে সিটিসেল উচ্চ আদালতে গেলে বিষয়টি আদালতের সিদ্ধান্তে ওপর চলে যায়। বিটিআরসি ওই নোটিশ দিলে সিটিসেল আপিল বিভাগে যায়। আপিল বিভাগ গত ২৯ আগস্ট সিটিসেলের বকেয়া টাকা পরিশোধ করার শর্তে অপারেশন চালিয়ে যেতে বলে। এজন্য সিটিসেল পেয়েছিল দুই মাস সময়। সিটিসেলের বকেয়া ৪৭৭ কোটি ৫১ লাখ টাকা দুই কিস্তিতে পরিশোধের কথা বলা হয়।
বিটিআরসি প্রকাশিত (গত ৩১ জুলাই পর্যন্ত) তথ্য অনুসারে সিটিসেলের গ্রাহক সংখ্যা ৬ লাখ ৬৮ হাজার। সংশ্লিষ্টরা বলেছিলেন, সিটিসেলের সক্রিয় গ্রাহকের সংখ্যা প্রায় দেড় লাখ (বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে নিবন্ধিত)। ৩১ আগস্ট বিটিআরসি প্রকাশিত এক তথ্যে সিটিসেলের গ্রাহক সংখ্যা ১ লাখ ৪২ হাজার উল্লেখ করা হয়।
/এসটি/








