ধরা যাক, আপনি স্মার্টফোনে দ্রুতগতির ইন্টারনেট থ্রিজি ব্যবহার করেন। কিন্তু সব সময় ইন্টারনেটের গতি সমান পান না। কখনও বেশি, কখনও কম। বাসার ভেতরে থাকলে কম গতি, বারান্দায় গেলে পান বেশি গতি।
আপনি হয়তো খেয়াল করেছেন, মোবাইল সেটে ইন্টারনেট চালু থাকলে চার্জ বেশিক্ষণ থাকে না। ঘর আর বারান্দা করতে গিয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখা গেল আপনার মোবাইলে চার্জ অর্ধেক শেষ বা পুরো শেষের পথে। এই সমস্যার বেশির ভাগ হয় স্মার্টফোনে। ফিচার ফোনেও এই সমস্যা হচ্ছে। তবে সমস্যাটি কিন্তু মোবাইল সেটের কারণে নয়। সমস্যা মোবাইলফোন অপারেটরগুলোর নেটওয়ার্ক সমস্যার কারণে। বিশেষজ্ঞরা এমনটিই ধারণা করছেন।
প্রযুক্তিবিদরা বলছেন,মোবাইলফোন সেটগুলোকে সারাক্ষণ (বার বার) ফ্রিকোয়েন্সি পরিবর্তন করতে হলে সেগুলো দ্রুত কর্মক্ষমতা হারায়। মোবাইলফোন অপারেটরগুলো তাদের নেটওয়ার্ক (বেশি সংখ্যক টাওয়ার স্থাপন করে) বাড়ালে এই সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে পারেন ব্যবহারকারীরা।
আরও পড়ুন: ঘুরে আসতে পারেন ফেসবুক সদরদফতর
সাধারণত বলা হয়ে থাকে, স্মার্টফোনে অনেক অ্যাপস ব্যবহার হয়। এ কারণে চার্জ বেশি লাগে। এই তথ্য যেমন সঠিক তেমনি এটাও ঠিক যে, প্রকট নেটওয়ার্ক সমস্যা মোবাইলফোনের ব্যাটারির আয়ু কমিয়ে দেয়।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন,মোবাইলফোন সেটে ইন্টারনেট চালু করলে ওপরের দিকে যদি জি (জিপিআরএস –গ্লোবাল প্যাকেট রেডিও সার্ভিস) লেখা ওঠে তাহলে বুঝতে হবে তা কম গতির টুজি নেটওয়ার্ক। যদি ইডিজিই (এনহ্যান্স ডেটা রেটস ফর জিএসএম ইভোলিউশন) ওঠে তাহলে ধরে নিতে হবে এই নেটওয়ার্ক ২জি ও থ্রিজির মধ্যবর্তী স্থানে। কেউ কেউ এটাকে ২.৫জি নেটওয়ার্কও বলে থাকেন।
যদি এইচ (এইচএসপিএ-হাই স্পিড প্যাকেট একসেস) বা এইচ প্লাস (এনহ্যান্সড) লেখা ওঠে তাহলে বুঝতে হবে ফুল ভলিউমে থ্রিজি রয়েছে। তবে এইচ প্লাস হলো এইচ –এর চেয়ে বেশি গতিসম্পন্ন। এছাড়াও রয়েছে ইউএমটিএস। এটিও থ্রিজি নেটওয়ার্ক। আর কখনও যদি মোবাইলে ডব্লিউসিডিএমএ (ওয়াইড ব্যান্ড কোড ডিভিশন মাল্টিপল একসেস) লেখা ভেসে আসে তাহলে ধরে নিতে হবে ওটিও থ্রিজি নেটওয়ার্ক, গতি আরও বেশি। এক মোবাইল সেটকে যদি এতোবার ফ্রিকোয়েন্সি বদলাতে হয় তাহলে ব্যাটারি আর কতক্ষণ দম রাখতে পারে প্রশ্ন বিশেষজ্ঞদের।
আরও পড়ুন- ওয়াশিংটন টাইমসে জয়ের নিবন্ধ: বাংলাদেশে ডিজিটালাইজেশন: আশার সঙ্গে বিপত্তিও আছে
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ মোবাইলফোন ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমপিআইএ) সাধারণ সম্পাদক ও সিম্ফনি মোবাইলের জ্যেষ্ঠ পরিচালক রেজওয়ানুল হক বলেন, দেশে সামগ্রিকভাবে মোবাইলফোনের নেটওয়ার্ক ভালো নয়। ব্যাটারি বেশি ড্রেইন (নিষ্কাষণ) হয়। বারবার ফ্রিকোয়েন্সি পরিবর্তন হয় যা মোবাইলে সেটের জন্য খুবই খারাপ। নেটওয়ার্কের উন্নতি না হলে বিশেষ করে সারাদেশের সব জায়গায় নেটওয়ার্ক সমান না হলে মোবাইলফোনের সমস্যা দূর হবে না।
তিনি জানান, বাংলাদেশে যে মোবাইল দিনে দুইবার চার্জ দিতে হয়, ওই একই মোবাইল একই সময়ে চীনে চার্জ দিতে হয় মাত্র একবার। উন্নত এবং সব জায়গা সমান নেওয়ার্ক থাকায় সেখানে চার্জ দ্রুত শেষ হয় না।
এদিকে, থ্রিজি নেটওয়ার্ক প্রায় সারাদেশে গেলেও সব জায়গায় না যাওয়ার কারণে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের সমস্যা হয়। এমনও দেখা গেছে, থ্রিজি প্যাকেজ কিনে ‘থ্রিজি নেটওয়ার্কের’ বাইরে গিয়ে দুর্বল নেটওয়ার্কের টুজি ব্যবহার করতে হয় ব্যবহারকারীকে। তখন সারাক্ষণই মোবাইলে নেটওয়ার্ক সার্চের অপশন (চাকা) ঘুরতেই থাকে। মোবাইল সেটের জন্য এটি ক্ষতিকর বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
বিশিষ্ট তথ্যপ্রযুক্তিবিদ সুমন আহমেদ সাবির বলেন, ভালো ইন্টারনেট পেতে হলে নেওয়ার্কও ভালো হতে হবে। তিনি বলেন, একটি টাওয়ার থেকে আরেকটি টাওয়ারের মধ্যবর্তীস্থানে যারা থাকেন তারাই এসব সমস্যা বেশি ভোগ করেন। অনেক সময় উঁচু উঁচু ভবনের কারণেও এ সমস্যা হতে পারে। মধ্যবর্তী ওইস্থানে একটি পকেট তৈরি হয়। যারা ওই পকেটে পড়েন তারা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন নেটওয়ার্ক সিগন্যাল (জিপিআরএস, এজ, এইচ, এইচ প্লাস) পান। মোবাইলফোন ফ্রিকোয়েন্সি খুঁজতে খুঁজতে তার সক্ষমতার অনেকাংশ ব্যয় করে। অপারেটরগুলোর নেটওয়ার্ক পকেটে সমস্যা না থাকলে আমাদের মোবাইলফোনের চার্জ আরও বেশিক্ষণ থাকবে বলে তিনি মনে করেন।
আরও পড়ুন: সরকারি কর্মকর্তাদের যোগাযোগে রিভের ইনফো-সরকার অ্যাপ
ঢাকার বাইরে বিশেষত গ্রামে এখনও টুজি ইন্টারনেটও সব জায়গায় ঠিকমত পৌঁছেনি। সেখানে পকেট থেকে মোবাইল বের করে টুজি নেটওয়ার্ক পেতেও অনেক সময় গলদঘর্ম হতে হয়। ইন্টারনেট পাওয়া না গেলেও নেটওয়ার্ক খোঁজার চাকা ঠিকই ঘুরতে থাকে,যা ব্যাটারির চার্জ দ্রুত নিঃশেষ করে দেয়।
এদিকে, মোবাইলফোন অপারেটরগুলো সারাদেশে থ্রিজি এবং ক্ষেত্র বিশেষে টুজির নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ করছে। এ বিষয়ে টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসির সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত স্মার্টফোনে একবার চার্জ দিয়ে সারাদিন চলা কষ্টকর হয়ে পড়বে বলে মনে করেন একটি মোবাইল অপারেটরের শীর্ষ কর্মকর্তা। নিজেকে উদ্ধৃত না করে তিনি বলেন,নেটওয়ার্ক সমস্যার সমাধান না হলে গ্রাহকদের এই দুর্ভোগ কোনও দিনও যাবে না।
চলতি বছর গ্রামীণফোন দেশের প্রতিটি কোণে থ্রিজি সেবা পৌঁছে দেবে বলে জানিয়েছেন অপারেটরটির প্রধান নির্বাহী রাজিব শেঠী। ২০১৬ সালের মধ্যে গ্রামীণফোনের যে ১০ হাজার বেজ স্টেশন রয়েছে তার সবগুলো থ্রিজিতে রূপান্তর করা হবে। ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বরে থ্রিজি সেবা চালু করার পর থেকে এখন পর্যন্ত ৫ হাজার ৮৩১টি বেজ স্টেশনকে থ্রিজিতে রূপান্তর করেছে প্রতিষ্ঠানটি। গত ৫ জানুয়ারি গ্রামীণফোন আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি এ ঘোষণা দেন। অন্যান্য মোবাইলফোন অপারেটররা এ বিষয়ে দ্রুত কাজ করছেন।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন,এর ফলে অন্তত গ্রামীণের গ্রাহকরা দীর্ঘমেয়াদি ব্যাটারি লাইফ উপভোগ করতে পারবেন।
/এইচএএইচ/এমএসএম /আপ- এপিএইচ/








