আওয়ামী লীগের সামনে কি ভয়াবহ বিপদ অপেক্ষা করছে?

Send
রায়হান জামিল
প্রকাশিত : ১০:৫৪, মে ০১, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ১১:০২, মে ০১, ২০১৬

রায়হান জামিলআওয়ামী লীগ কি বুঝতে পারছে- তারা দেশের ভেতরে এবং বাইরে সরকার হিসেবে কেমন ভাবমূর্তি তৈরি করছে?
গত সোমবার কলাবাগানে জুলহাজ মান্নান ও মাহবুব তনয়কে ঠাণ্ডা মাথায় কুপিয়ে হত্যা করে কিছু দুর্বৃত্ত। বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত সূত্রে, জুলহাজ ছিলেন ইউএসএআইডি’র কর্মকর্তা ও মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সাবেক প্রটোকল অফিসার। তার আরেকটা পরিচয়-  তিনি বাংলাদেশের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনির খালাত ভাই। তনয় ছিলেন নাট্যকর্মী এবং আশা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। বাংলাদেশে সমকামিতা একটি “নিষিদ্ধ" বিষয় হলেও, জুলহাজ কাজ করতেন সমকামীদের অধিকার নিয়ে। উন্নত বা পশ্চিমের দেশগুলোতে এমন কর্মকাণ্ড খুবই সাধারণ।
পত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্টে দেখা যায়, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. সোহেল মাহমুদ নিহত দুইজনের ময়নাতদন্ত করেন। তিনি বলেন, ‘তাদের ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করা হয়েছে।’ আঘাত এতো তীব্র ছিল যে, দু’জনেরই স্পাইনাল কর্ড কেটে গেছে। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তাদের মৃত্যু হয়েছে। এতো গভীর আঘাত করা হয়েছে যে দুজনেরই মাথার খুলি শুধু দুভাগ হওয়া বাকি ছিল প্রায়। কী ভয়াবহ কাণ্ড, চিন্তা করলে যে কোনও মানুষ আতঙ্কে শিউরে উঠবে!
কারো বুঝতে অসুবিধে হওয়ার কথা নয় যে এই হত্যাকাণ্ডগুলো যারা ঘটিয়েছে তারা ধর্মের একটি বিশেষ অনুশাসনে অন্ধ। তাই ধর্মের নাম নিয়ে এমন নোংরা কাজ করতে তাদের বাধে না।
এই ঘটনার কয়েকদিন আগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি সাহিত্যের প্রফেসর এ এফ এম রেজাউল করিম সিদ্দিকী খুন হন। মোটরসাইকেলে করে দুজন এসে তাকে কুপিয়ে রাস্তায় ফেলে যায়। সঙ্গীত পিপাসু হিসেবে পরিচিত এই ভালো মানুষটার কোনও শত্রু ছিল বলে কেউ কোনওদিন বলতে পারেনি। উনি সেতার বাজাতেন, সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন, এবং ছিলেন একজন মুক্তমনা মানুষ। কোন অপরাধে তাকে মরতে হলো তা আমরা এখনও জানি না। তার ভালোবাসার মানুষগুলোর কাছে বাকি জীবন হয়তো এই প্রশ্নটা থেকে যাবে।

আরও পড়তে পারেন: টাঙ্গাইলে দর্জিকে কুপিয়ে হত্যা, আইএসের ‘দায় স্বীকার’

মাত্র আট মাস আগে, ঢাকায় নিজ বাসায় নীলাদ্রি চট্টোপাধ্যায় নিলয়কে সন্ত্রাসীরা কুপিয়ে খুন করে। চিৎকার শুনে তার স্ত্রী খুনিদের পা জড়িয়ে ধরেন, কিন্তু খুনিরা তাকে পাশের বারান্দায় আটকে রাখে। একই অবস্থা হয় নিলয়ের বোনের বেলাতেও। অল্প কয়েক মিনিটের মধ্যেই খুনিরা নিলয়কে মেরে  চলে যায়। যখন সাধারণ মানুষ জুম্মার নামাজে ব্যস্ত, তখন চারজন লোক নিলয়ের বাসায় ঢুকে এই কাজ করে। তাদের মুখে ছিল ‘আল্লাহু আকবার’ এবং ‘নারায়ে তকবির’ স্লোগান।

আল্লাহ নাম নিয়ে সাধারণ মানুষ খুন করার অধিকার ইসলামে তারা কোথায় পেয়েছে, আমরা জানি না। হাজার বছরের ইসলামের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় ইসলাম সব সময়ই শান্তির কথা প্রচার করেছে। আমাদের দেশে ইসলাম যারা এনেছিলেন, তারা এনেছিলেন এই শান্তিপ্রিয় ইসলামেরই বাণী।

জুলহাজ, তনয়, বা নিলয়কে নিয়ে এই কথাগুলো বলার পেছনে আমার প্রধান কারণ অন্য। আমার প্রধান শঙ্কা আমাদের দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে, আমাদের দেশের সুনাম নিয়ে, আমাদের দেশের সরকারকে নিয়ে। মুক্তিযুদ্ধের কাণ্ডারি হিসাবে পরিচিত আওয়ামী লীগ এখন সরকার পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে। তাদের কাছে সাধারণ মানুষের অনেক আশা, অনেক ভরসা। আমরা যারা টুকটাক লিখি বা সমাজ/রাজনীতি নিয়ে চিন্তা করি, তারা মনে প্রাণে বিশ্বাস করি যে বঙ্গবন্ধুর রেখে যাওয়া এবং স্বপ্ন দেখা এই বাংলাদেশের বর্তমান একমাত্র নির্ভরযোগ্য নেতা আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাই তার কাছে আমাদের আশার কোনও শেষ নেই। কিন্তু শেখ হাসিনার সরকারের আমলেই আমরা যখন দেখি একের পর এক মানুষকে হত্যা করা হচ্ছে শুধু মুক্তচিন্তা-চেতনার জন্য, তাদের লেখার জন্য, তখন আমাদের মনে স্বাভাবিকভাবেই অনেক প্রশ্ন এবং শঙ্কার উদয় হয়।

আরও পড়তে পারেন: একজন রূপবানের মৃত্যু

আমাদের বাংলাদেশ কোন পথে হাঁটছে?

গত কয়েক বছরের মধ্যে আমরা হারিয়েছি আমার জানা মতে অন্তত ১২ জন মানুষকে, যারা খুন হয়েছেন নিজেদের মতামত প্রকাশের জন্য। বলা বাহুল্য, সেই মতামতগুলো কিন্তু হিংসা বিদ্বেষ মূলক ছিল না। আজ পর্যন্ত  হত্যাকারীদের কাউকেই আমাদের সরকার আইনের আওতায় আনতে পারেনি।

সিলেটে ব্লগার অনন্ত বিজয় দাস খুন হয়েছেন প্রায় প্রকাশ্য দিবালোকে এবং তার পরে চার মাসও পার হয়নি খুন হন নিলয়। তারপর আট মাসের মাথায় পরপর তিনটা হত্যাকাণ্ড এক সপ্তাহের মধ্যে। একই কায়দায়- ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে। একটা নয়, দুটো নয়, এক ডজন খুন হলো অথচ আমাদের পুলিশ বাহিনী কিছু করতে পারছে না। এর মধ্যে আরও ভয়ানক ব্যাপার হলো- খুন হওয়া মাত্র কয়েক দিন আগে নিলয় নিজেই গিয়েছিলেন পুলিশের কাছে সাহায্য চাইতে। সেই থানার অফিসার নিলয়কে বলেছেন- দেশ ছেড়ে চলে যেতে। কেন? এই দেশ কি কারও পৈত্রিক সম্পত্তি? পুলিশের কাজ আমাদের নিরাপত্তা দেওয়া। তার কেন দেশ ছেড়ে চলে যেতে বলবে?

আমাদের পুলিশ বাহিনীর প্রধান জুলহাজ-তনয় হত্যাকাণ্ডের পর বলেছেন- ‘পুলিশ ঘরে ঘরে পাহারা দিয়ে পারবে না, নিজেদেরও নিরাপত্তার দায়িত্ব নিতে হবে'। তাকে আমি ব্যক্তিগত ভাবে চিনি না, কিন্তু তার সম্পর্কে সব সময় আমি ভালো ভালো সব কথা শুনে এসেছি। কিন্তু এত বড় একটি দায়িত্বশীল অবস্থানে থেকে একজন মানুষ এমন কথা কী করে বলেন?  সরকার যদি আমাদের নিরাপত্তা দিতে না পারে, সেটা পরিষ্কার করে বলে দিক।

আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যদি দায়িত্ব সামলাতে না পারেন, পদত্যাগ করার শালীনতা দেখাতে না পারেন, তাহলে অন্তত মানুষের পক্ষে কথা বলুক। এটা আমাদের সাধারণ মানুষের দাবি। উনি তো এমন সব বক্তব্য দিচ্ছেন যাতে জঙ্গিরা আরও উৎসাহিত হচ্ছে। 

সরকারকে ভালো করে বুঝতে এবং মনে রাখতে হবে যে- আমরা অনেক সমালোচনা করছি তাদের নিয়ে। কিন্তু তীব্র সমালোচনা করছি অসহায়ত্ববোধ থেকে। সরকারকে বুঝতে হবে- এই সমালোচনা মানে দেশের নামে নিন্দা করা নয়।

আওয়ামী লীগকে আমরা কখনই হেফাজত, জামায়াত বা ওলামা লীগ হিসেবে দেখতে চাই না।

ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল বা এদের লালিত সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কিছু বলা মানেই আজকাল খুব সহজে নিজেকে একটি টার্গেটে পরিণত করা। যারা লেখেন তাদের সবাই এখন আতঙ্কে জীবন কাটাচ্ছেন। তার মধ্যে কয়েকটি হলো-

এক- ধর্মীয় উগ্রপন্থীরা ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে নাস্তিক ঘোষণা দিয়ে।

দুই- সরকারের দ্বারাও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ সব কিছুর সমালোচনা করতে গেলে অভিযোগ উঠতে পারে- আপনি দেশের বিরুদ্ধে বদনাম করছেন।

তিন- আইসিটি ৫৭ ধারা নামে একটি আইন আছে। যা ইচ্ছামতো ব্যবহার করা হতে পারে কোনও ধরনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়াই। তার ফাঁদে পড়ে আপনি জেলেও যেতে পারেন।

কিন্তু আমার প্রশ্ন হলো- ধর্মান্ধ এবং নোংরা মানসিকতার মানুষেরা কি আইনের ঊর্ধ্বে?

আমাদের দেখে এবং শুনে খুব কষ্ট হয় যখন আমাদের প্রধানমন্ত্রী গোপনে ড. অভিজিৎ রায়ের বাবাকে সান্ত্বনা দেন। এসবের ফলে সরকারের ইমেজ কোথায় গিয়ে দাঁড়াচ্ছে। দেশের নাগরিকদের কুপিয়ে মারা, খুনিদের ধরতে না পারার ব্যর্থতা কী ইমেজ তৈরি করছে সরকারের?

আমরা প্রায়ই শুনি সব কিছু হলো ভোটের হিসাব। আওয়ামী লীগ চায় এই সব ধর্মান্ধ এবং সন্ত্রাসী মৌলবাদীদের একটু দমিয়ে রাখতে, একটু খুশি রাখতে। তাহলে নাকি ভোটের সময় কাজ দেবে। যে কোনও রাজনৈতিক সচেতন মানুষ জানে আওয়ামী লীগ কখনও ধর্মান্ধদের কোনও ভোট কখনও পায়নি এবং পাবেও না।

আরও পড়তে পারেন: আমেরিকার আইএস তৎপরতা

আমরা জানি, শেখ হাসিনাকে হাজার রকমের হিসাব-নিকাশ করে চলতে হয়, এমনকী কথাও বলতে হয়।  কিন্তু মাননীয় প্রধানমন্ত্রী- আপনি আমাদের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা। আপনিই সবচেয়ে ভালো জানেন- বঙ্গবন্ধু কোন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন এবং পুরো জাতিকে কোন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন?

আওয়ামী লীগকে মনে রাখতে হবে- তাদের একটা বড় ভোট এসেছে তরুণ প্রজন্মের কাছ থেকে, যারা ‘ব্লগ দিয়ে ইন্টারনেট চালানো’ আর ‘ধর্মনিরপেক্ষতা বনাম নাস্তিকতা’- এগুলোর তফাৎ বোঝেন। গণতন্ত্রের পথে প্রতি পাঁচ বছরে একটি করে নির্বাচন আমাদের দেশে হবেই। সুতরাং এই তরুণ প্রজন্মের ক্ষোভ এবং হতাশার কারণ আপনারা হবেন না। এখনও সময় আছে।  সরকারের সমালোচনা দেশের বদনাম করা নয়। এটুকু অন্তত আপনারা বুঝবেন।

সাময়িক লাভের কথা বাদ দিয়ে দূরের ভয়াবহ বিপদের কথা ভাবুন। আফগানিস্তান, পাকিস্তান, সিরিয়া, ইরাক, ইয়েমেন - এগুলোর ভয়াবহ উদাহরণ খেয়াল করুন। বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ কিন্তু এই ধ্বংসের পথে অনেকটাই এগিয়ে গেছে যেটা সামাজিক মাধ্যমগুলোতে চোখ রাখলেই বোঝা যায়। দয়া করে বোঝার চেষ্টা করুন।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনাকে অনুরোধ। দ্রুত ব্যবস্থা নিন। তা না হলে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়নে আমরা পিছিয়ে যাবো। তরুণ প্রজন্মের মনের কথা একটু বুঝতে চেষ্টা করুন।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, জায়েদ ইউনিভার্সিটি, আবুধাবি

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ