সব সত্য কি বলেছেন মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী?

Send
তপন মাহমুদ
প্রকাশিত : ১৬:৫৫, জুলাই ২৫, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:১৮, জুলাই ২৫, ২০১৭

তপন মাহমুদএকটু পেছনের গল্প দিয়েই শুরু করি। আশা করি অনেকেরই মনে আছে। ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের কথা। বাংলাদেশের একটি প্রভাবশালী ইংরেজি জাতীয় দৈনিকের সম্পাদকের বিরুদ্ধে ৮৩টি মামলা হয়েছিল দেশের বিভিন্ন স্থানে। কারণ তিনি সত্য স্বীকার করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ডিজিএফআইয়ের তথ্য যাচাই না করে তারা অনেক সংবাদ প্রচার করেছিলেন। সেই সম্পাদক এজন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন। তবে তা অনেকেই মেনে নিতে পারেননি। তার বিরুদ্ধে তাই মামলা হয়েছে। তারা দাবি করেছেন, এসব সংবাদের কারণে তাদের সম্মান ও আর্থিক ক্ষতি হয়েছিল।
না, আমি মামলাবাজ নই। আমি পত্রিকাটির সম্পাদকের বিরুদ্ধে মামলারও বিরোধী। বরং সত্য স্বীকার করার জন্য তাকে ধন্যবাদ জানিয়েছি। কারণ অনেকেই তা গোপন করে রেখেছেন এবং এখনও সেটা স্বীকার করেননি। একইভাবে আমি শিক্ষামন্ত্রীকেও ধন্যবাদ জানাচ্ছি। তবে কিছু সংশয় আর প্রশ্ন রয়ে গেলো! তার কাছে বিনয়ের সঙ্গে জানতে চাই, তিনি কি পুরো সত্য বলেছেন? অথবা এমনও হতে পারে, পুরো সত্যটা তার জানা ছিল না। উপরন্তু, শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্যে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী, উভয়ের সম্মানহানি হয়েছে। অন্তত আমার কাছে তেমনই মনে হয়েছে। কারণ সব শিক্ষক ও শিক্ষার্থীকে একই পাল্লায় মাপা যাবে না। পরীক্ষার খাতা ঠিক মতো মূল্যায়ন না করার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে শিক্ষাবোর্ড যে শিক্ষা ব্যবস্থার ক্ষতি করেছেন, সেটা অন্তত শিক্ষামন্ত্রী মানবেন। এর সামাজিক ও আর্থিক ক্ষতিও আছে।
এবার একটু বিস্তারিতই বলি। রোববার এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল ঘোষণা করতে গিয়ে বলেছেন, ‘আগের সাধারণ ধারণা, সাধারণ কথায় প্রচলিত হয়ে গেছে, খাতা ওজন করে নম্বর দেওয়া হয়। এখন সেই সুযোগটা আর নেই। এখন খাতা দেখেই নম্বর দিতে হয়। আমাদের পাশের হার এবছর ৫.৭৯ শতাংশ কমেছে। এটাও আমি আগেই বলেছি খাতা সঠিক মূল্যায়ন করার ফলে স্বাভাবিকভাবেই এই পরিণতি এবং এটা আস্তে আস্তে উন্নতি হবে।’

অতএব দেখা গেলো, আমাদের মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী এই সত্যটা স্বীকার করে নিলেন যে, আগে সঠিকভাবে খাতা মূল্যায়ন করা হয়নি। আগে খাতা ওজন করে নম্বর দেওয়া হতো। শিক্ষকরা বাড়তি নম্বর দিত। ফলে শিক্ষার্থীরা অস্বাভাবিক ভালো ফল করতো।

এখন প্রশ্ন হলো, শিক্ষামন্ত্রী কেন এতদিন অসঙ্গতি মেনে নিয়েছেন? ওজন করে খাতা দেখা একটা অপরাধের বিষয়। কারণ সঠিকভাবে খাতা মূল্যায়ন করা শিক্ষকদের নৈতিক দায়িত্ব। একইসাথে শিক্ষামন্ত্রণালয় ও তার দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী ও কর্মকর্তাদের দায়িত্ব এটা নিশ্চিত করা যে, শিক্ষকরা সঠিকভাবে পড়াশোনা করাচ্ছেন কিনা, পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন করেছেন কিনা।

শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্যের সাথে একমত নাও হতে পারেন। শিক্ষকরা যদি খাতার ঠিক মূল্যায়ন না করে থাকেন, সেটা কি তাদের নিজের ইচ্ছায় করেছেন? নাকি কোনও নির্দেশনা ছিল?

মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী যাই ভাবুন আমি বলবো, জেনে বা না জেনে শিক্ষকদের ঘাড়ে দোষ চাপানোর চেষ্টা করেছেন তিনি। এটা শিক্ষকদের জন্য সম্মানজনক নয়। মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীর স্পষ্ট করে বলা দরকার ছিল, শিক্ষকরা নিজের ইচ্ছায় এমন কাজ করেছেন নাকি কোনও নির্দেশনা ছিল। অনেক শিক্ষকের সাথে বিভিন্ন সময় আমার কথা হয়েছে, যারা আর বোর্ডের খাতা দেখতে চান না। যদিও অনেক টাকা পাওয়া যায়।

দ্বিতীয়ত,  শিক্ষামন্ত্রীর কথায় এটাও স্পষ্ট হয়েছে যে, আগে পরীক্ষার খাতায় স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি নম্বর দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সবাই তো এমন নন। অনেকে তো ভালো পড়াশোনা করে ভালো পরীক্ষা দিয়েছেন। এদের খাতা অনেক কঠিনভাবে দেখলেও তারা জিপিএ ফাইভ পেত কিংবা ভালো ফল করতো। এখন কিভাবে আলাদা করা হবে যে, কে সত্যিই ভালো আর কে সুযোগ নিয়েছেন। অন্তত ফলাফলে তো সেটা বোঝা যাবে না। আর বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি বা চাকরির মতো প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায়ও এটা কম যোগ্যদের বাড়তি সুবিধা দিয়েছে।

তাহলে এমন অনেক প্রশ্ন সামনে এসেই যায় যে, বছরের পর বছর ধরে  শুধুমাত্র ভালো ফল দেখানোর জন্য বাড়তি নম্বর দেওয়াকে নিরুৎসাহিত করা হলো না কেন? কেন এ বিষয়ে কোনও মান নির্ধারণ করার উদ্যোগ নেওয়া হলো না?  তবে দেরীতে হলেও এমন উদ্যোগ সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য বটে। কিন্তু এর ফলে গত বছর বা তার আগের বছরগুলোতে পাস করা শিক্ষার্থীদের সাথে এবছর পাস করা শিক্ষার্থীদের ফলাফলে পার্থক্য হবে। আগামী দিনে যেকোনও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় এটা বৈষম্য তৈরি করবে।

তবে শুধু ফলাফলেই বৈষম্য নয়। গত কয়েক বছরে শিক্ষার্থীদের ফল ভালো হলেও মান নিয়ে অনেক সমালোচনা হয়েছে। এবং এর যে সত্যতা আছে, তার প্রমাণ মিলেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষাগুলোতে। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে বা বিভাগে যত সংখ্যক সিট ছিল, সে সংখ্যক শিক্ষার্থী পাস করতে পারেননি।

এখন প্রশ্ন হলো, এসবের দায় কি মাননীয় মন্ত্রী, তার মন্ত্রণালয় ও বোর্ড নেবে? কারণ তারা আগের বছরগুলোতে ফলাফল নিয়ে সব ধরনের সমালোচনার বেশ কড়া জবাব দিয়েছেন। তাদের মতে সব ঠিকই ছিল। কিন্তু এখন শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্যে আমরা দেখছি সব ঠিক ছিল না।

তবে এত কিছুর পরও শিক্ষামন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানাতে চাই। দেরীতে হলেও তিনি কিছুটা হলেও সত্য প্রকাশ করেছেন। আর এ সত্য আমাদের চোখের সামনে আরো অনেক সত্যকে উন্মেচিত করছে, করবে।

পরীক্ষার খাতার সঠিক মূল্যায়ন হোক, এ নিয়ে গত বছর কয়েক বেশ লেখালেখি ও কথাবার্তা হয়েছে। কিন্তু কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। শুধুমাত্র জিপিএ ফাইভ আর পাসের হার বেড়েছে। কিন্তু তা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে ক্রমশ ভেঙে দিচ্ছিল। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের এই সংকট উচ্চশিক্ষার ওপরও চাপ সৃষ্টি করছিলো। কারণ দিন শেষে একজন শিক্ষার্থীকে তার ফল দিয়ে নয়, জ্ঞান ও দক্ষতা দিয়েই নিজেকে প্রমাণ করতে হয়।

আর এটা বুঝতে খুব জ্ঞানী হওয়ার দরকার নেই যে, দক্ষ জনশক্তিই পারে একটা দেশকে উন্নত করতে। আগামী ২০২১ সালের মধ্যে দেশকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করার যে ভিশন বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকার দেখিয়েছে, তার বাস্তবায়নেও দরকার শিক্ষিত, জ্ঞানী ও দক্ষ জনবল, কে জিপিএ ফাইভ পেলো না পেলো সেটা কিন্তু বড় কথা নয়।

মাননীয় মন্ত্রী, তাই শুধু পরীক্ষার খাতার সঠিক মূল্যায়নই নয়, শিক্ষার মানকে বিশ্বমানে পৌঁছানোর লক্ষ্য নিয়ে কাজ করুন। সবাই আপনার গুণগান গাইবে। সবাই মন থেকে আপনাকে পুরস্কৃত করবে। আপনি নিশ্চয়ই সেটাই চাইবেন।

লেখক: জ্যেষ্ঠ প্রভাষক, সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ, স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ। 

 

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ