সড়ক নিরাপত্তা উপেক্ষিত, ভিকটিম দোষারোপের সংস্কৃতি

Send
সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা
প্রকাশিত : ১৩:৩৫, মে ২৩, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:৩৯, মে ২৩, ২০১৮

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজাযা স্বাভাবিক, যা অহরহ ঘটে তা নিয়ে আসলে সংবাদ হয় না। সড়ক দুর্ঘটনা এবং তাতে প্রাণহানি খুব স্বাভাবিক বিষয় এখন। তাই সরকার নির্বিকার, পরিবহন খাতের লোকজন নিশ্চিন্ত মনে এসব মেনে নিয়েছেন। বরং সড়ক দুর্ঘটনার ভিকটিমরা, তাদের পরিবারের লোকজনকেই এখন সব দায় নিতে হচ্ছে। আমরা যতই বলি না কেন, একশ্রেণির চালকের বেপরোয়া মনোভাবের জন্য দুর্ঘটনা কমানো যাচ্ছে না, তার কোনও মূল্য নেই।
সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে যারা একটু কথাবার্তা বলে, আন্দোলন করার চেষ্টা করে তারাই এখন ভিকটিম হয়ে যাচ্ছে। আমি দীর্ঘদিন ধরে এ নিয়ে কথা বলছি, আর সেই আমার গৃহকর্মী রোজিনাকে পা হারিয়ে জীবন দিতে হলো বনানীর রাস্তায়। ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা লোকজনের কথায় মনে হলো দোষ রোজিনার, রাজিবের, রাসেলের এবং সব ভিকটিমের। ঠিক এসব যখন ভাবছি, তখন শুনলাম সোমবার দুপুরে সাভারের হেমায়েতপুর বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় সময় উত্তম কুমার দেবনাথ (৩০) নামে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)-এর কর্মী নিহত হয়েছেন।  দোষ তো তাহলে তারও, তিনি কেন দাঁড়িয়ে ছিলেন? তার সংগঠন কেন নিরাপদ সড়কের আন্দোলন করে?

আমি আমার মতো অনেকেই একটা বিষয় বেশ বুঝতে পারছি, এই যে প্রতিদিন এতো এতো দুর্ঘটনা হয়, মানুষ নিহত আহত হয়, এর সব দায় প্রকৃতপক্ষে পথচারী, ক্ষুদ্র ভ্যান জাতীয় পরিবহনের, প্রাইভেটকার আর মাইক্রোবাসের। বড় বাস, ট্রাকচালকরা আসলে নিষ্পাপ প্রতিটি ঘটনায়।

তবু এ নিয়ে কিছু বলতে ইচ্ছে করে। সরকারের লোকজন, পরিবহন খাতের দানবীয় নেতারা যাই বলুন না কেন, আমরা বলেই যাবো–বেপরোয়া ড্রাইভিং বা বাসে বাসে রেষারেষি সড়ক-নৈরাজ্যের প্রধান কারণ। সেই সঙ্গে আছে কর্তৃপক্ষের দিক থেকে বেপরোয়া ব্যবস্থাপনা।

এই শহরে দুই একটি রাস্তায় জেব্রা ক্রসিং থাকলেও সেসব ট্রাফিক বিভাগের লোকজনই সেভাবে মানে না। গোটা বিশ্বে যেখানে জেব্রা ক্রসিংয়ে পা-ফেলা মাত্রই দূর থেকে আসা গাড়ি তার গতি কমিয়ে দাঁড়িয়ে যায়– এখানে কোনও গাড়ি-চালকই এই নিয়মটার তোয়াক্কা করে না। আবার একথাও সত্য যে জেব্রা ক্রসিং দিয়ে পার হওয়ার চাইতে, ফুট ওভারব্রিজ দিয়ে না গিয়ে ‘অন্যভাবে’ পার হওয়াটাই পছন্দ করেন অনেক পথচারী। ফুট ওভারব্রিজগুলোর অনেকগুলোই চলাচল উপযোগী নয়, বিশেষ করে সন্ধ্যার পর নারীদের জন্য তো নয়ই। রেষারেষি বা বেপরোয়া গাড়ি চালানো বন্ধ করতে বাসে স্পিড গভর্নর বসানোর প্রস্তাব করছি, যদি কর্তাব্যক্তি, পেশিবহুল রাজনৈতিক পরিবহন নেতারা দয়া করে রাজি হন।

আমাদের সড়ক-নিরাপত্তা নিয়ে ভাবনা কম। কারণ, একটা অংশ, যারা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী, তারা এই খাতে চাঁদাবাজি সংস্কৃতি জিইয়ে কোনও আইন করতে দিচ্ছে না। এদের সঙ্গে ক্ষমতার কেন্দ্রের সম্পর্ক। একটি সড়ক নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ প্রয়োজন। সেই সংস্থায় থাকবে পুলিশ, পরিবহন, শিক্ষা, তথ্য ও সংস্কৃতি, পূর্ত-সহ বিভিন্ন দফতরের প্রতিনিধিরা। একইভাবে জেলা স্তরে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে একটি করে জেলা সড়ক-নিরাপত্তা পরিষদ গড়া দরকার।

জাতিসংঘ ঘোষিত সড়ক নিরাপত্তা দশক (Decade of Action) চলবে ২০২০ সাল পর্যন্ত, যা শুরু হয়েছিল ২০১১ সালে। সড়ক নিরাপত্তা দশকের সঙ্গে বাংলাদেশ একাত্মতা ঘোষণা করেছে। কিন্তু এই সময়ে কতটা উন্নতি করেছি আমরা আর কতটা করবো সে এক প্রশ্ন। পৃথিবীর যেসব দেশে সড়ক নিরাপদ রাখার জন্য কোনও আচরণবিধি বা কোড নেই, বাংলাদেশ তার মধ্যে অন্যতম। নিরাপদ সড়ক আচরণবিধি হচ্ছে সেই ডকুমেন্ট, যেখানে কোনও আইনের কোনও ধারা লঙ্ঘনে কী ধরনের দণ্ড রয়েছে তা উল্লেখ করাসহ সড়কে চলাচলকারী বিভিন্ন যানবাহনের চালক, হেলপার, যাত্রী, পথচারী, ট্রাফিক পুলিশসহ সব ধরনের রাস্তা ব্যবহারকারী কোন পরিস্থিতিতে কী ধরনের আচরণ করবে তা বর্ণিত থাকে। সরকার ১৯৯০ সালের যে আইনটি সংশোধনের চেষ্টা করছে, সেখানেও উপেক্ষিত সড়ক নিরাপত্তার বিষয়টি। প্রস্তাবিত আইনে সড়ক নিরাপত্তার প্রসঙ্গটি উল্লেখই নেই বলেই জানা গেলো।  

দুর্ঘটনায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর একটি বাংলাদেশ। কিন্তু সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে নীতিনির্ধারকদের মনোভাব বরাবরই দায়সারা গোছের। সড়ক নিরাপত্তার সর্বোচ্চ ফোরাম ‘জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিল’। ছয়জন মন্ত্রী, ১১ সচিব, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, পরিবহন খাতের শীর্ষ নেতারা এ কাউন্সিলের সদস্য। আমাদের পরিবহন খাত সবচেয়ে অসংগঠিত। এ কারণে সংগঠিত উপায়ে চাঁদাবাজি হয় ঠিকই, কিন্তু চালকদের প্রশিক্ষণ ও ট্রাফিক সংক্রান্ত জ্ঞান দেওয়া হয় না। যেটুকু আইন আছে তা প্রয়োগে গাফিলতি এই ধরনের দুর্ঘটনাকে আরও উৎসাহিত করে।

জাতিসংঘ তাদের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় ২০২০ সালের মধ্যে বিশ্বে সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা অর্ধেকে নামিয়ে আনার লক্ষ্য স্থির করেছে। বিশ্বের প্রায় সব দেশই দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণ ও সচেতনতা বাড়াতে সড়ক নিরাপত্তা সপ্তাহ পালন করবে। কিন্তু এই লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে সম্পৃক্ত দেশ হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশে তৎপরতা খুব কম। দিন দিন বাড়ছে পরিবহন মালিক শ্রমিকদের বেপরোয়া মনোভাব ও নৈরাজ্য।

কাগজে-কলমে শক্তিশালী হলেও কাউন্সিলের সুপারিশ মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন হয় না। ছয় মাস অন্তর কাউন্সিলের সভা হওয়ার কথা থাকলেও গত দুই বছরেও তা হয়নি। দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ নিতেও সরকারি পর্যায়ে তেমন উদ্যোগ নেই। বরং এখন নতুন করে ভিকটিমদের দোষারোপ করার সংস্কৃতি।

লেখক: প্রধান সম্পাদক, জিটিভি ও সারাবাংলা

 

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ