ইরান-আমেরিকা যুদ্ধ অসম্ভব না

Send
আনিস আলমগীর
প্রকাশিত : ১৪:৩৭, জুন ১৮, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:৩৭, জুন ১৮, ২০১৯





আনিস আলমগীরইরান বা যুক্তরাষ্ট্র, দুই দেশের কেউ এই মুহূর্তে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরু করতে চায় বলে কারও বিশ্বাস হয় না। পর্যাপ্ত সামরিক শক্তি থাকা সত্ত্বেও ইরানের বিরুদ্ধে যদি বিমান ও নৌ হামলা চালায়, তা আমেরিকানদের জন্য সব ধরনের বিপদ ডেকে আনবে। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি বৃদ্ধির এক মাসের মধ্যে ওই অঞ্চলের তেলবাহী ট্যাংকারে দুই বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটায় এখন সবাই আশঙ্কা করছে, পরিকল্পিত নয় বরং দুর্ঘটনাবশত যুদ্ধের সূচনা হতে পারে তাদের মধ্যে। ট্রাম্প যতই বলুক ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ চায় না, উত্তেজনা প্রশমনে তার কূটনৈতিক ব্যর্থতাই হয়তো তাকে একটি যুদ্ধ উপহার দিতে পারে। আর এমন একটা যুদ্ধ বেধে গেলে, তাতে জড়িত হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে ইরান এবং আমেরিকার মিত্র দেশগুলোরও।






দুই দেশের উত্তেজনার মধ্যে গত বৃহস্পতিবার, ১৩ জুন ২০১৯ সকালে হরমুজ প্রণালিতে দু’টি অয়েল ট্যাংকারে বিস্ফোরণ এবং অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। একটি জাপানের, অন্যটি নরওয়ের। জাপানের অয়েল ট্যাংকারের আগুন সঙ্গে সঙ্গে নেভানো হলেও নরওয়ের ট্যাংকারে সারাদিন আগুন জ্বলে। যখন এই ঘটনা ঘটে, তখন জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে ইরান-মার্কিন উত্তেজনা প্রশমনের উদ্দেশ্যে দুই দিনের সফরে ইরানে অবস্থান করছিলেন। গত মে মাসে সংযুক্ত আরব আমিরাতের কাছে জাহাজে চারটি লিমপেট মাইন হামলার ঘটনার মতোই এ ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেছে ইরান। তবে দুটো ঘটনার জন্যই যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের কয়েকটি মিত্র দেশ ইরানকেই দায়ী করেছে।
তেহরান ও ওয়াশিংটন দু’পক্ষই চলমান সংকট সমাধানের ইঙ্গিত দিলেও, কেউ সঠিকভাবে পদক্ষেপ নিচ্ছে না। ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ে বৈঠকের প্রস্তাব দিয়েছেন। ইরান সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। ইরান বলেছে, বাণিজ্য অবরোধ প্রত্যাখ্যান ভিন্ন আমেরিকার সঙ্গে কোনও বৈঠকের কথা চিন্তাই করতে পারছে না ইরান। সর্বোপরি আমেরিকা তার কর্মকাণ্ডে বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে। আমেরিকা আলোচনার প্রস্তাব দেওয়ার আগে আরব সাগরে তার রণতরি পাঠিয়ে পরিস্থিতি উত্তেজনাকর করার চেষ্টা করেছে।
অভিযোগ উত্থাপন করে, রণতরি পাঠিয়ে চাপ প্রয়োগ করে আমেরিকা ইরানকে বাগে আনতে পারেনি এখনও। ইরানের জ্বালানি তেল না কেনার জন্য তার সমস্ত ক্রেতাকে চাপ প্রয়োগ করছে। জাপান, ভারত, চীন এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত অনেক দেশ ইরানের তেলের ক্রেতা এখন। ইরানের তেলের ক্রেতা দেশগুলোকে প্রচণ্ড চাপ প্রয়োগ করছে আমেরিকা, যেন তারা ইরান থেকে তেল কেনার সিদ্ধান্ত বাতিল করে।
ভারতের কাছে অনেক সস্তা দরে ইরান তেল বিক্রি করে আসছিল। ভারতও ইরান থেকে তেল না কেনার বিষয়টি কার্যকর করার প্রক্রিয়া আরম্ভ করেছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সম্প্রতি ভারত সফর করেছেন এবং সম্ভবত ইরানের দক্ষিণ-পূর্বে সিস্টান এবং বেলুচিস্তান প্রদেশে অবস্থিত চাবাহার সমুদ্রবন্দর ভারতের জন্য বন্ধ করে দেওয়ার কথা বলে গেছেন। ভারত ইরানের চাবাহার বন্দর লিজ নিয়েছিল মধ্য এশিয়ার স্থল বেষ্টিত দেশগুলোতে তার বাণিজ্য পরিচালনার জন্য।
ভারত চাবাহার বন্দর থেকে আফগানিস্তানসহ মধ্য এশিয়ার দেশগুলোতে সড়কও নির্মাণ করছে। এ প্রকল্পে ভারত কোটি কোটি ডলার ব্যয় করেছে, কিন্তু ইরান চাবাহার বন্দর বন্ধ করে দিলে ভারতের পরিপূর্ণ ইনভেস্টমেন্ট আটকা পড়ে যাবে, আর আফগানিস্তানসহ মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে তার বাণিজ্য সাম্প্রসারণের আকাঙ্ক্ষারও সমাপ্তি ঘটবে। ভারত এই পরিস্থিতিতে তার অপারগতার কথা আমেরিকাকে জানানো ছাড়া উপায় থাকছে না।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের ওপরও আমেরিকার প্রচণ্ড চাপ রয়েছে। ২০১৫ সালে ইরানের পারমাণবিক চুক্তি সম্পাদনের পর ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলো থেকে যেসব কোম্পানি ইরানে তাদের বিনিয়োগ আরম্ভ করেছিল, তাদের চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে, তারা যেন ইরানে বিনিয়োগ বন্ধ করে দেয়। নয়তো তাদের আমেরিকায় কোনও ব্যবসা করতে দেওয়া হবে না।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন এখনও ইরান থেকে তেল কেনার বিষয়ে অটল থাকলেও শেষ পর্যন্ত তারা তাদের সে সিদ্ধান্ত অব্যাহত রাখতে পারবে কি না, সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছে। কারণ ইরান এরই মাঝে ঘোষণা দিয়েছে, তারা ইউরেনিয়াম মজুতের পরিমাণ বাড়িয়ে দেবে। সোমবার ১৭ জুন ২০১৯ ইরানের পারমাণবিক শক্তি সংস্থা ঘোষণা করেছে, তারা ১০ দিনের মধ্যে পরমাণু চুক্তির দ্বারা নির্ধারিত ইউরেনিয়াম মজুত সীমাটি ভেঙে দেবে। চুক্তির আগে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ২০ শতাংশ পর্যন্ত ছিল। পারমাণবিক বোমা তৈরির জন্য ইউরেনিয়াম ৯০ শতাংশ সমৃদ্ধ করা প্রয়োজন। ইরানের আণবিক শক্তি সংস্থার মুখপাত্র বেহরুজ কামালবন্দি রাষ্ট্রীয় টিভিতে বলেছেন, ‘আমরা অতিসম্প্রতি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ চারগুণ বাড়িয়েছি। যাতে ১০ দিনের মধ্যে আমাদের ইউরেনিয়ামের মজুত বেঁধে দেওয়া ৩শ’ কেজি সীমা অতিক্রম করে যায়। এখনো সময় আছে...যদি ইউরোপীয় দেশগুলো ব্যবস্থা নেয়।’
২০১৫ সালে ইরানের সঙ্গে বিশ্বের ছয় শক্তিধর দেশের স্বাক্ষরিত পারমাণবিক চুক্তি অনুযায়ী, ইরান ৩ দশমিক ৬৭ শতাংশের বেশি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করতে পারবে না এবং এই সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ৩শ’ কিলোগ্রামের বেশি মজুত রাখতে পারবে না।
অবশ্য ২০০৩ সালে ডব্লিউ বুশ যখন মিথ্যা অজুহাত তুলে ইরাক আক্রমণ করেছিল, তখন ইউরোপীয় ইউনিয়ন সম্পূর্ণভাবে আমেরিকাকে সহযোগিতা করেনি। শুধু ব্রিটেন, হল্যান্ড ও পোল্যান্ড ইরাকের যুদ্ধে শামিল হয়েছিল। অবশ্য এখন ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে বলেছেন, ব্রিটেন ইরানকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা প্রদান করবে।
ইরানের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ তুলে আমেরিকা ২০১৮ সালের ৮ মে পারমাণবিক চুক্তি থেকে নিজে নিজের নাম প্রত্যাহার করে নিয়েছে। কিন্তু চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ব্রিটেন, ফ্রান্স, চীন, রাশিয়া, জার্মানি ও জাতিসংঘ এখনও সুদৃঢ়ভাবে চুক্তির পক্ষে অবস্থান নিয়ে আছে। আমেরিকা চেষ্টা করছে এ ঐক্যের ভিত্তি নষ্ট করতে। অবশ্য আমেরিকা যে ইরানের ওপর নতুন করে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, তাতে ইউরোপীয় শক্তি, চীন ও রাশিয়া পরমাণু চুক্তির সুরক্ষার জন্য মূলত ‘ঠোঁটের সেবা’ (lip service) দিচ্ছে, কিন্তু আমেরিকান চাপের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে অনিচ্ছুক মনে হচ্ছে।
চলমান উত্তেজনায় ইরানের নৌবাহিনী আরব সাগর ও ওমান সাগরে উপস্থিত আমেরিকান নৌশক্তিকে মোকাবিলা করতে পরিপূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে বসে আছে। ইরান এমনকি হাজার হাজার নৌকায় কামান বসিয়ে আমেরিকার দিকে তাক করে বসে আছে। আরব সাগর ও ওমান সাগরে যুদ্ধ শুরু হলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল সরবরাহ পরিপূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যাবে। হরমুজ প্রণালি ইরানের। তখন এ প্রণালি দিয়ে পশ্চিমা বিশ্বে অয়েল ট্যাংকার যাওয়াটা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যাবে। এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে, বিশ্বব্যাপী তেলের দাম বেড়ে যাবে।
যে কোনও বিশ্ব পরিস্থিতিতে ব্রিটেন এবং জাপান আমেরিকার উপগ্রহের মতো বিরাজ করে থাকে। ইরাক আক্রমণের সময় ব্রিটেন আমেরিকার সঙ্গেই যৌথ আক্রমণে ছিল, আর জাপান আমেরিকাকে ১০০ কোটি ডলার নগদ অর্থ দিয়েছিল। কিন্তু ইরানের ব্যাপারে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন এবং জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে গত ১২ ও ১৩ জুন ইরান সফর করেছেন।
ইরানকে নিয়ে ইসরায়েলি ষড়যন্ত্রকে সহযোগিতা করতে গিয়ে ট্রাম্প অহেতুক বিশ্বব্যবস্থাকে যে হুমকির মুখে ফেলেছেন, তার একটা সমাধানের পথ খুঁজে বের করার জন্য জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে যেটুকু চেষ্টা করছেন, তা প্রশংসার দাবি রাখে। তিনি ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানির সঙ্গে বৈঠক করেছেন এবং সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতাআয়াতুল্লাহ সৈয়দ আলী খামেনির সঙ্গেও দীর্ঘ বৈঠক করেছেন।
আবের সঙ্গে আয়াতুল্লাহর যে বৈঠক হয়েছে, তাতে খামেনি বলেছেন—তিনি বিশ্বাস করেন না ওয়াশিংটনের কোনও সৎ ইচ্ছা আছে। বৈঠকের ছবিসহ টুইটারে এক বার্তায় খামেনি বলেছেন—‘যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে কোনও বার্তা বিনিময় আমি যথোপযুক্ত মনে করছি না। বর্তমান বা ভবিষ্যতেও ট্রাম্পের প্রতি আমার কোনও বার্তা নেই। তিনি বিশ্বাস করেন না, সমঝোতার জন্য ওয়াশিংটনের কোনও সৎ উদ্দেশ্য আছে।
১৯৭৯ সালে ইরান বিপ্লবের পর জাপানের কোনও প্রধানমন্ত্রী ইরান সফর করলেন। শিনজো আবে বলেছেন, ইরান এবং আমেরিকার মাঝে সংঘাত এড়াতে জাপান সর্বোচ্চ ভূমিকা রাখতে চায়—এ বার্তা পৌঁছে দেওয়ার জন্যই তার সফর। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও আবের এ সফরকে স্বাগত জানিয়েছেন।
যাক, ওমান সাগর এবং পারস্য উপসাগরে ইরান আর আমেরিকার নৌশক্তি মুখোমুখি অবস্থানের কারণে পরিস্থিতি বিস্ফোরণোন্মুখ হয়ে উঠেছে। ক্ষুদ্র ঘটনা থেকে রণবাদ্য বেজে উঠতে পারে। এ সময়ে জাপানের প্রধানমন্ত্রীর ইরান সফর কতটা স্বস্তি আনতে পারে, দেখার বিষয়। কারণ অনেকে মনে করেন, এ সফরটা আমেরিকার সম্মতিতে হয়েছে। আমেরিকা যদি বাণিজ্য অবরোধের বিষয়ে কোনও বাস্তব সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করে, তবে আলোচনা ফলপ্রসূ হওয়ার ক্ষীণ সম্ভাবনাও নেই। আশা করি আবে কার্যকর একটা পদক্ষেপ গ্রহণের কথা আমেরিকাকে বলবেন।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট। ইরাক ও আফগান যুদ্ধ-সংবাদ সংগ্রহের জন্য খ্যাত
anisalamgir@gmail.com

/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ