‘আদিবাসী’ ভাষাচর্চা ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা চাই

Send
রাহমান নাসির উদ্দিন
প্রকাশিত : ০৯:৫৩, আগস্ট ০৯, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:২৫, আগস্ট ১৭, ২০১৯

রাহমান নাসির উদ্দিন

প্রতিবছরের মতো এ বছরও ৯ আগস্ট বিশ্বব্যাপী বিশেষ মর্যাদার সঙ্গে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক ‘আদিবাসী দিবস’। প্রতিবছরের মতো ২০১৯ সালেও নানান গুরুত্ব বিবেচনায় ‘আন্তর্জাতিক আদিবাসী’ দিবসের একটি শিরোনাম নির্ধারণ করা হয়েছে ‘আদিবাসী ভাষা’। কিন্তু ‘আদিবাসী’ নেতারা এই শিরোনামের একটি বাংলাদেশ সংস্করণ করেছে ‘আদিবাসী ভাষা চর্চা ও সংরক্ষণে এগিয়ে আসুন’। নিয়ম অনুযায়ী, জাতিসংঘ আন্তর্জাতিক ‘আদিবাসী দিবসের’ একটি সর্বজনীন শিরোনাম নির্ধারণ করলেও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে দেশে নিজস্ব সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় ‘আদিবাসী জনগোষ্ঠী’ জাতিসংঘ প্রদত্ত মূল বক্তব্যকে অপরিবর্তিত রেখে নিজেদের মতো করে একটি শিরোনাম নির্ধারণ করে।

এখানে প্রাসঙ্গিক বিবেচনায় বলা ভালো, জাতিসংঘ ২০১৯ সালকে ‘আদিবাসী ভাষা বর্ষ’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। এরসঙ্গে মিল রেখেই এ বছর আন্তর্জাতিক ‘আদিবাসী দিবসের’ শিরোনাম নির্ধারণ করা হয়েছে, ‘আদিবাসী ভাষা’। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও ভাষার অধিকার, মার্তৃভাষায় শিক্ষার অধিকার, বিলুপ্ত প্রায় ‘আদিবাসী’ পুনরুদ্ধার, ‘আদিবাসী’ ভাষা চর্চা ও প্রাজন্মিক অনুশীলন, নিজস্ব ভাষায় সাহিত্য-কর্ম সৃষ্টি এবং ভাষা সংরক্ষণের বহুমুখী ও বহুমাত্রিক দাবি নিয়ে সমতলে এবং পাহাড়ে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে ‘আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস’ পালিত হচ্ছে। এই দিনে বিশ্বব্যাপী ‘আদিবাসী’ জনগোষ্ঠী তাদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ভাষা-ভিত্তিক রূপ-বৈচিত্র্য প্রদর্শনীর পাশাপাশি নিজেদের বহুমাত্রিক বঞ্চনা, শোষণ ও নিপীড়নের ইতিবৃত্ত তুলে ধরে। একইসঙ্গে রাষ্ট্রের সামনে নিজেদের চাওয়া-চাহিদা ও আশা-আকাঙ্ক্ষার কথা দাবি আকারে উপস্থাপন করে। বাংলাদেশেও এর ব্যতিক্রম নয়।

জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, পৃথিবীর ৯০টি দেশে প্রায় ৩৭ কোটি ‘আদিবাসী’ মানুষের বসবাস। পৃথিবীর সমগ্র জনগোষ্ঠীর ৫ শতাংশ হচ্ছে ‘আদিবাসী’। এরা পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর মধ্যে অন্যতম। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, পৃথিবীর দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ১৫ শতাংশ হচ্ছে ‘আদিবাসী’। এ ‘আদিবাসী’ জনগোষ্ঠী পৃথিবীর প্রায় সাত হাজার ভাষায় কথা বলে। পাঁচ হাজার স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক সত্তার প্রতিনিধিত্ব করে। সত্যিকার অর্থে এ-পৃথিবীকে সাংস্কৃতিক বৈচিত্রে ভরপুর এবং মানব-বৈচিত্র্যে মনোরম করে তোলার পেছনে ‘আদিবাসী’ জনগোষ্ঠীর স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য সর্বাধিক অবদান রেখেছে। কিন্তু পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে দেশে একটা বিরাট সংখ্যাক ‘আদিবাসী’ জনগোষ্ঠীর জমি, জল, জঙ্গল, ভিটা, মাটি কেড়ে নেওয়া হয়েছে নানামুখী উন্নয়নের ঢেঁকুর তুলে;  পর্যটনের নামে ‘আদিবাসী’ জীবন ও সংস্কৃতিকে বানানো হচ্ছে ‘বিলাসী বিনোদন সামগ্রী’ ও বিক্রয়যোগ্য পণ্য; রাষ্ট্রীয় নিপীড়নে ‘আদিবাসী’ মানুষের নিজস্ব সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবন ধারা হয়ে পড়ছে সংকটাপন্ন। সর্বোপরি বিশ্বায়ন-নগরায়ন-শিল্পায়ন-আধুনিকায়নের নামে ‘আদিবাসী’ সংস্কৃতি হয়ে পড়ছে বিপন্ন। এরকম একটি বিশ্ব বাস্তবতায় আজ বিশ্বব্যাপী ‘আদিবাসী’ মানুষের ভাষাকে সামনে রেখে ‘আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস’ পালিত হচ্ছে। আর বাংলাদেশে এ-দিবস পালিত হয় অধিকতর তাৎপর্য নিয়ে। কেননা, বাংলাদেশের বসবাসরত প্রায় তিরিশ লাখ ‘আদিবাসী’ এখনও ‘আদিবাসী’ হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি পর্যন্ত অর্জন করতে পারেনি। ২০১১ সালের আদমশুমারিতে বাংলাদেশে বসবাসরত ‘আদিবাসী’দের বলা হয়েছে ‘অ্যাথনিক পপুলেশন’ আর ২০১৫ সালের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের ২৩ (ক) অনুচ্ছেদে সাংস্কৃতিকভাবে ভিন্ন জনগোষ্ঠীকে ‘উপজাতি’, ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’, ‘ক্ষুদ্র জাতিসত্তা’ প্রভৃতি শব্দ দিয়ে নির্দেশ করা হয়েছে। এই যে প্রায় তিরিশ লাখ ‘আদিবাসী’ জনগণকে রাষ্ট্র সাংবিধানিক ও আইনি কাঠামোর ভেতর দিয়ে অস্তিত্বহীন করে রেখেছে। এর মধ্য ‘আদিবাসী’ জনগোষ্ঠীর প্রতি রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গির একটি আলামত পাওয়া যায়।

এছাড়া, এই যে ‘আদিবাসী’ মানুষের অস্তিত্ব থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ রাষ্ট্র সেটা স্বীকার করে না, এটিই বলে দেয়, রাষ্ট্রের সঙ্গে ‘আদিবাসী’ জনগোষ্ঠীর সম্পর্ক এবং সে সম্পর্কের বিবর্তিত কাঠামোর স্বরূপ কী। বিশ্বব্যাপী যখন সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদকে একটি সুন্দর, সমৃদ্ধ ও উদার গণতন্ত্রের উদাহরণ হিসেবে বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশে বসবাসরত ‘আদিবাসী’ জনগোষ্ঠীকে সাংবিধানিক কাঠামোর বাইরে রেখে সমাজে একটি উদার গণতান্ত্রিক পরিবেশ সৃষ্টি করা খানিকটা সমস্যাজনক। ফলে সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদের কাঠামোয় একটি আধুনিক ও উদার-গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হয়ে ওঠার বিপুল সম্ভাবনা এরকম সংকীর্ণ চিন্তার কারণে বেশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তাই, ‘আদিবাসী ভাষা চর্চা’ ও সংরক্ষণের দাবির পাশাপাশি আজ  আবার বাংলাদেশে নতুন করে ‘আদিবাসী’ জনগোষ্ঠীর সাংবিধানিক স্বীকৃতি দাবি উচ্চারিত হবে সর্বত্র। অত্যন্ত ন্যায্য কারণেই আমি ‘আদিবাসী’ জনগোষ্ঠীর এ দাবিকে সমর্থন করি।   

উল্লেখ্য, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের বিশেষ করে জাতিসংঘের মাধ্যমে ২০০৭ সালেই বিষয়টির ষোলআনা ফয়সালা হয়ে গেলেও, বাংলাদেশে ‘আদিবাসী’ বিতর্ক এখনও ষোলআনাই জারি আছে। প্রকৃতপক্ষে দীর্ঘ আলোচনা, দীর্ঘ বিতর্ক এবং প্রায় দুই দশকের নানান কার্যক্রমের বিচার বিশ্লেষণের ভেতর দিয়ে জাতিসংঘের মাধ্যমে একটি আন্তর্জাতিক সনদ তৈরি করা হয়েছে ২০০৭ সালে, যা জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোটে পাস হয়। ১৯৮২ সালে জাতিসংঘে প্রথম ‘আদিবাসী’ বিষয়ক আলোচনা শুরু হয়। পাশাপাশি এর অস্তিত্ব আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকার করা হয়। প্রায় একদশক পরে দীর্ঘ আলোচনার ভিত্তিতে ১৯৯৪ সালের ২৩ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে প্রতিবছর ৯ আগস্টকে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে ‘আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস’ হিসাবে পালনের ঘোষণা দেওয়া হয় (রেজ্যুলেশন ৪৯/২১৪)। ৯ আগস্টকে তারিখ হিসাবে নির্ধারণ করার পেছনে প্রধান কারণ ছিল ১৯৮২ সালের এইদিনেই জাতিসংঘ সর্বপ্রথম ‘আদিবাসীদের’ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেয়। এরপরের বছর থেকে ১৯৯৫-২০০৪ ‘প্রথম আদিবাসী দশক’ এবং ২০০৫-২০১৪ ‘দ্বিতীয় আদিবাসী দশক’ ঘোষণা করা হয়। ‘প্রথম আদিবাসী দিবসে’র লক্ষ্য ছিল ‘আদিবাসীদের’ মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা,  ভূমি, পরিবেশ, উন্নয়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের সমস্যা দূরীকরণে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা শক্তিশালী করণ। ‘দ্বিতীয় আদিবাসী দিবসে’র লক্ষ্য ছিল ‘আদিবাসী’দের জীবনের নানান রিসোর্সের কার্যকর প্রয়োগ ও সম্মানের জায়গা নিশ্চিতকরণের জন্য অংশগ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করা। ২০০৭ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ‘আদিবাসী অধিকার সনদ’ সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোটে পাস হয়। যেখানে চারটি দেশ (আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ড) এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে এবং ১১ টি দেশ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া থেকে নিজেদের বিরত রাখে। দুঃখজনক হলেও সত্যি হচ্ছে, বাংলাদেশ সেই ১১টি দেশের মধ্যে একটি। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ জাতিসংঘের এ ঘোষণায় অনুস্বাক্ষর করেনি এবং এ ঘোষণাকে অনুসমর্থনও করেনি। অধিকন্তু পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, উপজাতি ওসম্প্রদায়’ বানিয়ে রাখা হয়েছে। ফলে, বাংলাদেশের ‘আদিবাসী’ জনগোষ্ঠী এখনও সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে ‘আদিবাসী’ হিসেবে তাদের জাতিগত স্বীকৃতি পায়নি। এ রকম একটি প্রেক্ষাপটে আজকে ভাষাচর্চা ও ভাষা সংরক্ষণের দাবি নিয়ে বাংলাদেশে পালিত হচ্ছে ‘আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস’।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট বাংলাদেশের বিপন্ন ভাষাগুলোর তালিকা প্রকাশ করেছে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট নৃভাষা বৈজ্ঞানিক সমীক্ষার মাধ্যমে বাংলাদেশে ৪১টি ভাষার সন্ধান পেয়েছে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের সমীক্ষায় পাওয়া ভাষাগুলোর মধ্যে ১৪টি ভাষা প্রায় বিপন্ন। ভাষাগুলো হলো–খাড়িয়া, কোড়া, সৌরা, মুন্ডারি, কোল, মালতো, খুমি, পাংখোয়া, রেংমিটচা, চাক, খিয়াং, লুসাই ও পাত্র। তবে বাংলাদেশের ‘আদিবাসী’ নেতারা মনে করেন, বাংলাদেশে ‘আদিবাসী’দের বিপন্ন ভাষার সংখ্যা আরও বেশি। এখানে মনে রাখা জরুরি, একটি জাতিগোষ্ঠীর আত্মপরিচয়, তাদের স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান-প্রতিষ্ঠান, সামাজিক রীতি-নীতি এবং ভাব আদান-প্রদানের একটি মূল কেন্দ্র হচ্ছে তার ভাষা। তাই, ভাষার চর্চা ও সংরক্ষণের ভেতর দিয়ে মূলত একটি জাতিগোষ্ঠীর অস্তিত্ব টিকে থাকা বা না-থাকার প্রশ্ন জড়িত।

উল্লেখ্য, ১৯৫২ সালে বাংলা ভাষাকে অর্থাৎ বাঙালিদের মাতৃভাষাকে রক্ষার জন্য এদেশের মানুষ নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিল। কেননা একটি জাতিগোষ্ঠীর অস্তিত্বের সঙ্গে তা সম্পৃক্ত। তাই, বাংলাদেশে বিপন্ন প্রায় ‘আদিবাসী ভাষা’ প্রকারান্তরে বিপন্ন প্রায় ‘আদিবাসী জাতিগোষ্ঠী’র অস্তিত্বের সংকটকে নির্দেশ করে। ফলে, আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসের আজকের ঘোষণা বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। তাই আমরা চাই, বাংলাদেশ একটি সুন্দর, সমৃদ্ধ ও উদার গণতান্ত্রিক দেশ হয়ে উঠুক। সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদ বাংলাদেশ রাষ্ট্রের চারিত্র্যিক বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠুক। আমরা চাই, নানান জাতের, নানান ধর্মের, নানান ভাষার ও নানান বর্ণের মানুষের সংমিশ্রণে ও সমমর্যাদার সহাবস্থানের মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি সত্যিকার সোনার বাংলা উঠুক। 

লেখক: নৃবিজ্ঞানী ও অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।     

 

 

 

 

/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ