behind the news
IPDC  ad on bangla Tribune
Vision  ad on bangla Tribune

বিজয়ের মাস ও পাকিস্তান

আহসান কবির১২:১৭, ডিসেম্বর ২১, ২০১৫

Ahsan Kabirএদেশে তিনটি কথা খুব প্রচলিত।
এক. তাসের খেলায় কোনও চাল (লিড) না থাকলে চিড়া চাল (ক্লাপস) দিতে হবে।

দুই. আমেরিকায় বসে রাশিয়ার অথবা রাশিয়ায় বসে আমেরিকার তুমুল সমালোচনা করা যাবে। কারও কোনও দায় নিতে হবে না।

তিন. আগে এরশাদকে নিয়ে যা ইচ্ছা তাই লেখা যেত, এখন জামায়াতে ইসলামী আর পাকিস্তানকে নিয়ে লেখা যাবে!

এই লেখাটা পাকিস্তানকে নিয়ে। পাকিস্তানকে নিয়ে সারা পৃথিবীতে যত নেগেটিভ লেখা ও রিপোর্ট হয়েছে, পৃথিবীর অন্য কোনও দেশকে নিয়ে তার অর্ধেকও হয়নি। অদূর ভবিষ্যতে এই হার কমবে বলে মনে হয় না। আর তাই নিজের পুরোনো লেখা থেকে (পুরোনো লেখা থেকে সামান্য কোনও কিছু ধার করলে সেটা নাকি ঋণের পর্যায়ে পড়ে না!) পাকিস্তান বিষয়ক কিছু তথ্য প্রথমেই তুলে ধরি—

এক. রাষ্ট্রীয়ভাবে পাকিস্তান মনে করে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে তারা কোনও গণহত্যা সংঘটিত করেনি। এ কারণে এটা নিয়ে পাকিস্তান, বাংলাদেশ বা পৃথিবীর অন্য কোথাও আলোচনা উঠলেই গণহত্যার দায় অস্বীকার করে পাকিস্তান। মানবতাবিরোধী অপরাধে যখন কামারুজ্জামান, কাদের মোল্লা, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ কিংবা সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরীর ফাঁসি কার্যকর হয়, পাকিস্তান তখন কূটনৈতিকভাবে প্রতিবাদ জানায়, দুঃখ প্রকাশ করে! ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যেমন পাকিস্তানের সঙ্গে সব ধরনের শিক্ষা সম্পর্ক ছিন্ন করেছে, ঠিক তেমনি যদি রাষ্ট্রীয়ভাবেও পাকিস্তানের সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করা যেত! যদিও পাকিস্তানে হামুদুর রহমানের কমিশনের রিপোর্ট অনুযায়ী বলা যায়, বাংলাদেশে গণহত্যা হয়েছিল। পাকিস্তানের গণহত্যা পাপের সঙ্গে এ দেশের কিছু কিছু ব্যাপারের সংযোগ আছে, যা পাঠকদের মনে করিয়ে দিচ্ছি—

ক. মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রসঙ্গ আসলেই অনেকেই ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধুর সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করার কথা বলেন। এটি একটি ভুল ও মিথ্য প্রচারণা। বঙ্গবন্ধুর ক্ষমা ঘোষণার আওতায় গণহত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, লুটতরাজ এবং জোর করে ধর্মান্তকরণের মতো অপরাধে অভিযুক্তরা অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না। এসব অপরাধে সারাদেশে ১১ হাজারের মতো অপরাধীর কেউ-কেউ বিচারের আওতাধীন এবং বেশিরভাগ অপরাধী কারান্তরীণ ছিলেন। জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে দালাল আইন বাতিল করেন। তখন এসব অপরাধী মুক্ত হয়ে যান!

খ. জামায়াতে ইসলামী কথায়-কথায় বলে থাকে, বাংলাদেশে কোনও মানবতাবিরোধী অপরাধী নেই। আসল যুদ্ধাপরাধী ১৯৫ জন পাকিস্তানি, যাদের গ্রেফতার করে ভারতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল এবং তাদের বিচার করা হয়নি। পাকিস্তানপ্রেমী জামায়াতসহ (মেড ইন পাকিস্তান) অনেকে কখনও ভাবেন না যে, কী কারণে এটি তখন সম্ভব ছিল না! ১৯৭৪ সালে দিল্লিতে স্বাক্ষরিত চুক্তিতে যে ১৯৫ জন পাকিস্তানি ছিলেন, তাদের বিচারের ব্যাপারে ভারতও সিরিয়াস ছিল না। আর সদ্য স্বাধীন দেশ বাংলাদেশের সাড়ে চার লাখ মানুষ তখন পাকিস্তানে জিম্মি ছিলেন, যারা দেশে ফেরার জন্য ব্যাকুল হয়ে ছিলেন। এই ব্যাপারটাকে উপলক্ষ করে ধূর্ত ভুট্টো পাকিস্তানে জিম্মি বিশ্বাসঘাতক (ভুট্টোর বিচারে) বাঙালিদের বিচার করার ঘোষণা দিয়ে ২৫২ জনকে গ্রেফতার করেছিলেন। এই বাস্তবতায় ১৯৫ জনকে পাকিস্তান যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয় এবং ধূর্ত ভুট্টো আবারও ঘোষণা দেন, এই ১৯৫ জনের ব্যাপারে একটা তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে এবং কারও বিরুদ্ধে যদি অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ঘোষণা পর্যন্তই ছিল ভুট্টোর কথা। এই ঘটনার পরেই জিম্মি হওয়া বাঙালিরা এদেশে ফিরতে শুরু করেন।

দুই. পাকিস্তান আসলে এমনই। হয়তো সে কারণেই নামজাদা পাকিস্তানি বিচারপতি কায়ানির মন্তব্য বহু বছর ধরে সুপার ডুপার হিট হয়ে আছে। তিনি বলেছিলেন, পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আর কিছু না পারুক, বার বার তারা দেশটাকেই (পাকিস্তানকে। বার বার সামরিক শাসনের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলকেই বুঝিয়েছিলেন!) দখল করতে পারে! মহামারি শব্দটা আমাদের কাছে অনেক বেশি পরিচিত। আগে মহামারি হয়ে দেখা দিত প্লেগ। এরপর কুষ্ঠ ও গুটি বসন্ত (স্মল পক্স)। এখন ডায়েরিয়া বা ডেঙ্গুর কথা শোনা যায়। পাকিস্তান যে মহামারিতে ভোগে, তার নাম সামরিক শাসন! পাকিস্তানের বেশিরভাগ নাগরিক মনে করেন, পৃথিবীর সেরা সেনাবাহিনী তাদের। ১৯৪৮, ১৯৬৫ ও ১৯৭১ এই তিনবার ভারত ও বাংলাদেশের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে পাকিস্তান। তিনবারই শোচনীয় পরাজয় ঘটে তাদের। তবু বেশির ভাগ পাকিস্তানি নাগরিক মনে করেন, তাদের সেনাবাহিনী সাহসী এবং কুলীন!

তিন. নিজ দেশের বাইরে খুন, নেশাদ্রব্য পাচার আর সন্ত্রাসী কার্যকলাপ ঘটানোর জন্য কোনও দেশের নাগরিকরা সবচেয়ে বেশি দণ্ড ভোগ করেছেন? উত্তর, পাকিস্তান। এই সব অপরাধের সঙ্গে ইদানীং যুক্ত হয়েছে জাল টাকার বিস্তার। পাকিস্তানিদের মতো টাকা, পাসপোর্ট বা সার্টিফিকেট জাল নাকি কেউ করতে পারে না। তো পাকিস্তানি এক নাগরিক টাকা জাল করার অপরাধে ধরা পড়েছেন ইন্ডিয়ায়। পুলিশ তাকে জিজ্ঞাসা করল, টাকা জাল করেছিস কেন? পাকিস্তানি আসামির উত্তর, স্যার, আপনাদের দেশের সরকারের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামতে চেয়েছিলাম!

পাকিস্তানিরা শুধু নিজ দেশের সরকারের সঙ্গেই টেক্কা দিতে চান না, অন্য দেশের সরকারের সঙ্গেও পাঞ্জা লড়তে চান। ইন্ডিয়ার বিভিন্ন রাজ্যে সরকারবিরোধী বাহিনী তৈরি এবং বোমা ও গ্রেনেড হামলার জন্য একাধিক পাকিস্তানি নাগরিক ইন্ডিয়াতে গ্রেফতার হয়েছেন। কারও কারও ফাঁসিও হয়েছে। তালেবানদের সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়েছিল পাকিস্তান। তালেবানদের সঙ্গে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সদস্যরা নিজেদের পরিচয় লুকিয়ে আফগানিস্তানে ঢুকেছিলেন এবং সেখানে তালেবান রাষ্ট্র কায়েম করেছিলেন। জর্ডানের রাজার সঙ্গে সেখানে আশ্রয় নেওয়া ফিলিস্তিনিদের একবার বিরোধ হয়েছিল। জর্ডানে সেবার ফিলিস্তিনি নিধনে সাহায্য করেছিল পাকিস্তান এবং নেতৃত্বে ছিলেন জিয়াউল হক (জেনারেল ও পরবর্তীকালে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট)।

চার. মেজর জেমস অ্যাবোটাবাদ। ব্রিটিশ আর্মির এই মেজর এই পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদ শহরটির গোড়াপত্তন করেছিলেন। পরবর্তীকালে এখানে মিলিটারি একাডেমি, সৈনিক একাডেমি, বালুচ রেজিমেন্টসহ পাকিস্তান আর্মির আটটি প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। অ্যাবোটাবাদের একটি অংশ অবসরপ্রাপ্ত সামরিক বাহিনীর অফিসারদের বাসস্থানের জায়গা হিসেবে বরাদ্দ দেওয়া হয়। পুরো অ্যাবোটাবাদে এক ধরনের পরোক্ষ সামরিক শাসন চলে। পুরো এলাকায় কোনও নতুন মানুষ এলে গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন খোঁজ খবর নেওয়া শুরু করে। এই শহরেই আমেরিকার কথিত এক নম্বর শত্রু লাদেনকে পাঁচ ছয় বছর লুকিয়ে রেখেছিল পাকিস্তান।

পাঁচ. পাকিস্তান এমনই। তবে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের অনেক মানুষের চিন্তাক্ষেত্রে একটি বিশেষ মিল রয়েছে। এরা ছবি দেখে ইন্ডিয়ান। পোষাকের ফ্যাশন নেয় বোম্বের নায়ক নায়িকাদের কাছ থেকে। দর্শনীয় স্থান দেখতে যায় ইন্ডিয়ায়। শিক্ষা এবং চিকিৎসা নিতেও ইন্ডিয়া যেতে দেখা যায়। বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের বহু শিল্পী বোম্বে ফিল্মের গান গাইতে পারলে নিজেদের ধন্য মনে করে। তবে গালি দেওয়ার ক্ষেত্রে ইন্ডিয়াকেই দেয়। পাকিস্তানের অনেক মানুষ ভারতকে তাদের শত্রু নাম্বার ওয়ান মনে করেন।

ছয়. পাকিস্তান ১৯৪৭ সালের পর থেকে আজ পর্যন্ত সামরিকতন্ত্রের বাইরে যেতে পারেনি, ভবিষ্যতেও পারবে না। তাদের মানসিকতা আসলে কেমন? নিচের কৌতুকটা পড়লেই বোঝা যাবে। কথা হচ্ছে রাজীব গান্ধী আর জেনারেল জিয়াউল হকের মধ্যে।

জিয়াউল হক: আপনার দেশে আপনাকে নিয়ে কেউ কৌতুক রচনা করে না? তাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেন?

রাজীব গান্ধী: করবে না কেন? আমরা কৌতুক রচয়িতাদের সঙ্গে কথা বলি। বোঝার চেষ্টা করি কেন এসব রচনা হচ্ছে। তারপর সেগুলো সমাধানের চেষ্টা করি। আপনারা কী করেন?

জিয়াউল হক: ধরে এনে ফায়ারিং স্কোয়াডে পাঠিয়ে দেই!

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ পাকিস্তানের কাছে হিন্দু মানসিকতার কিছু মুসলমান বাঙালির গাদ্দারি। সেই সঙ্গে ভারতীয় ষড়যন্ত্র! সেখানে গণহত্যার কোনও ব্যাপার নেই। নেই লুটতরাজ, আগুন দেওয়া আর ধর্ষণের  ঘটনাও। নেই ২৪ বছরের সীমাহীন বৈষম্য আর শোষণের ব্যাপার-স্যাপার। নেই বাঙালিকে দাবায়ে রাখার ব্যাপার কিংবা বাংলাদেশকে উপনিবেশ বানিয়ে রাখার কথা।

আমি তবু আশা করি, ব্রিটিশদের জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের জন্য দুঃখ প্রকাশের মতো পাকিস্তানও একদিন দুঃখ প্রকাশ করবে, ক্ষমা চাইবে বালাদেশের কাছে। জানি না আমার লেখা পড়ে কারও কারও জগজিৎ সিংয়ের সেই গানটার কথা মনে পড়বে কিনা! বেশি কিছু আশা করা ভুল/ বুঝলাম আমি এতদিনে!

লেখক: রম্য লেখক

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

Global Brand  ad on Bangla Tribune

লাইভ

IPDC  ad on bangla Tribune

কলামিস্ট

টপ