পাকিস্তানের রাজনীতির মাঝে অদৃশ্য পশ্চিমবঙ্গের মুসলমান

Send
গর্গ চট্টোপাধ্যায়
প্রকাশিত : ১১:২৮, ফেব্রুয়ারি ১৯, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৩০, ফেব্রুয়ারি ১৯, ২০১৬

গর্গ চট্টোপাধ্যায়২০১৫ সালের  অক্টোবরে, পাঞ্জাবের পাটিয়ালা ঘরানার প্রবাদপ্রতিম গজল গায়ক পাকিস্তানি নাগরিক গোলাম আলির একটি কনসার্ট অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল মহারাষ্ট্র রাজ্যের মুম্বাই শহরে। উগ্র-হিন্দুত্ববাদী শিবসেনা দলের হুমকি ও চাপে অনুষ্ঠান বাতিল হয়।  ক্ষমতাসীন বিজেপিকে এনিয়ে কিছুটা বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। এই ঘোলা জলে মাছ ধরে, নিজেদের  ‘সহনশীলতা’ প্রমাণ করে বাহবা পাওয়ার প্রচেষ্টায় জুটে যায় বেশ কিছু অ-বিজেপি রাজনৈতিক শক্তি।
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায় তাদের মধ্যে অন্যতম। তিনি গোলাম আলিকে আমন্ত্রণ জানান পশ্চিমবঙ্গে অনুষ্ঠান করার জন্য। ২০১৬ সালের ১২ জানুয়ারি কলকাতার নেতাজী ইনডোর স্টেডিয়ামে ১৫০০০ শ্রোতার সামনে অনুষ্ঠিত হয় গোলাম আলির গজল সন্ধ্যা। সেদিনের সব ব্যবস্থাপনাকে ব্যক্তিগতভাবে তদারকি করেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায় স্বয়ং। গোলাম আলিকে তিনি সংবর্ধনাও দেন। দৃশ্যতই আপ্লুত হয়ে অভিজ্ঞ গায়ক মমতার ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, ‘আমি তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ। তিনি সরস্বতী রূপে আমাদের সকলের উপকার করেছেন’।
মমতার গোলাম আলির অনুষ্ঠানের হোতা হওয়া নানাভাবে ইঙ্গিতময়। তিনি এই সংকেত  দিলেন যে ভারত সংঘরাষ্ট্রের সকল এলাকায় সকল মানুষ পাকিস্তানি সবকিছুকে বয়কট করার প্রশ্নে একাট্টা নয়, সকল এলাকায় অসহনশীল শক্তিগুলোর খবরদারিও চলে না । উপমহাদেশের বৃহত্তর রাজনৈতিক পটভূমিতে এটি অবশ্যই একটি সুস্থ ও শুভ লক্ষণ। কিন্তু আমরা যদি এই অনুষ্ঠান ও পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রতিক কিছু ঘটনার খুঁটিনাটি তলিয়ে দেখি, তাহলে দেখবো ব্যাপারটি অতটা সহজ নয়। বিশেষত পশ্চিমবঙ্গের অভ্যন্তরে  ধর্মনিরপেক্ষ ও সাম্প্রদায়িক সামাজিক-রাজনৈতিক স্রোতগুলোর মধ্যে যে আপাত সহজ বিভাজন আছে, তার প্রেক্ষিতে মমতার  কিছু সংকেত ও চিহ্ন ব্যবহারের রাজনীতি কোনও স্রোতগুলোকে পুষ্ট করে, সেটা পরিষ্কার করে বোঝা প্রয়োজন। 

কলকাতায় গোলাম আলির গজল সন্ধ্যার উদ্যোক্তা ছিল পশ্চিমবঙ্গ সরকার। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কোন দফতর? পাকিস্তানি গায়কের উর্দু গজলের যে আসলেই কোনও  ধর্ম হয় না, তা বোঝাতে এটির উদ্যোক্তা হতেই পারতো সংস্কৃতি দফতর বা নিদেনপক্ষে পর্যটন দফতর। উদ্যোক্তা ছিল পশ্চিমবঙ্গ সংখ্যালঘু উন্নয়ন ও অর্থ নিগম। পশ্চিমবঙ্গের “সংখ্যালঘু”-দের মধ্যে ৯০%এরও বেশি হলেন মুসলমান। তাদের সাথে একজন পাকিস্তানি গায়কের কিভাবে কোনও ‘বিশেষ’ সম্পর্ক থাকতে পারে, তা পরিষ্কার নয়, যদি না পশ্চিমবঙ্গ সরকার বোঝাতে চান যে পশ্চিমবঙ্গের অন্যান্য জনগণের তুলনায় গোলাম আলি কোনও অর্থে পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানদের বেশি কাছের। গোলাম আলির উর্দুও কোন বিশেষ  সম্পর্কে পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানের সঙ্গে তাকে আবদ্ধ করে না কারণ এ রাজ্যের মুসলমানের মধ্যে ৯০%এরও বেশি হলেন বাংলাভাষী, বাঙালি। উদ্যোক্তা চয়নের মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গের জনগণের এক অংশকে স্রেফ তার ধর্মীয় পরিচিতির মধ্যে সীমিত করা এবং সেই গোদা পরিচিতিটিকে বেশ প্রকট ভাবেই পাকিস্তানের আরেক মুসলমান গায়কের সাথে বিশেষ ভাবে যুক্ত করা - এগুলো ভারত সংঘের রাজনৈতিক আবর্তের সাম্প্রদায়িক ধারায় মুসলমান সম্বন্ধে চালু সবচেয়ে ক্ষতিকারক স্টিরিওটিপিকাল ধারণাগুলোকেও হাওয়া দেয়। এর  সংক্ষিপ্ত আকার হলো- মুসলমানদের পাকিস্তানের প্রতি বিশেষ প্রেম আছে। উপমহাদেশের সকল রাষ্ট্রেই প্রধান ধর্মীয় সংখ্যালঘুকে ‘অন্যের মাল’ বা ঘরশত্রু হিসেবে কল্পনা করার একটি সুদীর্ঘ লজ্জাজনক ঐতিহ্য চালু আছে, এমনকি রাজনৈতিকভাবে যারা ধর্মনিরপেক্ষ অর্থে মন্দের ভালো বলে পরিচিত, তাদের মধ্যেও।

মমতা এই প্রথমবার সংখ্যালঘু উন্নয়ন ও অর্থ নিগমের ঢাল ব্যবহার করছেন আধা-রাজনৈতিক স্বার্থে, এমন নয়। এই নিগমেরই অনুষ্ঠানগুলোতে তিনি ধর্মীয় সংখ্যালঘু, প্রধানত মোসলমানদের জন্য বিশেষ প্রকল্প ঘোষণা করেছেন। নানা বিশেষের মধ্যে একটি বিশেষভাবে দৃষ্টিকটু - পশ্চিমবঙ্গে একটি বিরাট নজরুল কেন্দ্র স্থাপনার ঘোষণা। নিখিল বাংলা-দেশে মুসলমান ঘরে জন্মানো ব্যক্তিত্ব খুব কম ছিলেন বা আছেন যাদের যশ হিন্দু-মুসলমানের ধার ধারে না, যদিও ১৯৭১ পরবর্তী কালে (এবং তার পূর্ব্বেও) নজরুলকে গণপ্রজান্তন্ত্রী বাংলাদেশের জাতীয় কবি বানিয়ে আলতো করে নজরুলকে ‘বিশেষ’ ভাবে পূর্ব-বাংলার করে গড়ে তোলা হয়েছে। এই ‘বিশেষ’এর মধ্যে ধর্মের ছাপ অনস্বীকার্য এবং মমতাদেবীর রকম-সকম দেখে মনে হয়, তিনিও বোধহয় নজরুলের এই ভ্রান্ত চরিত্রায়নে আস্থা রাখেন, অন্তত রাজনৈতিক স্বার্থে।  মমতাদেবীর সংখ্যালঘু উন্নয়ন মঞ্চকে ব্যবহার দেখিয়ে দেয় পশ্চিমবঙ্গের মুসলমান কি শুনতে চায়, সেই সম্বন্ধে তাঁর ঠিক বা বেঠিক ধারণা।         

২০১৫ সালের মে মাসে মমতাদেবীর সরকার প্রখ্যাত উর্দু কবি আল্লামা ইকবালের নাতি ওয়ালিদ ইকবালকে কলকাতায় ডাকেন সরকারি সাহায্যে চলা পশ্চিমবঙ্গ উর্দু একাডেমির সম্মেলন উপলক্ষ্যে। লাহোর থেকে এসে তিনি দীর্ঘপ্রয়াত ঠাকুরদা’র সম্মানার্থে দেওয়া পুরস্কার গ্রহণ করেন। আবারও, কোনও উর্দু কবিকে সম্মান দেওয়ার ব্যাপারে আপত্তির কিই বা থাকতে পারে? সমস্যা হলো, তৃণমূল দল যেভাবে উর্দু ও মুসলমানকে যুক্ত করে সেটা নিয়ে, আল্লামা ইকবালের নাতিকে এনে সেই ব্যাপারটিকে বিশাল সংখ্যক হোর্ডিং-এর সাহায্যে কলকাতার মুসলমান প্রধান এলাকাগুলোতে প্রচার করার পেছনের রাজনৈতিক হিসেব-নিকেশ ও ধারণা নিয়ে। তৃণমূল দলের ২০১১ সালের ঘোষণাপত্রে যেভাবে মাদ্রাসা ও উর্দু স্কুলের ব্যাপারটি সহজেই একসাথেই বলেছে। ঘোষণাপত্রে তারা প্রকট-ভাবে গুলিয়ে ফেলে মুসলমান ও উর্দু, আর তাদের অনুষ্ঠান-সম্পাদনের মধ্যে অন্তর্নিহিত থাকে  উর্দু ও পাকিস্তানকে গুলানোর, পরিশেষে আভাস থাকে মুসলমান ও পাকিস্তানকে গুলানোর। শেষের ভ্রান্তিটিই সবচেয়ে বিপদজনক।

পশ্চিমবঙ্গের ৯০% মুসলমান বাংলাভাষী। আল্লামা ইকবাল  বা উর্দু বা গোলাম আলি পশ্চিমবঙ্গের  হিন্দু  বাঙালির থেকে যত দূরে, ততটাই দূরের সেখানকার মুসলমান বাঙালির থেকে। অথচ তৃণমূল দলের মুসলমান নেতৃত্বের মধ্যে আনুপাতিক হারে বাংলাভাষীদের প্রতিনিধিত্ব বেশ কম। তৃণমূলের জন্মসূত্রে মুসলমান সাংসদদের মধ্যে ৪০% হলেন উর্দুভাষী, যেখানে পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানদের মধ্যে তারা ১০%ও না। এদেরকে নেতৃত্বে রাখার সুবিধা হলো, জনভিত্তিহীন নেতাদের বসিয়ে একাধারে যেমন দলের মুসলমানদের মধ্য থেকে স্বতন্ত্র জননেতা তৈরিকে আটকানো যায়, একই সাথে এই নেতাদের মুসলমানিত্ব ভেঙে সংখ্যালঘু প্রতিনিধিত্বের দায়টিও সারা হয়। পশ্চিমবঙ্গের ২৫% জনগণ হলেন মুসলমান বাঙালি। সেই বর্গ থেকে উঠে আসা স্বতন্ত্র জননেতা যে শর্তে দর কষাকষি করবেন, যেভাবে নিজেদের রাজনৈতিক প্রভাবের মাধ্যমে ক্ষমতার ভাগ-বাটোয়ারার অন্য বিন্যাস তৈরির সম্ভাবনা ধারণ করবেন, তা বর্তমান কায়েমী স্বার্থগুলোর স্থিতিশীলতার পক্ষে বিপদ। দেশ-ভাগ পূর্ববর্তী সময়ে শের-এ-বাংলা ঠিক এটিই করেছিলেন কৃষক-প্রজা পার্টির আমলে, সামন্তপ্রভু নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেস ও সামন্ত্রপ্রভু নিয়ন্ত্রিত  মুসলিম লীগের ‘শরিফজাদা’ নেতৃত্বের বাড়া ভাতে ছাই দিয়ে।

দুঃখের বিষয়, পশ্চিমবঙ্গের মুসলমান ৪৭-এর পর থেকে কোনও ফজলুল হক-কে পায়নি। তাই কলকাতায় উর্দু-পাকিস্তান আপ্যায়ন করে মুসলমান-মুসলমান খেলা করা সম্ভব।  গোলাম আলীর গজল সন্ধ্যাকে বুঝতে হবে সেই পরিপ্রেক্ষিতেও ।

সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গের মালদা জেলার কালিয়াচকে প্রায় লক্ষাধিক মুসলমান জনতা এক জমায়েত করে সুদূর উত্তর প্রদেশের এক অখ্যাত হিন্দু সাম্প্রদায়িক নেতার হজরত মহম্মদের প্রতি অবমাননাকর বক্তব্যের প্রতিবাদে। জমায়েতটি সহিংস হয়ে বেশ কিছু পুলিশ গাড়ি জ্বালায় এবং হিন্দু সম্পত্তি ভাঙচুর করে। এই দূরের ঘটনার ওপর ভিত্তি করে, সামাজিক মাধ্যমে ঘৃণার প্রচার যেভাবে এতগুলো মানুষকে একাট্টা করলো এক সহিংস প্রতিবাদে, তা চিন্তার বিষয় কারণ রাজনৈতিক দল বহির্ভূত এত বড় হিংসাত্বক জমায়েত প্রাতিষ্ঠানিক রাজনৈতিক সংগঠনের অক্ষমতা ও মাঠস্তরে অনুপস্থিতিকেই প্রমাণ করে । কোন গোষ্ঠীর ওপর ভিন্নতা আরোপ করতে করতে তা এক সময় ফ্রাংকেস্টাইন দৈত্যে পরিণত হতেই পারে। পশ্চিমবঙ্গের মুসলমান বাঙালির আর্থ-সামাজিক ক্ষমতায়নের যে রাজনীতি, তা গজল সন্ধ্যা ও নজরুল তীর্থের চমকের মাধ্যমে সম্ভব না। কারণ তার চাহিদাগুলো বিশাল-সংখ্যক হিন্দু বাঙালির থেকে আলাদা নয় - যথা  খাদ্য নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ইত্যাদি। এই পথটি কন্টকময় ও  লম্বা - অনেক বিরোধিতাও আসবে আশরাফ মুসলমান ও সবর্ণ হিন্দু কায়েমী স্বার্থে ঘা লাগলে। কিন্তু সে কঠিন পথের কোনও সহজ  বিকল্প নেই।      

লেখক: স্থিত মস্তিষ্ক-বিজ্ঞানী

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ