আগে চাই নিরাপত্তা, পরে উন্নয়ন

Send
প্রভাষ আমিন
প্রকাশিত : ১২:২৫, এপ্রিল ২৫, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ১২:৩৩, এপ্রিল ২৫, ২০১৬

Probhash Aminআমি জীবনে দেড়বার রাজশাহী গেছি। প্রথমবার গিয়েছি ১৯৮৫ সালে এসএসসি পরীক্ষার পর বেড়াতে। কুমিল্লা থেকে রাজশাহী বেড়াতে যাওয়ার সুযোগ বা সামর্থ্য তখন ছিল না। গিয়েছিলাম কারণ আমার সরকারি চাকরিজীবী বাবার পোস্টিং ছিল রাজশাহীতে। যাওয়ার পথে ফেরিতে উত্তাল যমুনা পাড়ি দেওয়ার স্মৃতি এখনও রোমাঞ্চিত করে। মনে আছে রাজশাহীর সাহেব বাজারে আব্বার মেসে বাট-বেটা সংসার পেতেছিলাম কয়েকদিনের জন্য। ভাত রান্না করাটা শিখেছিলাম তখন। মনে আছে রাজশাহী থেকে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ দেখতে গিয়েছিলাম। তখন হার্ডিঞ্জ ব্রিজ ছিল দেশের সবচেয়ে বড়। দ্বিতীয় দফা গিয়েছিলাম বছর চারেক আগে, এক কর্মশালায় প্রশিক্ষক হিসেবে। দ্বিতীয় দফার সফরটিকে অর্ধেক বলছি, কারণ কয়েক ঘণ্টার সেই সফরে কর্মশালার ভেন্যুর দেয়াল ছাড়া আর কিছু দেখিনি। তবে সেই কর্মশালার উদ্বোধনী অধিবেশনে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রিয় কথাশিল্পী শ্রদ্ধেয় হাসান আজিজুল হক। স্যারের সঙ্গে এক মঞ্চে বসেছি, নিজের সৌভাগ্যে নিজেকেই ঈর্ষা করতে ইচ্ছা করে। সেই হাসান আজিজুল হক শনিবার একটি দৈনিক পত্রিকার প্রথম পাতায় একটি লেখা লিখেছেন- 'প্রত্যেকটা মানুষ নিরাপত্তা নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত'। সেই লেখার সূত্র ধরেই এই লেখা।
দেড়বার রাজশাহী গেলেও বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে কখনও যাওয়া হয়নি। কিন্তু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অনেকেই আছেন আমার বন্ধু। বিশ্ববিদ্যালয়ের গল্প করার সময় তাদের চোখে মুখে যে আনন্দের আভা ফুটে উঠতো, তা আমার ভালো লাগতো। গল্প শুনতে শুনতে শান্ত-স্নিগ্ধ, কিন্তু প্রয়োজনে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো এক মতিহারের ছবি এঁকে নিয়েছি কল্পনায়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস গৌরবের ইতিহাস। ভাষা আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ- আমাদের মুক্তি সংগ্রামের প্রত্যেকটি অধ্যায়ে রয়েছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গৌরবোজ্জ্বল অবদান। স্বাধীনতার পর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনসহ সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলনেও ছিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। এমনকি ১/১১এর সুগার কোটেট মার্শাল ল'র বিরুদ্ধেও রুখে দাঁড়িয়েছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকরা।

আরও পড়তে পারেন: কাশিমপুর কারা ফটকে প্রধান রক্ষীকে গুলি করে হত্যা

কিন্তু এত গৌরবের সব অর্জন ম্লান হতে বসেছে মৌলবাদীদের থাবায়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে মৌলবাদীদের থাবা কীভাবে বিস্তার লাভ করলো তার বিস্তারিত ইতিহাস জানি না। তবে আশির দশকে পুনরুজ্জীবনের সময় ছাত্রশিবির দুটি বিশ্ববিদ্যালয়কে টার্গেট করেছিল, এক: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, দুই: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। বিভিন্ন হল দখলে নেওয়া, আশপাশের মেস ভাড়া নিয়ে আধিপত্য বিস্তার, অস্ত্র, নৃশংসতা সবই এসেছে শিবিরের হাত ধরে। আর মুক্তিযুদ্ধের সময়কার ভয়ঙ্কর ছাত্রসংঘই পরে ছাত্রশিবির হিসেবে ভয়ঙ্করতা অব্যাহত থাকে। আর ইদানিং বাংলাদেশে বিস্তার লাভ করা জঙ্গিবাদের শেকড়ও জামায়াত-শিবিরেই।

শুধু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় নয়, গোটা বাংলাদেশেই জঙ্গি মৌলবাদীরা প্রগতিশীলতার বিপক্ষে, মুক্তচিন্তার বিপক্ষে চাপাতি নিয়ে মাঠে নেমে পড়েছে। তালিকা করে করে তারা মুক্তবুদ্ধির মানুষদের হত্যা করছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েই গত ১২ বছরে চার শিক্ষককে হত্যা করা হয়েছে। এর মধ্যে শেষ দুজনকে হত্যা করা হয়েছে একই কায়দায়।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজির শিক্ষক রেজাউল করিম সিদ্দিকী একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন চালাতেন, সেই সংগঠন থেকে 'কোমলগান্ধার' নামে একটি পত্রিকা সম্পাদনা করতেন। তিনি ভালো সেতার বাজাতেন। তিনি শিক্ষার্থীদের সাংস্কৃতিক জাগরণের কথা বলতেন। এ ধরনের মানুষই তো মৌলবাদী অপশক্তির প্রধান শত্রু। তারা খুব পরিকল্পিতভাবে রেজাউল করিম সিদ্দিকীকে তার বাসার ২০ গজের মধ্যে কুপিয়ে হত্যা করে। রাস্তায় উপুড় হয়ে পড়ে থাকা একজন শিক্ষকের লাশ আমাদের অস্তিত্বকেই নাড়িয়ে দেয়।

 

আরও পড়তে পারেন: আরেক সুরাইয়া!

 

রেজাউল করিম সিদ্দিকীর হত্যার পর অনেকে বলছেন, তিনি তো ব্লগার ছিলেন না, তিনি তো নাস্তিক ছিলেন না; তাহলে তাকে হত্যা করা হলো কেন? এই যুক্তিটা খুবই হাস্যকর ও আপত্তিকর। তারমানে বাংলাদেশে মুক্তমনা-নাস্তিক-ব্লগারদের  হত্যা করলে অসুবিধা নেই। আসলে সকল প্রগতিশীল মানুষই মৌলবাদীদের শত্রু; তিনি আস্তিক বা নাস্তিক যাই হোন না কেন। স্বাধীন বাংলাদেশে সবারই বেঁচে থাকার অধিকার আছে।

বর্তমান সরকার অনেক উন্নয়ন কাজ করছে। সত্যি বলতে বাংলাদেশ এখন তৃতীয় বিশ্বে উন্নয়নের রোল মডেল। কিন্তু মানুষের জীবনের নিরাপত্তা না থাকলে, সব অর্জনই বিসর্জনে বদলে যাবে। আগে চাই জীবনের নিরাপত্তা, তারপর উন্নয়ন। বেঁচে থাকলে অনেক উন্নয়ন করা যাবে। যদি বেঁচে থাকি, অনেক উন্নয়ন করা যাবে।

শুরুতেই বলেছিলাম হাসান আজিজুল হকের লেখার কথা। তিনিও এই কথাটিই বলেছেন। তিনি লিখেছেন, 'আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে। দেশের মানুষ চাইছে তাদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হোক। ব্যক্তিগত নিরাপত্তা এখন সবাই চাইছে।'

 

আরও পড়তে পারেন: নতুন ছবিটা আর বানানো হলো না অধ্যাপক রেজাউলের

 

আমরাও তাই চাই। মৌলবাদীরা অন্ধকারে বাস করে, তালিকা করে আমাদের মুক্তচিন্তার প্রগতিশীল মানুষদের পেছন থেকে এসে কুপিয়ে চলে যাবে, এটা চলতে পারে না। তাহলে একদিন এই অন্ধকারই আমাদের গ্রাস করবে। সব আলো হারিয়ে যাবে কালোর মাঝে। এখনই আমাদের সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়তে হবে। প্রথম দায়িত্ব অবশ্যই রাষ্ট্রের, তারপর আমাদের সবার।

লেখক:  অ্যাসোসিয়েট হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ।

probhash2000@gmail.com

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ