বিদেশ থেকে আসা চালেই কৃষকের সর্বনাশ?

Send
বিপুল সরকার সানি, দিনাজপুর
প্রকাশিত : ১১:৫৯, মে ২৪, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১২:১০, মে ২৪, ২০১৯

ধানের বাম্পার ফলন হলেও এবার লোকসান গুনছেন চাষিরামাথার ঘাম পায়ে ফেলে ধান উৎপাদন করে ন্যায্যমূল্য পচ্ছেন না কৃষকরা। অন্যদিকে ভারত থেকে ব্যাপকহারে আমদানি করা হয়েছে চাল। সরকার ধানের আমদানি শুল্ক ২৮ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫৫ শতাংশ করার পর আমদানি কিছুটা কমেছে বলে জানান চাল ব্যবসায়ীরা। ধান-চালের ব্যবসায়ী ও মিল মালিকরা বলছেন, বিদেশ থেকে ব্যাপকহারে চাল আমদানি কারণেই বাজারে এর ব্যাপক প্রভাব পড়ছে। এ কারণে কমেছে দেশের উৎপাদিত ধান-চালের দাম ও চাহিদা।

কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে সংকট না থাকা সত্ত্বেও বিদেশ থেকে চাল আমদানি করায় বাজারে ধানের দাম কমেছে। আমদানি বন্ধ না হলে কৃষকরা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তারা। আর কৃষকরা বলছেন, এভাবে লোকসান হতে থাকলে তারা ধান চাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন এবং পেশা পরিবর্তনে বাধ্য হবেন।

কৃষি বিভাগের তথ্য মতে, গত বছর দেশে মোট ধান উৎপাদন হয়েছে ৩ কোটি ৬২ লাখ টন। এরপরও গত ২০১৭-২০১৮ অর্থ বছরে ১৫ লাখ টন চাল আমদানির লক্ষ্যমাত্রা নেয় সরকার। এবার লক্ষ্যমাত্রা ৩ কোটি ৫৫ লাখ টন। দিনাজপুরের হিলি স্থলবন্দর শুল্ক স্টেশনের রাজস্ব কর্মকর্তা নূর আমীন বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, এ বছরের জানুয়ারি থেকে ১৯ মে পর্যন্ত হিলি দিয়ে ভারত থেকে চাল আমদানি করা হয়েছে ৪৪ হাজার ৮৬ মেট্রিক টন।

দিনাজপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক তৌহিদুল ইকবাল বলেন, ‘দিনাজপুর জেলায় এবার মোট ১ লাখ ৭৪ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ করা হয়েছে। এরইমধ্যেই বোরো ধান কাটা শুরু করেছেন কৃষকরা। এবারের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ৭ লাখ মেট্রিক টন চাল। ধানের হিসেবে এর পরিমাণ প্রায় ১১ লাখ ২০ হাজার মেট্রিক টন।’ধানের বাম্পার ফলন হলেও এবার লোকসান গুনছেন চাষিরা

তিনি বলেন,‘দিনাজপুর থেকে এবার যে পরিমাণ ধান সংগ্রহ করছে সরকার, উৎপাদনের তুলনায় তা মাত্র শুন্য দশমিক ৪৫ শতাংশ।’ এবার দিনাজপুর জেলার কৃষকদের কাছ থেকে মাত্র ৫ হাজার ৪৮ মেট্রিক টন ধান ক্রয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে বলে তিনি জানান।

জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ আশ্রাফুজ্জামান বিষয়টি নিশ্চিত করে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘যে পরিমাণে ধান উৎপাদন হয়েছে, সেই পরিমাণে ধান কেনা হচ্ছে না। এছাড়া, সব কৃষকের কাছ থেকে ধান কেনাও সম্ভব নয়। কৃষি বিভাগের কাছ থেকে কৃষকদের তালিকা নেওয়া হচ্ছে এবং সেখান থেকে নারী কৃষকদের অগ্রাধিকার দিয়ে লটারির মাধ্যমে ধান সংগ্রহ করা হবে। তবে এখনও কৃষকদের তালিকা পাওয়া যায়নি।  ফলে ধান সংগ্রহও শুরু করা যায়নি।’ তিনি জানান, দিনাজপুরে এবার ৮৫ হাজার ৪৭ মেট্রিক টন সেদ্ধ চাল, ৮ হাজার ৭৮৪ মেট্রিক টন আতপ  চাল এবং ৫ হাজার ৪৮ মেট্রিক টন ধান ক্রয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্যে এরইমধ্যে ২ হাজার ৪৭৯ জন মিল মালিকের সঙ্গে চুক্তি প্রক্রিয়া সম্পন্ন  হয়েছে।

দিনাজপুরের কৃষকরা জানিয়েছেন, শ্রমিক সংকট নয় বরং এবারের সমস্যা ধানের কম দাম। শ্রমিক সংকট বরাবরই থাকলেও এবার শ্রমিকের মজুরি বেড়েছে। গত বছর  মজুরি ছিল দৈনিক ৩০০ টাকা, এবার   ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা। তবে এই মজুরিও দেওয়া সম্ভব হতো যদি ধানের সঠিক দাম থাকতো। ধান বিক্রি করে যেখানে উৎপাদন খরচই উঠছে না, সেখানে বাড়তি মজুরি দিয়ে ধান কাটা আরও লোকসানের।

বোলতৈড় গ্রামের কৃষক সেলিম রেজা বলেন, ‘ধান চাষে যদি এভাবে লোকসান হতেই থাকে, তাহলে এমন একটা সময় আসবে যখন কৃষকরা আর ধান আবাদ করবেন না। এমন আবাদ করার চেয়ে জমি ফেলে রাখাই ভালো। অন্তত নিজের শ্রম, বিনিয়োগ ও বাড়তি টেনশনের বোঝা তো বইতে হবে না।’

কৃষক বেনু রাম সরকার বলেন, ‘গত কয়েক বছর ধরেই  ধানে লোকসান গুনতে হচ্ছে। কিন্তু এবারের অবস্থাটা একেবারেই খারাপ। ধান ভালো হয়েছে, কিন্তু দাম নেই। যেখানে প্রতি মণ ধান উৎপাদনে কৃষকের খরচ হয়েছে ৭০০ থেকে ৭৫০ টাকা, সেখানে বাজারে প্রতি মণ ধানের দাম ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকা।’চালের দাম

তিনি বলেন, ‘অনেক কৃষক ধার-দেনা কিংবা ঋণ করে আবাদ করেছেন। বাধ্য হয়েই তাদেরকে লোকসান দিয়ে কম দামে ধান বিক্রি করতে হচ্ছে।’

এদিকে, ধান কিনে লোকসানের আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা। ধান-চাল ব্যবসায়ী গুলসান আলী বাবু বলেন, ‘ধানের দাম কম হওয়ায় কৃষকরা লোকসান দিচ্ছে, এটা বুঝি। কিন্তু আমরা যারা ব্যবসা করি, তারাও তো ভালো নেই। বাজারে ধানের দাম কম, এর কারণ চালের দাম কম এবং চাহিদাও নেই।’

দিনাজপুর চালকল মালিক গ্রুপের সভাপতি মোসাদ্দেক হুসেন বলেন, ‘বিদেশ থেকে ব্যাপকহারে চাল আমদানির কারণে বাজারে কম দামে চাল বিক্রি করছেন আমদানিকারকরা। এতে বাজারে চালের চাহিদা ও দাম দুটোই কমছে। তাই বেশি দামে ধান কিনে চাল বিক্রি করতে পারছেন না তারা। আমার মতে, কৃষকদের স্বার্থে ও কৃষি অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে এখন আমদানি নয়, বরং দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে চাল রফতানি করা উচিত।’

দিনাজপুরের হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. এটিএম শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘গত কয়েক বছর আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবং বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের কার্যকরী পদক্ষেপে দেশে ধান উৎপাদন অনেক বেড়েছে। এতে বার্ষিক চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি ধান উৎপাদন হচ্ছে। এরপরও প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও বিদেশ থেকে চাল আমদানি করা হচ্ছে। এ কারণে কৃষকরা তাদের উৎপাদিত ধানের ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।’ কৃষকদের ন্যায্য মূল্য প্রদানে এবং কৃষকদের বাঁচাতে যতদিন দেশে অতিরিক্ত ধান উৎপাদন হবে, ততদিন বিদেশ থেকে চাল আমদানি না করার ওপরে গুরুত্বারোপ করেন ড. ইসলাম। আর তা না হলে কৃষি অর্থনীতিতে ধস নামবে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

আরও পড়ুন- যেসব কারণে কমেছে ধানের দাম, বেড়েছে কৃষকের সংকট

 

/এফএস/এপিএইচ/

লাইভ

টপ