ব্রেক্সিট: কিছু প্রশ্ন এবং উত্তর

Send
ফাহমিদা উর্ণি
প্রকাশিত : ১৭:২৪, এপ্রিল ২৪, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:২৪, এপ্রিল ২৪, ২০১৬

আসছে ২৩ জুন যুক্তরাজ্যের ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকা না থাকার প্রশ্নে নিজেদের রায় দেবেন ব্রিটিশ জনগণ। ওইদিন অনুষ্ঠিত গণভোটেই নির্ধারিত হবে ব্রিটেনের পরিণতি। সুরাহা হবে আলোচিত ব্রেক্সিট ইস্যুর। কিন্তু এ ব্রেক্সিট আসলে কী? কিসের প্রেক্ষিতে এ সারসংক্ষেপের উৎপত্তি? কেন ব্রিটিশ নাগরিকদের কেউ কেউ ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছাড়তে চান? কেনইবা আবার সব ব্রিটিশ নাগরিক ইইউ ছাড়তে চান না? এ ব্যাপারে ব্রিটিশ অর্থনীতি বিশ্লেষকদের মত কী? ব্রিটেনের গণভোটকে সামনে রেখে এমন সব প্রশ্ন ওঠাটাই স্বাভাবিক। এই প্রতিবেদনে সেইসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে।

ব্রেক্সিট

 

ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রসঙ্গ

ইউরোপীয় ইউনিয়ন কিংবা ইইউ হলো ২৮টি সদস্য রাষ্ট্রবিশিষ্ট একটি অর্থনৈতিক জোট। কেবল জোটই নয়, বলা চলে এটি মুক্ত-বাণিজ্য অঞ্চলের চেয়েও বেশি কিছু। ইইউ’র জিডিপি ১৮ হাজার বিলিয়ন ডলারের চেয়েও বেশি। প্রতিষ্ঠার পর গত অর্ধ শতকেরও বেশি সময় ধরে ইইউ স্বাতন্ত্র্য বাড়িয়েছে। আলাদা করে গড়ে তুলেছে ইউরোপীয় কমিশন, ইউরোপীয় পার্লামেন্ট, ইউরোপিয়ান কোর্ট অব জাস্টিস। ১৯৭৩ সালের ১ জানুয়ারি যুক্তরাজ্য ইউরোপিয়ান ইকোনমিক কমিউনিটিতে যোগ দেয়। পরে এ কমিউনিটিই ইইউ নামে প্রতিষ্ঠা পায়।

আরও পড়ুন: ‘নিরাপত্তাজনিত কারণে’ মাতৃদুগ্ধ থেকে বঞ্চিত হলো শিশু

 

ব্রেক্সিট কী?

ব্রেক্সিট হলো ব্রিটিশ এক্সিটের সংক্ষেপিত রূপ। অর্থাৎ ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে ব্রিটেনের বের হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তথা এক্সিট বোঝাতে ব্রেক্সিট শব্দটি ব্যবহার করা হয়। শব্দটি অনেকটা গ্রেক্সিটের মতো। গ্রিস ইউরোজোন থেকে ছিটকে পড়তে পারে বলে কয়েক বছর ধরে যে সম্ভাবনার গুঞ্জন চলছিল তা থেকেই গ্রেক্সিট শব্দটি চালু হয়েছিল। সে ধারাবাহিতায় ব্রিটেনের এক্সিট অর্থাৎ ব্রিটেনের ইইউ থেকে বের হয়ে যাওয়ার প্রশ্নে চালু হয় ব্রেক্সিট শব্দটি।

ব্রিটেন ও ইইউ`র পতাকা

 ব্রেক্সিট ইস্যুর প্রেক্ষাপট

 যুক্তরাজ্যে অভিবাসীদের আধিক্য নিয়ে ব্রিটিশ নাগরিকদের মধ্যে এক ধরণের অস্বস্তি রয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিয়ম অনুযায়ী ইইউভুক্ত ২৮টি দেশের নাগরিক ভিসা ছাড়াই এক দেশ থেকে আরেক দেশে প্রবেশ করতে পারে। আর সে কারণে গত মেয়াদে ডেভিড ক্যামেরন সরকার ইইউর বাইরের দেশ থেকে আসা অভিবাসীদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে আনতে সক্ষম হলেও ইইউভুক্ত নাগরিকদের প্রবেশ ঠেকাতে পারেনি। নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী এবারের মেয়াদে ইইউভুক্ত দেশের নাগরিকদের যুক্তরাজ্যে প্রবেশ নিরুৎসাহিত করতে চার বছরের জন্য সুবিধা ভাতা বন্ধ রাখার প্রস্তাব দেন ক্যামেরন। এতে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান ইইউভুক্ত দেশের রাষ্ট্রপ্রধানরা। তাদের দাবি, সদস্য দেশের নাগরিকদের সুবিধা ভাতা প্রদানে বৈষম্য করা হলে তা হবে ইইউর প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্যের সাথে সাংঘর্ষিক।

আর তা নিয়ে যুক্তরাজ্যকে ইইউতে রাখা না রাখার ব্যাপারে প্রশ্ন তৈরি হয়।

আরও পড়ুন: মার্কিন জোটের বিমান হামলায় চারমাসে নিহত মাত্র ২০ বেসামরিক ব্যক্তি!

গণভোট প্রসঙ্গ

ব্রেক্সিট প্রশ্নে ইইউভুক্ত নেতাদের সঙ্গে আলোচনায় অংশ নিয়ে অভিবাসীদের সুবিধা সীমিত করাসহ চারটি সংস্কার প্রস্তাব দেন ক্যামেরন। পরে সে প্রস্তাব নিয়ে ক্যামেরনের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছান ইইউ নেতারা। ইইউ’র সঙ্গে সমঝোতার পর দেশে ফিরে গণভোটের তারিখ ঘোষণা করেন ক্যামেরন। ব্রিটিশ আইন অনুযায়ী, গণভোটের ১৬ সপ্তাহ আগে তারিখ ঘোষণা করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সে হিসেবে ২৩ জুন তারিখটি নির্ধারণ করা হয়। ব্রিটেনের ইইউতে থাকা না থাকার প্রশ্নে দেশটির জনগণই ওই গণভোটে চূড়ান্ত রায় দেবেন। ব্রেক্সিট প্রশ্নে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য তাই ওই গণভোটের রায় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। আর তাই ২৩ জুন হয়ে উঠেছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

 

১৮ কিংবা তার চেয়ে বেশি বয়সী ব্রিটিশ, আইরিশ কিংবা কমনওয়েলথ নাগরিকেরা এ গণভোটে অংশ নিতে পারবেন।  ভোট দিতে পারবেন ১৫ বছরের কম সময় ধরে বিদেশে থাকা ব্রিটিশ নাগরিকরাও।

ইইউতে থাকার পক্ষে ক্যামেরনের উদ্যোগকে ভালোভাবে নিচ্ছেন না খোদ রক্ষণশীলদের (কনজারভেটিভ) অনেকে। তবে লেবার পার্টি শুরু থেকেই ইইউ তে থাকার পক্ষে প্রচার চালাচ্ছে।  লিবারেল ডেমোক্র্যাটস (লিবডেম), এসএনপি এবং গ্রিন পার্টিও চায় যুক্তরাজ্য ইইউতে থাকুক। অপর পক্ষে ইউকেআইপি যুক্তরাজ্যের ইইউতে থাকার ঘোরতর বিরোধী।  

ব্রিটিশ এক্সিটের প্রতিকী ছবি

ব্রিটেন ইইউ থেকে বের হয়ে গেলে পরবর্তীতে কী হতে পারে


ইইউ থেকে বের হয়ে গেলে ব্রিটেনের পরিণতি কী হতে পারে তা নিয়ে দুই ধরনের মতামত রয়েছে।  ইইউবিরোধীদের কেউ কেউ বলছেন, এ জোট থেকে বের হয়ে আসলে ব্রিটেনের একক বাজার তৈরি হবে এবং জনগণ অবাধ চলাচলের সুযোগ পাবে। অন্যদিকে বিরোধীরা বলছেন, এ ধরনের ভাবনা অনেক বেশি কাল্পনিক। তাদের মতে, ইইউ থেকে বের হলে ব্রিটেনকে হয় নরওয়ের মতো ইইউ’র বাজেটে অর্থের যোগান দিয়ে যাওয়া এবং জোটের বিধিনিষেধ বাস্তবায়ন করে যেতে হবে কিংবা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বিধিমালার আওতায় এসে ইইউ’র সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করতে হবে। ব্রেক্সিটের প্রভাব কী হতে পারে তা দুটো বিষয়ের ওপর নির্ভর করছে। তার একটি হলো, ব্রেক্সিটের পর যুক্তরাজ্য ইইউ’র সঙ্গে কেমন ধরনের সম্পর্ক রাখতে চায় এবং অন্যটি হলো ইইউ আদৌ সে ধরনের সম্পর্কে রাজি হবে কিনা। তবে যতটুকু বোঝা যাচ্ছে তাতে ইইউ’র সঙ্গে যুক্তরাজ্যের নরওয়ে ধাঁচের সম্পর্ক রাখার সম্ভাবনা কম। সেক্ষেত্রে তাদের মধ্যে দূরবর্তী সম্পর্ক গড়ে ওঠার সম্ভাবনাই জোরালো হয়ে উঠেছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে যুক্তরাজ্যের বের হওয়া না হওয়া প্রশ্নে গণভোট ২৩ জুন

অর্থনীতি বিশ্লেষকরা কী মনে করেন

ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদদের অনেকেই বিশ্বাস করেন যে ইইউ থেকে বের হয়ে আসাটা যুক্তরাজ্যের অর্থনীতির জন্য খারাপ হবে। ১শ জনেরও বেশি প্রভাবশালী চিন্তাবিদের ওপর ফিনান্সিয়্যাল টাইমসের চালানো জরিপে দেখা গেছে ব্রেক্সিট হলে ২০১৬ সালে যুক্তরাজ্যের প্রবৃদ্ধি বাড়বে না। জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় তিন-চতুর্থাংশ অর্থনীতিবিদ মনে করেন ইইউ থেকে বের হয়ে আসলে বহির্বিশ্বে ব্রিটেনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হবে। মাত্র ৮ শতাংশ মনে করেন ইইউ থেকে আলাদা হলে ব্রিটেন লাভবান হবে। ২০ শতাংশেরও কম অর্থনীতিবিদ মনে করছেন ইইউ ছাড়লে খুব সামান্যই পরিবর্তন ঘটবে।

আরও পড়ুনঃ বিয়ের পাত্রী হিসেবে চীনে পাচার হচ্ছেন ভিয়েতনামের নারী 

ইউরোপীয় ই্উনিয়নে যুক্তরাজ্যের থাকা না থাকার প্রশ্নে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া গণভোটকে সামনে রেখে চলছে 'ভোট লিভ' এবং 'কনজারভেটিভস ফর ব্রিটেন' নামে আলাদা দুটি ক্যাম্পেইন। 'ভোট লিভ'ক্যাম্পেইনটি চালাচ্ছে যুক্তরাজ্যের স্বাধীন ধারার বেশ কয়েকটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান। আর 'কনজারভেটিভস ফর ব্রিটেন' ক্যাম্পেইনটি চালাচ্ছেন ইইউবিরোধী টোরি রক্ষণশীল নেতারা,যারা ক্যামেরনের দলেরই লোক। তবে ক্যামেরন সরকারের বেশ কয়েকজন মন্ত্রী ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকার পক্ষে সম্মতি জানালেও অনেকেই আবার ক্যামেরনের বিপক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছেন। লন্ডনের মেয়র বরিস জনসনও চান যুক্তরাজ্য ইইউ থেকে বেরিয়ে আসুক। শেষ পর্যন্ত কাদের জয় হয় তা দেখার জন্য ২৩ জুন পর্যন্ত অপেক্ষার পালা। সূত্র: ফিনান্সিয়াল টাইমস, গার্ডিয়ান, বিবিসি

/এফইউ/বিএ/

লাইভ

টপ