বিয়ের পাত্রী হিসেবে চীনে পাচার হচ্ছেন ভিয়েতনামের নারী

Send
বিদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত : ১৪:৫২, এপ্রিল ১৯, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:০৩, এপ্রিল ১৯, ২০১৬

‘আমি জানতাম না, যেখানে আমার ঘুম ভেঙ্গেছে সেই জায়গাটা চীন।’ লেন(ছদ্মনাম) নামের এক ভিয়েতনামি নারী এভাবেই সেই রাতের বর্ণনা দেন যে রাতে তার জীবন পুরোপুরি বদলে যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন লেন। সে সময় অনলাইনে পরিচয় হওয়া এক বন্ধুর আমন্ত্রণে অন্যান্য বন্ধুদের সঙ্গে নৈশভোজে যোগ দিয়ে লেন পাচার হয়ে যান চীনে।

‘আমি ছাড়াও সেখানে আরও তিনটি মেয়ে ছিল। আমাদের পাহারা দিয়ে রাখার জন্যও লোক ছিল যেন আমরা কেউ পালিয়ে যেতে না পারি।’  বলেন লেন।

ওইখানে থেকেই লেন জানতে পারেন তাকে চীনে পাচার করে দেওয়া হয়েছে। ভিয়েতনাম-চীন সীমান্তের কাছের গ্রামগুলো ভিয়েতনাম থেকে নারী পাচারের এক একটি কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কাজ করে। এখান থেকে এমনকি ১৩ বছরের মেয়েদেরও কৌশলে অথবা জোরপূর্বক চীনে পাচার করে দেওয়া হয়। পাচারের জন্য ব্যবহৃত হয় নৌকা, মোটরবাইক অথবা গাড়ি। চীনে ভিয়েতনামের মেয়েদের ব্যাপক চাহিদা। কেননা চীনে এক সন্তান নীতি ও পুত্র সন্তানের চাহিদা নারী-পুরুষের আনুপাতিক হার বদলে দিয়েছে। এক পর্যায়ে দেশটিতে নারীর সংখ্যা কমে যায়। সহজভাবে বললে, চীনা পুরুষরা বিয়ের কনের জন্য বুভুক্ষ হয়ে থাকেন।

আরও পড়ুনঃ কলকাতায় নারী শিক্ষার্থীকে যৌন হয়রানি, অভিযোগ গ্রহণে পুলিশের গাফিলতি 

ভিয়েতনামে জাতিসংঘের পাচার-বিরোধী বিভাগের সমন্বয়ক হা থি ভ্যান খান বলেন, ‘সাধারণ একজন চীনা পুরুষের চীনা একজন নারীকে বিয়ে করতে হলে, বেশ বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতে হয়। স্ত্রীকে উপহারসামগ্রী ছাড়াও বিয়ের পর বসত করার জন্য একটি বাড়ি কিনে দেওয়া চীনের ঐতিহ্যের মধ্যে পড়ে। ফলে তারা পাশের দেশ থেকে কম খরচে বউ পেতে চায়।

ভিয়েতনামের পাচার বিরোধী সংস্থা প্যাসিফিক লিঙ্কস ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা দিপ ভং জানান, ৩ হাজার টাকায় ভিয়েতনামের মেয়ে কিনে ফেলা যায়, চীনের সঙ্গে ভিয়েতনামের সাংস্কৃতিক সাদৃশ্যও চীনা পুরুষদের ভিয়েতনামের মেয়েদের প্রতি আকৃষ্ট করে।

আরও পড়ুনঃ ভারতে গোপন শিশুসদন, অনাকাঙ্ক্ষিত শিশুর বাজার

নগুয়েনকে(ছদ্মনাম) যখন তার প্রেমিক ভিয়েতনাম থেকে পাচার করে চীনে বিক্রি করে দেয়, তখন তার বয়স ছিল মাত্র ১৬। প্রথমদিকে জোরপূর্বক এই বিবাহ মেনে নেননি তিনি। বিদ্রোহ করলে তাকে শারীরিক আঘাত, খাদ্যপানীয় থেকে বঞ্চিত করা, এমনকি হত্যারও হুমকি দেওয়া হয়। নগুয়েন এখন ধাতস্থ হয়ে গেছেন। তার স্বামীও পরের দিকে তার প্রতি সহৃদয় ব্যবহার করতেন কিন্তু ভিয়েতনামে ফেলে আসা পরিবারের জন্য সবসময়ই তার মন কাঁদতো।

160413153240-vietnam-china-child-trafficking-escaped-exlarge-169

দ্য প্যাসিফিক লিঙ্কস ফাউন্ডেশন এই পাচারকৃত মেয়েদের জন্য লাও চাই অঞ্চলে একটি আশ্রয়কেন্দ্র পরিচালনা করে থাকে।সেখানে তাদের শিক্ষা, নানা রকম প্রশিক্ষণ, আর্ট থেরাপি, বাগান করা ইত্যাদির ব্যবস্থা রয়েছে। একই রকম তিক্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে আসা এই নারীদের নিজের পায়ে দাঁড়ানোর ব্যবস্থা করে এই ফাউন্ডেশন।

160412145634-cfp-vietnam-stories-exlarge-169

এ ছাড়াও ভিয়েতনামের মেয়েদের পাচারকারীর কবল থেকে বাঁচানোর জন্য প্রচারণাও চালায় এই সংগঠন। মাসে একদিন আশ্রয়কেন্দ্রের মেয়েরা বাক হা নামের একটি স্থানীয় বাজারে যায়, সেখানে তারা নিজেদের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন।

দিপ বলেন, ‘আমি মনে করি, সচেতনতাই পাচার ঠেকানোর একমাত্র উপায়।’

ভিয়েতনাম পুলিশ অনেক সময়ই চীনা পুলিশের সহায়তায় পাচার প্রতিরোধে কাজ করে। ভিয়েতনাম সরকারের সোশ্যাল ভাইস প্রিভেনশন ডিপার্টমেন্টের প্রধান নগুয়েন টুওং লং জানান, গত বছর মোট ১১৯ জন পাচারকৃত মেয়েকে উদ্ধার করে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়।

তিনি জানান, ভিয়েতনাম ও চীনের পুলিশ মিলে একটি পাচারকারী চক্রকেও ধরতে পেরেছিলো। তারা ভিয়েতনামের মেয়েদের নিয়ে চীনের বেশ্যাপল্লীতে বিক্রি করে দিতো, সেখানে ওই মেয়েদের জোরপূর্বক যৌনকর্মী হিসেবে কাজ করানো হতো।

লেন এবং নগুয়েনের পরিচয় হয় চীনের একটি শহরে। সেখানেই তারা মিলিত চেষ্টায় পালিয়ে আসতে সক্ষম হন। তারা জানান, স্কুলে পড়ার সময় শিক্ষকরা অনেক সময় তাদের নারী পাচার সম্পর্কে সাবধানবাণী শুনিয়েছিলেন। কিন্তু তারা কেউই বিশ্বাস করেননি এমনটা তাদের জীবনেও ঘটতে পারে।

 

সূত্র: সিএনএন

/ইউআর/     

লাইভ

টপ