প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যে ঘেরা সোনার চর

Send
রাজিব বসু, পটুয়াখালী
প্রকাশিত : ১৭:৩৭, ফেব্রুয়ারি ০৯, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:৪০, ফেব্রুয়ারি ০৯, ২০১৯

সোনার চর সৈকতে অতিথি পাখিপটুয়াখালী থেকে ১০০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্ব কোণে বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষে রাঙ্গাবালী উপজেলায় রয়েছে অপরূপ সোনার চর। ‘সাগরকন্যা’ কুয়াকাটা থেকে ৩০ কিলোমিটার পূর্ব-দক্ষিণে এটি অবস্থিত। বৈচিত্র্যময় প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগের জন্য এই চরে প্রতিদিন ভ্রমণপিপাসুরা ভিড় করেন। এখানে রয়েছে গাছপালা, বন্য পশু-পাখি ও অপরূপ সৈকত। এছাড়া বনের মধ্য দিয়ে বয়ে গেছে ছোট-বড় অসংখ্য খাল। সবই পর্যটকদের মন কাড়ে।

সোনার চরে বিস্তীর্ণ বনভূমির পাশাপাশি রয়েছে ১০ কিলোমিটার দীর্ঘ সমুদ্র সৈকত। নদী আর সাগরের জল আছড়ে পড়ে চারপাশে। সূর্যের আলোয় চিকচিক করে বালি। কেওড়া, গেওরা, সুন্দরী, গোলপাতা, বাইন, পশুর, ঝাউসহ বিভিন্ন প্রজাতির বৃক্ষের সমাহার রয়েছে এখানে। কান পাতলে ঝাউবাগানের ভেতরে বয়ে চলা বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ শোনা যায়। শেষ বিকালে মনোরম সৈকতে শুরু হয় লাল কাঁকড়ার ছোটাছুটি। এছাড়া দ্বীপটিতে রয়েছে বহু প্রজাতির বন্যপ্রাণী। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য বানর, খেঁকশিয়াল, উদবিড়াল, বেজী, বাঘডাসা, সাপ, কচ্ছপ।

সোনার চর সৈকতের পাশেই জেগে উঠেছে বিস্তীর্ণ চরসকাল-দুপুর-বিকাল পাখির কলরবে মুখর থাকে পুরো চর। বিশেষ করে শীত মৌসুমে ১০ লক্ষাধিক অতিথি পাখির সমাগম ঘটে এখানে। গাঙচিল, গাঙকবুতর, বালিহাঁস, পাতিহাঁস, সাইবেরিয়ান লাল হাঁস, পানকৌড়ি, বক, মদনটাক উড়ে বেড়ায় এখানে-সেখানে। অতিথি পাখির কলরব আর সাগরের ঢেউয়ের গর্জনে মুখর হয়ে ওঠে সোনার চরের প্রাকৃতিক পরিবেশ।

সোনার চরের একটি সরু খাললোকমুখে শোনা যায়, সূর্যের আলোয় প্রতিটি বালুকনা সোনার মতো দেখায় বলে এর নামকরণ হয়েছে ‘সোনার চর’। যদিও কবে চরটি জেগে ওঠে সেই সঠিক তথ্য কারও জানা নেই। পটুয়াখালী উপকূলীয় বন বিভাগ সূত্র জানায়, ২০১২ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি সংরক্ষিত এই বনভূমি বন্যপ্রাণী বিচরণের অভয়ারণ্য ঘোষণা করে সরকার। এর মোট আয়তন ৬ হাজার একর (৯.৩৮ বর্গমাইল)।

সোনার চরে প্রকৃতির বৈচিত্র্যময় পরিবেশ উপভোগ করেন দূর-দূরান্ত থেকে আসা পর্যটকরা। শেষ বিকালে সূর্যের রক্তিম আলো সৈকতে এসে পড়লে মনোরম দৃশ্যের দেখা মেলে এখানে। বনের আশেপাশে মাছ শিকার করেন শতাধিক জেলে। এখানে চিংড়ি, ছুড়ি, লইট্টা, ফাইস্যা, বৈরাগী, রামচোচ, কোরাল, পোমা, মেদ, টেংরা, গুলিশা, শাপলাপাতাসহ সামুদ্রিক মাছ পাওয়া যায়।

সোনার চরের সৈকতে উড়ছে অতিথি পাখিতবে সোনার চরের বিট অফিসার প্রণব কুমার মিত্র বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, এখানে রাতে পর্যটকদের থাকার মতো কোনও ব্যবস্থা নেই। তাই ইচ্ছে থাকলেও দিনের বেলা ছাড়া এখানে থাকতে পারেন না পর্যটকরা। তারা দিনে এসে আবার ফিরে যায়। এ কারণে রাতের সৌন্দর্য অধরাই রয়ে গেছে তাদের। এছাড়া খাওয়ার কোনও সুব্যবস্থা নেই।

চরে বন বিভাগের একটি বিট অফিস আছে। চর মোন্তাজের ফরেস্ট রেঞ্জার অমিতাভ বসু বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, সোনার চর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত জনবলের সংকট রয়েছে। এখানে বিট অফিসারসহ মাত্র ছয়জন বনরক্ষক নিয়োজিত আছেন। তিনি জানান, ছয় মাস আগে ঢাকা থেকে চর মোন্তাজে একটি লঞ্চ সার্ভিস চালু হয়েছিল। কিন্তু সেটি একমাস যাতায়াতের পর বন্ধ হয়ে যায়। পুনরায় লঞ্চটি চালু হলে চরে পর্যটকের সংখ্যা বাড়তো বলে মনে করেন তিনি।

সোনার চর থেকে দেখা সন্ধ্যার সৌন্দর্যপটুয়াখালী উপকূলীয় বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. আমিনুল ইসলাম জানান, সোনার চরে আসার ক্ষেত্রে নদী বা সমুদ্রই হচ্ছে যাতায়াতের একমাত্র উপায়। পর্যটকরা ট্রলার বা স্পিডবোট নিয়ে আসে। কিন্তু এখানে কোনও জেটি নাই। তাই পর্যটকদের সুবিধার্থে জেটি প্রয়োজন। বনে পায়ে হাঁটার জন্য ফুটরেল নির্মাণ দরকার। পাশাপাশি পর্যটকদের জন্য প্রয়োজন যাত্রী ছাউনি।

সোনার চরের বিস্তীর্ণ বনভূমিএই বন কর্মকর্তা আরও জানিয়েছেন, সোনার চরে এলজিইডি বিশ্রামাগার, পাবলিক টয়লেট, পায়ে হাঁটার পথ ও হেলিকপ্টার নামার জন্য হেলিপ্যাড নির্মাণ করা হয়েছিল। সমুদ্রের ঢেউয়ের কারণে অব্যাহত ভাঙনে সেগুলো ভেঙে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।

কাঙ্ক্ষিত সেবা আর যাতায়াত সমস্যার কারণে এখনও পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয় হয়নি বৈচিত্র্যময় প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এই লীলাভূমি। সংশ্লিষ্টদের আশা, সরকারি ও বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হলে সোনার চর হয়ে ওঠতে পারে বিশ্বমানের পর্যটন কেন্দ্র।

সোনার চরের সৈকতে পাখিদের মিলনমেলাযেভাবে যাবেন
রাঙ্গাবালী উপজেলা সদর থেকে দুই কিলোমিটার পথ পেরিয়ে গহিনখালী লঞ্চঘাট। সেখান থেকে লঞ্চযোগে প্রায় একঘণ্টার নৌ-পথ পাড়ি দিয়ে চর মোন্তাজ ইউনিয়ন। চর মোন্তাজ থেকে ট্রলারযোগে প্রায় আরও একঘণ্টার পথ পেরোলে দেখা মেলে সোনার চরের।

/জেএইচ/
টপ