লেখকের দায় ও সার্ত্রের রায়

Send
বিধান রিবেরু
প্রকাশিত : ০৬:০০, সেপ্টেম্বর ০২, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ০৬:০০, সেপ্টেম্বর ০২, ২০১৮

লেখক কেন লিখবেন? কার জন্য লিখবেন? লেখালেখির বিষয়টাই বা কি হবে? কেন হবে? কোন দায়বদ্ধতা থেকে হবে? ইত্যকার প্রশ্নের উত্তর মাথায় নিয়ে লেখক লিখতে বসেন না, তবে লেখক যখন লিখতে বসেন, তখন যদি তার নিজের সময়কে, সমকালকে মাথায় ধারণ করে না লিখতে পারেন, তাহলে তার সকল লেখালেখি আস্তাকুড়ে নিক্ষেপিত হতে পারে। উল্লিখিত প্রশ্নমালার উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছিলেন ফরাসি দার্শনিক ও লেখক জঁ পল সার্ত্রে। আমরা সার্ত্রের চিন্তার সাথেই মিলিয়ে দেখে নিতে চাই বর্তমান বাংলাদেশের লেখকদের অবস্থা।

এই রচনাটি এমন এক সময়ে লিখছি, যখন নানা মাত্রার সঙ্কটের ভেতর দিয়ে দেশের মানুষ সময় পার করছে। বিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় সকল জায়গাতেই অসন্তোষ ও আন্দোলন। সেই আন্দোলন প্রায়ই রাজপথ কাঁপিয়ে দিচ্ছে। ধর্ষণ, গুম, খুন থেকে শুরু করে ‘ক্রসফায়ার’—এ যেন এক ভয়াল সময় প্রত্যক্ষ করছে সবাই। সাধারণ নাগরিকদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে রাষ্ট্র। সমাজেও বাড়ছে অন্যায়, অবিচার ও বৈষম্য। বলতে গেলে নানা স্তরেই ক্ষমতাবানদের দ্বারা নিপীড়ন ও নিষ্পেষণের শিকার হচ্ছে দুর্বলেরা। অন্যদিকে সরকারি ও বেসরকারী ব্যাংকে ঋণের নামে চলছে লুটপাটের মহোৎসব। মোদ্দা কথা ক্ষমতাবান ও এলিটরা জোট বেধে যেভাবে পারছে নিংড়ে শুষে নিচ্ছে নিচুশ্রেণীর মানুষের শ্রম, ঘাম ও স্বপ্ন।

বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থা পুনরায় বিভিন্ন ঘটনা বলে মনে করিয়ে দেয়ার দরকার নেই। তো এই পরিস্থিতিতে একটি দেশের লেখকের ভূমিকা কেমন হবে? তিনি কি শুধু ফুল-পাখি-লতাপাতা নিয়েই ব্যস্ত সময় পার করবেন? শুধু ঈদ সংখ্যায় লিখে প্রাপ্ত অর্থই হবে তার ঈপ্সিত বস্তু? সমাজের সঙ্কটকে এড়িয়ে গিয়ে লেখক মূলত কার পক্ষে নিজেকে সাব্যস্ত করবেন? রাষ্ট্রের বিশাল অংশ যখন শুধু নির্বাচন নামের স্বাধীনতা ছাড়া (সেটাও এখন কেড়ে নেয়া হয়), আর কোন স্বাধীনতা বা মুক্তির স্বাদ পায় না, সেখানে লেখক কি করে একা একা মুক্ত থাকেন? বা মুক্তবুদ্ধির লেখক হন?

মুক্তবুদ্ধির লেখক বলতে আমি বুঝি যিনি মানুষের বুদ্ধির মুক্তির জন্য লেখালেখি করেন। একা একা তো মুক্ত হয়ে বুদ্ধিচর্চা করা যায় না। সার্ত্রে যেমনটা বলেন, মানুষের মুক্তি নির্ভর করে অন্যদের মুক্তির উপর। সমাজ থেকে যদি শোষণ ও বঞ্চনা বিদায় হয়, তাহলে সমাজে বসবাসকারী লেখকও মুক্তির স্বাদ পান। এখানেই লেখককে সার্ত্রে কর্তব্য ও ন্যয়পরায়ণতা, সামাজিক মানবিকতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেন। সার্ত্রে বলছেন—

‘…লেখকের স্বাধীনতা বোঝা যায় নাগরিকদের স্বাধীনতার ভেতর দিয়ে। কেউ তো ভৃত্যদের জন্য লেখেন না। গদ্য শিল্পটা একটি শাসনব্যবস্থার সাথেই খাপ খাওয়াতে পারে—গণতন্ত্র— যেখানে ‘গদ্য’ অর্থ বহন করে। যখন কেউ হুমকিপ্রাপ্ত, তখন অন্যকেও সেটা দেয়া হয়। আর কলম দিয়ে এসবের দমন করতে যাওয়া যথেষ্ট নয়। এমন এক দিন আসবে যখন কলমকে বলপ্রয়োগ করে থামিয়ে দেয়া হবে, তখন লেখককে অবশ্যই অস্ত্র হাতে তুলে নিতে হবে। এভাবে হয় তো আপনাকে একটা জায়গায় পৌঁছুতে হয়, যে মতই আপনি দেন না কেন, সাহিত্য আপনাকে একটা যুদ্ধের মধ্যে ঠেলে দেবে। লেখালেখি হলো স্বাধীনতা চাওয়ার একটি পন্থা; একবার আপনি লেখালেখি শুরু করেছেন তো বাধ্যতামূলকভাবে তা চালিয়ে যেতে হবে, আপনি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়ে পড়বেন।’ (সার্ত্রে ২০০৯: ৪৯)

সার্ত্রে এরপর লেখককে প্রশ্ন করছেন, প্রতিজ্ঞা কিসের জন্য? প্রতিদিনকার স্বাধীনতা রক্ষার জন্যই এই প্রতিজ্ঞা, রাজনৈতিক ও সামাজিক লড়াইয়ের মধ্য দিয়েই এই প্রতিজ্ঞা জারি রাখতে হয়। এর মাধ্যমেই বৃহৎ গোষ্ঠীর সঙ্গে লেখক যুক্ত হতে পারেন, পাঠকদের যুক্ত করতে পারেন। সার্ত্রের যুক্তি খুব পরিষ্কার— একটি নির্দিষ্ট সমাজ ব্যবস্থায় ছিটকে পড়া মানুষ বা পাঠককে আবার যুক্ত করার মধ্য দিয়ে মুক্ত করার রসদ সাহিত্যের মধ্যেই নিহিত থাকে, আর ওরকম মাপের সাহিত্য তৈরি করতে পারেন একজন দায়িত্বশীল লেখকই। আর অন্যকে যুক্ত ও মুক্ত করার প্রক্রিয়ায় প্রকৃত প্রস্তাবে লেখক নিজেও মুক্ত হন। সার্ত্রে মনে করেন, ‘সাহিত্য তখনই বিযুক্ত হয়ে পড়ে যখন নিজের স্বায়ত্তশাসনের অধিকার সম্পর্কে খোদ সাহিত্যই আত্মভোলা হয় বা এড়িয়ে যায় এবং যখন সাহিত্য কালিক ক্ষমতা, মতবাদ ও আধ্যাত্মবাদের পক্ষে ওকালতি শুরু করে’।

সাহিত্যকে বৃহৎ জনগোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত করতে লেখকের কর্তব্য হলো সমাজের জাড্য, অজ্ঞানতা, কুসংস্কার ও মিথ্যা আবেগকে দূর করা। লেখক যে আবার তার লেখার মধ্য দিয়ে চৈতন্যের পরিপূর্ণ স্বাধীনতার মওকা দেন তাও কিন্তু নয়। একেকজন লেখক একেকরকম স্বাধীনতার পক্ষে কাজ করেন। এটা নির্ভর করে নির্দিষ্ট স্থান-কাল-পাত্রের উপর। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে সক্রিয় লেখকদের লেখনী আর স্বাধীন বাংলাদেশে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে লেখালেখির ধরন দুই ধরনের। দুই ধরনের মুক্তির বারতা প্রচার করেছেন লেখকরা। আবার ঠিক এই মুহূর্তে যে দুই একজন শক্ত হাতে লিখে চলেছেন তাদের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা আগের লেখকদের চেয়ে স্বভাবতই ভিন্ন প্রকৃতির।  

প্রশ্ন হলো বাংলাদেশের মতো একটি বুর্জোয়া রাষ্ট্রে একজন লেখক কি নিয়ে কাজ করেন? বা বর্তমানে তার আকাঙ্ক্ষিত মুক্তির ধরনটাই বা কেমন হওয়া প্রয়োজন? যদি তিনি সংবেদনশীল হন, যদি তিনি সামাজিক বৈষম্য ও বিচারহীনতা দেখে শক্ত হাতে কলম ধরেন এবং সেটা অবশ্যই মজলুমদের পক্ষে যায়, তাহলে বলা যায় লেখক বুর্জোয়া হলেও, তার পক্ষপাতিত্ব থাকে বিপরীত পক্ষের দিকে। লেখকের দায়টাই এমন। তিনি যে সমাজেই অবস্থান করুন না কেন, তার অবস্থান শেষ পর্যন্ত গেঁড়াকলে পড়া বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর পক্ষেই যাবে, যদি তিনি সৎ হন। তাই, সার্ত্রে বলছেন,

‘… লেখক হলেন শাসক উচ্চশ্রেণীর উপর নির্ভরশীল। কিন্তু কার্যত তিনি অবস্থান নেন বিপরীতে, তাদের পক্ষে, যারা তাকে বাঁচিয়ে রাখে”। (সার্ত্রে ২০০৯: ৬২)

কথা হলো বাংলাদেশের কজন লেখক গণচাঁদা তুলে জীবন যাপন করেন, বলতে গেলে একজনও নন। তাহলে বলা যায়, বুর্জোয়া সমাজের নানা সুযোগ সুবিধা নিয়েই লেখকরা লেখালেখি করেন এখানে। তাদের কতজন লাগাতারভাবে সমাজের অসঙ্গতি ও অন্যায় নিয়ে নিপীড়িত, নিষ্পেষিত মানুষের পক্ষে লিখে চলেছেন? সাহিত্যের সবগুলো মাধ্যমে? বিশেষ করে যদি বলি, সরকারি ও বেসরকারি পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখকরা? অথবা বুর্জোয়া প্রতিষ্ঠানে অর্থের বিনিময়ে লেখা লেখকরা? লেখক সম্প্রদায় তো নিজেরাই দাবি করেন, তারা সমাজের অগ্রগামী মানুষ, তাহলে ভ্যানগার্ড হিসেবে তো তাদের দায়দায়িত্ব থাকার কথা। সেটা তো দেখা যাচ্ছে না। বুর্জোয়া লেখকেরও তো মানবিক দায় থাকতে হয়, নৈতিকতার তাড়া থাকতে হয়। বর্তমানে ফেসবুক এসে বোধহয় এই দায়িত্বের আরো বারোটা বাজিয়েছে। আবার উল্টোটাও করেছে— অর্থাৎ উপকারও করেছে। ক্ষতি যেটা করেছে সেটা হলো, কোন কোন লেখক চলমান সঙ্কট নিয়ে দুই এক লাইনের মন্তব্য করে দিয়ে দায়িত্ব শেষ মনে করছেন। তারা সত্যের পক্ষে লেখা চালিয়ে যাওয়াটাকে আর চলমান প্রক্রিয়ার অংশ মনে করছেন না। অন্যদিকে এই লেখকরা যে সমস্যা এড়িয়ে গিয়ে, উটপাখির মতো শাসক এলিট শ্রেণীর সুবিধার বালিতে চোখ বুজে থাকতে চান, অথবা ক্ষমতার পদলেহন করতেই বেশি আগ্রহী, সেটাও প্রকাশ্যে আসতে পেরেছে এই ফেসবুকের কল্যাণেই।

এখন সাহিত্য কি ‘ঘুম পাড়ানি মাসি পিসি’ ধরনের হবে, যা পড়ে লোকে আয়েশে চোখ বুজে ফেলবে, নাকি সাহিত্য হবে অস্বস্তির উদ্রেককারী? পাঠককে বেচইন করে দেয়াই তো সাহিত্য তথা লেখকের কাজ হওয়ার কথা। সেই বেচইন-করা লেখা কোথায়? যখন দেশে ছাত্রদের আন্দোলন কর্মসূচীতে ক্ষমতাসীন দলের ক্যাডাররা হামলা চালাচ্ছে, সরকারী বাহিনী রাতদুপুরে আন্দোলনকারীদের বাসা থেকে ঘুম থেকে তুলে নিয়ে যাচ্ছে, দেশের প্রথিতযশা কথাসাহিত্যিকরা তখন দেখি ফুটবল বিশ্বকাপ নিয়ে কলাম লিখছেন। ইতালির বিপ্লবী চিন্তাবিদ আন্তোনিও গ্রামশির ভাষায় হয় তো এদের বলা যাবে ‘আপনকার বুদ্ধিজীবী’ বা অর্গানিক ইন্টেলেকচুয়াল। কিন্তু আমাদের সন্ধানে ট্র্যাডিশনাল বা ‘পর বুদ্ধিজীবী’ আছে কি? যে পরের জন্য, বিশেষ করে পর্যুদস্ত পরের জন্য লিখবেন, পর-করণ বা পরকীয়া বা এলিয়েনেশন ঠেকাবেন, নিজের ও অপরের? যে নিজের যতটুকু স্বাধীনতা আছে ততটুকু অন্তত কাজে লাগাবেন? সার্ত্রের চিন্তায় নিজের সাথে অপরের যতটুকু স্বীকৃত দূরত্ব সেটাতেই বিরাজ করে নিজের সায়ত্তশাসন, সচেতনভাবে কর্মঠ হয়ে ওঠার স্বাধীনতা।

এখন স্বাধীনভাবে লেখালেখি করতে গিয়ে যেন রচনার বিষয়বস্তু নিষ্ফলা অন্ধ মতবাদে পর্যবসিত না হয় সেদিকেও লক্ষ্য রাখতে হবে। সম্ভাব্য স্বাধীন পাঠকের প্রতি লিখে, লেখকের নিজে স্বাধীন হওয়ার এই প্রক্রিয়াটি দ্বান্দ্বিক ও পরিপূরক। লেখক যখন লিখছেন তিনি তখন সকলে পড়বে বলেই লিখে থাকেন, কিন্তু বাস্তবতা হলো সকলে সেই লেখা পড়ে ওঠেন না। তবে যারা পড়ে ওঠেন, তারা লেখকের প্রতি অনুরক্ত হন বা হন না। তাই বলে লেখক লেখালেখি বন্ধ করে দেন না। নানা মাত্রার ঝুঁকি লেখককে নিতেই হয়। পাঠকের সমাদর না পাওয়া, শাসকের কোপানলে পড়া, প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীর রোষানলে পড়া সহ বিবিধ ঝুঁকি নিয়েই লেখকের সত্য কথা বলতে হয়। সাদাকে সাদা বলাই লেখকের কাজ, শত ঝুঁকি থাকলেও। সার্ত্রে বলছেন,

‘লেখকের কাজ হলো তাসের ইশকাপনকে ইশকাপন বলা। যদি শব্দগুলো অসুস্থ হয়, সেটা আমাদের দায়িত্ব ওগুলোকে সুস্থ করে তোলা। সেটার বদলে অনেক লেখক এই অসুস্থতার সঙ্গেই দিন গুজরান করেন। অনেকাংশেই আধুনিক সাহিত্য শব্দের কর্কটরোগে আক্রান্ত।’ (সার্ত্রে ২০০৯: ২১৯)

ভনিতা না করে একটি শব্দকে ঋজুতার সাথে ব্যবহার করা, মূল বক্তব্যকে ধোঁয়াশার ভেতর না রাখা এবং সর্বোপরী রচনার ভেতর পরাবাস্তব পরিস্থিতির সৃষ্টি না করার পক্ষে মত দেন সার্ত্রে। এর কারণ, সার্ত্রে মনে করেন, একজন পাঠকের উপর সরাসরি প্রভাব বিস্তার করতে পারার মধ্যেই একজন লেখকের শক্তি নিহিত থাকে। অযথা শব্দ ও বাক্যের তীর দিয়ে পাঠককে দ্বিধাগ্রস্ত বা পীড়িত করা লেখকের কাজ নয়। বরং সঙ্কটাপন্ন কাল থেকে তার ভেতর যে ক্রোধ ও উদ্যম জমা হয়, সেটাকে সরাসরি লেখায় রূপান্তর করাই লেখকের ধর্ম হওয়া উচিত। কিন্তু সেই ক্রোধ ও উদ্যম জমা হচ্ছে কি বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠিত লেখকদের ভেতর? কবি কি শুধু কবিতাই লিখে প্রতিবাদ করবেন? গদ্যের শক্তিকে কাজে লাগাবেন না? গল্পকার কি শুধু ইশারা-ইঙ্গিতে গল্পই লিখে যাবেন? সরাসরি বলবার সাহস সঞ্চয় করবেন না? একজন পাঠকও যখন লেখকের লেখা পড়ছেন, তখন তার হয়ে কথা বলার দায়িত্ব লেখকের কাঁধেই বর্তায়। কিন্তু সুনিপুণ কায়দায় সেই দায়িত্ব এড়িয়ে যেতেই দেখছি বাংলাদেশী লেখকদের।  

প্রত্যেক সমাজেই সময়ের দাবি কোন কোন লেখক ধারালো লেখনীর মাধ্যমে মেটান, আবার কখনো বা এড়িয়ে যান, আঁতাত করেন শাসকদের সঙ্গে, আবার কখনো হয় তো লেখক ধরতেই পারেন না সময়ের দাবী কোনটি। মোটা দাগে অনেকে কলাকৈবল্যবাদী হয়ে ওঠেন, অনেকে নিপীড়িত মানুষের কাতারে নিজেকে প্রতিস্থাপিত করেন। সার্ত্রে মনে করেন, কলাকৈবল্যবাদ আসলে বুর্জোয়াদের মদত পাওয়া ঘুরপথের এক রণকৌশল। এই কৌশলের কারণে বুর্জোয়ারা নিজেদের উপস্থাপন ভিন্নভাবে করতে পারে, নিজেদের শোষণের চিত্রটা লুকোতে পারে। মানে তারা কলাকৈবল্যবাদকে উৎসাহ দিলে, বেশি হলে ‘সঙ্কীর্ণমনা’ গালিখানা শুনতে হবে, কিন্তু ‘শোষক’ কদাচ নয়। এখন এই সঙ্কীর্ণমনাদের সাহিত্য কলাকৈবল্যবাদের পথ ধরে নান্দনিকভাবে যত সূক্ষ্ম ও অন্তর্মুখী হবে ততই আসলে লাভবান হবে বুর্জোয়ারা, সেই সাহিত্য ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাবে সর্বহারাদের। সাহিত্য রচনা ও শ্রেণীর প্রশ্নে এহেন আলাপ অবশ্য সার্ত্রের আগে লিওঁ ট্রটস্কি ‘সাহিত্য ও বিপ্লব’ বইতে করেছেন।

প্রতীকাশ্রয়ী (Symbolist) বা পরাবাস্তববাদী (Surrealist) লেখকদের প্রসঙ্গে তাই সার্ত্রের অভিযোগ, এরা আত্মার বিপ্লব ঘটানোর কথা বলেছেন ঠিকই, কিন্তু সমাজের কাঠামো পরিবর্তনে এরা কোন ভূমিকা রাখেননি। এখানে সার্ত্রে যেন প্রতিধ্বনি করছেন কার্ল মার্কসের চিন্তাকে: দার্শনিকরা দুনিয়াকে শুধু ব্যাখ্যাই করেছেন, কিন্তু এখন দরকার দুনিয়াকে বদলে ফেলা।

সার্ত্রে বলছেন, লেখককে এগোতে হবে কর্মপরিকল্পনা বা অনুশীলনে মধ্য দিয়ে, মার্কসের ভাবনায় যা প্র্যাক্সিস (Praxis)। শুধুমাত্র তত্ত্ব নয়, তত্ত্বের আলোকে সৃজনশীলতা দিয়ে কোন পরিকল্পনাকে এগিয়ে নেয়া, নিজের জীবনে সেটা চর্চার ভেতর আনাকেই মার্কস নাম দিয়েছিলেন প্র্যাক্সিস। সাহিত্য সার্ত্রের মতে একটি সামাজিক কর্ম, এই কর্মটি অনুশীলন তথা প্র্যাক্সিসের ভেতর দিয়ে হবে সেটাই কাম্য সার্ত্রের কাছে। সমকালের চেতনার সৎ প্রতিফলনই সাহিত্যে দেখতে চান সার্ত্রে। শুদ্ধ সাহিত্যচর্চা নয়, জীবনাচরণের ভেতর দিয়েও ন্যায়ের প্রতি, সত্যের পক্ষে চর্চা চালিয়ে যাওয়ার কথা বলেন সার্ত্রে।

লেখালেখির উদ্দেশ্য লিখে জীবনধারণ করা নয়। আবার ভাবকল্পের জন্য জীবন থেকে পালিয়ে যাওয়া বা দুনিয়াবি ফুল-পাখি-লতা-পাতা ভাবাও নয়।সার্ত্রে আরো যোগ করছেন, লেখালেখি অচেনা ও অখ্যাত শব্দের তরবারি দিয়ে পেছন থেকে ব্যবহার করে পাঠককে রক্তাক্ত করাও নয়। সার্ত্রে বলছেন,

‘এটা হলো একটি পেশার চর্চা। এটি এমন এক পেশা যাতে শিক্ষানবিসি করতে হয়, টেকসই কাজ করতে হয়, পেশাদারী সচেতনতা থাকতে হয় এবং দায়িত্বজ্ঞান থাকতে হয়।’ (সার্ত্রে ২০০৯: ১৭৯)

ভাষাকে রপ্ত করার সাথে সাথে লেখককে কালের নায়ক হয়ে উঠতে হয়। মুখপাত্র হয়ে উঠতে হয় তার নিজের জনগোষ্ঠীর, বিশেষ করে যারা শোষিত ও অসহায়। দুটো বিষয় এখানে জড়িত, লেখককে ভাষার সঠিক প্রয়োগ জানতে হবে, আর  সেটার মাধ্যমে আম জনতার প্রতিনিধি হয়ে উঠতে হবে। একজন লেখক যদি ভাষাটা ভালো বোঝেন, কিন্তু সময় ও মানুষ বোঝেন না, তাহলে সেই লেখকের লেখা শেষ পর্যন্ত কেরদানিই হয়ে উঠবে। কবি হেলাল হাফিজ যেমনটা বলেছিলেন—‘নিউট্রন বোমা বোঝো, মানুষ বোঝো না’—লেখককে ‘নিউট্রন বোমা’ও বুঝতে হবে, মানুষও বুঝতে হবে। মানুষের ভেতর যে যাপিত জীবনের বেদনা সেটাকে অনুভব করতে হবে। তাহলে সেই লেখক পাঠকের হৃদয়ের মুক্তির ইশতেহার রচনা করতে পারবেন।

লেখালেখিকে মনে হতে পারে একটি বোঝা। মনে হতে পারে এই বোঝা সার্ত্রে চাপিয়ে দিচ্ছেন, তাঁর ‘সাহিত্য কি?’ (১৯৪৮) বইটির মাধ্যমে। এরকম মনে হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। তাই সার্ত্রে বলছেন, এই অতিরিক্ত দায়ভার চাপিয়ে দেয়ার তিনি কে? আর এই অধিকারই বা তাঁকে কে দিয়েছে? তাছাড়া এমন ছেলেমানুষি ইশতেহার লেখার ইচ্ছাও তাঁর নেই। তিনি শুধু লেখকের দৃষ্টিভঙ্গি, ঝুঁকি ও তার উপর মানুষের দাবির বিষয়টা আলাপ করার চেষ্টা করেছেন। সার্ত্রে মনে করেন, অনুশীলনের সাহিত্য (A literature of praxis) পলায়নপর জনতার এই সময়ে সত্ত্বাশালী হয়ে উঠছে। তাই লেখকদের অনুশীলন বা প্র্যাক্সিসের দিকে ঝোকার পরামর্শ দেন সার্ত্রে। যে যারযার মতো করেই অনুশীলন করবেন, নিজস্ব কৌশল, ঢং ও বিষয় দিয়েই লেখক লড়াই চালাবেন। সার্ত্রে বলছেন,

‘যদি লেখক এসব সমস্যার গুরুত্ব দ্বারা নিমজ্জিত হন, আমার মতো,তাহলে নিশ্চিত থাকেন ওই লেখক কাজের সৃজনশীল ঐক্য, যেটাকে বলা যেতে পারে মুক্ত সৃষ্টির চলিষ্ণু নিরবিচ্ছিন্নতার মাধ্যমে ওসব সমস্যার সমাধান প্রস্তাব করবেন।’ (সার্ত্রে ২০০৯: ২২৯)

সমাজের সঙ্কটকে সচেতন লেখক নিরবিচ্ছিন্নভাবে সৃজনশীলতার চর্চার মাধ্যমে ফুটিয়ে তুললেই যে সেই সাহিত্য অমর হয়ে উঠবে সেই নিশ্চয়তা অবশ্য নেই। তবে, সার্ত্রে বলছেন, এমন চর্চার ভেতর দিয়ে গেলে সাহিত্য অমরত্ব লাভের সুযোগ লাভ করে। আর এই সুযোগটা লেখকদের অবশ্যই কাজে লাগাতে হবে। যদি লেখকরা এটাকে হেলায় হারান, তাহলে গোটা লেখক সম্প্রদায়ের জন্য যেমন বিষয়টা খারাপ হয়, তেমনি সমাজের জন্যও হয়ে ওঠে নেতিবাচক। কথা হলো সমাজের জন্য লেখকের প্রয়োজন আছে কি না। উত্তর হলো অবশ্যই আছে। লেখকই পারেন সাধারণ মানুষের মুখপাত্র হয়ে কথা বলতে, লেখনীর মাধ্যমে সাদাকে সাদা, কালোকে কালো বলতে। লেখক যদি শাসক ও উচ্চশ্রেণীর তোষণে ব্যস্ত থাকেন, লেখক যদি কেবল জনতুষ্টির দিকেই নজর দেন, তিনি যদি কালের আহ্বান না শুনতে পান, তাহলে তাঁর স্থায়িত্ব হবে স্বল্পদিনের। আর যদি, সার্ত্রে বলছেন,কোন সাহিত্যকর্ম বা বই রাগ, অস্বস্তি, লজ্জা, ঘৃণা, ভালোবাসা ইত্যাদি আবেগের জন্ম দিতে থাকে, সেই লেখক যদি মারাও যান, তিনি বেঁচে থাকবেন, শত প্লাবনেও।

সামাজিক প্লাবনের ভেতর দিয়েও লেখক তৈরি হয়। বাংলাদেশেও হয়েছে। বিশেষ করে তরুণরাই লেখক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন নানা সঙ্কটের কালে। কিন্তু বর্তমান সময়ে তরুণদের একটি বিরাট অংশ হয় পরকিকরণের বলি (Alienated), রাজনীতিবিমুখ, নয় তো ক্ষমতাসীন দলের চাটুবৃত্তিতে ব্যস্ত। তাই জনগণের এই অংশ থেকে লেখক বা বুদ্ধিজীবী বেরিয়ে আসার সম্ভাবনা কম। আগেই বলেছি প্রতিষ্ঠিত লেখকরাও খুব বেশি আওয়াজ তুলছেন না, পাছে আরাম নষ্ট হয়ে যায়! তাই বলা যায়, প্রায় মুখপাত্রহীন অবস্থার মধ্যে পড়েছে আমাদের সমাজ। এই অবস্থার উত্তরণ প্রয়োজন।

 

সূত্র : Jean–Paul Sartre, What is Literature?, Translated by Bernard Frechtman, London and New York: Routledge, 2009.  

//জেডএস//

লাইভ

টপ