কারা কর্তৃপক্ষ সাহস দেখালে ইতিহাস হতো অন্যরকম: সিমিন হোসেন

Send
আসিফ ইসলাম শাওন
প্রকাশিত : ১৯:২২, নভেম্বর ০৩, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ২০:১৭, নভেম্বর ০৩, ২০১৭

তাজউদ্দিন আহমদের মেয়ে সিমিন হোসেন রিমি (ছবি- মাহমুদ হোসেন অপু/ঢাকা ট্রিবিউন)‘‘বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর তখন ক্ষমতায় খন্দকার মুশতাক আহমেদ। এর এক সপ্তাহের মাথায়, ১৯৭৫ সালের ২২ আগস্ট বাবাকে ধরে নিয়ে যায় পুলিশ। ওই সময় বাবা বলেছিলেন, আমরা হয়তো আর কখনও তাকে দেখতে পাবো না। ওই দিন সকালে পুলিশ আসে আমাদের ধানমন্ডির বাসায়। বাবাকে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি যখন চলছে, বাবার কাছে মা জানতে চাইলেন, ‘তোমার কী মনে হয়, কবে ছাড়বে তোমাকে?’ জবাবে বাবা বলেন, ‘হয়তো আর কখনই না।’ পুলিশরা তখন বাবাকে কিছু কাপড়-চোপড়ও সঙ্গে নিতে বলে। বোঝাই যাচ্ছিল, বাবাকে ওরা দীর্ঘদিনের জন্যই নিয়ে যাচ্ছিল।’’
কথাগুলো বলছিলেন জাতীয় চার নেতার অন্যতম এবং বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদের মেয়ে সিমিন হোসেন রিমি। জেলহত্যা দিবস উপলক্ষে কথা হয় তার সঙ্গে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে যে নামগুলো জড়িয়ে আছে, তার মধ্যে অন্যতম তাজউদ্দিন আহমদ। মুজিবনগর সরকারের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, দুই মন্ত্রী এম মনসুর আলী ও এ এইচ এম কামরুজ্জামান ও তিনি একসঙ্গে পরিচিত জাতীয় চার নেতা হিসেবে। বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত ছিলেন তারা। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করার পর কারাবন্দি করা হয় এই চার নেতাকে। ওই বছরের ৩ নভেম্বর কারাগারেই হত্যা করা হয় তাদের। সেই থেকেই এই দিনটিকে পালন করা হয়ে আসছে ‘জেলহত্যা দিবস’ হিসেবে।
জাতীয় চার নেতার সন্তানদের অনেকেই পরবর্তী সময়ে যুক্ত হয়েছেন জাতীয় রাজনীতিতে। তাজউদ্দিন আহমদের দুই সন্তান সিমিন হোসেন রিমি ও সোহেল তাজও বাবার রাজনৈতিক মতাদর্শের উত্তরসূরি হয়েছেন। এর মধ্যে বাবাকে হারানোর সময় নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী রিমি বর্তমানে গাজীপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে সিমি বলেন, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরপরই তাদের ধানমন্ডির বাসা পুলিশ দিয়ে ঘেরাও করে ফেলা হয়। তার বাবা তাজউদ্দিনকে গৃহবন্দি করে ফেলে পুলিশ। তিনি বলেন, ‘তারা আমাদের বাসার ছাদেও পাহারা বসায়। আমাদের বাসা থেকে কাউকে বের হতে দেওয়া হয়নি, কাউকে বাসায় ঢুকতেও দেওয়া হয়নি। পরে বাবাকে তো কারাগারেই নিয়ে যায়। সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে গিয়ে বাবার সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পাই আমরা।’
রিমি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুকে যেসব সেনাসদস্য হত্যা করেছিল, অক্টোবর মাসের শেষের দিকে তারা জাতীয় চার নেতাকে বন্দি করে রাখা কারাগারের সেলগুলো রেকি করতে শুরু করে। একদিন কারা উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি প্রিজন) কাজি আব্দুল আওয়ালকে ডেকে পাঠানো হয় বঙ্গভবনে। সেখানে মেজর সৈয়দ ফারুক রহমান তার কাছে কারাগারের নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পর্কে জানতে চান। কারাগারে থাকা গুরুত্বপূর্ণ কোনও বন্দির ওপর বাইরে থেকে হামলা হলে তা ঠেকাতে কী ধরনের ব্যবস্থা আছে, তাও বিস্তারিত জানতে চান মেজর ফারুক। জবাবে ডিআইজি প্রিজন জানান, যেকোনও জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী রয়েছে। সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে হামলা হলে কারা কর্তৃপক্ষ কী করতে পারবে— এরপর তা জানতে চান মেজর ফারুক। এ ক্ষেত্রে কারা কর্তৃপক্ষের তেমন কিছু করার থাকবে না বলে জানিয়ে দেন ডিআইজি প্রিজন।’
এর পরের কয়েকদিনে ডিআইজি প্রিজনের কাছে আরও বেশ কয়েকটি ফোন আসে এবং তার কাছে কারাগারের নিরাপত্তা নিয়েই জানতে চাওয়া হয়।
ওই সময়ের বিবরণ দিতে গিয়ে রিমি বলেন, ‘নভেম্বরের ১ তারিখে মা কারাগারে বাবার সঙ্গে দেখা করতে যান। সেটাই ছিল বাবার সঙ্গে মায়ের শেষ দেখা। ওই সময় মাকে বাবা বলেছিলেন, যেকোনও সময় তাদের (চার নেতা) হত্যা করা হতে পারে।’
তাজউদ্দিন আহমদ ছিলেন একজন কোমল হৃদয়ের মানুষ। কারাগারে থাকার সময় বিভিন্ন ধরনের কাজ করে সময় কাটাতেন তিনি। কারাগারে তার সঙ্গে আর যারা ছিলেন, তাদেরও বিভিন্ন কাজে সাহায্য করতেন। রিমি বলেন, ‘বাবা বাগান খুব পছন্দ করতেন। কারাগারে গিয়ে তিনি সময় কাটাতে বাগান করাকেই বেছে নেন। কারাগারের ভেতরে তিনি অনেক গাছ লাগিয়েছেন। এমনকি তাকে হত্যা করার একদিন আগেও, ১ নভেম্বর ৭০টি গাছের চারা লাগান তিনি। অথচ এমন একজন মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করে আততায়ীরা।
ওই সময়ে কারা কর্তৃপক্ষ একটু সাহসী হয়ে চার নেতার হত্যাকারীদের থামানোর মতো সাহস দেখাতে পারলে ইতিহাস অন্যরকম হতো বলে মনে করেন রিমি।
সেদিনের স্মৃতি হাতড়ে রিমি বলেন, ‘নভেম্বরের ৩ তারিখে ‍গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে বাবাসহ চার নেতাকে বঙ্গভবন বা ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। কিন্তু পরের দিন সকালে আমরা জানতে পারলাম, কারাগারের ভেতরে গোলাগুলি হয়েছে। কারও কোনও ধারণা ছিল না প্রকৃতপক্ষ কী হয়েছে। পরে বিকালে তিন জন নারী আমার চাচার বাসায় আসে এবং তারাই জানায়, আমার বাবা আর নেই। তার সঙ্গে কারাগারে থাকা বাকি তিন নেতাকেও হত্যা করা হয়েছে।’
এর একদিন পর ৫ নভেম্বর বনানী কবরস্থানে তাজউদ্দিনকে দাফন করা হয় বলে জানান রিমি। তিনি বলেন, ‘বাবাকে দাফন করে আসার পর আমরা গুজব শুনলাম, আমাদের বাসায় নাকি হামলা চালানো হবে। তখন আমরা পরিবারের সদস্যরা সবাই ভাগ হয়ে যাই। যে যার মতো পালিয়ে বেড়ায়। তখন আমরা নিজেরাও জানতাম না কে কোথায় আছি। ঠিক এমনই এক নিষ্ঠুর সময় আমাদের পেরিয়ে আসতে হয়েছে। অথচ কারা কর্তৃপক্ষ একটু সাহস দেখালেই হয়তো ইতিহাস হতো অন্যরকম।’

(ঢাকা ট্রিবিউনে প্রকাশিত)
আরও পড়ুন-
কারাগারের গায়ে তাদের রক্ত
বাবার মৃত্যুর সংবাদ পত্রিকা পড়ে জেনেছি: খায়রুজ্জামান লিটন
বাবাকে যে সেলে হত্যা করা হয়েছিল সেখানে ৯ মাস ছিলাম: নাসিম
আমাদের কাউকেই বাবার কবর দেখতে দেওয়া হয়নি: সৈয়দ আশরাফ

/টিআর/

লাইভ

টপ