অনৈতিক প্রস্তাবে রাজি না হওয়াতেই মাদ্রাসা ছাত্রকে হত্যা

Send
বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
প্রকাশিত : ১৭:৫৯, নভেম্বর ২২, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ২০:০৪, নভেম্বর ২২, ২০১৭

মদিনাতুল মাদ্রাসার ছাত্রাবাসরাজধানীর গুলিস্তানের মদিনাতুল উলুম হাফিজিয়া মাদ্রাসার ছাত্র মো. আব্দুর রহমান জিদান (১৪) অনৈতিক প্রস্তাবে সাড়া না দেওয়ায় তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে দায় স্বীকার করে একথা জানিয়েছে হত্যায় জড়িত একমাত্র আসামি মো. আবু বক্কর (১৬)। বুধবার (২২ নভেম্বর) বিকালে ঢাকার র‌্যাব মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে খবরটি জানান র‌্যাব ৩-এর অধিনায়ক ইমরানুল হাসান। এদিন সদরঘাট এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়।

গত ১৯ নভেম্বর দিবাগত রাতে ওই মাদ্রাসার একটি সেফটিক ট্যাংক থেকে জিদানের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ঘুমন্ত বেশকিছু শিশু-কিশোরের মধ্যেই গলা কেটে হত্যা করে তার লাশ সেফটিক ট্যাংকে ফেলে পালিয়ে যায় আরেক শিক্ষার্থী আবু বক্কর।

যে কারণে আব্দুর রহমান ও আবু বক্করের মনোমালিন্য
র‌্যাব জানায়, আব্দুর রহমান ছিল আবু বক্করের জুনিয়র। আসামি আবু বক্কর বিভিন্ন সময় আব্দুর রহমানকে অনৈতিক সম্পর্ক গড়ার প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু সে এতে রাজি না হওয়ায় ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে আবু বক্কর। এরই মধ্যে মাদ্রাসার হেফজ বিভাগের আরেক শিক্ষার্থীর সঙ্গে আব্দুর রহমানের ঘনিষ্ঠতা বাড়লে তার ক্ষোভ আরও বেড়ে যায়। তাদের মধ্যে এর আগেও বেশ কয়েকবার ঝামেলা হয়েছিল।

র‌্যাব আরও জানিয়েছে, আবু বক্কর সিনিয়র ছাত্র হওয়ায় আব্দুর রহমানকে দিয়ে মাঝে মধ্যে কাপড় ধোয়ানো, খাবার আনা-নেওয়াসহ বিভিন্ন ব্যক্তিগত কাজ করে দেওয়ার আদেশ করতো। কিন্তু সে আদেশ অমান্য করায় তাদের মধ্যে মনোমালিন্য শুরু হয়। এর জেরে গত ১৬ নভেম্বর আব্দুর রহমানকে চড়-থাপ্পড় মারে আবু বক্কর। আব্দুর রহমান এ বিষয়ে মাদ্রাসার শিক্ষক মো. ইয়াছিন হুজুরকে বিচার দিলে তিনি আবু বক্করকে সতর্ক করে মীমাংসা করে দেন। এ ঘটনার কারণেই সে পূর্ব পরিকল্পিতভাবে আব্দুর রহমানকে মেরে ফেলে।

যেভাবে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়
র‌্যাব ৩-এর অধিনায়ক জানান, গত ১৬ নভেম্বর মাদ্রাসার শিক্ষক সতর্ক করে দিলে তখনই আবু বক্কর হত্যার পরিকল্পনা সাজাতে থাকে। ১৯ নভেম্বর এশার নামাজের পর সে তার ফল কাটার ছুরিতে ধার দেয় ও আব্দুর রহমানের গলা কেটে লাশ সেফটিক ট্যাংকে লুকিয়ে ফেলার ষড়যন্ত্র করে।

অন্যান্য দিনের মতো খাবার খেয়ে রাত ১০টার দিকে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা ঘুমিয়ে পড়লে সুযোগের অপেক্ষা করতে থাকে আবু বক্কর। রাত আনুমানিক দেড়টার দিকে ট্রাঙ্ক থেকে ফল কাটার ছুরি বের করে সে আব্দুর রহমানের মুখ চেপে ধরে ও একাধিকবার গলায় আঘাত করে। মৃত্যু নিশ্চিতের পর লাশ তুলে নিয়ে বাথরুমের পাশে সেফটিক ট্যাংকের কাছে নিয়ে ভেতরে ফেলে দেয়াল টপকে পালিয়ে যায় আবু বক্কর।

হত্যাকাণ্ডের সময় আব্দুর রহমানের গোঙানির শব্দে দু’একজনের ঘুম ভাঙলেও অন্ধকার ঘরে মশারির ভেতরে থাকায় কি হচ্ছিল তা বুঝতে পারেনি কেউ। এ সময় ওই ঘরে অন্তত ৩০ থেকে ৩৫ শিক্ষার্থী ঘুমন্ত অবস্থায় ছিল বলে জানায় র‌্যাব।

ঘটনার অনেক পর মাদ্রাসার শিক্ষক রক্তের দাগ অনুসরণ করে সেফটিক ট্যাংকের কাছে যান। এরপর সেখান থেকে মৃতদেহ উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে পাঠানো হয় ভোর সোয়া ৪টার দিকে।

আসামি আবু বক্কর ধরা পড়লো যেভাবে
র‌্যাব ৩-এর অধিনায়ক ইমরানুল হাসান বলেন, ‘হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই আমাদের গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয় ও ছায়া তদন্ত শুরু করে র‌্যাব। এরই পরিপ্রেক্ষিতে আবু বক্করের ভাইবোনের মোবাইল ট্র্যাক করে বুধবার সকাল ৯টার দিকে রাজধানীর সদরঘাট এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়।

চার বছর ধরে গুলিস্তান আহাদ পুলিশ বক্সের পেছনে টিনশেড মদিনাতুল উলুম হাফিজিয়া মাদ্রাসায় পড়াশোনা করছে আবু বক্কর। আব্দুর রহমান জিদানের মতো অন্য শিক্ষার্থীদেরও সে এ ধরনের অনৈতিক প্রস্তাব দিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে এ বিষয়ে তদন্তের পর বিস্তারিত বলা যাবে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানায় র‌্যাব।

আব্দুর রহমান জিদান তিন বছর চার মাস ধরে এই মাদ্রাসায় হেফজা পড়ছিল। সে ছিল ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ের হাফিজ উদ্দিনের ছেলে। আর আবু বক্করের গ্রামের বাড়ি বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জে। সে হেফজা পড়া শেষ করেছে।

একনজরে মদিনাতুল উলুম হাফিজিয়া মাদ্রাসা
জানা গেছে, ২০১০ সালে প্রতিষ্ঠিত এই মাদ্রাসাটিতে শিক্ষার্থীদের হেফজা (হাফেজি) পড়ানো হয়। মূলত এতিম শিশু-কিশোর ও আর্থিকভাবে অসচ্ছল পরিবার তাদের সন্তানদের এই মাদ্রাসায় পড়তে দেন। মাসিক ৮০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা বেতন দিতে হয় এখানে। এছাড়া বিভিন্ন আর্থিক সহযোগিতায় চলে মাদ্রাসাটি।

মাদ্রাসার ভেতরেই শিশু-কিশোররা থাকে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা শতাধিক শিক্ষার্থী হাফেজি পড়ে। শিক্ষার্থীদের বয়স ৫ থেকে ১৬ বছরের মধ্যে। মাদ্রাসার ওপরে টিনের ভেতর থাইগ্লাসের একটি পার্টিশন রয়েছে। পার্টিশনের দুই পাশেই সারি করে শিক্ষার্থীরা মেঝেতে ঘুমায়। আবু বক্কর ও আব্দুর রহমান ঘুমাতো এক সারিতেই। তাদের দু’জনের বিছানার মাঝখানে থাকতো অন্য দুই শিক্ষার্থী।
মাদ্রাসার দুই শিক্ষক থাকেন ছাত্রাবাসে। তাদের মধ্যে মো. রাফসানি বাংলা পড়ান। অন্য শিক্ষক মোহাম্মদ মিরাজ নুরানি পড়ান। মাদ্রাসার বাবুর্চি হাবিবুর রহমান ঘুমান ছাত্রাবাসের বাইরের একটি রুমে।

আরও পড়ুন-
মাদ্রাসা ছাত্র জিদান হত্যা মামলার একমাত্র আসামি গ্রেফতার

ঘুমন্ত ৪০ শিশু-কিশোরের মধ্যে মাদ্রাসা ছাত্রকে গলা কেটে হত্যা!

গুলিস্তানে মাদ্রাসাছাত্রের গলাকাটা লাশ উদ্ধার

/আরজে/জেএইচ/

লাইভ

টপ