একান্ত সাক্ষাৎকারে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটি ব্যবহারই করতে পারছে না সরকার, ফেরত পাঠাবে কীভাবে?

Send
সালমান তারেক শাকিল
প্রকাশিত : ২৩:২৬, ফেব্রুয়ারি ১৯, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২২:৫০, ফেব্রুয়ারি ২০, ২০১৯

সাক্ষাৎকারে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও এফএসি কমিটির প্রধান আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও দলটির ফরেইন অ্যাফেয়ার্স কমিটির (এফএসি) প্রধান আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, ‘ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে শুরু থেকে এখন পর্যন্ত ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। যেখানে রোহিঙ্গা শব্দটাই ব্যবহার করতে পারছে না, সেখানে কীভাবে ফেরত যাবে রোহিঙ্গারা। সরকার রোহিঙ্গা ইস্যুটিকে মূলধন করে এগুতে চাচ্ছে।’

মঙ্গলবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে রাজধানীর বনানীতে তার ব্যবসায়িক কার্যালয়ে বাংলা ট্রিবিউনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী এসব কথা বলেন। ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে এফএসি’র প্রধান হিসেবে আমীর খসরুকে নিযুক্ত করেন বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

সাক্ষাৎকারে সাবেক এই বাণিজ্যমন্ত্রী বিএনপির বিদেশনীতি, ভারত ও চীনের সঙ্গে দলীয় সম্পর্ক, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অবস্থান, রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ সরকারের সর্বশেষ আচরণ পর্যালোচনা করেন। এছাড়া পশ্চিমা বিশ্ব জামায়াতের সঙ্গে জোটগত সম্পর্কের বিষয়টি কীভাবে বিবেচনা করে, সে বিষয়টিও তুলে ধরেন আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বাংলা ট্রিবিউনের পাঠকদের জন্য তার পুরো সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হলো।

বাংলা ট্রিবিউন: সম্প্রতি আপনি বিএনপির ফরেন অ্যাফেয়ার্স কমিটির টিম লিডার হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন।

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী: আপনাকে বলেছি, আমরা সবাই মিলে কাজ করি। কিসের লিডার-ফিডার।

বাংলা ট্রিবিউন:  এই মুহূর্তে ফরেইন অ্যাফেয়ার্স কমিটির মূল চ্যালেঞ্জ কী বলে মনে করেন?

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী: চ্যালেঞ্জ তো আমাদের যেটা ফরেন পলিসি আছে 'সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে শত্রুতা নয়', এই নীতিকে সামনে রেখেই আমরা প্রতিটি দেশের সঙ্গে যোগাযোগ রাখবো, কথা বলবো, তাদেরকে অবহিত করবো— দল হিসেবে আমাদের চিন্তা কী। বৈদেশিক নীতিমালা হিসেবে কোন এরিয়াতে কী, তা আমরা তাদেরকে জানাবো।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও এফএসি কমিটির প্রধান আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী

বাংলা ট্রিবিউন: সেক্ষেত্রে ১০-১২ বছর আগের চেয়ে বা  আপনি যেহেতু দায়িত্বে এসেছেন, দৃষ্টিভঙ্গিগত বা আচরণগত কোনও পরিবর্তন আসবে কী?

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী: দৃষ্টিভঙ্গি তো দলের দৃষ্টিভঙ্গি। দলের দৃষ্টিভঙ্গির পরিপ্রেক্ষিতে আমাকে কাজ করতে হবে। আমাদের দলের দৃষ্টিভঙ্গি ও নীতিমালা অনুযায়ী দেশের স্বার্থ সুরক্ষিত রেখে সব দেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক করে আমাদেরকে এগোতে হবে । দেশের স্বার্থ ও জনগণের স্বার্থ সুরক্ষিত রেখে মিউচুয়াল বেনিফিট এর পরিপ্রেক্ষিতে সম্পর্ক গড়ে তোলা।

বাংলা ট্রিবিউন: গত কমিটির চেয়ে এবারের এফএসি কমিটিতে সদস্য-সংখ্যা বেড়েছে, কারণ কি?

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী: একটা দলের কার্যক্রমে সদস্য সংখ্যা বাড়তে পারে, কমতে পারে। এটা তো কোনও বিষয় না। দল বড় হচ্ছে, দলের মধ্যে লোক সংখ্যা বাড়ছে এবং কাজ করার জন্য দলের নেতাকর্মীদের আগ্রহ বাড়ছে। সে দিক থেকে সদস্য সংখ্যা বাড়তে পারে।

বাংলা ট্রিবিউন: সামনে ভারতে জাতীয় নির্বাচন, এই নির্বাচনকে বিএনপি কীভাবে মূল্যায়ন করছে?

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী: ভারতের নির্বাচন দেশটির অভ্যন্তরীণ বিষয়। সেদেশের নির্বাচনে যে বা যারাই জয়ী হোক বা বিরোধী দল হোক—আমরা সবার সঙ্গে কাজ করবো। ভারতের জনগণ নির্ধারণ করবে তারা কাকে ভোট দেবে, নির্বাচিত করবে, এটা তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ব্যাপার। এ বিষয়টা নিয়ে মাথা ঘামাতে চাই না।

বাংলা ট্রিবিউন: সেক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন বিজেপি বা কংগ্রেস—এই দুয়ের মধ্যে লাভ-ক্ষতি দেখছেন কী?

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী: আমাদের সবার সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখতে হবে। ভারতের জনগণ নির্ধারণ করবে কারা ক্ষমতায় আসবে এবং কারা বিরোধী দলে থাকবে। আমি আগেই বলেছি ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে বিএনপি মাথা ঘামাবে না। আমরা মনে করি, বাংলাদেশের জনগণ ও ভারতীয় জনগণের মধ্যে যে সম্পর্ক, সেটাই হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ। কোনও দল বা গোষ্ঠীর ব্যাপার এখানে নেই।

বাংলা ট্রিবিউন: গত বছর বাংলাদেশে নির্বাচনের আগে আপনি ভারতে সফরে গিয়েছিলেন এবং সেখানে থিঙ্ক ট্যাঙ্কসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সরকারের ও সরকারের বাইরে নানান জনের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। সেই আলোচনার অগ্রগতি কতটা? বিএনপির সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর জোটগত সম্পর্কের বিষয়টি তো ভারতের অনীহার বিষয়টি গণমাধ্যমে এসেছে।

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী: ভারতের সঙ্গে আমাদের যে সম্পর্ক, সেখানে অবস্থানটা হচ্ছে এরকম যে বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্ক কী হবে। পরস্পরের সম্মানবোধের ভিত্তিতে, বন্ধুত্বের ভিত্তিতে। বিশেষ করে দুই দেশের জনগণের মধ্যে বন্ধুত্বের ভিত্তিতে। কোনও দল কিংবা গোষ্ঠীর ভিত্তিতে আমাদের সম্পর্ক নয়। সুতরাং সেই সম্পর্ক ভারতের সঙ্গে এখনও অব্যাহত আছে। নতুন করে কিছু করার নাই।  (পড়ুন: বাংলাদেশে কী হচ্ছে, জানতে চায় ভারত: আমীর খসরু)

বাংলা ট্রিবিউন: গতবছর রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আপনাদের একটা উদ্যোগ ছিল। এই সমস্যা সমাধানে আপনাদের নতুন করে কোনও প্ল্যান আছে?

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও এফএসি কমিটির প্রধান আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী: রোহিঙ্গা সমস্যাটি এই সরকার শুরু থেকেই খুব ভালোভাবে হ্যান্ডেল করতে পারেনি। প্রথমে তারা যখন আসা শুরু করেছে, তখন সরকারের পক্ষ থেকে বাধাগ্রস্ত করা হয়েছে। এটা সকলের মনে আছে, পত্রপত্রিকায় এসেছে। জয়েন্ট অপারেশনের জন্য মিয়ানমারকে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তো, সে ক্ষেত্রে যখন বিএনপির চেয়ারপারসন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া প্রথম মুখ খুললেন যে, ‘‘মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের আমাদের দেশে আসতে দেওয়া উচিত। তারা নির্যাতিত এবং স্টেটলেস এবং তাদের ফেরত যেতে হবে।’’

জিয়াউর রহমানের সরকারের সময় এবং বেগম খালেদা জিয়া সরকারের সময় তাদেরকে ফেরত দেওয়া হয়েছে। এবারও তারা ফেরত যাবে এটাই স্বাভাবিক। বিপর্যস্ত অবস্থায় তাদেরকে সাহায্য করা উচিত মানবিক কারণে। এটা নিয়ে যখন খালেদা জিয়া প্রথম কথা বললেন, সঙ্গে-সঙ্গে দেশের মানুষ একটা অবস্থান নিয়ে নিয়েছে। তারপর আন্তর্জাতিকভাবে এটার পক্ষে তখন সরকারের টনক নড়েছে মাত্র।

বাংলা ট্রিবিউন: এখন সরকারের অবস্থান কী?

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী: এখন সরকার এটাকে মূলধন করে এগুতে চাচ্ছে। এখানে রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়ার যে উদ্যোগ প্রয়োজন, বাংলাদেশ স্বাধীন সার্বভৌম শক্তিশালী দেশ হিসেবে সেটা কিন্তু এখন পরিলক্ষিত হচ্ছে না।

বাংলা ট্রিবিউন: রোহিঙ্গাদের বিষয়ে চীন এবং রাশিয়া কয়েকবারই বাধা দিয়েছে জাতিসংঘে...।

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী: সরকার যে দ্বিপাক্ষিক চুক্তিগুলো করেছে, তাতে সেগুলো সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ নেই। যেখানে রোহিঙ্গা শব্দটার ব্যবহার করতে পারছে না, সেখানে কীভাবে ফেরত যাবে রোহিঙ্গারা? উৎস (শুরু) থেকে এখন পর্যন্ত তারা ব্যর্থ। রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে মাল্টিপল যে উদ্যোগ, যে উৎসাহ উদ্দীপনা ছিলো- সেটাকে এখনো ক্যাপিটালাইজ করতে পারে নাই, যেটা বিএনপির সময় আমরা করেছিলাম। মিয়ানমার কিন্তু রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে উৎসাহী নয়। তারা শুধু কথা বলছে।

বাংলা ট্রিবিউন: মিয়ানমার সেনাপ্রধান দুই দিন আগেই বলেছেন, তাদের ওপরে নির্যাতন হয়েছে তাতে রাষ্ট্র জড়িত নয়। এটা অবস্থার পরিবর্তন না কৌশল?

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী:  সারা বিশ্ব কী দেখছে, সারা বিশ্ব কী করছে, এটার ওপর আন্তর্জাতিক রিপোর্টগুলো যদি দেখেন, সেখানে কী বলা হচ্ছে? তারা এমন কিছু বলেছে সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে, নামধাম নিয়ে অ্যাকশন নেওয়ার কথা বলেছে।

বাংলা ট্রিবিউন: এখানে আপনি নিজেও জানেন অং সান সু চি তার যে অবস্থান, তার বিরুদ্ধে পশ্চিমা বিশ্বের সবাই তো অবস্থান নিয়েছে। শুধু চীন এবং রাশিয়ার অবস্থান ভিন্ন। এটা চীন এবং রাশিয়ার সঙ্গে ডিল করবে কীভাবে?

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী: যেখানে আমরা দুই বার করেছি...আমরা বেগম খালেদা জিয়ার সময় করেছি, জিয়াউর রহমানের সময়ও করেছি। সবাইকে অনবোর্ড (এনে) আমরা লিখিত (চুক্তি) করেছিলাম, তাই না! তারা পারছে না কেন, তাদের বন্ধুত্বের সম্পর্কটা কোথায় তাহলে? কোন এলাকায় তাদের এ সম্পর্ক, এটা তো আমরা বুঝতে পারছি না। আমরা বিএনপি'র সময় দুই দুইবার আন্তর্জাতিক মহলকে নিয়ে এই কাজগুলো করেছি। তারা ব্যর্থ হচ্ছে কেন। তাহলে তাদের বন্ধুত্বের উৎসটা কোথায়।

বাংলা ট্রিবিউন: এক্ষেত্রে আপনি সরকারকে কিছু বলতে চান কী না?

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী: আমরা সহযোগিতা করতে রাজি আছি, আমাদের অভিজ্ঞতা আছে। আমরা সহযোগিতার আহ্বান করেছি, যেহেতু এই কাজটি আমরা দুই-দুই বার করেছি। আমাদের পক্ষ থেকে সরকারকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছি কিন্তু সরকার তো সেটা নেয়নি। এই সমস্ত সমস্যার সমাধান জাতির সকলের ঐক্যমতের পরিপ্রেক্ষিতে করতে হয়। এটা কোনও একটি দল অথবা সরকার ওইভাবে করতে পারে না। এখানে জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজন। কিন্তু তারা সেদিকে মোটেই মনোযোগী নয়।

বাংলা ট্রিবিউন: চীনের সঙ্গে আপনাদের সম্পর্কের অবনতি ১৫ বছর আগে ঘটেছিল, এই সম্পর্ক এখন কেমন? আপনি তো দায়িত্ব নিয়েছেন?

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী: আমার দায়িত্বের ওপর সব কিছু হবে না, এটি দল নিয়েছে।

বাংলা ট্রিবিউন: অনেকেই বলছে চীনের সঙ্গে বিএনপি'র সুসম্পর্কের জায়গাটাও অনেকটাই অনুপস্থিত? এমনকী আপনার দলেও প্রচার আছে।

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী: আমি তো কোনও অনুপস্থিতি দেখছি না। আমি তো খুব ভালোভাবেই দেখছি, ভালোভাবে উপস্থিত আছে। কিছুদিন আগেও তো বিএনপির একটি ডেলিগেটস চীন ঘুরে এসেছে, নির্বাচনের ৪/৫ দিন আগে। বিএনপি থেকে চায়নার নিমন্ত্রণে নিয়মিতভাবে ডেলিগেটস যাচ্ছে। নিয়মিতভাবে যাচ্ছে।

বাংলা ট্রিবিউন: আপনার দলে কোনও-কোনও নেতা মনে করেন, সম্পর্কের ঘাটতির কারণে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আপনাদের চীনপন্থী নেতারা মনোনয়ন পাননি।

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী: মনোনয়ন এর ওপর ভিত্তি করে তো কারও সঙ্গে বন্ধুত্ব হয় না। বাংলাদেশের কোনও দল কাকে মনোনয়ন দেবে, এটা দলের বিষয়, অভ্যন্তরীণ বিষয়। এটার ওপর ভিত্তি করে কিন্তু কোনও বন্ধুত্ব হয় না। এটা যারা বলে, তাদের দূরদর্শিতার অভাব আছে। কারণ বিএনপি কাকে নমিনেশন দেবে তা কোনও দেশের ওপর নির্ভর করবে না। এদিক থেকে বিএনপি একটি ইন্ডিপেন্ডেন্ট দল। কোনও দেশের ওপর ভিত্তি করে বিএনপি রাজনীতি করে না।

বাংলা ট্রিবিউন: সৌদি সরকারের সঙ্গে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার সামরিক চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। আমাদের দেশের সেনারা ইয়েমেনে-সৌদি সীমান্তে অবস্থান নেবে। এটা নিয়ে বিএনপি'র অবস্থান কী?

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী: ব্যাপার হচ্ছে, যতগুলো চুক্তি করছে সরকার- তা জনগণের সামনে কিছু তুলে ধরছে না। এই চুক্তিতে কী আছে, আমরা তো জানি না। আমরা যে মতামত দেবো, দেশ জাতি কেউ জানে না, এমন কী সংসদও জানে না। এবং আজ অবধি তারা যতগুলো চুক্তি করছে বা করেছে, কোন চুক্তি কিন্তু জনসাধারণকে জানাচ্ছে না। সুতরাং জনসাধারণ যদি নাই জানে তাদের এই চুক্তিতে কী আছে, যেহেতু তারা নির্বাচিত নয়—সেহেতু তারা জনগণকে জানানোর প্রয়োজন মনে করছে না। তারা অনির্বাচিত, সাধারণ জনগণের কাছে তাদের জবাবদিহিতাও নাই।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও এফএসি কমিটির প্রধান আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী

বাংলা ট্রিবিউন: পশ্চিমা বিশ্ব জামায়াতে ইসলামীর মৌলবাদী রাজনীতি নিয়ে তাদের মতামত নানান সময় ব্যক্ত করছে, জামায়াতের সঙ্গে আপনাদের দীর্ঘদিনের জোট। ইতোমধ্যে তাদের দলের অভ্যন্তর থেকে একজন সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল পদত্যাগ করেছেন এবং কারণও বলেছেন। আপনারা এখনও জামায়াতকে নিয়ে আছেন। পশ্চিমাদের অবস্থানের পরিপ্রেক্ষিতে আপনারা পরিস্থিতি কীভাবে মোকাবিলা করবেন?

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী: এখানে মোকাবিলা করার কিছু নাই। জামায়াত শুধু নয়, ২০ দলের যে জোট আছে এবং ঐক্যফ্রন্ট নিয়ে বৃহৎ যে জোট আছে—এটা কোনও আদর্শিক জোট নয়। প্রত্যেকটি দলের আদর্শ আছে, তাদের দর্শন আছে, মূল্যবোধ আছে এবং সেটা তাদের নিজস্ব ব্যাপার। আমাদের যে কমন গ্রাউন্ড—বাংলাদেশের জনগণের ভোটাধিকার, গণতন্ত্র, আইনের শাসন এবং স্বাধীনতা ফিরে পাওয়ার ওপর ভিত্তি করে জোট হয়েছে। সুতরাং এটি কোনও আদর্শিক জোট নয়। কোনও দলের আদর্শগত বিষয়টা তাদের নিজস্ব ব্যাপার। আমাদের সঙ্গে সম্পর্কটা হচ্ছে শুধুমাত্র দেশের যে মৌলিক অধিকার বলেছি, সেগুলো ফিরে পাওয়ার জন্য। আমরা ঐক্যমতে এসেছি কিন্তু তাদের সঙ্গে কোনও আদর্শিক নয়। এই একমত কিন্তু স্থায়ী কিছু নয়। এটা হচ্ছে আজকে দেশের অগণতান্ত্রিক প্রেক্ষাপটের পরিপ্রেক্ষিতে একমত হয়েছে। রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই ঐক্যমতগুলো হয়। যখন এগুলো প্রয়োজন শেষ হয়ে যাবে, তখন যার যার ঘরে ফিরে যাবে। জামায়াতের অভ্যন্তরীণ তাদের দলের বিষয় সেগুলো আমাদের জানার বিষয় না।

বাংলা ট্রিবিউন: একাদশ নির্বাচন নিয়ে আপনারা যতগুলো অভিযোগ করেছেন, এগুলো তো এর আগে বাংলাদেশে নিযুক্ত কূটনীতিকদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন, অবহিত করেছেন। ফলশ্রুতিতে এখন কোন ফলাফল আসছে কী না?

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী: বিশ্বে যে গণতান্ত্রিক দেশগুলো আছে তারা কেউ 'অভিনন্দন' শব্দটি ব্যবহার করেনি। কালকে যদি একটি স্বৈরাচার শাসকও আসে তারা সেভাবেই স্বাগত জানাবে। কারণ, তাদের রিলেশনের জন্য। বাংলাদেশের জনগণ ভোট দিয়েছে কী দেয়নি, এটি তাদের বিষয় না। কিন্তু বিশ্বের যে কোনও গণতান্ত্রিক সরকার—তারা কিন্তু বার্তা দিয়েছে পরিষ্কার করে। বার্তাটা হচ্ছে  বাংলাদেশের নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ, বার্তাটা কী এটা তদন্ত হওয়া দরকার, বার্তাটা কী ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে বাধাগ্রস্ত করা হয়েছে, বার্তাটা কী পর্যবেক্ষক বাধাগ্রস্ত করা হয়েছে, রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে ভোটারদেরকে দমন করা হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যে বক্তব্যকে বলা হয়েছে, ‘অভিনন্দন জানানো হয়েছে’, সেই চিঠিটি তারা পুরোপুরি পড়েনি। সেটা ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন বলেন, যুক্তরাজ্য বলেন, যত রাষ্ট্র আছে গণতান্ত্রিক; সবার কাছে এই কথাগুলো কমন, এমনকী জাতিসংঘসহ।

বাংলা ট্রিবিউন: আপনি দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য একজন, ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে বিএনপির  চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারাগারে আছেন, দল গোছানোর প্রস্তাব দল থেকে এসেছে ভেতরে থেকেই, ইতোমধ্যে কার্যক্রম শুরু হয়েছে। স্থায়ী কমিটির একজন নীতিনির্ধারক হিসেবে বিএনপির আগামী দিনের রাজনীতির মূল বিষয় কী হবে?

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী: মূল বিষয় হচ্ছে বাংলাদেশের জনগণের ভোটের মাধ্যমে একটি সরকার গঠন করা। জনগণের মৌলিক অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া। সাংবিধানিক রাজনৈতিক অধিকার ফিরিয়ে আনা, এগুলো হচ্ছে মূল বিষয়। আর এর মাধ্যমে একটি নির্বাচিত সরকারকে ‘জবাবদিহি সরকার’ পর্যন্ত করা। আমরা তো বলছি নির্বাচন বাতিল করে নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে একটি নির্বাচিত সংসদ সরকার গঠন করার জন্য। আজকের দিনের আলোর মতো সত্য যে, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়েছে। কাউকে প্রমাণ করার প্রয়োজন নেই এটা। এটা নিয়ে কোনও বিভক্তি নেই, কোনও বিতর্ক নাই। জনগণের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়েছে এটা বাংলাদেশের প্রতিটি জনগণের কাছে স্পষ্ট হয়েছে। এই ভোটাধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার যে আন্দোলন, এটা আরও সুস্পষ্ট হয়েছে। বেগম খালেদা জিয়াকে জেলে নেওয়ার পেছনে মূল কারণ হচ্ছে, জনগণকে বাইরে রেখে ক্ষমতা দখলের যে প্রক্রিয়া সেটা বাস্তবায়ন করা। একটি মিথ্যা মামলার মাধ্যমে বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেত্রী, গণতন্ত্রের মাকে জেলে রেখে গণতন্ত্রকে হত্যা করা হচ্ছে তাদের উদ্দেশ্য। তাদের ভীতি হচ্ছে এই জনপ্রিয় নেত্রী যদি বাইরে থাকে, তবে আজকে জনগণের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়ে তাদের নির্বাচনে জয়ী হওয়া সম্ভব নয়।

আরও পড়ুন: বিএনপি কি চীনকে পাশ কাটাচ্ছে?

/টিএন/

লাইভ

টপ