behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

বাংলাদেশে নারীদের চাকরি অনেক চ্যালেঞ্জিং: রাশিদা সুলতানা

জাকিয়া আহমেদ০৩:০৭, মার্চ ০৮, ২০১৬

রাশিদা সুলতানা‘গাজীপুরে প্রথম পোস্টিং হয় এএসপি হিসেবে। একদিন গাজীপুর চৌরাস্তায় গেলাম  আমার এক সহকর্মীসহ। গাড়ি থেকে নামার পর প্রচুর মানুষ আমাদের ঘিরে দাঁড়ান। তারা আমাদের অবাক চোখে দেখেন। পুলিশের পোশাক পরা দুজন নারী। তাদের কাছে এটা বিস্ময়কর ছিল।’—এভাবেই নিজের পেশাগত জীবনের বর্ণনা দেন রাশিদা সুলতানা। তিনি এখন জাতিসংঘের শান্তি মিশনে কাজ করছেন। জাতিসংঘ শান্তি মিশন দারফুরের কেন্দ্রীয় সেক্টরের প্রশাসনিক প্রধানের দায়িত্ব পালন করছেন। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার হিসেবে কাজ করেছেন ২০১১ সালে। ব্যক্তি জীবনে তিনি দুই সন্তানের জননী। পুলিশের বাইরে তার আরও একটি পরিচয় রয়েছে। তিনি একজন সফল লেখকও। প্রকাশিত হয়েছে তার ছয়টি বই। সম্প্রতি সুদান থেকে কয়েকদিনের জন্য দেশে এসেছেন। এরই মাঝে মুখোমুখে হয়েছেন বাংলা ট্রিবিউনের।

বাংলা ট্রিবিউন:  আপনার বেড়ে ওঠার কথা শুনতে চাই।

রাশিদা সুলতানা: ছোটবেলা থেকেই ঢাকাতে। আইডিয়াল স্কুল, ভিকারুন্নেছা নুন স্কুল অ্যান্ড কলেজ হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে পড়াশোনা করেছি। পড়েছি জাপানের রিৎসুমেইকান বিশ্ববিদ্যালয়েও। তবে, আইডিয়াল স্কুল নিয়ে আমার মিশ্র একটা অনুভূতি রয়েছে। কারণ, স্কুলটি  অনেক বেশি রক্ষণশীল ছিল। স্কুলে সবার, এমনকি একেবারে ক্লাস ওয়ান টু থেকেই মাথায় ঘোমটা দিয়ে যেতে হতো,  ছেলেদের পরতে হতো মাথায় টুপি। ভীষণ কড়া একটা স্কুল ছিল, ওটা একটা ভীতিকর অভিজ্ঞতা। আমার মনে হয়, স্কুল কখনও এমন হওয়া উচিত নয়। ছাত্র-ছাত্রীদের কখনও এত কঠোর নিয়মের ভেতর দিয়ে যাওয়া উচিত নয়। ডিসিপ্লিন যেন নির্যাতন না হয়ে যায়, সেদিকে দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন স্কুলগুলোর। পুরো সিস্টেমটা, বিষয়টা আমার কাছে অস্বাস্থ্যকর, অন্যায় এবং নির্যাতনমূলক লাগত, আমি জানি না এখনও সেই রকম রয়েছে কিনা স্কুলটি। আমি বিশ্বাস করি, পড়ালেখা, শৈশব, কৈশোরে আনন্দের মধ্যে দিয়ে করতে হতে হবে।

তবে, দুই-একজন শিক্ষক ছিলেন, যাদের ব্যক্তিত্ব আমাকে প্রেরণা দিয়েছে। আমাদের বিনোদন কম ছিল। যে পরিমাণ স্বাধীনতা নিয়ে একটা ছেলে বড় হতো, সে রকম আমরা পেতাম না। ঘরের ভেতর থেকে স্কুল আর বাসা। বাইরে গেলেও মায়ের তত্ত্বাবধানে যেতে  হতো। এ রকম কঠোরতার ভেতর দিয়ে আমার শৈশব-কৈশোর কেটেছে।

আর আজকের প্রজন্মের মেয়েদের অনুশাসন অনেক কম। এখনকার প্রজন্ম অনেক বেশি স্বাধীনতা নিয়ে বড় হচ্ছে। ফেসবুক, ম্যাসেঞ্জার, অনেক টিভি চ্যানেল থাকাতে বই পড়ার সময়টা তাদের কম।

বাংলা ট্রিবিউন: নারী অধিকার আদায় ও যৌতুক নিরোধে আপনার পরামর্শ কী?

রাশিদা সুলতানা: আমরা মধ্যবিত্ত শ্রেণি নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও এগিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু নিম্নবিত্তের অবস্থাটা করুণ। সেখানে যৌতুক ছাড়া কোনও বিয়ে হচ্ছে না। প্রতিটি মেয়েকে ৩০ থেকে ৭০ হাজার টাকা যৌতুক দিয়ে বিয়ে দিতে হচ্ছে,  এটা প্রদীপের নিচের অন্ধকারের মতো। নারীর ক্ষমতায়নের অর্জনগুলোকে ম্লান করে দেয়। নীতি নির্ধারকরা বলবেন, যৌতুকবিরোধী শক্তিশালী আইন আছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে এই আইনের প্রয়োগ কম। যৌতুকের জন্য নির্যাতিত নারীরা খুব কমই পুলিশের কাছে রিপোর্ট করেন। দিনের পর দিন নির্যাতিত হয়েও তারা প্রাণপণ চেষ্টা করে সংসার টিকিয়ে রাখতে। যৌতুকের লেনদেন দরিদ্র পরিবারে এত বেশি যে, তা তাদের আরও দরিদ্র করে ফেলছে। যৌতুকের জন্য প্রতিদিন মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত এবং দরিদ্র নারীরা মার খাচ্ছেন। এ থেকে মুক্তি দরকার। আর এর পরিবর্তনের জন্য দরকার সামাজিক সচেতনতা এবং যৌতুকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা। নারী নির্যাতন ও যৌতুকবিরোধী পাঠ্যসূচি মূল কারিকুলামে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। কারণ, আইন দিয়ে নারী নির্যাতন এবং যৌতুকপ্রথা বন্ধ করা যায়নি। এ বিষয়ে সবার মধ্যে সংবেদনশীলতা তৈরি করা সবচেয়ে জরুরি।

বর্তমানে পুলিশে, আর্মি, নেভি, এয়ারফোর্সে  অনেক মেয়ে আসছেন। এটা আমাকে গর্বিত করে। কোনও ধরনের চ্যালেঞ্জ নিতে বাংলাদেশের মেয়েরা আর ভয় পান না, এটা দারুণ ব্যাপার।  আমার অনুরোধ সরকারি নারী-পুরুষ কর্মকর্তা সবার প্রতি, তারা যেন আউট অব বক্স চিন্তা করেন। ইউনিফর্ম পরা নারী অফিসাররা যদি স্কুলগুলোতে গিয়ে যৌতুক প্রথার বিরুদ্ধে কথা বলেন, সেটার প্রভাব সৃষ্টি হবে। এসপি, ডিসি, এএসপি, ইউএনও, ম্যাজিস্ট্রেটরা যদি বলেন স্কুলগুলোতে গিয়ে, জেলা শহরের কলেজগুলোতে গিয়ে যৌতুকের বিরুদ্ধে, নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে কথা বলেন, শিশুদের ভেতরে বই পড়ার জন্য স্বপ্নের বীজ, সচেতনতার বীজ বুনে দেন তাহলে তা সমাজ পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। যৌতুকের বিরুদ্ধে  যেকোনওভাবেই হোক জনযুদ্ধ ঘোষণা করতে হবে।

বাংলা ট্রিবিউন: পেশাগত জীবনে আপনার সংগ্রাম ও অর্জন সম্পর্কে কিছু বলুন।

রাশিদা সুলতানা: নিজের চোখের সামনে দুজন দৃঢ়চেতা নারী দেখে বড় হয়েছি। তারা হলেন নানু ও মা। তারা দুজনেই অত্যন্ত দৃঢ়চেতা মানুষ। তাদের অনুপ্রেরণায় নিজের স্বপ্নের প্রতি, ইচ্ছার প্রতি কমিটেট থেকেছি। 

আমি শৈশব, কৈশোরে  যেভাবে নিজেকে দেখতে চেয়েছি সেই বয়সে, এই বয়সে আমি সেখানেই রয়েছি। অল্প বয়সে বিয়ে হয়েছে, সন্তানের মা হয়েছি কিন্তু আমি জানতাম আমার স্বপ্ন কী, জানতাম কোথায় আমাকে যেতে হবে, কোথায় যেতে চাই। মাস্টার্স পরীক্ষার অল্প কিছুদিন আগেই ১৮তম বিসিএস লিখিত পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করি। সহকারী পুলিশ সুপার হিসেবে চাকরি পাই। কিন্তু পরের বিসিএসে অংশ নিলে আমি প্রশাসন ক্যাডার চাকরি পাই। তখন পরিবারের সবাই চান যে, আমি প্রশাসনে কাজ করি, কারণ পুলিশের কাজটা খুব বেশি চ্যালেঞ্জিং। কিন্তু এই প্রথম আমি পরিবারের সবার মতের বিরুদ্ধে গেলাম। কারণ, আমার মধ্যে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ নেওয়ার ইচ্ছা  ছিল সবসময় এবং চ্যালেঞ্জ আমি এখনও নিতে পছন্দ করি। আমি ব্যক্তিজীবনে কোনও কমফোর্ট জোনে থাকতে পছন্দ করি না। জীবনে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি আমাকে হতে হয়েছে। যেগুলো আমাকে ঋদ্ধ করেছে, শক্তিশালী করেছে।

আর পুলিশ একাডেমির ট্রেনিংয়ে শারীরিক এবং মানসিক কষ্ট ছিল অবর্ণনীয়। আদরে ভালোবাসায় বেড়ে ওঠা মেয়ে আমি, সেখানে নানা অভিজ্ঞতায় দিন কেটেছে আমার। তখন হাজারটা সমস্যার মুখোমুখি হয়েছি প্রতিদিন। আজ লেখক হিসেবে, মানুষ হিসেবে যতটা ম্যাচিউরড, জাতিসংঘের মতো জায়গায় যতটা আত্মবিশ্বাস নিয়ে কাজ করছি, বিভিন্ন সমস্যা মোকাবিলা করছি তা হয়তো এত সহজে পারতাম না। যদি না বাংলাদেশের চাকরিতে চ্যালেঞ্জগুলোর ভেতর দিয়ে আমাকে যেতে না হতো। তাই আমি আর এখন চাই না আমার সন্তান যেন থাকে দুধে-ভাতে। আমি চাই তারাও নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হোক, তারা সেগুলো মোকাবিলা করুক। তবেই তারা শক্তিশালী মানুষ হয়ে বেড়ে উঠবে।

গাজীপুরের এএসপি দিয়ে চাকরি জীবন শুরু। তারপর গোয়েন্দাবিভাগে (ডিবি) কাজ করেছি। আমার রাজনৈতিক বোধ, রাজনৈতিক সচেতনতা, লেখক হিসেবে আমার যে বিদ্রোহী সত্তা, এ সব কিছুর জন্য সিভিল সার্ভিসের, পুলিশ সার্ভিসের যে সংস্কৃতি, এ সবের কাছে কৃতজ্ঞ।

পুলিশের চাকরি অথবা সরকারি, বেসরকারি সবখানেই বাংলাদেশের মেয়েদের জন্য  চাকরি করাটা চ্যালেঞ্জিং। কর্মক্ষেত্রে বাংলাদেশের বেশিরভাগ সহকর্মীই জাজমেন্টাল মনোভাব দেখান মেয়েদের বিষয়ে। সাধারণ মানুষের অনেক উৎসাহ, উদ্দীপনা, ভালোবাসা, সাহস পেয়েছি পুলিশে যোগদানের পরে।

বাংলা ট্রিবিউনের প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলছেন রাশিদা সুলতানা

 

বাংলা ট্রিবিউন: জাতিসংঘের শান্তি মিশনে কখন গেলেন, সেখানের অভিজ্ঞতা কেমন?

রাশিদা সুলতানা:   আমি দারফুর প্রথম যাই ২০০৭-এর ডিসেম্বরে। এর আগে নভেম্বরে যাই খারতুমে। সুদানে তাপমাত্রা অনেক সময় ৪৫ থেকে ৪৭ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড পর্যন্ত ওঠে। এটা ছিল ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা।  প্রথমদিকে খুব কষ্ট হতো। তারপর যখন দারফুরে যাই, তখন সেখানে পুরোদস্তুর যুদ্ধ চলছিল। পুরো শহরজুড়ে প্রতিদিন গোলাগুলি হতো, মনে করতাম আমরা যুদ্ধক্ষেত্রের ভেতরেই রয়েছি। জাতিসংঘের একটা বিষয় রয়েছে যে, তারা চেষ্টা করে, তাদের কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে।

তারপরও বেশকয়েকজন সহকর্মী কিডন্যাপড হয়ে যান, যদিও পরে তারা প্রত্যেকে ছাড়া পেয়েছেন। প্রায় চার থেকে পাঁচমাস পর।

শুরুতে আমাদের নারী কর্মকর্তারা আইডিপি ক্যাম্পে গেল বা বাজারে গেলে স্থানীয় লোকদের প্রতিরোধের মুখোমুখি হতো। শরিয়া আইনের দেশে প্যান্ট শার্ট পরা মেয়েদের ঘুরে বেড়াতে দেখতে স্থানীয়দের কেউ কেউ পছন্দ করতেন না।

এখন সেই অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। এখন বরং দারফুরের মানুষেরা চান না, ইউএন মিশন সেখানে বন্ধ হয়ে যাক, তারা নানাভাবে মিশনের ওপর নির্ভর করেন, অনেকে এখানে চাকরিও করছেন।

বাংলা ট্রিবিউন:  আপনার আরেক পরিচয়, আপনি একজন লেখক।  এখন কী লিখছেন?

রাশিদা সুলতানা: নতুন উপন্যাস লিখতে শুরু করেছি।  উপন্যাসটা শেষ করতে চাই। খসড়া লেখা হয়ে গেছে। তবে নাম এখনও ঠিক করিনি। সময়ের অভাবে লেখা শেষ করতে পারছি না।

বাংলা ট্রিবিউন: নারী সাংবাদিকদের কিভাবে মূল্যায়ন করবেন?

রাশিদা সুলতানা:  বাংলাদেশে অনেক নারী এখন সাংবাদিকতা করছেন। নানা জায়গায় তারা কাজের প্রয়োজনে ছুটে যাচ্ছেন, স্কুটি চালাচ্ছেন। এটা তো রীতিমতো বিপ্লব মনে করি আমি। আমি তো দেখি, ভালো-ভালো নিউজগুলোর বেশিরভাগই মেয়েরা করছেন। এটা দেখে কিন্তু গ্রামের মানুষরাও উৎসাহিত হচ্ছেন। তারাও নিজেদের মেয়েকে সেখানে দেখার স্বপ্ন দেখেন, প্রচলিত সব ট্যাবুগুলো ভেঙে যাচ্ছে।

 

ছবি: সাজ্জাদ হোসেন

/এমএনএইচ/

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune
টপ