একান্ত সাক্ষাৎকারে ডা.তানভীর আহমেদসাংবাদিক-পুলিশ দেখলে মাথা গরম হয়ে যেত

Send
জাকিয়া আহমেদ
প্রকাশিত : ০৮:২৪, মার্চ ২৩, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ২১:৪৬, মার্চ ২৩, ২০১৬

ডা. তানভীর আহমেদবয়সে তরুণ হলেও এরই মধ্যে রয়েল অস্ট্রেলেশিয়ান কলেজ অব সার্জনস এবং রয়েল কলেজ অব সার্জনস ইন ইংল্যান্ড অ্যান্ড ব্রিটিশ প্লাস্টিক সার্জারি অ্যাসোসিয়েশন-এ স্কলারশিপ পেয়ে ডিগ্রি নিয়ে এসেছেন তিনি। আর কিছুদিনের মধ্যেই যাচ্ছেন আমেরিকান কলেজ অব সার্জনস এবং আমেরিকান সোসাইটি অব প্লাস্টিক সার্জনস-এ। পৃথিবী বিখ্যাত এই চার প্রতিষ্ঠানে প্রথম বাংলাদেশি প্লাস্টিক সার্জন হিসেবে যিনি স্কলারশীপ পেয়ে লেখাপড়ার সুযোগ পেয়েছেন, তিনি ডা. তানভীর আহমেদ। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের এই সহকারী অধ্যাপক জানান, বার্ন  ইউনিটে কাজ করতে পেরে তার জীবন ধন্য। জানালেন,বিদেশে পড়ার কারণে তার আচরণগত পরিবর্তন হয়েছে, যা একজন চিকিৎসকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

সম্প্রতি কথা হয় এই চিকিৎসকের সঙ্গে।‍ তিনি জানান, পৃথিবীর বিখ্যাত এসব প্রতিষ্ঠানে পড়তে গিয়ে প্রত্যক্ষ করেছেন উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার এবং চিকিৎসকদের আচরণগত পার্থক্য। তবে একই সঙ্গে বললেন, গরীব দেশ হিসেবে বাংলাদেশের রয়েছে সীমাবদ্ধতা, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিট আর্শীবাদ। নয়তো এতো পোড়া রোগীর চিকিৎসা দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়তো।

ডা.তানভীর জানালেন, পৃথিবীর সবচেয়ে পুরানো প্রতিষ্ঠান-আমেরিকান কলেজ অব সার্জনস, এখান থেকে সার্জারিতে সবচেয়ে উচ্চতর ডিগ্রি দেওয়া হয়।সেখানে আমি পড়তে যাচ্ছি এটা অনেক বড় পাওয়া।

বললেন, এটা এমন না যে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য,পূর্ণমাত্রায় প্রতিযোগিতার ভেতর দিয়ে আমি এই স্কলারশিপ পেয়েছি। এটা এই ইন্সটিটিউটের ১০২ দুই বছরের ইতিহাস। বাংলাদেশ থেকে আমি তৃতীয় ব্যক্তি যিনি এই স্কলারশিপ পেয়েছি। এর আগে এখানে গিয়েছেন বাংলাদেশের চিকিৎসাজগতের খুব স্বনামধন্য দুজন অধ্যাপক। একজন বিএসএমএমইউ-র শিশু সার্জারি বিভাগের চেয়ারম্যান প্রফেসর শফিকুল হক আরেকজন হলেন প্রফেসর সর্দার আবু নাঈম-যিনি বাংলাদেশে ল্যাপারস্কপি সার্জারি প্রথম চালু করেন।তবে প্লাস্টিক সার্জনদের ভেতরে আমি প্রথম।

ডা.তানভীর ২০১৩ তে যান অস্ট্রেলিয়ার রয়েল অস্ট্রেলেসিয়ান কলেজ অব সার্জনসে। এখানেও বাংলাদেশ থেকে আর কেউ যাননি আগে।এরপরে তিনি ২০১৩ এর সেপ্টেম্বরে যান রয়েল কলেজ অব সার্জনস ইন ইংল্যান্ড অ্যান্ড ব্রিটিশ প্ল্যাস্টিক সার্জারি অ্যাসোসিয়েশন।

জানালেন,এসব প্রতিষ্ঠানে প্রতিযোগিদের প্রতিটি বিষয় খুব অ্যাডুকেশন-স্কুল, কলেজ, মেডিক্যাল স্টাডি, পোস্ট গ্রাজুয়েশন, রিসার্চ, পাবলিকেশন্স, এক্সট্রা কারিকুলাম অ্যাক্টিভিটিজ, ভলান্টারি কাজ সব কিছু দেখা হয়। খুব টাফ এটা। একই সঙ্গে নিজের ব্যক্তিগত তথ্যাদিও দিতে হয় এ কারণে যে, আমি কেন এই স্কলারশিপ চাই, পেলে আমার কি চেঞ্জ হবে এবং আমার জীবনে কতোটা প্রভাব ফেলবে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ  আমার দেশের কী উপকার হবে। এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রেফারেন্স।

ডা. তানভীর আহমেদতিনি বলেন,আমি খুব কৃতজ্ঞ বার্ন ইউনিটের বর্তমান পরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আবুল কালাম স্যার,ডা.সামন্ত লাল সেন স্যার,অধ্যাপক রায়হানা আউয়াল ম্যাম এবং অধ্যাপক সাজ্জাদ খন্দকার স্যার এবং প্রফেসর শাফকাত খন্দকারের কাছে।


একই সঙ্গে সরকারের কাছেও কৃতজ্ঞ বার্ন ইউনিটে কাজ করতে দেওয়ায়।কারণ,প্রতিটি মানুষের যে কোনও ধরণের ডেভেলপমেন্টের জন্য পরিবেশ-পরিস্থিতি মূখ্য ভূমিকা পালন করে।

আগে সাংবাদিক, পুলিশ, রোগীর লোক দেখলেই মাথা গরম হয়ে যেতো জানিয়ে ডা. তানভীর  বলেন, কিন্তু কতো সময় ধরে আপনার সঙ্গে কথা হচ্ছে।এই আচরণগত পরিবর্তনটাই আমাকে সবজায়গায় বদলে দিয়েছে।অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ড থেকে ফিরে আসার পর আমার আমুল পরিবর্তন  হয়েছে।শুধুমাত্র রোগীর সঙ্গে ওদের অ্যাপ্রোচ – এই বিষয়টাই আমি শিখেছি, যেটা আমাকে বদলে দিয়েছে।

আমাদের দেশে  সবার অভিযোগ, ডাক্তারদের অ্যাপ্রোচ ও ব্যবহার ভালো না। আমি এখন বুঝতে পারি, আমার অ্যাপ্রোচ, রোগীর সঙ্গে কথা বলা, তাদেরকে হ্যান্ডেল করা-ব্যবহারগত, আচরণগত এই বদল ওখানে না গেলে হতো না।

বললেন, ওরা যে খুব ভালো সার্জারি করে সেটা আমি বলছি না। আমাদের দেশে অধ্যাপক আবুল কালাম, ডা. সামন্ত লাল সেন, অধ্যাপক শাফকাত তারা যেই মানের সার্জন এটা চিন্তাই করা যায় না।

আমাদের দেশে, রোগী এলেই ওষুধ দিতে হবে, অপারেশন করতে হবে এটাই ছিল আগে ভাবনা।কোন রোগীর অপারেশন করা যাবে না এই চিন্তাই আমার মাথায় আগে ছিল না।ওখানে জ্বরের রোগী এলে তাকে মোটিভেট করা হয়, বলা হয় জ্বর সেরে যাবে কিন্তু এখানে ডাক্তারের কাছে গেলেই আমরা ওষুধ দিয়ে দিচ্ছি।

হেলথ সিস্টেমে যে কত অ্যাডভান্স টেকনোলজি চলে এসছে, বিশ্ব যে কোথায় চলে গেছে, আর আমরা যে কোথায় পড়ে আছি- এটা ওখানে না গেলে বুঝতাম না।

ওরা যে টেকনোলজি নিয়ে অপারেশন করে সে তুলনায় আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। নিয়ম হচ্ছে, একটা হাসপাতালের সার্জিক্যাল ইন্সট্রুমেন্টস প্রতিবছর বদলে ফেলতে হবে, কিন্তু আমাদের গরীব দেশে সেটা সম্ভব নয়।এই সক্ষমতা অর্জন করতে আমাদের কতো বছর লাগবে  জানি না।

তিনি বলেন, সত্যিকার অর্থে বাংলাদেশের কোনও সরকারি হাসপাতালই আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে  তুলনা করতে পারবো না। শুধুমাত্র রোগীর সংখ্যার দিক দিয়ে আমরা এগিয়ে আছি। আমরা বলতে পারি, এতো সংখ্যক রোগীকে আমরা চিকিৎসা দিচ্ছি, এতো রোগীর অপারেশন করছি, এতো মানুষকে সেবা দিচ্ছি, এটা বিশ্বের অন্য কোথাও হয় না, এটা সত্যি কথা।কিন্তু কোয়ালিটি অব সার্ভিসে অনেক পিছিয়ে রয়েছি আমরা।

তবে বার্ন ইউনিট আমাদের দেশে একটা বিপ্লবের মতো।এটা না থাকলে এতো পোড়া রোগী কোথায় চিকিৎসা করাতেন। সরকার এখানে অনেক সাহায্য করছে। গরীব দেশ।মানুষের সক্ষমতা কম, সরকারেরওতো সক্ষমতা কম।অন্য কোনও গরীব দেশে এধরণের বিনামূল্যে চিকিৎসা নেই, বেশিরভাগ দেশেই পেইড সিস্টেম করে ফেলেছে।

বার্ন  ইউনিট চলছে শুধুমাত্র সবার সদিচ্ছার কারণে।এতো রোগীদের চিকিৎসা দেই, স্যাররা সামনে থেকে লিড দেন আমরা তাদের পেছনে আছি। সরকার এখানে উদারভাবে সাহায্য করছে, সাধারণ মানুষ মনখুলে দান করছে। আর রোগীরা অনেক বেশি আস্থাশীল আমাদের প্রতি, তারা অনেক ধৈর্য ধরে আমাদের কথা শোনে। আর আমরা ডাক্তাররাও যথাসাধ্য চেষ্টা করি। ধীরে ধীরে আমাদের সক্ষমতা বাড়ছে।ব্যক্তিগতভাবে বার্ন ইউনিটে কাজ করে আমার জীবন ধন্য হয়েছে এটা বলতে পারি।

এপিএইচ/ 

লাইভ

টপ