আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণায় নেতৃত্বের অবহেলা রয়েছে: সাক্ষাৎকারে গয়েশ্বর

Send
আদিত্য রিমন
প্রকাশিত : ১৮:৫৮, এপ্রিল ২৬, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২২:৩২, এপ্রিল ২৬, ২০১৯

বাংলা ট্রিবিউনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে গয়েশ্বর চন্দ্র রায়  ‘মাঠ পর্যায়ে দলীয় কর্মসূচির সফলতা নিয়ে সংশয় দেখছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। তার মতে, আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণায় যেমন কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অবহেলা রয়েছে, তেমনি তৃণমূল নেতাকর্মীরা আন্দোলন সফল করতে পারবেন কিনা তা নিয়েও সংশয় রয়েছে। ফলে কিছু লোকের প্রতিবাদী কণ্ঠ আর বাস্তবতা এক নয়। সুতরাং আমাদের ঘাটতি দুইদিকেই আছে।’

সমসাময়িক রাজনীতি, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন, খালেদা জিয়ার প্যারোলে মুক্তি নিয়ে আলোচনা, বিএনপির নির্বাচিতদের শপথ ও আন্দোলন সংগ্রাম নিয়ে বাংলা ট্রিবিউনকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে গয়েশ্বর চন্দ্র রায় এসব কথা বলেন। ১৫ এপ্রিল নেওয়া সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হলো—

বাংলা ট্রিবিউন: বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীরা আন্দোলন চায় আর আপনারা নীতিনির্ধারকরা আন্দোলনের ডাক দিচ্ছেন না। এ নিয়ে বিভিন্ন আলোচনা সভায় তৃণমূল নেতাকর্মীদের মুখোমুখি হতে হচ্ছে কেন্দ্রীয় নেতাদের।
গয়েশ্বর চন্দ্র রায়: এটাকে যদি আমি খোলাখুলি বলি, তাহলে বলতে হয় ম্যাডামের (খালেদা জিয়া) মুক্তি চায় না দলে এমন কোনও লোক নেই। এখন যারা আন্দোলনের কর্মসূচি দেবেন সেই নেতাদের মধ্যে একটা সংশয় কাজ করে যে কর্মসূচিটা যথাযথভাবে পালন হবে কিনা। তৃণমূলের যে দাবি সেটাও অযৌক্তিক নয়। কিন্তু কোনও সিদ্ধান্ত দিতে গেলে সার্বিক সামর্থ্যের ও পরিবেশ পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করতে হয়। আমাদের তো অনেক ক্ষতি হয়েছে। অনেক নেতাকর্মী হামলা-মামলার শিকার হয়েছেন। অনেকে খুন, গুম হয়েছেন। এখন আন্দোলন নিয়ে দলে কিন্তু সংশয় দুই ধরনের আছে। তৃণমূলের একশ্রেণির কর্মীদের যেমন ডিমান্ড আছে বা ঊর্ধ্বতন নেতাদের অবহেলা-অগ্রাহ্য তাদের চোখে পড়ে। আবার ঊর্ধ্বতন নেতৃবৃন্দও কর্মসূচি দেওয়ার আগে ভাবেন আন্দোলন সফল হবে কিনা, বা কর্মীরা সফল করতে পারবে কিনা অথবা দেশে সেই ধরনের পরিস্থিতি আছে কিনা। এই বিষয়গুলো কিন্তু মাঠে পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়। এখন কিছু লোকের প্রতিবাদী কণ্ঠ আর বাস্তবতাটা কিন্তু এক নয়। সত্য কথাটা বলা যত সহজ, বাস্তবায়ন করা তত সহজ নয়।
বিএনপির যখন হরতাল-অবরোধের মতো কর্মসূচি ছিল তখন পত্রপত্রিকায় অনেকে তিরস্কার করেছে মাঠে লোক নাই- এই বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই মাঠের লোক কারা? তৃণমূলের কর্মীরাই তো মাঠের লোক। সুতরাং আমাদের ঘাটতি দুইদিকেই আছে। সাংগঠনিকভাবে তৃণমূলকে সংঘটিত করে রাস্তায় নামানোর ব্যাপারেও আমাদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা আছে। এখন প্রশ্ন হলো পরস্পর পরস্পরের প্রতি আস্থা তৈরি হয় কর্মের মধ্য দিয়ে। আর আন্দোলন হবে না এমন সিদ্ধান্ত তো বিএনপি নেয়নি। পরিবেশ পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে আন্দোলনের গতি কখন কোনদিকে যাবে। আর বিএনপি কেমন আন্দোলন করতে পারে সেটা তো ২০১৩, ১৪ ও ১৫ সালে প্রমাণ হয়েছে। ২০১৪ সালের নির্বাচনের সময় তো রাজধানী ছাড়া পুরো বাংলাদেশই যুক্ত ছিল বিএনপিতে। ব্যারিস্টার রফিকুল হক টেলিভিশনে বলেছিলেন, রাজধানীর মালিক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আর বাংলাদেশের মালিক খালেদা জিয়া। ফলে অতীত ইতিহাস বলে আমরা আন্দোলন করতে পারি। কিন্তু আমাদের বুঝতে হবে বর্তমানে প্রশাসন মাঠে-ময়দানে সবকিছু সরকারের নিয়ন্ত্রণে রেখেছে।
প্রশাসনের লোকজন এখন দলীয় নেতাকর্মীদের চাইতে বেশি অ্যাগ্রেসিভ (আক্রমণাত্মক) দাবি করে সাবেক এ মন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগের একমাত্র শক্তি পুলিশ প্রশাসন। কারণ, পুলিশকে জনগণের মুখোমুখি করে দিয়েছে তারা। রাতের বেলায় ভোট ডাকাতি বা সিল মারামারি যা কিছু করেছে তা প্রশাসনের মাধ্যমে করেছে। আওয়ামী লীগের নিজস্ব সাংগঠনিক শক্তি দিয়ে ভোটকেন্দ্র দখল করতে পারেনি তারা। আন্দোলনের সময়ও ২০ দলীয় জোটকে আওয়ামী লীগ সাংগঠনিক শক্তি দিয়ে মোকাবিলা করার সামর্থ্য প্রমাণ করতে পারেনি। অর্থাৎ প্রশাসনের কর্মকর্তারা চাকরির ভয়ে বা অন্য কোনও কারণে হোক তারা দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে পারেনি। আমাদের এই বিষয়টা বিবেচনায় রাখতে হবে।
বিএনপি বহুদলীয় গণতন্ত্রে বিশ্বাসী উল্লেখ করে গয়েশ্বর বলেন, যারা ক্ষমতায় আছে তারা অন্য রাজনৈতিক দলের অস্তিত্ব সহ্য করতে পারে না। বহু দল ছাড়া গণতন্ত্র হয় না। বর্তমান সরকার চলছে একদলীয় শাসনের দিকে, সেখানে আমরা গণতান্ত্রিক আন্দোলন করবো প্রকাশ্য মাঠে। বিএনপি তো কোনও গোপন সংগঠন নয়। গণতন্ত্রের আন্দোলন আর স্বাধীনতার যুদ্ধের আন্দোলন এক নয়। অর্থাৎ বিএনপি তো সশস্ত্র বিপ্লবে বিশ্বাস করে না। এই সীমিত সুযোগের মধ্য দিয়ে, যতটুকু সম্ভব নানা প্রতিবাদের মধ্য দিয়ে প্রতিবাদের ভাষা চালু রাখতে হবে।
বাংলা ট্রিবিউন: একাদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপির বিজয়ী সংসদ সদস্যরা শপথ নেবেন কিনা
গয়েশ্বর চন্দ্র রায়: বাংলাদেশে তো একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়নি। এটা বিএনপির বিপর্যয় নয়, জাতীয় বিপর্যয়। দলমত নির্বিশেষে সবার মতামত, ভোটাররা ভোট দিতে পারেন নি। ফলে বিএনপির বিপর্যয় শব্দটার সঙ্গে আমি একমত নয়। এটা সারা জাতির বিপর্যয়। সুতরাং যারা সরকারে আছে, সংসদে কথা বলে, তারাও লজ্জা পায় তারা কীভাবে সংসদ সদস্য হয়েছেন তারা নিজেরাও জানেন না। ফলে তারাও জয়লাভ করেননি, বিএনপিও পরাজিত হয়নি। কারণ, জয়-পরাজয় নির্ধারণ করেন সাধারণ মানুষ ও ভোটাররা। ফলে আমাদের সংসদে যাওয়ার কোনও সিদ্ধান্ত নেই।
বাংলা ট্রিবিউন: রাজনৈতিক অঙ্গনে একটা গুঞ্জন রয়েছে- খালেদা জিয়ার মুক্তির বিপরীতে বিএনপির নির্বাচিত ৬ সংসদ সদস্য শপথ গ্রহণ করবেন
গয়েশ্বর চন্দ্র রায়: এটা নিয়ে মানুষের মধ্যে সংশয় থাকাটাই স্বাভাবিক। কারণ, ইতোমধ্যে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের দুইজন সংসদ সদস্য শপথগ্রহণ করেছেন। আমরা দলীয়ভাবে এই ধরনের আলোচনার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। এই রকম কোনও সিদ্ধান্তও হয়নি যে এই শর্তে ম্যাডামের (খালেদা জিয়া) মুক্তি জড়িত। এটা নিয়ে এখনও কোনও আনুষ্ঠানিক মিটিং হয়নি। আড়ালে-আবড়ালে কেউ যদি এই রকম মনোভাব পোষণ করেন, সেটা তাদের মনে আছে। যতক্ষণ পর্যন্ত এই কথাগুলো মিটিংয়ে না আসবে, ততক্ষণ এ বিষয়ে মন্তব্য করার সুযোগ নেই।
বাংলা ট্রিবিউন: খালেদা জিয়া প্যারোলে মুক্তি নিতে পারেন বলে গুঞ্জন রয়েছে। আপনি তো তার সঙ্গে (১৪ এপ্রিল) দেখা করেছেন, তিনি কি প্যারোলে মুক্তি নেওয়ার বিষয়ে কিছু বলেছেন?
গয়েশ্বর চন্দ্র রায়: আমরা কিন্তু নিজেদের মামলা ও ম্যাডাম খালেদা জিয়ার মামলাগুলো আইনি প্রক্রিয়ায় মোকাবিলা করছি। বাংলাদেশের প্রচলিত আইন এবং কনভেনশন বলে- এই জাতীয় শাস্তি, সাজা সত্য-মিথ্যা যাই হোক এবং অ্যাপিলেট ডিভিশনে চূড়ান্ত মীমাংসা হওয়ার আগ পর্যন্ত জামিনে থাকার নিয়ম আছে। ম্যাডামকে যতদিনই শাস্তি দেওয়া হোক না কেন তা আমরা যথাযথ মনে করি না। কারণ, এটা সরকারের ইচ্ছা বাস্তবায়নের শাস্তি। তারপরও আইনের মাধ্যমে তার জামিন হওয়ার সুযোগ আছে। দেশে শত শত দৃষ্টান্ত আছে ২০ থেকে ২৫ বছর সাজা হওয়ার পরও তারা জামিন পেয়েছেন। সুতরাং আমরা তো অনবরত চেষ্টা করছি তার জামিনের জন্য। জামিন যে কেন হচ্ছে না, তার (খালেদা জিয়া) ক্ষেত্রে আইনের প্রয়োগ দেখলে বোঝা যায়। যখন একজন সাধারণ লোক জামিন পান কিন্তু মাসের পর মাস, বছরের পর বছরও তার (খালেদা জিয়া) জামিন হয় না। অর্থাৎ এখানে নিশ্চয় সরকারের বাধা-বিপত্তি বা ইচ্ছাকে আদালত উপেক্ষা করতে পারে না। এটা কিন্তু দৃশ্যমান। ফলে সরকার যদি প্যারোলে মুক্তি দিতে পারে, তাহলে জামিনে বাধা দেয় কেন? কারণ, প্যারোলে মুক্তি তো সরকারের কাছে চাইতে হবে। আমি প্যারোলে মুক্তি চাইলাম আর সরকার যদি সেটা গ্রহণ করতে পারে, তাহলে আমি আদালতের মাধ্যমে জামিন চাই সেখানে বাধা দেয় কেন। আইনে যেখানে খালেদা জিয়াকে জামিন দেওয়ার বিধান আছে, সেখানে তিনি প্যারোলে মুক্তি চাইবেন কেন? প্যারোলে মুক্তি মানেই নানা শর্ত। জামিনও নিঃশর্ত না। উচ্চ আদালতে যখন মামলা মীমাংসিত হবে তখন বোঝা যাবে আগের রায় বহাল আছে কিনা।
বাংলা ট্রিবিউন: বিএনপির অনেক নেতা বলছেন, আইনি প্রক্রিয়ায় খালেদা জিয়াকে মুক্ত করা সম্ভব নয়। এটাকে কীভাবে ব্যাখা করবেন।
গয়েশ্বর চন্দ্র রায়: এই কথার সঙ্গে আমি একমত নই। আইনি প্রক্রিয়ায় খালেদা জিয়ার জামিন হতে পারে, বাধা সরকার। আর আমি যদি বলি আইনি প্রক্রিয়ায় তার জামিন হবে না, তাহলে মনে হয় আইনের বিধান নাই তাকে জামিন দেওয়ার। ফলে সরকারের সেই বাধা দূর করার জন্য আন্দোলন করা দরকার। রাজনৈতিক দলের নেতা কারাগারে যাওয়ার পর তাকে মুক্ত করতে শুধু আইনি প্রক্রিয়া না, রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলাও করতে হয়। আইনি প্রক্রিয়া ও আন্দোলন পাশাপাশি থাকে, অতীতেও তাই হয়েছে। অতীতেও দেখা গেছে, আন্দোলনের চাপে আদালত অসহায় হয়ে মুক্তি দিয়েছে। এই রকম ইতিহাসও বাংলাদেশে আছে। ৬৯ সালে আন্দোলনের চাপে অনেক নেতা কারাগার থেকে মুক্ত হয়েছেন।
বাংলা ট্রিবিউন: বিএনপির কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের সময় শেষ হয়ে গেছে। কবে কাউন্সিল হবে।
গয়েশ্বর চন্দ্র রায়: সারাদেশে সংগঠনকে পুনর্গঠন করার যে প্রক্রিয়া শুরু এটাই তো কাউন্সিলের প্রস্তুতির দিকে ধাবিত হচ্ছে নাকি? কারণ, একটা বড় সমাবেশ করে কেন্দ্রীয় কমিটি করার নামই কিন্তু কাউন্সিল না। কাউন্সিল মানেই নিচ থেকে উঁচু সব স্তরে সংগঠনকে সংগঠিত করা। এটা চললে যথাযথ সময়ে কেন্দ্রীয় কাউন্সিলও হবে। হবে না এই কথাটা বলার সুযোগ নেই। তবে কবে হবে সেই তারিখটা তো নির্ধারিত নয়। নির্ধারিত তারিখ ঘোষণা করারও কিছু নিয়ম-কানুন আছে। আমরা অবশ্যই আশা করছি, আগামী কাউন্সিলও নেত্রী খালেদা জিয়ার সভাপতিত্ব ও উপস্থিতিতে হবে।

/ওআর/এমওএফ/

লাইভ

টপ