বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫১ শতাংশ নারী হলেও তাদের সার্বিক জীবনযাত্রা, আত্মমর্যাদা এবং সামাজিক নিরাপত্তার ভিত্তিটি আজও এক গভীর ও জটিল সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশের শ্রমশক্তিতে নারীদের অংশগ্রহণের হার ৪২.৭ শতাংশ হলেও এই সংখ্যার আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে নারীদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও দৈনন্দিন জীবনের এক চরম অনিশ্চয়তার চিত্র।
অতীতে ভাগ্যোন্নয়নের আশায় প্রবাসে পাড়ি জমানোর এক প্রবল প্রবণতা নারী শ্রমিকদের মধ্যে দেখা যেতো, যেখানে কোভিড-১৯ মহামারির আগে প্রতি বছর প্রায় এক লাখের বেশি নারী কাজের সন্ধানে বিদেশে যেতেন। তবে ২০২২ সালের পর থেকে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে নারী গমনের এই হার অস্বাভাবিকভাবে কমতে শুরু করে। সরকারি ‘ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট প্ল্যাটফর্ম’-এর তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৬ ডিসেম্বরের মধ্যবর্তী সময়ে মাত্র প্রায় ৫৬ হাজার ২৯২ জন নারী কাজের উদ্দেশ্যে বিদেশে গিয়েছেন, যা ২০২২ সালের তুলনায় প্রায় ৪৭ শতাংশ কম। কাজের উদ্দেশ্যে বিদেশে যাওয়ার এই হার হ্রাস পাওয়া কেবল অর্থনৈতিক মন্দার প্রকাশ নয়, বরং এর নেপথ্যে রয়েছে নারী নিরাপত্তার এক ভয়াবহ ও অমীমাংসিত সংকেতের ছায়া।
দেশের প্রবাসগামী নারী শ্রমিকের সংখ্যা কমার সঙ্গে সঙ্গে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক পরিসরে নারীদের ওপর শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক সহিংসতার মাত্রা জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত পাঁচ বছরের সার্বিক চিত্র গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় যে নারী ও কন্যাশিশুদের প্রতি নিষ্ঠুর নির্যাতনের মাত্রা কতটা অনিয়ন্ত্রিত রূপ ধারণ করেছে। প্রতিদিনের সংবাদের পাতায় কিংবা সামাজিক বাস্তবে যৌন হয়রানি, ধর্ষণ, পারিবারিক সহিংসতা এবং নির্মম হত্যাকাণ্ডের ঘটনাগুলো এখন দৈনন্দিন চালচিত্রে পরিণত হয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, গত পাঁচ বছরের ব্যবধানেই দেশে প্রায় ১২ হাজার নারী ও কন্যাশিশু চরম সহিংসতার শিকার হয়েছেন এবং এর মধ্যে ৬ হাজারের বেশি নারী ও শিশু নৃশংস ধর্ষণের মুখোমুখি হয়েছেন। অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হলো, নারীর প্রতি এই পাশবিক নির্যাতন ও বৈষম্যের পরিধি এখন আর কেবল অভ্যন্তরীণ ভৌগোলিক সীমানায় সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা নতুন রূপ লাভ করে আন্তর্জাতিক সিন্ডিকেটের হাতে লাভজনক পণ্যে পরিণত হয়েছে।
নারীর প্রতি এই সহিংসতার সবচেয়ে শঙ্কা জাগানো আন্তদেশীয় প্রকাশ ঘটেছে ভুয়া বিয়ের ফাঁদে ফেলে বাংলাদেশি নারীদের চীনে পাচার করার ক্রমবর্ধমান চক্রের মধ্য দিয়ে। ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যবর্তী মাত্র পাঁচ বছরের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, প্রায় ৪ হাজার ২৩৬ জন বাংলাদেশি নারী পারিবারিক ভিসায় চীনে ভ্রমণ করেছেন। এই বিশাল সংখ্যক নারীর একটি বড় অংশকেই উন্নত জীবনের লোভনীয় স্বপ্ন দেখিয়ে, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুরক্ষার মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে, অথবা কোনও কোনও ক্ষেত্রে জোরপূর্বক বিয়ে করে চীনে নিয়ে পাচার করে দেওয়া হচ্ছে।
পাচারকারী সিন্ডিকেটগুলো অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে দেশের আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়া, স্বল্প শিক্ষিত এবং বিশেষ করে পার্বত্য অঞ্চলের নিরীহ ও সরল প্রকৃতির আদিবাসী নারীদের নিজেদের প্রধান টার্গেটে পরিণত করছে। আপাতদৃষ্টিতে একে সাধারণ বা বৈধ আন্তর্জাতিক বিবাহ মনে হলেও এর নেপথ্যে কাজ করছে এক ভয়াবহ মানব পাচার চক্র, যারা পারিবারিক ভিসাকে আইনি ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে নারীদের এক চরম অনিশ্চিত জীবনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
এই সুসংগঠিত আন্তর্জাতিক পাচারচক্রটির কার্যক্রম পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এতে কেবল চীনা নাগরিকরাই যুক্ত নয়, বরং তাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সক্রিয় রয়েছে স্থানীয় একশ্রেণির অসাধু মধ্যস্থতাকারী সিন্ডিকেট। তারা অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে আমাদের সমাজব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক কাঠামোর ভেতরের মৌলিক দুর্বলতাগুলোকে নিজেদের অপরাধমূলক স্বার্থে ব্যবহার করছে। এর প্রধানতম কারণ হলো— বাংলাদেশের প্রান্তিক ও দরিদ্র পরিবারগুলোর তীব্র অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতা। অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত পরিবারের কাছে বিদেশে বিয়ের প্রস্তাব একটি অলৌকিক মুক্তির পথ মনে হয়। দারিদ্র্য থেকে মুক্তি পাওয়ার এই তীব্র আকাঙ্ক্ষাকেই পাচারকারীরা শোষণ করে এবং অলীক আশার জালে তাদের বন্দি ফেলে।
দ্বিতীয়ত, আমাদের চিরায়ত পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় নারীর নিজস্ব মতামত, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, স্বাধীন চলাফেরা এবং বিয়ের মতো স্পর্শকাতর সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা চরমভাবে সীমাবদ্ধ। সমাজে এখনও বিয়েকেই একজন নারীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুরক্ষার মূল মাধ্যম হিসেবে দেখার প্রবল মানসিকতা বিদ্যমান। নারীদের স্বাবলম্বী করার বদলে বিয়ের মাধ্যমে অন্য কারও ওপর নির্ভরশীল করে দেওয়ার এই সামাজিক প্রবণতাই অপরাধীচক্রের জন্য এক মহাসুযোগ তৈরি করে দেয়।
তৃতীয়ত, এই প্রক্রিয়ায় জড়িত মধ্যস্থতাকারী দেশীয় ঘটকচক্র, পরিচিত ব্যক্তি বা অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলো খুব সহজেই পরিবারগুলোর আস্থা অর্জন করে নেয়। সাধারণ পরিবারগুলোর পক্ষে সুদূর বিদেশের পাত্রের সঠিক পরিচয়, ব্যাকগ্রাউন্ড কিংবা প্রকৃত উদ্দেশ্য যাচাই-বাছাই করার মতো কোনও আনুষ্ঠানিক বা সহজলভ্য ব্যবস্থা থাকে না। তথ্যভিত্তিক এই চরম অজ্ঞতা এবং যাচাই করার অক্ষমতার সুযোগ নিয়ে অপরাধীরা খুব সহজেই ভুয়া কাগজপত্র ও মিথ্যা পরিচয় তৈরি করে অপরাধ সংঘটিত করতে সক্ষম হয়।
চতুর্থত, সমাজের একশ্রেণির কট্টরপন্থী মনোভাব ও ধর্মের অপব্যাখ্যা নারীদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিকাশের পথকে রুদ্ধ করে দিচ্ছে। তারা নারীদের উচ্চশিক্ষা, স্বাধীন কর্মসংস্থান এবং সামাজিক নেতৃত্বে অংশগ্রহণের বিরুদ্ধে নেতিবাচক মতাদর্শ প্রচার করে চলেছে। নারীবিদ্বেষী এই কাঠামোর কারণে নারীরা উপযুক্ত শিক্ষা ও আত্মনির্ভরশীল হওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, যা তাদের মানসিকভাবে দুর্বল করে তুলছে এবং সমাজে চরম প্রান্তিক অবস্থানে ঠেলে দিচ্ছে—ফলে তারা পাচারকারীদের সহজ শিকারে পরিণত হচ্ছে।
পঞ্চম কারণটি হলো, আমাদের দেশে বিদেশি নাগরিকদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করার মতো কোনও কার্যকর ট্র্যাকিং ব্যবস্থা বা ডিজিটাল নজরদারি না থাকা। দেশের দুর্বল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে যেকোনও বিদেশি নাগরিক এসে অপরাধমূলক চক্রান্ত শেষ করে স্বদেশে ফিরে যেতে পারছে। শক্ত ট্র্যাকিং ব্যবস্থা না থাকার কারণে অপরাধ সংঘটনের পর তাদের চিহ্নিত করা বা আইনের আওতায় আনা অসম্ভব হয়ে পড়ে।
ষষ্ঠ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হলো আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর ব্যর্থতা এবং আন্তদেশীয় আইনি সহযোগিতার চরম সীমাবদ্ধতা। পাচারকারী চক্রগুলো খুব ভালো করেই জানে যে প্রশাসনিক ও বিচারিক ব্যবস্থায় প্রচুর ফাঁকফোকর রয়েছে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার শিথিলতা, ক্ষমতার সমঝোতা এবং জবাবদিহির তীব্র অভাবের কারণে অপরাধীরা বেপরোয়া হয়ে উঠছে, যা দেশের সাধারণ ও অসহায় নারীদের জীবনকে চরম ঝুঁকিতে ফেলছে।
সর্বোপরি, ভুয়া বিয়ের নামে আন্তর্জাতিক নারীপাচারের এই মানবিক বিপর্যয় কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি দারিদ্র্য, পিতৃতান্ত্রিক সমাজকাঠামো, লিঙ্গবৈষম্য, সংকুচিত কর্মসংস্থান এবং প্রশাসনিক শিথিলতার এক ভয়াবহ সম্মিলিত আন্তদেশীয় রূপ। এই সংকট থেকে রক্ষা পেতে হলে কেবল গুটিকয়েক দৃশ্যমান অপরাধীকে শাস্তি দেওয়াই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন নারীদের বাস্তবভিত্তিক অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা, নিরাপদ অভিবাসনের সুব্যবস্থা করা, বিয়ের মধ্যস্থতাকারীদের কঠোর আইনি নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনা, সর্বস্তরে জনসচেতনতা সৃষ্টি করা এবং দুই দেশের মধ্যে শক্তিশালী কূটনৈতিক ও আইনি সহযোগিতা প্রতিষ্ঠা করা। তবেই কেবল বাংলাদেশের নারীদের জীবনের নিরাপত্তা ও আত্মমর্যাদা রক্ষা করা সম্ভব হবে।
লেখক: পিএইচডি গবেষক, ইউনিভার্সিটি অব লুইভেল, যুক্তরাষ্ট্র









