বাংলাদেশে এখন ছিনতাইও বেশ গণতান্ত্রিক হয়েছে। কাউকে দেখে আর বিশেষ বাছবিচার করে না। ধনী-গরিব, নারী-পুরুষ, চাকরিজীবী-শিক্ষক— যে সামনে পড়ছে, তারই ব্যাগে গণতন্ত্রের হাত পড়ছে। তবে একটা বিষয় ছিনতাইকারীরা খুব ভালোভাবে বুঝেছে— মানুষের ব্যাগ টানতে হলে মানুষের জীবনটাও একটু টান পড়তে পারে। সেটা নিয়ে তাদের কোনও মাথাব্যথা নেই।
২৯ আগস্ট সকালে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার সামনে এমনই এক ছিনতাইয়ের শিকার হয়ে প্রাণ হারালেন বগুড়ার গাবতলীর একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা রনজিনা পারভীন। বয়স ৫৫ বছর। চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার জন্য রাতে বগুড়া থেকে ঢাকায় এসেছিলেন। ভোরে গাবতলী বাস টার্মিনালে নেমে রিকশায় করে ফার্মগেটের হাসপাতালে যাচ্ছিলেন। সংসদ ভবনের সামনে একটি মোটরসাইকেল এসে তাঁর ব্যাগ ধরে টান দেয়। তিনি রিকশা থেকে পড়ে মাথায় গুরুতর আঘাত পান। হাসপাতালে নেওয়ার পর তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয়।
ব্যস। একটি ব্যাগের জন্য একজন মানুষের জীবন শেষ। এখন পুলিশ বলছে, ছিনতাইকারী ও মোটরসাইকেলটি শনাক্ত করে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। আমরা আশ্বস্ত হতে পারি।
কারণ বাংলাদেশে অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর পুলিশ সাধারণত খুবই কর্মঠ হয়ে ওঠে। অপরাধী পালিয়ে গেলে তাকে খুঁজে বের করার জন্য অভিযান শুরু হয়। সিসিটিভি ফুটেজ দেখা হয়। প্রত্যক্ষদর্শী খোঁজা হয়। সন্দেহভাজনদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তারপর একদিন হয়তো সংবাদ আসে— ‘ছিনতাইকারী গ্রেফতার’।
জনগণ তখন হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। মৃত মানুষটি অবশ্য আর হাঁফ ছাড়তে পারেন না। কারণ তিনি মারা গেছেন। এই ছোট্ট পার্থক্যটি আমাদের প্রশাসনিক সাফল্যের পরিসংখ্যানে খুব একটা গুরুত্ব পায় না। অপরাধী ধরা পড়েছে—সাফল্য।
কিন্তু অপরাধ সংঘটিত হওয়ার আগেই যদি তাকে ঠেকানো যেত—সেটা যেন একটু বেশি কঠিন কাজ। আমাদের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সাফল্য সম্ভবত এখানেই—অপরাধীকে ধরার চেয়ে অপরাধের পর সংবাদ সম্মেলন করা সহজ, তদন্তের কথা বলা সহজ, ‘দ্রুত গ্রেফতার করা হবে’ বলা আরও সহজ।
নাগরিককে নিরাপদ রাখা কঠিন। আর কঠিন কাজ করার চেয়ে সহজ কাজের প্রতি আমাদের রাষ্ট্রীয় ভালোবাসা বহু পুরোনো। সংসদ ভবনের সামনে ঘটনাটি ঘটেছে—এটাই এই মৃত্যুর সবচেয়ে বড় বিদ্রূপ।
জাতীয় সংসদ আমাদের গণতন্ত্রের প্রতীক। সেখানে আইন তৈরি হয়। নাগরিকের অধিকার, নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার, সুশাসন—এসব নিয়ে আলোচনা হয়। আর সেই সংসদ ভবনের কয়েকশ গজের মধ্যে একজন সাধারণ নাগরিকের ব্যাগ ধরে টান দেয় ছিনতাইকারী।
অর্থাৎ আইন প্রণয়নের ভবনের সামনে আইনভঙ্গের বাস্তব প্রয়োগ। কী চমৎকার প্রতীকী দৃশ্য! ভেতরে আইন, বাইরে আইনহীনতা। ভেতরে নাগরিক অধিকার নিয়ে আলোচনা, বাইরে নাগরিকের ব্যাগ টানতে টানতে নাগরিকের জীবনই চলে গেল।
আমাদের সমস্যা হলো, আমরা ছিনতাইকে এখনও অনেকটা ‘ছোট অপরাধ’ হিসেবে দেখি। কারও মোবাইল গেল, কারও ব্যাগ গেল, কারও গলার চেইন গেল—এই পর্যন্ত। যেন মানুষের জিনিসপত্রের সঙ্গে মানুষের জীবন যায় না।
অথচ চলন্ত রিকশা থেকে ব্যাগ টেনে নেওয়া কোনও নিরীহ চুরি নয়। এটি একটি অত্যন্ত বিপজ্জনক সহিংসতা। ব্যাগের সঙ্গে মানুষও পড়ে যেতে পারেন। গাড়ির নিচে যেতে পারেন। মাথায় আঘাত পেতে পারেন। স্থায়ীভাবে পঙ্গু হতে পারেন। মারা যেতে পারেন।
রনজিনা পারভীনের ক্ষেত্রে সেটিই ঘটেছে। তাঁর অপরাধ কী ছিল? তিনি ঢাকায় এসেছিলেন চিকিৎসা নিতে। অপরাধী সম্ভবত চিকিৎসার প্রয়োজন বোধ করেনি। সে শুধু ভেবেছে, ওই ব্যাগে কী আছে। একজন মানুষের জীবন বনাম একটি ব্যাগ। অপরাধীর কাছে ব্যাগের মূল্য বেশি। রাষ্ট্রের কাছে মানুষের জীবন কি সত্যিই ব্যাগের চেয়ে বেশি?
এই প্রশ্নের উত্তর রাষ্ট্রকে কথায় নয়, কাজে দিতে হবে। কারণ আমরা এমন এক রাজধানীতে বাস করছি, যেখানে মানুষ রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে মোবাইল শক্ত করে ধরে রাখে। রিকশায় বসে ব্যাগ বুকের সঙ্গে চেপে রাখে। মোটরসাইকেল দেখলে সতর্ক হয়। সন্ধ্যার পর রাস্তা বদলে ফেলে। নির্জন জায়গা এড়িয়ে চলে।
অর্থাৎ নাগরিক এখন শুধু রাস্তায় চলাচল করেন না— তিনি প্রতিটি মুহূর্তে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা করেন। রিকশায়র উঠেছেন— ব্যাগ কোন পাশে রাখবেন? মোবাইল বের করেছেন— চারপাশে তাকাবেন। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়েছেন—মোটরসাইকেল আসছে কিনা দেখবেন। রাতে ফিরছেন—পেছনে কে আসছে দেখবেন।
এভাবে একসময় দেখা যাবে, মানুষ নাগরিক নয়, নিজেই নিজের নিরাপত্তা কর্মকর্তা। পুলিশ কোথায়? সেটা অবশ্য আলাদা প্রশ্ন। পুলিশ আছে। ক্যামেরা আছে। আইন আছে। টহল আছে। মামলা আছে। তদন্ত আছে। অভিযান আছে। গ্রেফতার আছে। শুধু নিরাপত্তার নিশ্চয়তাটাই মাঝে মাঝে অনুপস্থিত।
এখানে আরেকটি মজার ব্যাপার আছে। আমাদের শহরে সিসিটিভি ক্যামেরার সংখ্যা কম নয়। ক্যামেরা যেন আধুনিক নগর সভ্যতার অলংকার। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ক্যামেরা কি শুধু অপরাধের ভিডিও আর্কাইভ করার জন্য, নাকি অপরাধ প্রতিরোধের জন্য?
অপরাধী ক্যামেরায় ধরা পড়লো, তারপর তাকে খোঁজা হলো—এটি ভালো। কিন্তু ক্যামেরা দেখে সন্দেহজনক গতিবিধি শনাক্ত করে যদি অপরাধ ঘটার আগেই ব্যবস্থা নেওয়া যায়, সেটিই আসল সাফল্য। নইলে ক্যামেরা হবে আমাদের নতুন যুগের ‘সাক্ষী’—সব দেখে, কিছু করতে পারে না।
বাংলাদেশে মৃত মানুষের সংখ্যা নিয়ে আমরা বেশ অভ্যস্ত। সড়ক দুর্ঘটনা, অগ্নিকাণ্ড, ছিনতাই, মাদক, খুন—প্রতিটি ক্ষেত্রেই মৃত্যুর পর আমরা প্রশ্ন করি। তারপর কিছুদিন উত্তেজনা থাকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ ওঠে।
সংবাদপত্রে সম্পাদকীয় হয়। কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেয়। তারপর নতুন ঘটনা আসে, পুরোনো ঘটনা সরে যায়। আমাদের স্মৃতিশক্তি আশ্চর্যজনকভাবে দুর্বল। অপরাধীরা অবশ্য আমাদের চেয়ে বেশি স্মৃতিশক্তিসম্পন্ন। তারা মনে রাখে কোথায় পুলিশ কম, কোথায় নজরদারি দুর্বল, কোন সময়ে রাস্তা ফাঁকা, কোন ধরনের যাত্রী সহজ টার্গেট। রাষ্ট্র যদি অপরাধীর চেয়ে কম বুদ্ধিমান হয়, তাহলে নাগরিকের বিপদ অবশ্যম্ভাবী।
আর শুধু ছিনতাইকারীকে ধরলেই হবে না। মোটরসাইকেলটি কার? সেটি বৈধভাবে ব্যবহৃত হচ্ছিল কিনা? অপরাধীরা কোথা থেকে এসেছিল? ছিনতাইয়ের পর কোথায় যায়? লুটের মাল কার কাছে বিক্রি করে? এই চক্রের পেছনে আর কারা আছে? নিয়মিত এমন অপরাধ ঘটছে কোথায়? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে।
কারণ ছিনতাইকারী কোনও বিচ্ছিন্ন প্রাণী নয় যে, জঙ্গল থেকে হঠাৎ বেরিয়ে এসে ব্যাগ টেনে আবার জঙ্গলে ঢুকে যায়। তার একটি নেটওয়ার্ক থাকে। তার বাজার থাকে। তার ক্রেতা থাকে। তার নিরাপদ আশ্রয় থাকে। তার তথ্যদাতা থাকতে পারে। তার অপরাধের অভ্যাস থাকে। অর্থাৎ ব্যাগ টানা হাতটি শুধু একটি হাত নয়— এর পেছনে একটি ব্যবস্থা থাকতে পারে। সেই ব্যবস্থায় আঘাত না করে শুধু একজন ছিনতাইকারীকে ধরে ছবি তুললে সমস্যার সমাধান হবে না।
আরেকটি বিষয় ভুলে গেলে চলবে না। রনজিনা পারভীন ছিলেন একজন শিক্ষক। যে মানুষটি জীবনের একটি বড় অংশ শিশুদের শিক্ষা দিয়েছেন, তিনি নিজের চিকিৎসার জন্য রাজধানীতে এসে নিরাপত্তাহীনতার শিকার হলেন।
একজন শিক্ষককে আমরা সমাজের ভবিষ্যৎ নির্মাতা বলি। কিন্তু তাঁর বর্তমান নিরাপদ রাখতে পারলাম না। কী চমৎকার রাষ্ট্রীয় কৌতুক! আমরা শিশুদের বলি— ভালো মানুষ হও, আইন মানো, অন্যের ক্ষতি করো না। আর বড়দের পৃথিবীতে একজন মানুষ আরেকজনের ব্যাগ ধরে এমনভাবে টান দেয় যে মানুষটি মারা যান।
তারপর আমরা শিশুকে আবার নীতিকথা শেখাই। সমস্যা হলো, শিশুরা এখন নীতিকথার চেয়ে বাস্তবতা একটু বেশি দেখে। তাই রনজিনা পারভীনের মৃত্যু শুধু একজন নারীর মৃত্যু নয়। এটি একটি প্রশ্নের মৃত্যু নয়, বরং বহু প্রশ্নের জন্ম।
রাজধানীতে নাগরিক নিরাপত্তা কার দায়িত্ব? ছিনতাইকে কেন এখনও কার্যকরভাবে দমন করা যাচ্ছে না? অপরাধের হটস্পটগুলো চিহ্নিত করে নিয়মিত নজরদারি কেন হয় না? মোটরসাইকেলভিত্তিক ছিনতাই ঠেকাতে বিশেষ ব্যবস্থা কোথায়?
সিসিটিভি শুধু অপরাধের পরে ফুটেজ দেখবে, নাকি অপরাধের আগেও সতর্ক করবে? নআর সবচেয়ে বড় কথা—একজন সাধারণ নাগরিকের জীবন কি রাষ্ট্রের কাছে সত্যিই এতটাই মূল্যবান যে, তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য আলাদা করে ভাবতে হবে? আমাদের এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে। নাগরিক কি প্রতিদিন রাস্তায় বেরিয়ে নিজের জীবনকে ভাগ্যের হাতে তুলে দেবেন, নাকি রাষ্ট্র তার নিরাপত্তার দায়িত্ব নেবে?
কারণ রাষ্ট্র যদি শুধু মৃত্যুর পর তদন্ত করে, তবে সেটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষা নয়— সেটি মৃত্যুর পর হিসাবরক্ষণ। রনজিনা পারভীনের ব্যাগ হয়তো ছিনতাইকারীরা নিয়ে গেছে। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে আমাদের কাছ থেকে আরও মূল্যবান কিছু চলে গেছে—রাজধানীর রাস্তায় নিরাপদে চলাচল করার স্বাভাবিক অধিকারবোধ।
এখন অন্তত এটুকু নিশ্চিত করা দরকার, তাঁর মৃত্যু যেন আরেকটি ‘ঘটনা’ হয়ে ফাইলের ভেতর ঢুকে না যায়। কারণ ছিনতাইকারী যদি ব্যাগ নিয়ে পালিয়ে যায়, সেটি অপরাধ। কিন্তু রাষ্ট্র যদি প্রতিবার শুধু বলে ‘অপরাধীকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে’, আর নাগরিক প্রতিবার প্রাণ হারান— তাহলে সেটি শুধু অপরাধীর ব্যর্থতা নয়। সেটি রাষ্ট্রের নিরাপত্তাব্যবস্থারও ব্যর্থতা।
সংসদ ভবনের সামনে একজন নাগরিকের জীবন যখন একটি ব্যাগের দড়ির সঙ্গে ঝুলে যায়, তখন আমাদের শুধু ছিনতাইকারীকে খুঁজলে চলবে না। খুঁজতে হবে—নাগরিকের নিরাপত্তা কোথায় হারিয়ে গেল।
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী ও কলামিস্ট




