হেফাজতে নির্যাতনের ঘটনায় বিচার-ক্ষতিপূরণ: আমাদের সংপ্রশ্ন ও করণীয়

রেজাউর রহমান লেনিন
২৬ জুন ২০২৬, ২০:১১আপডেট : ২৬ জুন ২০২৬, ২০:৩৪

প্রতিবছর ২৬ জুন জাতিসংঘ ‘নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের সমর্থনে আন্তর্জাতিক দিবস’ (ইন্টারন্যাশনাল ডে ইন সাপোর্ট অব ভিকটিমস অব টর্চার) পালন করে। এটি আন্তর্জাতিক নির্যাতনবিরোধী দিবস নামেও পরিচিত। দিবসটি উপলক্ষে জাতিসংঘ কোনও নির্দিষ্ট বৈশ্বিক প্রতিপাদ্য ঘোষণা করে না; বরং নির্যাতনের বিরুদ্ধে সর্বজনীন সংহতি, জবাবদিহি এবং নির্যাতনের সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করে।

সব ধরনের নির্যাতন থেকে মুক্ত থাকা মানুষের মৌলিক অধিকার। কোনও ব্যক্তি অভিযুক্ত হলেও তাকে অবশ্যই যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার সুযোগ দিতে হবে। নির্যাতন বা অবৈধ শাস্তির মাধ্যমে কারও জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার খর্ব করা মৌলিক মানবাধিকারের গুরুতর লঙ্ঘন। কিন্তু বাংলাদেশে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কর্মকাণ্ডে নির্যাতনের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও অপরাধ তদন্তের প্রচলিত ব্যবস্থার মধ্যেই নির্যাতন যেন এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। একই সময়ে এ ধরনের অভিযোগ নিয়ে গণমাধ্যমে প্রতিবেদনও তুলনামূলক কম প্রকাশিত হয়। আবার বিচার বিভাগীয় ও প্রশাসনিক পর্যায়ে অনেক ক্ষেত্রেই এসব অভিযোগ কার্যকর তদন্ত ও জবাবদিহির পরিবর্তে আড়াল করার প্রবণতা দেখা যায়।

মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) ও আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের আবহে দেশে অন্তত ৩৯ জন হেফাজতে মারা গেছেন। এই প্রবণতা প্রতি মাসেই অব্যাহত ছিল; মার্চে ১১ জন এবং এপ্রিলে ছয়জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে।

চলতি বছরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জবাবদিহি নিয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর মধ্যে রয়েছে ফরিদপুরে ডিবি হেফাজতে আইন কলেজের শিক্ষার্থী ইশতিয়াক আহমেদ প্রান্তর মৃত্যু। পরিবারের নির্যাতনের অভিযোগের পর ব্যাপক সমালোচনার মুখে সংশ্লিষ্ট ডিবির ওসিকে প্রত্যাহার করা হয়। একই মাসে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে রাজনৈতিক কর্মী নুরুল আলমের মৃত্যু এবং ফেব্রুয়ারিতে দিনাজপুর কারাগারে সাবেক মন্ত্রী রমেশ চন্দ্র সেনের চিকিৎসাগত অবহেলায় মৃত্যুর ঘটনাও হেফাজতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ নির্যাতনের গুরুতর উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছে।

সরকারি পক্ষ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সেমিনারে হেফাজতে নির্যাতন ও গুমের ঘটনা উল্লেখযোগ্য হারে কমে এসেছে বলে দাবি করলেও মাঠপর্যায়ের এসব ঘটনা দেখায়, দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি উদ্বেগমুক্ত নয়।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়েও প্রায় সব আইন প্রয়োগকারী সংস্থার বিরুদ্ধে হেফাজতে নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। এমনকি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধেও অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের মধ্যে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‍্যাব) বিরুদ্ধে হেফাজতে নির্যাতন, জোরপূর্বক গুম এবং বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ সবচেয়ে বেশি আলোচিত। জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে নথিভুক্ত বহু ঘটনায় দেখা গেছে, র‍্যাবের হাতে গ্রেফতারের পর ভুক্তভোগীদের মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে।

শেখ হাসিনার শাসনামলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ঠিক কত মানুষ নির্যাতন বা অবমাননাকর আচরণের শিকার হয়েছেন, তার নির্ভুল পরিসংখ্যান নির্ধারণ করা কঠিন। তবে সংবাদপত্র ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর নথি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, নির্যাতনের শিকারদের বড় অংশই ছিলেন কৃষিজীবী ও শ্রমজীবী মানুষ, রাজনৈতিক কর্মী, সাংবাদিক, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, আইনজীবী এবং ভিন্নমতাবলম্বী নাগরিক।

একইসঙ্গে উল্লেখ করা প্রয়োজন, শেখ হাসিনা দেশত্যাগের পর ২০২৪ সালের ৯ আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রথম ১৬ মাসে ৪৫টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথম ১২ মাসেই নিহত হয়েছেন ৩৩ জন। নিহতদের মধ্যে ১৩ জন যৌথ বাহিনীর হাতে, ১০ জন পুলিশের হাতে এবং ৪ জন গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হেফাজতে মারা যান। এ ছাড়া একজন করে র‍্যাব, সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী ও বিজিবির অভিযানে নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ১৬ জনকে গুলি করে, ১১ জনকে হেফাজতে নির্যাতন করে এবং ৬ জনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে।

মানবাধিকার সংগঠন অধিকার ও আসকের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হেফাজতে মৃত্যুর ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ ঘটনায় কোনও তদন্তই হয় না। অভিযোগকারীদের অনেকেই হুমকি, হয়রানি ও পাল্টা মামলার মুখে পড়েন।

বাংলাদেশে ব্যবহৃত নির্যাতনের পদ্ধতিগুলো অত্যন্ত নিষ্ঠুর, অমানবিক ও অবমাননাকর।

সাম্প্রতিক বাস্তবতায় একটি আশাব্যঞ্জক দিকও রয়েছে। ২০২৪ সালের ১০ ডিসেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি আনুষ্ঠানিকভাবে র‍্যাব বিলুপ্তির দাবি তোলে। যদিও ২০০৪ সালে দলটির সরকারই এই বাহিনী গঠন করেছিল, ২০২৬ সালের মে–জুনে দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও গণমাধ্যমের আলোচনায় উঠে এসেছে—রাষ্ট্রীয় সহিংসতার এই চক্র ভাঙতে বিএনপি এখন র‍্যাবের অতীত কার্যক্রমের একটি নির্মোহ মূল্যায়ন করতে চায়। একই সঙ্গে জাতিসংঘের মানবাধিকার নির্দেশিকা অনুসারে বাহিনীটি বিলুপ্ত করার পক্ষেও তাদের অবস্থান স্পষ্ট।

অর্থাৎ, বিএনপি এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা র‍্যাব বিলুপ্তির পক্ষে অবস্থান নিলেও সরকারের বর্তমান দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন। সরকার বাহিনীটিকে পুরোপুরি বিলুপ্ত না করে সামরিক প্রেষণ কাঠামো, নাম ও পোশাক পরিবর্তনের মাধ্যমে একটি নতুন জবাবদিহিমূলক আইনি কাঠামোর অধীনে পুনর্গঠনের কথা বলছে।

আন্তর্জাতিক ও জাতীয় আইনের আলোকে

সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্রের (ইউডিএইচআর) ৩ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, প্রত্যেক মানুষের জীবন, স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তার অধিকার রয়েছে। একই ঘোষণাপত্রের ৫ নম্বর অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, কাউকে নির্যাতন কিংবা নিষ্ঠুর, অমানবিক বা অবমাননাকর আচরণ বা শাস্তির শিকার করা যাবে না।

একই নীতি প্রতিফলিত হয়েছে নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তির (আইসিসিপিআর) ৭ নম্বর অনুচ্ছেদেও। সেখানে নির্যাতন এবং নিষ্ঠুর, অমানবিক বা অবমাননাকর আচরণ বা শাস্তিকে সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

বাংলাদেশের সংবিধানেও এই অধিকারগুলো নিশ্চিত করা হয়েছে। সংবিধানের ৩১, ৩২ ও ৩৫ (৫) অনুচ্ছেদে আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার, জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার এবং নির্যাতন বা অবমাননাকর আচরণ থেকে মুক্ত থাকার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। ফলে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক—উভয় আইনেই এটি নাগরিকের একটি মৌলিক অধিকার, যা জরুরি অবস্থা, জাতীয় নিরাপত্তা বা অন্য কোনও অজুহাতে স্থগিত করা যায় না।

১৯৮৪ সালের ১০ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ‘নির্যাতন ও অন্যান্য নিষ্ঠুর, অমানবিক বা অবমাননাকর আচরণ বা শাস্তির বিরুদ্ধে কনভেনশন’ (সিএটি) গ্রহণ করে। ইউডিএইচআর বা আইসিসিপিআরের তুলনায় এই কনভেনশনে নির্যাতন প্রতিরোধ, শাস্তি ও প্রতিকার সম্পর্কে আরও বিস্তারিত বিধান রয়েছে। কনভেনশনের ৪ নম্বর অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রগুলোকে নির্যাতনের প্রতিটি ঘটনাকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করার এবং অপরাধের গুরুত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ শাস্তির ব্যবস্থা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

কিন্তু সাংবিধানিক ও আন্তর্জাতিক সুরক্ষা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশে, বিশেষ করে হেফাজতে থাকা ব্যক্তিরা, নিয়মিত নির্যাতনের অভিযোগের মুখোমুখি হন। অনেক ক্ষেত্রে গ্রেপ্তারের পর স্বীকারোক্তি আদায়ের উদ্দেশ্যেই এই নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে।

ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৩০ ধারা নির্বিচারে গ্রেফতার ও আটকের বিরুদ্ধে কিছু সুরক্ষা দিলেও ৫৪ ধারার অধীনে পরোয়ানা ছাড়াই গ্রেফতারের ক্ষমতা এবং ১৬৭ ধারার অধীনে পুলিশি হেফাজতে রাখার বিধানের অপব্যবহার বহুদিন ধরেই বিতর্কের বিষয়। এর ফলে সুষ্ঠু বিচার, নির্যাতন থেকে মুক্তি এবং মানবিক আচরণের সাংবিধানিক অধিকার ক্ষুণ্ন হচ্ছে।

‘ব্লাস্ট অ্যান্ড আদার্স বনাম বাংলাদেশ অ্যান্ড আদার্স’ মামলায় হাইকোর্ট বিভাগ মত দেয়, এই ধারাগুলোর কিছু অংশ সংবিধানের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ এবং সেগুলোর সংশোধন প্রয়োজন। আদালত আইন সংশোধনের জন্য সরকারকে ছয় মাস সময় দিয়ে সাত দফা সুপারিশ এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ক্ষমতার অপব্যবহার ঠেকাতে ১৫ দফা নির্দেশনা দিয়েছিলেন।

কিন্তু সাংবিধানিক নিশ্চয়তা ও আদালতের নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও বাস্তবে এসব সুরক্ষা নিয়মিতভাবে কার্যকর করা হয়নি। ফলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেগুলো কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে গেছে।

এই বাস্তবতায় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যুর ঘটনা নিয়মিতভাবে ঘটতে থাকে। উদাহরণ হিসেবে ২০১৩ সালে অন্তত ৭২ জন ব্যক্তি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নির্যাতনে প্রাণ হারান। এই প্রেক্ষাপটে মানবাধিকার সংগঠন ও নাগরিক সমাজ নির্যাতন প্রতিরোধে একটি কার্যকর আইন প্রণয়নের দাবি জানায়। একই সঙ্গে নির্যাতনের বিরুদ্ধে কনভেনশনের সদস্যরাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশও এমন আইন প্রণয়নে আন্তর্জাতিকভাবে বাধ্য ছিল।

এই প্রেক্ষাপটে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের নির্যাতনের ঘটনাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করার লক্ষ্যে 'নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন, ২০১৩'-এর খসড়া প্রথমে ২০০৯ সালের ৫ মার্চ বেসরকারি সদস্যের বিল হিসেবে জাতীয় সংসদে উত্থাপিত হয়। পরে ২০১৩ সালের ২৭ অক্টোবর সংসদ আইনটি পাস করে।

কিন্তু আইনটি প্রণয়নের এক দশক পরও বাস্তব চিত্র খুব একটা বদলায়নি। একটি বছরে অন্তত ৮৭ জন ব্যক্তি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এবং ৪১ জন বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হয়েছেন।

বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় নির্যাতন কেবল পুলিশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। র‍্যাব, গোয়েন্দা সংস্থা, বিজিবি, কারা কর্তৃপক্ষ, এমনকি জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও নাগরিকদের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে।

২০১৩ সালের আইনটি কার্যকর হলেও বাস্তবে এর প্রয়োগ এখনো সীমিত ও অসংগঠিত। ফলে অধিকাংশ ভুক্তভোগী ন্যায়বিচার পান না; ক্ষতিপূরণ কিংবা চিকিৎসা–সহায়তা পাওয়ার সুযোগ তো আরও সীমিত।

আইনের সীমাবদ্ধতা ও সংস্কারের প্রয়োজন

‘নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন, ২০১৩’ একটি বিশেষ ও সংবেদনশীল অপরাধকে কেন্দ্র করে প্রণীত হলেও এর বিভিন্ন ধারায় উল্লেখযোগ্য সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

আইনের বর্তমান সংজ্ঞায় ‘নির্যাতন’কে মূলত তথ্য বা স্বীকারোক্তি আদায়ের উদ্দেশ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে। ফলে ক্ষমতার অপব্যবহার, রিমান্ডে থাকা ব্যক্তির ওপর শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন কিংবা নির্যাতনের অন্যান্য জটিল মাত্রা সংজ্ঞার বাইরে থেকে গেছে।

একইভাবে আইনের ২(৪) ধারায় ‘আইন প্রয়োগকারী সংস্থা’র সংজ্ঞায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর বা দুর্নীতি দমন কমিশনের মতো সংস্থাগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি, যদিও তাদের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও নির্যাতনের অভিযোগ ওঠার ঝুঁকি রয়েছে।

আইনটি বিচার পরিচালনার দায়িত্ব দায়রা জজ আদালতের ওপর ন্যস্ত করলেও প্রাথমিক বিচারিক আদালতের ভূমিকা কিংবা বন্দীদের অভিযোগ দায়েরের সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি স্পষ্ট করেনি। আবার তদন্তের দায়িত্ব মূলত পুলিশের ওপরই থাকায় নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়। পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের ক্ষেত্রেও স্বাধীন বিচার বিভাগীয় তদন্ত বাধ্যতামূলক করা হয়নি।

ময়নাতদন্তের সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি ও প্রতিবেদন সংগ্রহের নিয়মও আইনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ নেই। একইভাবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তদন্ত বা বিচার শেষ না হলে তার আইনি পরিণতি কী হবে, সে বিষয়েও আইনটি নীরব।

আইনের ১৫ ধারায় শাস্তির যে বিধান রয়েছে, তা ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধির সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। অপরাধের ধরন অনুযায়ী শাস্তিরও কোনও স্পষ্ট শ্রেণিবিন্যাস করা হয়নি।

এ ছাড়া ক্ষতিপূরণের বিধানও অত্যন্ত সীমিত। এতে ভুক্তভোগীদের পুনর্বাসন কিংবা ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকানোর নিশ্চয়তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো অনুপস্থিত।

আইনের ১১ ধারায় সাক্ষী সুরক্ষার কথা বলা হলেও এর উপধারাগুলোর মধ্যে কিছু অসামঞ্জস্য রয়েছে, যা বাস্তব প্রয়োগে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করতে পারে। একই সঙ্গে ভুক্তভোগী বা অভিযোগকারীকে ভয়ভীতি দেখানোকে পৃথক অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়নি।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা হলো, দেশের বাইরে বা অতিরিক্ত-আঞ্চলিক (এক্সট্রা-টেরিটোরিয়াল) ক্ষেত্রে সংঘটিত অপরাধ সম্পর্কে আইনটি নীরব। একইভাবে আপিল–সংক্রান্ত বিধানে ‘পর্যালোচনা’ শব্দের পরিবর্তে ‘সংশোধন’ শব্দের ব্যবহার আইনগতভাবে অধিকতর উপযুক্ত হতে পারে। এসব সীমাবদ্ধতা দূর করতে ধারাবাহিক আইন সংস্কার প্রয়োজন।

প্রথমত, ‘নির্যাতন’-এর সংজ্ঞাকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে কেবল তথ্য বা স্বীকারোক্তি আদায়ের উদ্দেশ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে এর পরিধি সম্প্রসারণ করতে হবে। একই সঙ্গে 'হেফাজত' ও 'সরকারি কর্মকর্তা'র সুস্পষ্ট সংজ্ঞা আইনে যুক্ত করা প্রয়োজন।

দ্বিতীয়ত, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সংজ্ঞার আওতায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, দুর্নীতি দমন কমিশনসহ সব নিরাপত্তা সংস্থাকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

তৃতীয়ত, কোন আদালত অভিযোগ গ্রহণ করবে, বন্দীরা কীভাবে অভিযোগ দায়ের করবেন এবং চিকিৎসকদের কাছ থেকে কীভাবে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন সংগ্রহ করা হবে—এসব বিষয়ে স্পষ্ট বিধান যুক্ত করা প্রয়োজন।

চতুর্থত, তদন্তের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগের ক্ষেত্রে বিচার বিভাগীয় তদন্ত বাধ্যতামূলক করতে হবে। জেলা পুলিশের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের বাইরে একটি স্বাধীন তদন্তকারী সংস্থার মাধ্যমে এ প্রক্রিয়া পরিচালনা করা উচিত।

পঞ্চমত, তদন্ত ১২০ দিন এবং বিচার ২১০ কার্যদিবসের মধ্যে শেষ না হলে পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা কী হবে, তা আইনেই স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন।

ষষ্ঠত, শাস্তির বিধানকে দণ্ডবিধির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। একই সঙ্গে ১৫ ধারায় কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের ক্ষেত্রে ‘বা’ শব্দের পরিবর্তে ‘এবং’ শব্দ প্রতিস্থাপনের বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে।

সপ্তমত, ভুক্তভোগীদের প্রকৃত ক্ষতি ও ভোগান্তির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ক্ষতিপূরণের পরিমাণ বৃদ্ধি করতে হবে এবং রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে সেই অর্থ পরিশোধের সুস্পষ্ট ব্যবস্থা রাখতে হবে। পাশাপাশি জরিমানা ও কারাদণ্ডের বাইরে দোষী কর্মকর্তাদের স্থায়ীভাবে চাকরি থেকে অপসারণ এবং ভবিষ্যতে সরকারি চাকরির অযোগ্য ঘোষণার বিধান যুক্ত করা যেতে পারে।

অষ্টমত, সাক্ষীদের জন্য একটি পৃথক ও কার্যকর সুরক্ষা কাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক কনভেনশনের আলোকে বাংলাদেশের জাহাজ বা বিমানে সংঘটিত অপরাধের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত-আঞ্চলিক এখতিয়ারের বিধান যুক্ত করা যেতে পারে।

রাষ্ট্র, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা ও নাগরিক সমাজের করণীয়

আইন সংস্কারের পাশাপাশি রাষ্ট্র, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা এবং নাগরিক সমাজের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া নির্যাতনমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো, সব ধরনের নির্যাতন ও মর্যাদাহানিকর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অবসান ঘটিয়ে অপরাধীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনা। একই সঙ্গে এমন একটি পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে, যেখানে নারী, সংখ্যালঘু ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা সমানভাবে তাদের কথা বলার সুযোগ পান।

নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে শুধু অপরাধের বিচার করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। তাঁদের অভিজ্ঞতার স্বীকৃতি, যথাযথ পুনর্বাসন, জীবিকা ও শিক্ষা সহায়তা এবং সামাজিক কলঙ্কমুক্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করে তাঁদের স্বায়ত্তশাসন পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক ক্ষমা প্রার্থনা এবং যেকোনো পরিস্থিতিতে নির্যাতন সহ্য করা হবে না—এমন সুস্পষ্ট রাষ্ট্রীয় বার্তা দেওয়া প্রয়োজন।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ব্যবস্থারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের জন্য নিরাপদ ও গোপনীয় পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যাতে তারা তাঁদের অভিজ্ঞতা ও প্রত্যাশা তুলে ধরতে পারেন। একই সঙ্গে দারিদ্র্য, বৈষম্য ও নির্যাতনের পারস্পরিক সম্পর্কও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিনিধিসহ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বিশেষজ্ঞদের নিয়মিত বাংলাদেশ সফরের সুযোগ সৃষ্টি করা এবং জাতিসংঘের স্বেচ্ছাসেবী তহবিলের মাধ্যমে নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের সহায়তা আরও সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন।

নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলোরও দায়িত্ব কম নয়। নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের কেবল সহায়তা গ্রহণকারী হিসেবে নয়, বরং অভিজ্ঞতাসম্পন্ন বিশেষজ্ঞ, গবেষক এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ–প্রক্রিয়ার অংশীদার হিসেবে মূল্যায়ন করতে হবে। তাদের অভিজ্ঞতাকে কেন্দ্র করেই প্রচারণা, প্রশিক্ষণ ও নীতিনির্ধারণী কার্যক্রম পরিচালিত হওয়া উচিত।

২০১৩ সালে ‘নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন’ প্রণয়ন নিঃসন্দেহে একটি যুগান্তকারী ও প্রগতিশীল পদক্ষেপ ছিল। এই আইন সরকারি কর্মচারীদের জবাবদিহির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করেছে। কিন্তু একটি সহিংসতামুক্ত সমাজ গড়ে তুলতে হলে আইনের বিদ্যমান সীমাবদ্ধতাগুলো কাটিয়ে ওঠা জরুরি।

সে জন্য বিচার বিভাগের সক্রিয় ভূমিকা, সংসদের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় আইন সংশোধন এবং বিচারক, আইনজীবী, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্য ও মানবাধিকার কর্মীদের মধ্যে ব্যাপক সচেতনতা তৈরির উদ্যোগ সমানভাবে প্রয়োজন। কারণ, নির্যাতনের বিরুদ্ধে কার্যকর অবস্থান কেবল একটি আইনের বিষয় নয়; এটি একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে মানবাধিকার, জবাবদিহি ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মৌলিক শর্ত।

/ইউএস/এমওএফ/
সম্পর্কিত
সুইস ব্যাংকের টাকা: ১৮ মাসে ফিরলো না এক ডলারও 
মাদকবিরোধী দিবস: তরুণ প্রজন্ম রক্ষায় সম্মিলিত উদ্যোগ জরুরি 
হেফাজতে নির্যাতন: আইন আছে, বিচার নেই কেন? 
সর্বশেষ খবর
ইরান-মার্কিন চুক্তির ১ সপ্তাহ: সুফল পাচ্ছে কারা
ইরান-মার্কিন চুক্তির ১ সপ্তাহ: সুফল পাচ্ছে কারা
পুরান ঢাকায় তাজিয়া মিছিলে ছুরিকাঘাতে যুবককে হত্যার অভিযোগ
পুরান ঢাকায় তাজিয়া মিছিলে ছুরিকাঘাতে যুবককে হত্যার অভিযোগ
পদ্মার বালু উত্তোলন নিয়ে গোলাগুলি, একজন নিহত
পদ্মার বালু উত্তোলন নিয়ে গোলাগুলি, একজন নিহত
প্রশ্নপত্র নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করলে পুলিশ আটকাবে: শিক্ষামন্ত্রী
প্রশ্নপত্র নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করলে পুলিশ আটকাবে: শিক্ষামন্ত্রী
সর্বাধিক পঠিত
মা ও তিন মেয়েকে কুপিয়ে হত্যার রহস্য কী, যা বললেন প্রতিবেশীরা
মা ও তিন মেয়েকে কুপিয়ে হত্যার রহস্য কী, যা বললেন প্রতিবেশীরা
ডিআইজি বিপ্লব বিজয় তালুকদার সাময়িক বরখাস্ত
ডিআইজি বিপ্লব বিজয় তালুকদার সাময়িক বরখাস্ত
নবম পে স্কেল: কারা পাবেন, কারা অপেক্ষায় থাকছেন 
নবম পে স্কেল: কারা পাবেন, কারা অপেক্ষায় থাকছেন 
বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমার হয়ে করিডোরের প্রস্তাব চীনের
বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমার হয়ে করিডোরের প্রস্তাব চীনের
কাজ না করে আয় করাই এখন নতুন ‘আমেরিকান স্বপ্ন’
কাজ না করে আয় করাই এখন নতুন ‘আমেরিকান স্বপ্ন’