২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর নবনির্বাচিত জাতীয় সংসদ কর্তৃক আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়াটি মানবাধিকার সুরক্ষার ক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি কাঠামোগত দুর্বলতা ও উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকার এবং উত্তর-ক্রান্তিকালীন প্রেক্ষাপটে আইনসভার সবচেয়ে বড় সাংবিধানিক দায়িত্ব ছিল সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদের আওতায় বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের জরুরি অধ্যাদেশগুলোকে পুঙ্খানুপুঙ্খ ধারাভিত্তিক বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনার মাধ্যমে চূড়ান্ত আইনে রূপান্তর করা। তবে সংসদে পর্যাপ্ত দীর্ঘমেয়াদি বিতর্ক ও যাচাই-বাছাই ছাড়াই গুরুত্বপূর্ণ মানবাধিকার সংক্রান্ত অধ্যাদেশগুলো নিষ্পত্তি করার যে প্রবণতা দেখা গেছে, তা আইনের গুণগত মান এবং গণতান্ত্রিক বৈধতাকে দুর্বল করেছে।
বিশেষ করে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন সংস্কারের ক্ষেত্রে সংসদ ২০২৫ সালের প্রগতিশীল অধ্যাদেশ বাতিল করে কার্যত ২০০৯ সালের পুরোনো আইনি কাঠামো পুনর্বহাল করেছে। এর ফলে শৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগ সরাসরি স্বাধীনভাবে তদন্ত করার যে সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল, তা পুনরায় সংকুচিত হয়ে সরকারের আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদন-নির্ভর ব্যবস্থার অধীনে চলে গেছে। এটি আন্তর্জাতিক প্যারিস নীতিমালার আলোকে মানবাধিকার কমিশনের নিরপেক্ষ তদারকি ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতায় বড় ধরনের আঘাত হেনেছে।
একইভাবে, বলপূর্বক গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার সংক্রান্ত আইনের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সনদের (আইসিপিপিইডি) পূর্ণাঙ্গ চেতনা ধারণ করার বদলে তদন্তভার মূলত পুলিশ ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর ন্যস্ত রাখা হয়েছে, যা সরাসরি স্বার্থের সংঘাত তৈরি করে। কমান্ড রেসপনসিবিলিটি বা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দায় নির্ধারণের আইনি ফাঁকফোকর এবং ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণকে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির বাইরে অবিচ্ছেদ্য আইনি অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও আইনসভা প্রত্যাশিত কঠোর অবস্থান নিতে ব্যর্থ হয়েছে।
সামগ্রিকভাবে সাধারণ নাগরিক ও প্রান্তিক মানবাধিকার কর্মীদের মতামত উপেক্ষিত রেখে আমলাতান্ত্রিক খসড়া নির্ভরতা এবং মতপ্রকাশ ও নাগরিক স্বাধীনতার ক্ষেত্রে থাকা পুরোনো নিপীড়নমূলক আইনি সংস্কৃতির কাঠামোগত অবসান না ঘটানোই এই আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ার প্রধান মানবাধিকারিক ঝুঁকি। কেননা, একটি নির্বাচিত সরকারের ছয় মাসের আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ার মূল পরীক্ষা হলো—তারা কতটা নিষ্ঠার সাথে রাষ্ট্রীয় বাহিনীগুলোর ওপর স্বাধীন তদারকি প্রতিষ্ঠা করেছে, আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ মুক্ত হয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও গবেষণানির্ভর আইন প্রণয়ন পদ্ধতি অনুসরণ করেছে এবং বিচারিক পর্যালোচনা ও সাংবিধানিক মৌলিক অধিকারকে আইনের প্রতিটি ধারায় নিশ্চিত করেছে, কিন্তু ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর নবনির্বাচিত সংসদ কর্তৃক আইন প্রণয়ন ও সংশোধনের ক্ষেত্রে নাগরিক সমাজের প্রধান উদ্বেগগুলো কেন্দ্রীভূত হয়েছে—বিশেষ করে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, বলপূর্বক গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, সাইবার সুরক্ষা আইন এবং সন্ত্রাসবিরোধী কাঠামোর মতো স্পর্শকাতর ক্ষেত্রগুলোতে। মানবাধিকার কর্মী ও নাগরিকদের এই উদ্বেগ আরও বেশিমাত্রায় হতাশার জন্ম দিয়েছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) আইন, ২০২৬-এর খসড়া মূলত দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে সমালোচিত র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নকে বিলুপ্ত করে বাংলাদেশ পুলিশের অধীনে একটি নতুন বিশেষায়িত ইউনিট গঠনের লক্ষ্যে মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের ঘোষণার মধ্যে দিয়ে।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের আমলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (সংশোধন) আইন, ২০০৩ সংশোধনীর মাধ্যমে ২০০৪ সালে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন প্রতিষ্ঠা করা হয়। বিএনপি ঘোষিত রাষ্ট্র সংস্কারের ৩১ দফা রূপরেখা এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জবাবদিহি ও র্যাব বিলুপ্তির বিষয়ে দলটির অবস্থানকে দুটি আলাদা, কিন্তু পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত প্রেক্ষাপট থেকে বিস্তারিতভাবে বোঝা যায়।
প্রথমত, ২০২৩ সালের জুলাই মাসে বিএনপি সমমনা দলগুলোর সাথে যে মূল ৩১ দফা রাষ্ট্র সংস্কার রূপরেখা ঘোষণা করেছিল, সেখানে সরাসরি ‘র্যাব’ নামটি উল্লেখ করে বা কোনও একক বাহিনীকে নির্দিষ্ট করে বিলুপ্তির ঘোষণা দেওয়া হয়নি। তবে সমগ্র আইন-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা কাঠামোর গভীর সংস্কার এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার জন্য সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল।
দ্বিতীয়ত, মূল ৩১ দফার বাইরে র্যাব বাতিলের প্রশ্নে বিএনপির সুনির্দিষ্ট অবস্থান আরও স্পষ্ট ও প্রকাশ্য রূপ নেয় দলটির বিভিন্ন রাজনৈতিক বক্তব্যে এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সংস্কার কার্যক্রমে। যদিও ২০০৪ সালে বিএনপি সরকারের আমলেই র্যাব গঠিত হয়েছিল, পরবর্তীকালে বাহিনীটির বিরুদ্ধে গুম, খুন ও গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠায় দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব বিভিন্ন সময়ে র্যাব বিলুপ্তির দাবি তোলে। সেই প্রেক্ষাপটে, ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) আইন, ২০২৬’-এর খসড়া বিলটি সমকালীন বাংলাদেশের নিরাপত্তা খাত সংস্কার, গণতান্ত্রিক রূপান্তর এবং মানবাধিকার সুরক্ষার মৌলিক মানদণ্ডের প্রক্ষাপটে একটি সংবেদনশীল দলিল।
আপাতদৃষ্টিতে এই আইনের প্রস্তাবনা পাঠ করলে মনে হতে পারে যে এটি বিগত দুই দশকের বেশি সময় ধরে বিতর্কিত, সমালোচিত এবং গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে অভিযুক্ত র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন তথা র্যাবকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত করে পুলিশ বাহিনীর কাঠামোর অধীনে একটি আধুনিক ও বিশেষায়িত ইউনিট গঠনের সংকল্প ব্যক্ত করছে। কিন্তু আইনের অভ্যন্তরীণ ধারা-উপধারা, আইনি ভাষার বিন্যাস, প্রাতিষ্ঠানিক কমান্ড কাঠামো এবং বিচারিক জবাবদিহির কার্যপদ্ধতি গভীরভাবে ব্যবচ্ছেদ করলে এটি দ্ব্যর্থহীনভাবে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে খসড়াটি প্রকৃত কাঠামোগত রূপান্তরের চেয়ে নিছক একটি প্রাতিষ্ঠানিক নামবদল বা পরিমার্জনের আইনি আবরণ তৈরি করেছে। যে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি, বিচারহীনতার পরিবেশ এবং আইনি দুর্বলতার ওপর দাঁড়িয়ে অতীতে জোরপূর্বক গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গোপন হেফাজত ও শারীরিক নির্যাতনের মতো জঘন্য অপরাধ সংঘটিত হয়েছিল—প্রস্তাবিত আইনের পরতে পরতে সেই পুরোনো কাঠামোরই পুনরাবৃত্তি লক্ষ করা যায়। একটি সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারের প্রধানতম শর্ত হলো—আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে বেসামরিক জবাবদিহি, নিয়ন্ত্রিত আইনি এখতিয়ার এবং সাধারণ ফৌজদারি আদালতের নিরঙ্কুশ আওতাভুক্ত রাখা। এই প্রবন্ধের মূল লক্ষ্য হলো, প্রস্তাবিত এসআরবি আইনের সামগ্রিক বিন্যাসকে সংবিধানের মৌলিক অধিকার, আইনের শাসন, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড এবং বিচার ব্যবস্থার নিরপেক্ষতার নিরিখে বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করা।
আইনের কাঠামোগত বিশ্লেষণের শুরুতে খসড়াটির ধারা-৩ বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য, যেখানে বলা হয়েছে যে আপাতত বলবৎ অন্য কোনও আইনে যা কিছুই থাকুক না কেন, এই আইনের বিধানাবলি প্রাধান্য পাবে। আইনের শাসনের অন্যতম প্রধান নীতি হলো সর্বজনীন ফৌজদারি আইনের অভিন্ন প্রয়োগ এবং কোনও বিশেষ সংস্থাকে সাধারণ বিচার প্রক্রিয়ার ঊর্ধ্বে স্থান না দেওয়া। ফৌজদারি কার্যবিধি এবং নিয়মিত সাক্ষ্য আইনের স্বাভাবিক সুরক্ষাকবচগুলোকে খর্ব করে একটি বিশেষায়িত সংস্থাকে এই ধরনের নিরঙ্কুশ আইনি শ্রেষ্ঠত্ব প্রদান করা ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও ন্যায়বিচারের মৌলিক ধারণার পরিপন্থি। তদুপরি আইনের দ্বিতীয় অধ্যায়ে ইউনিটটির গঠন প্রণালীতে যে কাঠামোগত দ্বিচারিতা বহাল রাখা হয়েছে, তা বেসামরিক পুলিশি ব্যবস্থার আত্মাকে গভীরভাবে আঘাত করে।
ধারা ৪-এর উপধারা ৩ অনুযায়ী প্রতিরক্ষা কর্মবিভাগ এবং অন্যান্য শৃঙ্খলা বাহিনী থেকে সদস্যদের প্রেষণে বা অস্থায়ীভাবে সংযুক্তির মাধ্যমে এসআরবি গঠিত হবে। বিগত ২০ বছরের অভিজ্ঞতা সাক্ষ্য দেয় যে নিয়মিত পুলিশিংয়ের মধ্যে সামরিক ও আধা-সামরিক বাহিনীর সদস্যদের প্রেষণে নিয়োগের মাধ্যমে একটি সংকর কমান্ড কাঠামো তৈরি করা হয়, যা আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে সামরিকায়িত মনস্তত্ত্বে পরিচালিত করে। নাগরিক শৃঙ্খলা রক্ষা এবং অপরাধ দমন মূলত একটি বেসামরিক ও আইনি প্রক্রিয়া, যার ভিত্তি হলো নাগরিক অধিকার ও মানবাধিকারের প্রতি পরম শ্রদ্ধা। কিন্তু সামরিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সদস্যদের বেসামরিক পুলিশিংয়ে সরাসরি মোতায়েন করার ফলে বেসামরিক জবাবদিহির ভারসাম্য বিনষ্ট হয় এবং একটি সমান্তরাল আধাসামরিক শাসনব্যবস্থার জন্ম নেয়, যা গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার সাথে কোনোভাবেই সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
প্রেষণ কাঠামোর এই ত্রুটি আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে আইনের পঞ্চম অধ্যায়ে বর্ণিত শৃঙ্খলা ও জবাবদিহি সংক্রান্ত ধারাগুলোতে। ধারা ১৯(২) অনুযায়ী ইউনিটের কোনও সদস্যের বিরুদ্ধে ধারা ১৭-এ বর্ণিত অসদাচরণ বা শৃঙ্খলা লঙ্ঘনের অভিযোগ প্রমাণিত হলে মহাপরিচালক কেবল তাকে তার নিয়োগকারী সংস্থা বা মাতৃ ইউনিটে প্রতিবেদনসহ ফেরত পাঠানোর সুপারিশ করবেন। এই বিধানটি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের জন্য কার্যত এক ধরনের কাঠামোগত দায়মুক্তি নিশ্চিত করে। মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো গুরুতর অপরাধকে যখন ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য না করে কেবল ‘বিভাগীয় শৃঙ্খলা লঙ্ঘন’ হিসেবে দেখা হয় এবং অপরাধীকে প্রকাশ্য ও স্বাধীন ফৌজদারি আদালতের মুখোমুখি না করে মাতৃ সংস্থায় ফেরত পাঠিয়ে দায়মুক্ত রাখা হয়, তখন ন্যায়বিচারের শেষ ভরসাস্থলটিও ভেঙে পড়ে। এটি সাধারণ নাগরিকদের জন্য প্রযোজ্য ফৌজদারি বিচারের সমতার নীতিকে সম্পূর্ণ নস্যাৎ করে।
সংবিধানের ২৭ ও ৩১ অনুচ্ছেদে আইনের দৃষ্টিতে সমতা এবং আইনের আশ্রয়লাভের যে অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে, প্রেষণে আসা কর্মকর্তাদের জন্য আলাদা সুরক্ষার এই দ্বৈতনীতি তার সরাসরি লঙ্ঘন। অধিকন্তু ধারা ২১(২) এবং ধারা ২৬(২)-এ উল্লেখ করা হয়েছে যে এই আইনের অধীনে নতুন বিধি প্রণীত না হওয়া পর্যন্ত ২০০৫ সালের র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন সংক্রান্ত বিতর্কিত কোর্ট পদ্ধতি ও বিভাগীয় কার্যধারা বিধিমালা প্রযোজ্য থাকবে। এটি প্রমাণ করে যে বাহিনীর নাম বদলালেও এর ভেতরের আদালত ব্যবস্থা এবং শাস্তিমূলক প্রক্রিয়াটি অবিকল পূর্বের অস্বচ্ছ ও স্বগোত্রীয় তদন্ত কাঠামোর ওপরই নির্ভরশীল থাকছে, যেখানে অতীতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার নিশ্চিত করার নজির অত্যন্ত বিরল।
আইনের তৃতীয় অধ্যায়ে এসআরবির ক্ষমতা, দায়িত্ব ও কার্যাবলির যে বিস্তৃতি টানা হয়েছে, তা নিয়মিত জেলা পুলিশ এবং সাধারণ থানা ব্যবস্থার সমান্তরালে এক ধরনের অস্বাভাবিক ও লাগামহীন কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে।
ধারা ১০-এ অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, অস্ত্র-মাদক উদ্ধার থেকে শুরু করে মানবপাচার, সাইবার অপরাধ, ধর্ষণ, জমি দখলদারি ও অন্যান্য অপরাধ দমনের মতো প্রায় সকল ফৌজদারি ক্ষেত্রকে এই বিশেষায়িত ইউনিটের আওতাভুক্ত করা হয়েছে। একটি আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিশেষায়িত ইউনিটের কাজ হওয়া উচিত অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট, যেমন উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ সন্ত্রাসবাদ দমন বা জটিল জিম্মি উদ্ধার অভিযান। কিন্তু সাধারণ ফৌজদারি অপরাধের প্রায় প্রতিটি স্তরে বিশেষ বাহিনীকে প্রবেশাধিকার দেওয়া হলে নিয়মিত থানা পুলিশ দুর্বল ও প্রান্তিক হয়ে পড়ে এবং বিশেষ বাহিনীটির নাগরিকের প্রাত্যহিক জীবনে অপ্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপের ক্ষেত্র প্রসারিত হয়।
আরও আশঙ্কাজনক হলো—ধারা ১২(১)(খ)-এর ভাষা, যেখানে কেবল ‘আমলযোগ্য অপরাধে জড়িত সন্দেহে’ যেকোনও স্থানে প্রবেশ, তল্লাশি, জব্দকরণ ও গ্রেফতারের ঢালাও ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। কোনও ধরনের বিশ্বাসযোগ্য ও বস্তুনিষ্ঠ প্রমাণ ব্যতিরেকে কেবল ‘সন্দেহের’ ওপর ভিত্তি করে নাগরিকের বাসস্থান বা প্রতিষ্ঠানে প্রবেশ এবং গ্রেফতারের ক্ষমতা সরাসরি ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং সংবিধানে সংরক্ষিত ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকারের ওপর চরম আঘাত। এটি রাজনৈতিক ভিন্নমত দমন, নাগরিক সমাজের কণ্ঠরোধ এবং হয়রানির এক স্থায়ী আইনি সুযোগ তৈরি করে দেয়।
প্রস্তাবিত খসড়াটির সবচেয়ে উদ্বেগজনক এবং মানবাধিকারের সাথে সাংঘর্ষিক দিকটি নিহিত রয়েছে হেফাজত ও জিজ্ঞাসাবাদ সংক্রান্ত বিধানাবলির মধ্যে। ধারা ১৪-তে বলা হয়েছে যে গ্রেফতারকৃত ব্যক্তি বা জব্দকৃত আলামত অনতিবিলম্বে নিকটবর্তী থানার হেফাজতে সোপর্দ করতে হবে, যা ফৌজদারি কার্যবিধির সাধারণ নিয়মের অনুরূপ। কিন্তু এর ঠিক পরবর্তী অধ্যায়ে ধারা ১৫(৪)-এ বিধান রাখা হয়েছে যে সুষ্ঠু তদন্তের প্রয়োজনে এসআরবির নিজস্ব হাজতখানা, মালখানা ও জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষ থাকবে। এই দুটি ধারার মধ্যকার পারস্পরিক দ্বন্দ্ব অত্যন্ত গভীর এবং বিপজ্জনক। যদি গ্রেফতারের পর অভিযুক্তকে অবিলম্বে নিয়মিত থানায় হস্তান্তর করতেই হয়, তবে বিশেষ ইউনিটের অধীনে নিজস্ব হাজতখানা ও জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষের আইনি অস্তিত্ব কেন রাখা হলো, তা এক বিশাল প্রশ্নের জন্ম দেয়। এই আইনি অস্পষ্টতা অতীতে ব্যবহৃত সেই অনানুষ্ঠানিক ও গোপন আটকব্যবস্থাকে পুনরুজ্জীবিত করার সুযোগ দেয়, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের ভাষায় গুম ও নির্যাতনের অন্যতম প্রধান উৎস।
জাতিসংঘ ঘোষিত নির্যাতনবিরোধী সনদ (সিএটি) এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক দলিলের অন্যতম প্রধান শর্ত হলো যে কোনও অভিযুক্ত ব্যক্তিকে প্রকাশ্যে আইনি হেফাজতে রাখতে হবে এবং ম্যাজিস্ট্রেটের সার্বক্ষণিক নজরদারির আওতায় তদন্ত পরিচালনা করতে হবে।
নিজস্ব হাজতখানা ও বদ্ধ জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষের বিধান থাকলে আসামির ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানোর সুযোগ বহুগুণ বৃদ্ধি পায় এবং হেফাজতে মৃত্যুর মতো ঘটনাগুলোকে ধামাচাপা দেওয়া সহজ হয়। ধারা ১৫(৪)-এর মতো বিধান বহাল থাকলে অভিযুক্ত ব্যক্তির মৌলিক মানবাধিকার ও আইনি অধিকার রক্ষা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে।
তদন্ত ও প্রসিকিউশনের ক্ষেত্রে ধারা ১৫(২)-এ মহাপরিচালককে সাব-ইন্সপেক্টর পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের তদন্তের দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে এবং ধারা ১৩ নম্বরে তাদের ফৌজদারি কার্যবিধির অধীন পুলিশ কর্মকর্তার সমমর্যাদা প্রদান করা হয়েছে। কিন্তু পুরো প্রক্রিয়ায় বিচারিক তদারকির সুনির্দিষ্ট সীমারেখা টানা হয়নি। ম্যাজিস্ট্রেট বা বিচারিক কর্তৃপক্ষের সরাসরি সম্পৃক্ততা ছাড়া যখন একটি সামরিক ধাঁচের বিশেষ ইউনিটকে তদন্ত ও নিজস্ব কক্ষে জিজ্ঞাসাবাদের ক্ষমতা দেওয়া হয়, তখন ফৌজদারি কার্যবিধির মৌলিক ভারসাম্য চরমভাবে বিনষ্ট হয়। ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার প্রধান রক্ষাকবচ হলো—তদন্ত কর্মকর্তার নিরপেক্ষতা এবং সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহের স্বচ্ছতা। নিজস্ব মালখানা ও হাজতখানার আড়ালে যদি ফরেনসিক বা তদন্ত প্রক্রিয়া পরিচালিত হয়, তবে আলামত বিকৃতি বা জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি আদায়ের সম্ভাবনা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে, যা সংবিধানের ৩৫ অনুচ্ছেদে বর্ণিত আত্মপক্ষ সমর্থনের মৌলিক অধিকার এবং ফেয়ার ট্রায়ালের ধারণাকে ধ্বংস করে দেয়।
আইনের ষষ্ঠ অধ্যায়ে বর্ণিত ‘অভিযোগ প্রতিকার কমিটি’ আপাতদৃষ্টিতে একটি ইতিবাচক তদারকি ব্যবস্থার মতো মনে হলেও এর অভ্যন্তরীণ গঠন কাঠামো ন্যায়বিচারের মূল নীতির সাথে সাংঘর্ষিক। ধারা ২২(১) অনুযায়ী এই কমিটির পাঁচ জন সদস্যের মধ্যে চার জনই হবেন সরাসরি সরকার ও পুলিশ প্রশাসনের প্রতিনিধি—যথা ইউনিটের অতিরিক্ত মহাপরিচালক, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি, পুলিশ অধিদফতরের প্রতিনিধি এবং ইউনিটেরই লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া পরিচালক। মাত্র একজন সদস্য বাইরে থেকে মানবাধিকার বা আইন বিশেষজ্ঞ হিসেবে মনোনীত হবেন। এই ধরনের একটি প্রশাসনিক কাঠামো কখনোই কোনও স্বাধীন বাহ্যিক তদারকি ব্যবস্থা বা ইনডিপেনডেন্ট পুলিশ কমপ্লেইন্টস কমিশন হিসেবে কার্যকর হতে পারে না।
কোনও বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা যখন নিজেদের সহকর্মীদের বিরুদ্ধে সাধারণ নাগরিকের তোলা অভিযোগের বিচার করবেন, তখন সেখানে স্বার্থের সংঘাত এবং প্রাতিষ্ঠানিক পক্ষপাতের জন্ম হওয়া অনিবার্য। ন্যায়বিচারের সর্বজনীন নীতি হলো—কেউ নিজের মামলায় নিজেই বিচারক হতে পারেন না। অধিকন্তু, ধারা ২২(২)(গ) অনুযায়ী এই কমিটির ক্ষমতা কেবল সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিকট ‘সুপারিশ’ এবং ‘পরামর্শ’ প্রদানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন, বিচারবহির্ভূত বলপ্রয়োগ বা দুর্নীতির ক্ষেত্রে যদি কোনো কমিটির সরাসরি মামলা দায়ের, স্বাধীন প্রসিকিউশন পরিচালনা বা বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষমতা না থাকে, তবে তা কেবল একটি আনুষ্ঠানিক দাফতরিক আইনি কাঠামো হিসেবেই কার্যকর থাকবে, যা নাগরিকদের কোনও প্রকৃত ন্যায়বিচার দিতে পারবে না।
আইনের শেষ ভাগে অষ্টম অধ্যায়ের ধারা ২৬-এ বর্ণিত রহিতকরণ ও হেফাজত সংক্রান্ত উপধারাগুলো খসড়াটির প্রকৃত উদ্দেশ্যকে উন্মোচিত করে দেয়। ধারা ২৬(৩) থেকে ২৬(৭) পর্যন্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে বিলুপ্ত হতে যাওয়া র্যাবের সকল স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি, নগদ ও ব্যাংকে গচ্ছিত অর্থ, দায়-দায়িত্ব, রেকর্ডপত্র, এমনকি সকল কর্মকর্তা ও কর্মচারী স্বয়ংক্রিয়ভাবে নবগঠিত এসআরবিতে স্থানান্তরিত ও অন্তর্ভুক্ত হবেন। তদুপরি অতীতে র্যাবের অধীনে কৃত সব কাজ, জারিকৃত আদেশ, বিভাগীয় ব্যবস্থা বা বাহিনীর আদালতের কার্যধারাকে নতুন আইনের অধীনে বৈধ ও বহাল বলে ঘোষণা করা হয়েছে। এই ঢালাও স্থানান্তর এবং উত্তরাধিকারের বৈধতা দান প্রমাণ করে যে অতীতের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাবলির কোনও নিরপেক্ষ অডিট, দায় নিরূপণ বা দোষী সদস্যদের জবাবদিহির আওতায় আনার কোনও সদিচ্ছা এই আইনের নেই। যারা অতীতে কাঠামোগত দায়মুক্তির সুযোগে নাগরিক অধিকার হরণ করেছে, তাদের কোনও রূপান্তর বা জবাবদিহি ছাড়াই একই সুযোগ-সুবিধা ও ক্ষমতায় নতুন মোড়কে পুনর্বাসিত করা হচ্ছে। এর ফলে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর ন্যায়বিচার পাওয়ার পথ আরও সংকুচিত হবে এবং সমাজে বিচারহীনতার সংস্কৃতি প্রাতিষ্ঠানিক স্থায়ী রূপ লাভ করবে।
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নিরাপত্তা খাতের সংস্কার হতে হয় মৌলিক, যা শুরু হয় ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, সম্পূর্ণ বেসামরিকীকরণ এবং নিরঙ্কুশ বিচারিক জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন আইন, ২০২৬’-এর এই খসড়াটি সেই ঐতিহাসিক সুযোগকে অবহেলা করে কেবল পুরোনো ব্যবস্থার ওপর একটি নতুন আইনি প্রলেপ দেওয়ার চেষ্টা করেছে। প্রেষণ ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা, নিজস্ব হাজতখানা ও জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি, অতি-বিস্তৃত সমান্তরাল এখতিয়ার, দুর্বল অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থা এবং অতীতের সব কার্যকলাপের নির্বিচার বৈধতাদানের মধ্য দিয়ে খসড়াটি মানবাধিকার ও আইনের শাসনের জন্য এক বিরাট উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটি কার্যকর, মানবিক এবং সাংবিধানিক শাসনব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে এই খসড়াটির আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন। বিশেষায়িত ইউনিটটিকে প্রেষণমুক্ত করে শতভাগ বেসামরিক পুলিশ ক্যাডারের অধীনে আনা, নিজস্ব হাজতখানা ও অস্পষ্ট জিজ্ঞাসাবাদের বিধান বাতিল করে প্রচলিত থানা ও বিচারিক কাঠামোর কঠোর নজরদারিতে আনা, অস্পষ্ট সন্দেহের ভিত্তিতে তল্লাশি ও গ্রেফতারের ক্ষমতা রহিত করা এবং একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন বাহ্যিক পুলিশ অভিযোগ কমিশন গঠন করাই কেবল পারে এই সংস্কারকে অর্থবহ রূপ দিতে।
অন্যথায়, আইনের নাম পরিবর্তন হলেও নাগরিকের মৌলিক অধিকার খর্ব হওয়ার এবং রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন অব্যাহত থাকার পুরোনো সংকট চিরস্থায়ী রূপ ধারণ করবে। অন্যথায়, কেবল প্রাতিষ্ঠানিক নামবদল করে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঝুঁকি, মানবতাবিরোধী অপরাধের ধারাবাহিকতা ও দায়মুক্তির সংকট কোনোভাবেই দূর করা সম্ভব হবে না।
লেখক: গবেষক ও মানবাধিকারকর্মী







