কেন সুর আগে পৌঁছে যায়, পরে আসে গানের কথা

খালিদ এইচ. খান
২৭ জুলাই ২০২৬, ০৯:১১আপডেট : ২৭ জুলাই ২০২৬, ০৯:১১

আমরা যখন কোনো গান শুনি, তখন প্রায়ই তার কথার প্রতি তেমন মনোযোগ দিই না, যদিও গানের কথা গভীর তাৎপর্যপূর্ণ ও শক্তিশালী। সত্যি বলতে, একটি গানের তাল ও ছন্দ আমাদের তাৎক্ষণিকভাবে আলোড়িত করে। সুর ও গীতিকথা এমন নিবিড়ভাবে পরস্পরের সঙ্গে জড়িত যে, একটিকে অন্যটি থেকে বিচ্ছিন্ন করে ভাবা যায় না।

সংগীতে সুরের রয়েছে অনন্য এক শক্তি। গানের কথার প্রতি সচেতন মনোযোগ না দিয়েও তা শ্রোতার মনে নস্টালজিয়া জাগিয়ে তুলতে পারে কিংবা আনন্দ ও বেদনার গভীর অনুভূতিতে নিমজ্জিত করতে পারে। অন্যদিকে, গীতিকথা শ্রোতাকে নিয়ে যায় আরও গভীর এক স্তরে। তা মনে স্থায়ী ছাপ ফেলে এবং প্রায়ই দর্শন, আত্মজিজ্ঞাসা ও ভাবনার জন্ম দেয়। আর যখন উৎকৃষ্ট সুরের সমর্থন মেলে, তখন গীতিকথার গভীরতা ও শক্তি আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।

সুর আমাদের হৃদয় স্পর্শ করে এবং আবেগকে আলোড়িত করে। প্রায় মুহূর্তের মধ্যেই তা রুচিশীল ও সাধারণ; উভয় ধরনের শ্রোতার ওপর গভীর প্রভাব বিস্তার করতে পারে। তবে সুরের আরেকটি দিকও রয়েছে। কখনও তা এতটাই জটিল ও মনননির্ভর হয়ে ওঠে যে, সাধারণ শ্রোতার পক্ষে তার গভীরতা উপলব্ধি করা সহজ হয় না। উদাহরণস্বরূপ, ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ ও রবিশঙ্করের অনেক সুরসৃষ্টি সাধারণ উপলব্ধির সীমা অতিক্রম করে যায়; সেগুলোর প্রকৃত আস্বাদন মূলত মননশীল শ্রোতার পক্ষেই সম্ভব।

গীতিকথার ক্ষেত্রেও একই বৈচিত্র্য লক্ষ করা যায়। কিছু গানের কথা সহজ অর্থ বহন করে এবং সাময়িক ছাপ রেখে যায়। আবার কিছু গীতিকথা গভীরভাবে দার্শনিক, যা আধ্যাত্মিক বা বৌদ্ধিক জাগরণের অনুভূতি সৃষ্টি করে।

সক্রেটিস, প্লেটো ও অ্যারিস্টটলের মতো মহান দার্শনিকদের বহু চিরন্তন ভাবনা আজও মূলত একাডেমিক কিংবা বুদ্ধিবৃত্তিক পরিমণ্ডলেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু সেই ভাবনাগুলো যখন আকর্ষণীয় সুরে গাঁথা গানে রূপ নেয়, তখন তারা এমন এক গীতিময় রূপ লাভ করে, যা ব্যাপকভাবে মানুষের হৃদয়ে পৌঁছে যায় এবং লক্ষ লক্ষ মানুষের মনে স্থায়ী ছাপ ফেলে।

কখনও কখনও গভীর আধ্যাত্মিক বার্তাও কিছু গানের মাধ্যমে প্রকাশ পায় এবং গীতিকথা ও সুরের মনোমুগ্ধকর সংমিশ্রণে তা বুদ্ধিজীবী সমাজ থেকে সাধারণ মানুষের মধ্যেও বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করে। এর উদাহরণ হিসেবে একটি লোকগীতি এবং একটি চলচ্চিত্রের গান উল্লেখ করা যেতে পারে।

বহুল পরিচিত লালনগীতি ‘ও যার আপন খবর আপনার হয় না’ সরল সুরে রচিত হলেও তার অন্তর্নিহিত আধ্যাত্মিক তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর। একইভাবে, প্রখ্যাত গীতিকার গাজী মাজহারুল আনোয়ার এবং বিশিষ্ট সুরকার আলাউদ্দিন আলীর সৃষ্ট চলচ্চিত্রের গান ‘আছেন আমার মোক্তার, আছেন আমার ব্যারিস্টার’-এও গভীর আধ্যাত্মিক ভাবধারা প্রতিফলিত হয়েছে।

এ ধরনের সৃষ্টি বাংলা সংস্কৃতিতে চিরকাল বেঁচে থাকবে। বাংলাদেশের সেইসব দূরদর্শী গীতিকার ও সুরকারের প্রতি সমগ্র সমাজ চিরঋণী থাকবে, যাঁদের সৃষ্টিকর্ম আজও মানুষকে অনুপ্রাণিত করে, সমৃদ্ধ করে এবং আমাদের জাতির আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক সত্তাকে ধারণ ও সংরক্ষণ করে চলেছে।

সাম্প্রদায়িক সংঘাতকে কেন্দ্র করে নির্মিত হিন্দি চলচ্চিত্র ‘বোম্বে’-তে প্রখ্যাত সুরকার এ. আর. রহমান এমন এক গভীর আবেগময় সুরসৃষ্টি করেছিলেন, যা চলচ্চিত্রটির আবেগঘন প্রভাবের অন্যতম ভিত্তিতে পরিণত হয়। একইভাবে, ইংরেজি চলচ্চিত্র ‘টাইটানিক’-এর গান “মাই হার্ট উইল গো অন” তার মনোমুগ্ধকর সুর ও অর্থবহ গীতিকথার কারণে বিশ্বজুড়ে অসামান্য জনপ্রিয়তা অর্জন করে।

এমন বহু উদাহরণ রয়েছে, যেখানে কবিতা পরবর্তীকালে গানে রূপান্তরিত হয়েছে। বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত, যা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচনা করেছিলেন, মূলত একটি কবিতা। পরে এতে সুরারোপ করা হয়, যার সুরের অনুপ্রেরণা নেওয়া হয় গগন হরকরার বাউলধারা থেকে। পরবর্তীকালে এটি আমাদের জাতীয় পরিচয়ের এক অনন্য প্রতীকে পরিণত হয়।

কাজী নজরুল ইসলামের ‘চল চল চল’ এবং রবার্ট ফ্রস্টের “স্টপিং বাই উডস অন অ্যা স্নো ইভিনিং”—এমন বহু রচনার মধ্যে উল্লেখযোগ্য, যেখানে উচ্চমানের কাব্যিক প্রকাশভঙ্গি ও অনবদ্য সুরসৌন্দর্য সৃষ্টিগুলোকে অনন্য ও স্মরণীয় করে তুলেছে।

কিছু কিছু অসাধারণ গীতিকথা এমনিতেই নিজস্ব এক অন্তর্নিহিত সুর বহন করে এবং আনুষ্ঠানিকভাবে সুরারোপ না হলেও গভীর আবেদন সৃষ্টি করে। যেমন—

আই হ্যাভ স্প্রেড মাই ড্রিমস আনডার ইওর ফিট

ট্রিড সফটলি বিকজ ইউ ট্রিড অন মাই ড্রিমস’’

ডব্লিউ. বি. ইয়েটসের “হি উইশেস ফর দ্য ক্লোদস অব হ্যাভেন” কবিতার এই অংশটি সুন্দরভাবে দেখিয়ে দেয়, কীভাবে কাব্যিক ভাষা নিজেই এক ধরনের সুরময়তা সৃষ্টি করতে পারে।

যেখানে ইয়েটস কাব্যের অন্তর্নিহিত সুরের দৃষ্টান্ত তুলে ধরেছেন, সেখানে পার্সি বিশি শেলি মানুষের বেদনার সঙ্গে যুক্ত গানের আবেগময় শক্তির কথা বলেছেন। তাঁর “টু অ্যা স্কাইল্যার্ক” কবিতায় তিনি লিখেছেন—

আওয়ার সুইটেস্ট সংস আর দোজ দ্যাট টেল অব স্যাডেস্ট থট’’।

এই ভাবনার প্রতিফলন বিভিন্ন প্রেক্ষাপটের বহু গানে লক্ষ করা যায়।

ভাষা আন্দোলনের অমর গান ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি’, যার গীতিকার আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী, এই ভাবনার এক উজ্জ্বল উদাহরণ। ভাষা আন্দোলনের শহীদদের আত্মত্যাগকে কেন্দ্র করে রচিত এই গানটি আলতাফ মাহমুদের গভীর অনুরণনময় সুরে অসামান্য জনপ্রিয়তা অর্জন করে এবং মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী স্থান করে নেয়।

একই ধরনের আবেগঘন আবেদন পাওয়া যায় ‘একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি’ গানেও, যা ক্ষুদিরাম বসুর সঙ্গে সম্পৃক্ত। হৃদয়স্পর্শী গীতিকথা ও মর্মস্পর্শী সুরের শক্তিশালী সমন্বয়ই গানটিকে এক কালজয়ী মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছে।

ব্রিটিশ সংগীত কিংবদন্তি এলটন জন প্রিন্সেস ডায়ানার মর্মান্তিক মৃত্যুর পর তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে “ক্যান্ডে ইন দ্য উইন্ড” গানটি লিখে পরিবেশন করেন। সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম শোকাবহ ঘটনার প্রেক্ষাপটে এটি ছিল এক গভীর আবেগময় এবং সময়োপযোগী সংগীত নিবেদন।

এই ধারণাকে আরও বিস্তৃত করলে দেখা যায়, সুর কেবল সংগঠিত সংগীতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।

মহান মার্কিন কবি ওয়াল্ট হুইটম্যান তাঁর ‘‘প্রাউড মিউজিক অব দ্যা স্টোর্ম’’ কবিতায় সুরের ধারণাকে প্রচলিত সংগীতের সীমানার অনেক বাইরে নিয়ে গেছেন। তাঁর দৃষ্টিতে, প্রকৃতির মৌলিক ধ্বনির মধ্যে এমন এক বিস্তৃত সুরের জগৎ নিহিত, যেখানে মানবিক আবেগ এবং অগণিত কণ্ঠস্বর প্রতিফলিত হয়। তিনি সেই প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্ন করেন যে, সুর কেবল গীতিকথা বা আনুষ্ঠানিক সংগীতরচনার ওপর নির্ভরশীল। বরং তাঁর মতে, অস্তিত্বের নিজস্ব ছন্দ থেকেই সুরের জন্ম। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে, সময়ের প্রবাহে মানুষের সব গান—অর্থাৎ মানুষের আবেগ ও কণ্ঠস্বরের বহুমাত্রিক প্রকাশ—পৃথিবীর সেই মহাসংগীতের মধ্যেই তাদের প্রকৃত অর্থ খুঁজে পায়। আর আনুষ্ঠানিক সংগীতরচনা সেই গভীর, সর্বজনীন সুরেরই পরিশীলিত প্রকাশ।

অতএব, শিল্পের আবেগগত ও সাংস্কৃতিক প্রভাব নির্মাণে সুর ও গীতিকথা একে অপরের পরিপূরক। ধ্যান ও আধ্যাত্মিক সাধনায়ও সুর প্রায়ই এক রূপান্তরমূলক ভূমিকা পালন করে। আবার নস্টালজিয়ার মুহূর্তে সাধারণত প্রথমে আমাদের মনে ভেসে ওঠে সুর, তারপর ধীরে ধীরে ফিরে আসে গানের কথা।

মানবসভ্যতার প্রারম্ভিক পর্যায়ে সম্ভবত সুরের আবির্ভাব ঘটেছিল ভাষারও আগে। সুরের উৎসকে লক্ষ লক্ষ বছর আগের সেই প্রাগৈতিহাসিক সময় পর্যন্ত অনুসরণ করা যায়, যখন আদিম মানুষের কোনো সুগঠিত ভাষা ছিল না; তারা শব্দ, সংকেত এবং বিভিন্ন ধরনের কণ্ঠস্বরের মাধ্যমে যোগাযোগ করত। এই প্রকাশভঙ্গিগুলোকে আদিম স্তোত্র হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে, যা মূলত সুরেরই প্রাথমিক রূপ।

একইভাবে, ভাষাহীন সেই যুগে আদিম মানুষের অঙ্গভঙ্গি—বিশেষত চোখের ভাষায় প্রকাশিত অনুভূতি—গীতিকথারও এক প্রাথমিক পূর্বসূরি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তা আনুষ্ঠানিক ভাষা না হলেও ছিল আবেগের বাহক এবং প্রাক্-ভাষিক জগতের এক কার্যকর যোগাযোগমাধ্যম।

শত সহস্র বছরের বিবর্তনের ধারায় ধীরে ধীরে ভাষার বিকাশ ঘটেছে। তাই ধারণাগত ও বিবর্তনগত—উভয় দৃষ্টিকোণ থেকেই মানবজীবনে সুরের অবস্থান আরও মৌলিক।

সম্ভবত সুরের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো, এই পৃথিবীর বাসিন্দা হিসেবে আমরা প্রতিনিয়ত এক সূক্ষ্ম কম্পনের মধ্যে অবস্থান করছি—পৃথিবী নিজেই যেন অবিরাম এক প্রায় অদৃশ্য অনুরণন সৃষ্টি করে চলেছে। সেই গভীর, অন্তর্লীন স্পন্দনই হয়তো নীরবে আমাদের ভেতরে সুর সৃষ্টির প্রেরণা জাগিয়ে তোলে। পৃথিবীর সেই নীরব ছন্দকেই আমরা আমাদের নিজস্ব অনুভূতি ও সৃষ্টিশীলতার মধ্য দিয়ে সুরে রূপ দিই।

লেখক: প্রকৌশলী, শিল্পোদ্যোক্তা এবং বিজ্ঞান ও সাহিত্য-অনুরাগী।

/ইউএস/
সম্পর্কিত
জুলাই অভ্যুত্থান: বিসর্জিত প্রাণের নীরব আর্তনাদ
জুলাই অভ্যুত্থান: বিসর্জিত প্রাণের নীরব আর্তনাদ
জোরপূর্বক গুমের বিচারে প্রাতিষ্ঠানিক ও পদ্ধতিগত গলদ এবং ভুক্তভোগীবান্ধব বিচার সম্ভব? 
অধ্যাদেশ থেকে নতুন খসড়া আইনজোরপূর্বক গুমের বিচারে প্রাতিষ্ঠানিক ও পদ্ধতিগত গলদ এবং ভুক্তভোগীবান্ধব বিচার সম্ভব? 
সীমান্ত অঞ্চলে জামায়াতের শক্তি বৃদ্ধিকে যেভাবে দেখছে ভারত
সীমান্ত অঞ্চলে জামায়াতের শক্তি বৃদ্ধিকে যেভাবে দেখছে ভারত
জনসংখ্যার ভবিষ্যৎ: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবট এবং শ্রমবাজার
জনসংখ্যার ভবিষ্যৎ: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবট এবং শ্রমবাজার
বিনোদন বিভাগের সর্বশেষ
অকালপ্রয়াণে গিটারিস্ট সাদ্দাম রনি
অকালপ্রয়াণে গিটারিস্ট সাদ্দাম রনি
মুক্তির চতুর্থ দিনেই একশ’ কোটির ক্লাবে বিজয়ের ‘জন নায়গন’
মুক্তির চতুর্থ দিনেই একশ’ কোটির ক্লাবে বিজয়ের ‘জন নায়গন’
দুষ্কৃতকারী ও রাজনৈতিক দল আন্দোলনকে ছিনতাই করেছে: রাভিনা ট্যান্ডন
দুষ্কৃতকারী ও রাজনৈতিক দল আন্দোলনকে ছিনতাই করেছে: রাভিনা ট্যান্ডন
সুনিধি নায়েকের কণ্ঠে ‘পাতার বাঁশরি’ শুনে কী বললেন জয়া আহসান?
সুনিধি নায়েকের কণ্ঠে ‘পাতার বাঁশরি’ শুনে কী বললেন জয়া আহসান?
শুরু হচ্ছে শিশুশিল্পী প্রতিযোগিতা ‘শাপলাকুঁড়ি ২০২৬’
শুরু হচ্ছে শিশুশিল্পী প্রতিযোগিতা ‘শাপলাকুঁড়ি ২০২৬’