X
শুক্রবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২১, ৯ আশ্বিন ১৪২৮

সেকশনস

শহীদুল জহিরকে নিয়ে গাঁথার আয়োজন

আপডেট : ১৬ অক্টোবর ২০১৭, ১১:২৩

(বাম থেকে) হামীম কামরুল হক, মোজাফফর হোসেন এবং আফরোজা আক্তার টিনা ধানমন্ডির ইএমকে সেন্টারে গত ১৪ অক্টোবর বিকেলে নারীদের সংগঠন ‘গাঁথা’র নিয়মিত মাসিক সাহিত্য আড্ডা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ‘শহীদুল জহিরের গল্প : বাস্তবের জাদু কিংবা জাদুর বাস্তব’ শীর্ষক ওই আড্ডায় আলোচনা  করেন কথাসাহিত্যিক হামীম কামরুল হক এবং মোজাফফর হোসেন।

আড্ডায় শহীদুল জহিরের চারটি ছোটগল্পের উপর আলোচনা করা হয়। হামীম কামরুল হক ‘চতুর্থ মাত্রা’ ও ‘আগারগাঁও কলোনিতে নয়নতারা ফুল কেন নেই’ গল্প দুটির উপর আলোচনা করেন। মোজাফফর হোসেন ‘ডুমুর খেকো মানুষ’ এবং ‘কাঠুরে ও দাঁড়কাক’ গল্পের উপর আলোচনা করেন।

হামীম কামরুল হক বলেন, বাংলা ভাষায় শহীদুল জহিরের যে প্রবণতা তা আর কারো মধ্যে ছিল না। শহীদুল জহির ঠিক জাদুবাস্তববাদী লেখক নন। তার লেখার কাঠামো এবং বয়ান পাঠককে আকৃষ্ট করে। তিনি খুব সাধারণ বিষয়কে লেখার নিজস্ব ধারায় জাদুময়তার রূপ দিয়েছেন। নিজ দেশের মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে তুলে ধরেছেন। তিনি মানুষের জীবনের দৈনন্দিন তুচ্ছতা খুঁজে বেড়াতেন এবং সেগুলো নিয়েই লিখতেন। এই তুচ্ছতাকে আমরা সাধারণত খেয়াল করি না। তাই এটাকে আমাদের কাছে জাদুবাস্তবতা বলে মনে হয়।

গল্পের প্রসঙ্গে হামীম কামরুল হক বলেন, আগারগাঁও কলোনিতে নয়নতারা ফুল কেন নেই- গল্পে শহীদুল জহির প্রকৃতি ও প্রেমের দারুণ উপমায় আমাদের দেশের একটি কঠিন সময়ের পরিস্থিতি তুলে ধরেছেন।

মোজাফফর হোসেন বলেন, শহীদুল জহির জাদুবাস্তবতার সার্থক আখ্যানশিল্পী গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস এবং চেতনা প্রবাহ রীতির প্রবক্তা সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। তার গদ্যে বাস্তবতার সঙ্গে রূপকথার এবং কথ্য ভাষার সঙ্গে মান ভাষার মিশ্রণে একটি স্বকীয় ধারা তৈরি হয়েছে।

মোজাফফর হোসেন আরো বলেন, তিনি কাঠামো সচেতন লেখক। তিনি ঐতিহ্যগত শৈলী থেকে বের হতে চেয়েছেন। তার ছোটগল্পের কাহিনিতে গভীর জীবন ও অন্তর্লোক একই সাথে মিলিত হয়। তাকে আমরা উত্তর কাঠামোবাদী ভাবতে পারি। তিনি ভাষাকে নতুন করে পরিসঞ্চালন করেছেন।

মোজাফফর আরো বলেন, ডুমুর খেকো মানুষের গল্পটি কিছুটা কল্পনাপ্রবণ। এই গল্পে শহীদুল জহির কল্পনা করেই ছেড়ে দেননি, বাস্তবতার উল্লেখও করেছেন। এখানে তিনি স্থান সময়েরও ব্যবহার করেছেন। এটি জাদুবাস্তবতা দিয়ে শুরু ও জনশ্রুতি দিয়ে শেষ হয়। অন্যদিকে কাঠুরে ও দাঁড়কাক গল্পটি জনশ্রুতি দিয়ে শুরু হলেও শেষ হয় জাদুবাস্তবতা দিয়ে। 

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন কথাশিল্পী পাপড়ি রহমান এবং গাঁথার সাধারণ সম্পাদক জ্যাকি কবির। ডুমুর খেকো মানুষ থেকে নির্বাচিত অংশ পাঠ করেন ড. নাহিদ কায়সার এবং আগারগাঁও কলোনিতে নয়নতারা ফুল কেন নেই থেকে পাঠ করেন আফরোজা আক্তার টিনা। অনুষ্ঠান সঞ্চলনা করেন ড. ইশরাত তানিয়া।


 

আগামীকাল পড়ুন মোজাফফর হোসেনের সম্পূর্ণ আলোচনা।

//জেডএস//

সম্পর্কিত

শনিবার একুশের সংকলনের ‘কবি-অভিষেক’

শনিবার একুশের সংকলনের ‘কবি-অভিষেক’

অবশেষে বইমেলা

অবশেষে বইমেলা

আজ কবি শামীম রেজার সুবর্ণজয়ন্তী

আজ কবি শামীম রেজার সুবর্ণজয়ন্তী

তরুণ লিখিয়ের খোঁজে জলধি

তরুণ লিখিয়ের খোঁজে জলধি

পর্ব—চার

সাহিত্যতত্ত্ব : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা

আপডেট : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২:১৬

পূর্বপ্রকাশের পর
লঞ্জাইনাসের সাবলাইম তত্ত্ব

গ্রিক পণ্ডিতদের কাছ থেকে আমরা সাহিত্য বিষয়ে পেয়েছি ‘মাইমেসিস’ তত্ত্ব আর রোমান যুগ থেকে পেয়েছি ‘সাবলাইম’ তত্ত্ব। সাবলাইম তত্ত্বও সাহিত্যের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। মাইমেসিস তত্ত্বের বিষয়বস্তু হলো সাহিত্যের কার্যধারা আর সাবলাইম তত্ত্বের বিষয়বস্তু হলো সাহিত্যের শৈলী। সাবলাইম তত্ত্বটি যে গ্রন্থ থেকে আমরা গ্রহণ করেছি সে গ্রন্থটিও গ্রিক ভাষায় লিখিত এবং লেখার সময়কাল খ্রিষ্টীয় প্রথম শতক। বইটির গ্রিক নাম ‘পেরি হিপসুস’ (Peri Hypsous) ইংরেজিতে ‘On Sublime’। বইটির নাম আমরা জানলেও এটির লেখক কে তা আমরা নিশ্চিতভাবে জানি না। ১৫৫৪ সালে এটি প্রথম মুদ্রিত হয় এবং সে মুদ্রণে লেখকের নাম উল্লেখ করা হয়েছিল ডায়োনিসিয়াস লঞ্জাইনাস (Dionysius Longinus)। কিন্তু পরে দেখা যায় যে, পাণ্ডুলিপিতে লেখকের নাম লেখা ছিল Dionysius Or Longinus; Dionysius Longinus নয়। এই আবিষ্কারের পর থেকে অনেক ইতিহাস খোঁড়াখুঁড়ি হয় আসল লেখকের নাম উদ্ধারের জন্য। অনেক নাম আসে। অনেক বিতণ্ডা হয়। শেষে রেগে গিয়ে স্থির করা হয় এর লেখক হলেন Pseudo-Longinus, অর্থাৎ জনৈক ‘ভুয়া’ লঞ্জাইনাস। 
সাবলাইম সম্পর্কে প্রথম কথায়ই লঞ্জাইনাস বলছেন যে এটি হলো ভাষার উচ্চতা আর চমৎকারিত্ব (loftiness and excellence of language)। মহান লেখকরা তাঁদের লেখার এই গুণের ভিত্তিতে অত্যুচ্চ খ্যাতি আর অমরত্ব অর্জন করে থাকেন। ভাষার এই উচ্চতা আর চমৎকারিত্ব অর্জিত হলো কিনা তা নির্ভর করে ভাষাটি পাঠকের উপর কী প্রভাব ফেলল তার ওপর। দেখতে হবে ভাষাটি পাঠককে তার ভিতর থেকে বের আনল কিনা। ভাষাটি যদি যুক্তিপ্রধান হয় তাহলে তার কাজ হবে পাঠককে কোনো সিদ্ধান্তের দিকে প্ররোচিত করা। এক্ষেত্রে পাঠকের নিজস্ব যুক্তিবুদ্ধি সেই প্ররোচনার বিরুদ্ধে তাকে দাঁড়াতে শক্তি জোগাবে। পাঠক নিজের যুক্তিবুদ্ধির জোর দ্বারা সেই ভাষার শক্তিকে দমিত করতে সমর্থও হতে পারে। এই প্রকার ভাষা সাবলাইম নয়; এই ভাষা পাঠককে তার অবস্থান থেকে, তার কোটর থেকে নাড়িয়ে দিতে সমর্থ হয় না। ফলে যুক্তিতর্কের প্ররোচনাময় ভাষা সাহিত্যের ‘সাবলাইম’ ভাষার মর্যাদা অর্জন করতে পারে না। সাহিত্যের ভাষা হবে সেই ভাষা যার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর মতো পাঠকের কোনো শক্তি থাকবে না। আরব্য একটি ধ্রুপদী কথা আছে কবিতার ব্যাপারে যা লঞ্জাইনাসের এই সাবলাইম ধারণাকে প্রতিধ্বনিত করে। আরব্য সেই ধ্রুপদী সংজ্ঞায় বলা হয়েছে কবিতা হলো সেই ভাষা যা শ্রোতার কানের অনুমতি ছাড়া হৃদয়ে প্রবেশ করে। লঞ্জাইনাসও সাহিত্যের সেই ভাষাকে সাবলাইম বলেছেন যা অপ্রতিরোধ্য শক্তিতে পাঠককে নাড়িয়ে দেয়, পাঠককে তার ভিতর থেকে এমন শক্তিতে বের করে আনে যে পাঠক ইচ্ছে করলেও সে শক্তির বিরুদ্ধে কোনো প্রতিরোধ গড়তে পারে না। এই ভাষা যখন পাঠককে আন্দোলিত করে পাঠক তখন বিমূঢ় হয়ে যায়। লঞ্জাইনাসের এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায় যে, সাহিত্যগত ভাবনা বিষয়ে লঞ্জাইনাস অনেকটাই প্লেটোপন্থি, এরিস্টটলপন্থি নন। প্লেটো বলেছেন সাহিত্য যুক্তিবুদ্ধিকে নষ্ট করে এবং আবেগের উপদ্রবকে বাড়িয়ে তোলে। লঞ্জাইনাস সেই সুরেই বলেছেন যে, মহৎ সাহিত্যের ভাষা মানুষের যুক্তিবুদ্ধিকে বজ্রাঘাতে আহতের মতো থ’ বানিয়ে দেয় এবং পাঠককে তার আবেগের ও অনুভবের স্রোতে ভাসিয়ে নেয়। 
অবশ্য প্লেটোর অনুসরণে লঞ্জাইনাস সাহিত্যের ভাষার এই শক্তিকে অভিযুক্ত করেননি এবং সাহিত্যকে নিষিদ্ধ করার কথাও বলেননি। উপরন্তু, বইয়ের ৭ম অধ্যায়ে এসে, মনে হচ্ছে, তিনি বুঝতে পারলেন যে তিনি যা বলছেন তার মধ্যদিয়ে সাহিত্যের ভাষার একটি ক্ষতিকর দিকের কথা তিনি বলে ফেলেছেন। তাই এবারে সেই ক্ষতি পোষাতে গিয়ে তিনি একটু স্ববিরোধী হয়েই বললেন—‘সাহিত্যের সাবলাইম ভাষা পাঠকের আত্মার জন্য উচ্চভাবনার খোরাক জোগায়’ (dispose[s] the soul to high thoughts . . . leave[s] in the mind more food for reflection than the words seem to convey)। লঞ্জাইনাসের টেক্সটের বিশ্লেষণে স্টিফেন হ্যালিওয়েল এর নাম দিয়েছেন ‘অর্থের অতিরিক্ত’ বা ‘অর্থের উদ্বৃত্ত’ (surplus of meaning)। তিনি মনে করেন সাহিত্যের সাবলাইম ভাষা এভাবে অর্থের অতিরিক্ততা সৃষ্টির মাধ্যমে পাঠককে এক গভীরতর বাস্তবতার দিকে নিয়ে যায়। যুক্তিবুদ্ধির সাধারণ চর্চার মাধ্যমে উপলব্ধির সে গভীরতায় কখনো পৌঁছা সম্ভব নয়।
সাহিত্যের এই মহীয়ান অর্থাৎ সাবলাইম ভাষা কীভাবে তৈরি হবে, এর উপাদান কী কী—এ বিষয়েও লঞ্জাইনাস তাঁর বইয়ে আলোচনা করেছেন। লঞ্জাইনাসের মতে সাহিত্যের সাবলাইম ভাষার উপাদান বা উপকরণ হলো পাঁচটি : ১. মহৎ ভাব ধারণের ক্ষমতা, ২. প্রচণ্ড আবেগ জাগানোর ক্ষমতা, ৩. ভাষার অলংকার (figures of speech), ৪. উচ্চমার্গীয় শব্দ, ও ৫. শব্দের মহৎ বিন্যাস। প্রথম দুটি উপাদান বিষয়ে লেখকের কিছু করণীয় নেই। মহৎ ভাব ও উচ্চ আবেগের বিষয় হলো লেখার বিষয়বস্তু সংশ্লিষ্ট। লেখার বিষয়বস্তুর এই মহিমা না থাকলে শুধু লেখকের কারিগরি যোগ্যতার জোরে সাহিত্যকে সাবলাইম পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই বলেই লঞ্জাইনাসের ধারণা। সাবলিমিটি অর্জনের বাকি তিনটি উপাদান সম্পূর্ণই লেখকের কারিগরি যোগ্যতার অংশ। লেখককে জানতে হবে কীভাবে ভাষায় চমৎকার ও মনোহর অলংকার সৃষ্টি করতে হয়, কীভাবে উচ্চমার্গীয় শব্দ খুঁজে পেতে হয় এবং কীভাবে সে শব্দমালা মহৎ শৈল্পিক বিন্যাসে বাঁধতে হয়। 
লঞ্জাইনাসের মতে মহৎ ভাব ও উচ্চ ভাব তিনভাবে অর্জিত হতে পারে। প্রথমত, এটি ঈশ্বরের দান হিসেবে লেখকের মনে আপনা-আপনি জন্ম নিতে পারে। দ্বিতীয়ত, মহৎ লেখকরে লেখা অনুকরণ করার মাধ্যমে এটি অর্জিত হতে পারে। তৃতীয়ত, কল্পনার জোরেও এটি অর্জিত হতে পারে বলে লঞ্জাইনাসের বিশ্বাস। লক্ষণীয় যে, সাহিত্যতাত্ত্বিকদের মধ্যে লঞ্জাইনাসই প্রথম কল্পনার ব্যাপারটি সাহিত্যে গুরুত্বের সাথে দেখেছেন। লঞ্জাইনাসের এই কথা একটু ভিন্নভাবে রোম্যান্টিক যুগে প্রবলভাবে আবার ফিরে এসেছে। তবে তার পূর্বে ইংরেজি তথা ইউরোপীয় সাহিত্যে পুরো গ্রিক ও রোমান ভাবনাকে পাথেয় ধরে রেনেসাঁস যুগে নির্মিত হয়েছিল সাহিত্যের তাবৎ নমুনা ও আদর্শ। গ্রিক ও রোমান ভাবনায় উজ্জীবিত হয়ে; প্লেটো, এরিস্টটল ও লঞ্জাইনাসের চিন্তার অনুসারী হয়ে সাহিত্যের সেই নমুনা ও আদর্শকে ঘিরে যে তত্ত্বের উদ্ভব ঘটেছিল তার সুপরিচিত নাম হলো নিওক্লাসিসিজম বা নব্যধ্রুপদীবাদ। আমাদের পরের আলোচনা এই নিওক্লাসিসিজম নিয়ে।   


নিওক্লাসিসিজম

সাহিত্যতত্ত্বে নিওক্লাসিসিজম বিষয়টি এক এক দেশের জন্য এক এক রকমের। দেশভেদে ও সাহিত্যভেদে এর সময়কাল এবং বিষয়বস্তুতে স্পষ্ট ভিন্নতা রয়েছে। আমরা এখানে যে শুধু ব্রিটেনভিত্তিক ইংরেজি সাহিত্যের নিরিখে নিওক্লাসিসিজম বিষয়ে আলোচনা করতে যাচ্ছি। নিওক্লাসিসিজম শব্দটি ইংরেজিতে ব্যবহৃত হলেও এর খাঁটি ইংরেজি হলো নিউক্লাসিসিজম। বাংলা করলে দাঁড়ায় নব্য ক্লাসিসিজম। ক্লাসিসিজম মানে হলে ক্লাসিকসের ভিত্তিতে দাঁড় করানো সাহিত্য ভাবনা। ইংরেজ তথা ইউরোপীয় ভাবনায় ক্লাসিক হলো গ্রিক ও রোমান সাহিত্য। সোজা করলে নিওক্লাসিসিজমের অর্থ দাঁড়ায় গ্রিক ও রোমান সাহিত্যের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা সাহিত্যভাবনা বা সাহিত্যতত্ত্ব।  
শব্দের ব্যুৎপত্তি থেকে আহরিত এই অর্থের সাথে নিওক্লাসিসিজমের ব্যবহারিক অর্থ খুব একটা আলাদা নয়। সারা ইউরোপ জুড়ে রেনেসাঁস পরবর্তী শিক্ষিত মহল তাদের সাহিত্যের দিকনির্দেশনা সংগ্রহ করতে শুরু করলো গ্রিক ও রোমান ক্লাসিকস থেকে তারই ফসল হিসেবে তৈরি হলো নিওক্লাসিক সাহিত্য মতবাদ। ইংরেজ দেশে এই সময়টা হলো মোটামুটি ১৬৬০ থেকে ১৭৯০ পর্যন্ত, অর্থাৎ ইংরেজ পিউরিটান আন্দোলনের নেতা অলিভার ক্রমওয়েলকে হত্যার পর থেকে ফরাসি সম্রাট ষোড়শ লুইয়ের হত্যার আগ পর্যন্ত সময়কাল। রেনেসাঁসের পর থেকে রোম্যান্টিকের শুরু পর্যন্ত সময়কাল।
নিওক্লাসিসিজমের সময়কালটাকে সাহিত্যবিষয়ক ফতোয়ার কালও বলা যেতে পারে। এসময় কোনটা সাহিত্য হলো আর কোনটা সাহিত্য হলো না তা গ্রিক ও রোমান ক্লাসিকসে যাঁরা পণ্ডিত ও জ্ঞানী ছিলেন তাঁদের ফতোয়ার ওপর নির্ভর করত। কবিতাটির ফর্ম কী হবে, তার ছন্দ কী হবে, তার অলঙ্কার কী হবে সব ক্ষেত্রেই তখন ক্লাসিকস থেকে নির্দেশনা আহরণ করতে হতো। আর সে নির্দেশনা শুধু কবিতার জন্য নয়, সাহিত্যের সব শাখার জন্যই এসময় ক্লাসিক সাহিত্য থেকে ফতোয়া আর কানুন আহরণ করতে হতো। সেসব ফতোয়া দিয়ে আলক্সান্ডার পোপ দুখানা গ্রন্থও লিখে ফেলেছিলেন : একখানা ‘An Essay on Criticism’, অপরখানা ‘Essay on Man’। দুখানাই কবিতায় লেখা প্রবন্ধ। শেষোক্ত প্রবন্ধখানায় গ্রিক-রোমানদের সাহিত্যের এইসব ফতোয়া বা কানুনের মাহাত্ম্য বর্ণনা করতে গিয়ে পোপ সোজা বলে দিয়েছিলেন যে, এসব নিয়মকানুন কোনো মানুষের তৈরি জিনিস নয়, এগুলো খোদ ভগবানের তৈরি। ভগবান যেমন প্রকৃতি বানিয়ে আমাদেরকে দিয়েছেন, তেমনি এগুলোও আমাদের জন্য বানিয়ে দিয়েছেন। মানুষ খালি এগুলোকে প্রকৃতি থেকে খুঁজে নিয়ে একটু সাজিয়েছে মাত্র। পোপের ভাষায়— Those rules of old discover’d, not devis’d/ Are Nature still, but Nature methodis’d। 
ক্লাসিক সাহিত্যের নিয়মকানুন দিয়ে সাহিত্যকে শাসনের যুগ হিসেবে নিওক্লাসিকাল যুগ মৌলিকভাবে পরিচিত হলেও সাহিত্যবিষয়ক ভাবনা ও চর্চায় এর আরো কিছু ভিন্নতর অনুষঙ্গও রয়েছে। রেনেসাঁস যুগে ঈশ্বরকে সরিয়ে দিয়ে মানবের জয়গানের যে সূচনা হয়েছিল নিওক্লাসিকাল যুগে এসে সে জয়গানের একটু লাগাম টেনে ধরা হলো। নিওক্লাসিকাল যুগের সাহিত্য তার বিষয়বস্তুতে মানবের জয়গান না গেয়ে বরং মানবের ত্রুটি ও স্খলনের জায়গাগুলো ব্যাপকভাবে তুলে আনতে শুরু করল। ক্লাসিক গ্রিক সাহিত্যে ভালো মানুষ নিয়ে ছিল মহাকাব্য আর ট্র্যাজেডি, এবং খারাপ মানুষ নিয়ে ছিল স্যাটায়ার আর কমেডি। নিওক্লাসিকাল যুগ ক্লাসিকাল যুগের সেই ভালো মানুষের সাহিত্য রচনায় নামল না, বরং উঠে পড়ে নামল খারাপ মানুষের সাহিত্য রচনায়। ফলে এই যুগে ক্লাসিকাল ধারায় মহাকাব্য আর ট্র্যাজেডি তেমন আসলো না, আসলো হরেক জাতের কমেডি, আর আসলো হরেক জাতের স্যাটায়ার। এমনকি মহাকাব্যের রূপকেও তারা মক-এপিক নামের নতুন ধারায় স্যাটায়ার রচনার কাজে ব্যবহার শুরু করল। 
আরো একটা বিষয়ে নিওক্লাসিকাল যুগ ইংরেজি তথা ইউরোপীয় সাহিত্যকে পিছিয়ে দিলো। ক্লাসিকসের অন্ধ অনুকরণের মাধ্যমে নিওক্লাসিকাল যুগ কল্পনার জায়গা সাহিত্যে ব্যাপকভাবে সংকুচিত করে ফেলল। সে সংকোচন এমনভাবে চলতে থাকল যে শেষ পর্যন্ত কল্পনার বিপুল শক্তিধারী মানুষদেরকে এই চর্চার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে নামতে হলো। সেই বিদ্রোহ থেকেই জন্ম নিলো রোম্যান্টিসিজম নামের নতুন সাহিত্যভাবনা বা সাহিত্যতত্ত্ব। আমাদের পরের আলোচনা এই রোম্যান্টিসিজম নিয়ে। চলবে

/জেডএস/

সম্পর্কিত

লিডসে এলিয়টের 'ওয়েস্টল্যান্ড' ও নজরুলের 'বিদ্রোহী' কবিতার শতবর্ষ

লিডসে এলিয়টের 'ওয়েস্টল্যান্ড' ও নজরুলের 'বিদ্রোহী' কবিতার শতবর্ষ

বঙ্গবন্ধুর স্বাস্থ্য ভাবনা

বঙ্গবন্ধুর স্বাস্থ্য ভাবনা

অন্নজল ও অন্যান্য কবিতা  

অন্নজল ও অন্যান্য কবিতা  

একদিন দিনে চাঁদ ফুটবে

একদিন দিনে চাঁদ ফুটবে

লিডসে এলিয়টের 'ওয়েস্টল্যান্ড' ও নজরুলের 'বিদ্রোহী' কবিতার শতবর্ষ

আপডেট : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৪:৫১

যুক্তরাজ্যের লিডস শহরের সেভেন আর্টস থিয়েটারে উদযাপিত হতে যাচ্ছে কবি কাজী নজরুল ইসলামের 'বিদ্রোহী' এবং টি এস এলিয়ট রচিত কবিতা 'ওয়েস্টল্যান্ড'র গৌরবময় শতবর্ষ। আগামী ২ অক্টোবর শনিবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে এ অনুষ্ঠান হবে।
ভারতীয় মার্গসঙ্গীত ও দক্ষিণ এশীয় শিল্প, সাহিত্য, সঙ্গীতের শীর্ষ সংস্থা সৌধ সোসাইটি অব পোয়েট্রি অ্যান্ড ইন্ডিয়ান মিউজিকের ব্যবস্থাপনায় এই বিশেষ উদযাপনে মঞ্চায়িত হবে কবি টি এম আহমেদ কায়সার পরিচালিত বিশেষ কাব্য-আলেখ্য দ্য রেবেল অ্যান্ড দ্য ওয়েস্টল্যান্ড। এতে এলিয়টের চরিত্র রূপায়ন করছেন কবি ও নাট্যকার জন ফার্নডন এবং নজরুলের চরিত্রে থাকছেন আবৃত্তিকার মানস চৌধুরী। এলিয়টের সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী অধ্যাপক শিব কে কুমারের চরিত্রে অভিনয় করবেন শান্তনু গোস্বামী। মূল কবিতা দুটির নাটকীয় পাঠ ও অভিনয়ে থাকছেন কবি বেকি চেরিম্যান, কবি এরিক শিলান্ডার, কবি মাইলস সল্টার, শ্রী গাঙ্গুলি, কানিজ ফাতেমা চৌধুরী, এহসান আহমাদ রাজ, মোহাম্মদ সাদিফ, মিলি বসু, অভ্র ভৌমিক প্রমুখ। সঙ্গীত ব্যবস্থাপনায় থাকছেন প্রীতম সাহা। আলোক প্রক্ষেপণ ও ব্যবস্থাপনায় পাবলো খালেদ।
এই কবিতা দুটির ঐতিহাসিক প্রেক্ষিত এবং বিশ্ব-কবিতায় এর প্রভাব নিয়ে বক্তব্য রাখবেন লিডস ট্রিনিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক কবি ওজ হার্ডউইক।
বাংলা ও ইংরেজি দুই সমৃদ্ধ কাব্য-ঐতিহ্যের প্রখ্যাত দুই কবিতার শতবর্ষ উদযাপনে দ্য রেবেল এবং দ্য ওয়েস্টল্যান্ড মঞ্চায়িত হবে ১৪ মার্চ লন্ডনের রিচমিপ থিয়েটারে এবং পরবর্তীতে ম্যানচেস্টার মিউজিয়াম, হাউজ অব কমন্স, ব্রিটিশ লাইব্রেরিসহ ব্রিটেনের বিভিন্ন শিল্পমঞ্চে, কয়েকটি শহরে।

/জেডএস/

সম্পর্কিত

সাহিত্যতত্ত্ব : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা

সাহিত্যতত্ত্ব : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা

বঙ্গবন্ধুর স্বাস্থ্য ভাবনা

বঙ্গবন্ধুর স্বাস্থ্য ভাবনা

অন্নজল ও অন্যান্য কবিতা  

অন্নজল ও অন্যান্য কবিতা  

একদিন দিনে চাঁদ ফুটবে

একদিন দিনে চাঁদ ফুটবে

বঙ্গবন্ধুর স্বাস্থ্য ভাবনা

আপডেট : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২:২১

কিশোর বয়স থেকে রাজনীতি করেছেন বঙ্গবন্ধু। ১৯৪৭-এর পর পশ্চিম পাকিস্তানি শাসক-শোষকগোষ্ঠী পূর্ব বাংলা তথা পূর্ব পাকিস্তানের মানুষকে সকল ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত রেখেছে, তা তিনি নিজের জীবনেই অনুভব করেছেন। ক্ষমতায় যাবেন কি না তা নিয়ে কোনো নিশ্চয়তা না থাকলেও দেশের মানুষের জন্য কোন কোন কাজ করা দরকার সেই ভাবনা সব দক্ষ রাজনীতিবিদেরই থাকে। বঙ্গবন্ধুর আরো বেশি ছিল। কারণ তিনি নিজে ছিলেন স্বাপ্নিক এবং স্বপ্নদ্রষ্টা। বিরোধী রাজনীতি করার সময় দেশের অর্থনীতি কীভাবে পরিচালিত হওয়া উচিত তা যেমন ভাবতেন, তেমনই ভাবতেন জনগণের স্বাস্থ্য উন্নয়নের জন্য কোন পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হওয়া উচিত। অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান, কর্মসংস্থান—সবকিছু নিয়েই গভীরভাবে ভাবতেন। জানতেন ঔপনিবেশিক আমলের নীতি এবং অবকাঠামো দিয়ে জনগণের জীবনের মূল চাহিদাগুলো পূরণ করা সম্ভব নয়। তাই ক্ষমতায় গেলে কী করবেন, সে বিষয়ে প্রায় পূর্ণাঙ্গ ধারণা ছিল তাঁর। ছিল হয়তো লিখিত পরিকল্পনার ছকও। তাই তো দেখা যায়, মুক্তিযুদ্ধের শেষে ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ দেশের মাটিতে পা দিয়েই তিনি কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। এবং প্রথমেই হাত দিয়েছেন দেশের মানুষের মৌলিক প্রয়োজন পূরণ করার ক্ষেত্রেগুলিতে। স্বাস্থ্য তেমনই একটি মৌলিক প্রয়োজন এবং অধিকার। সীমিত সংখ্যক সুবিধাভোগী মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্যসেবাকে বন্দি না রেখে দেশের সাত কোটি জনগণের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা নির্মিত হয়েছে তাঁর হাত ধরে। 
          এই বইয়ের লেখক অধ্যাপক ডা. হারিসুল হক পাঠকদের মনে করিয়ে দিচ্ছেন, দেশে ফেরার ২১ দিনের মাথায় বঙ্গবন্ধু গঠন করলেন পরিকল্পনা কমিশন। হাত দিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা প্রণয়নের কাজে।
          কেমন ছিল সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশের স্বাস্থ্য-অবকাঠামো? লেখক হারিসুল হকের বই থেকে জানা যাচ্ছে, সারা দেশে সাত কোটি মানুষের জন্য হাসপাতালে শয্যা ছিল মাত্র ১২৩১১টি। দেশে ডাক্তারের সংখ্যা মাত্র ৭০০ জন। তাদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধে শহিদ হয়েছেন ৭০ জন। বিভিন্ন বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ডাক্তার ২৫৯ জন। তাদের সবার অবস্থান ছিল রাজধানী ঢাকাতে এবং মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালগুলিতে। তার মানে, ঢাকার বাইরে কোনো রোগীর বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের সেবা পাওয়ার কোনো সুযোগই ছিল না।
          চিকিৎসাব্যবস্থা মানে কেবল ডাক্তার নয়। নার্স, ল্যাব টেকনিশিয়ান, ওয়ার্ড বয়, প্যারামেডিক, অ্যাম্বুলেন্সচালক, হেলথ ভিজিটর, সেনিটারি ইন্সপেক্টর, ফার্মাসিস্টসহ নানা ধরনের স্বাস্থ্যসেবাদানকারীদের নিয়ে গড়ে ওঠে একটি দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা। সেইসব টেকনিক্যাল মানুষের সংখ্যাও ছিল নিতান্তই অপ্রতুল। সারা দেশে নার্স ছিলেন ৭০০ জন, মিডওয়াইভস ছিলেন ২৫০ জন, স্বাস্থ্য পরিদর্শিকা ২৫০ জন। কমপাউন্ডার ছিলেন ১০০০ জনেরও কম। সারাদেশে নামমাত্র রুরাল হেলথ সেন্টার ছিল ১৫০টি। নামমাত্র বলা হচ্ছে এইজন্য যে সেগুলোতে কোনো ডাক্তার তো দূরের কথা, প্যারামেডিকেরও পদায়ন ছিল না।  এই সংখ্যাগুলোই বলে দেয় এই দেশের মানুষের জন্য কার্যত কোনো স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার ইচ্ছাই ছিল না পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর। তাদের জীবন পুরোটাই ছিল নিয়তির ওপর নির্ভরশীল। স্থানীয় হাতুড়ে, কবিরাজ, হেকিমদের ওপর নির্ভর করতে হতো সর্বাংশে।
          এই অবস্থা পরিবর্তনের জন্য ব্যাপক পরিকল্পনা করলেন বঙ্গবন্ধু। রাতারাতি তো একটা দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা উন্নত করা সম্ভব নয়। তাই কিছু ছিল আশু লক্ষ্য, কিছু মধ্যম মেয়াদী, এবং কিছু সুদূরপ্রসারী। প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় স্বাস্থ্যব্যবস্থায় কিউরেটিভ এবং প্রিভেনটিভ চিকিৎসাকে সমন্বিত করা হয়েছিল। বিশুদ্ধ পানি, পয়ঃনিষ্কাশন, এনভায়রনমেন্টাল হেলথ, গর্ভবতী মা ও প্রসূতি পরিচর্যা, জনগণকে স্বাস্থ্যশিক্ষা দেওয়া, বিভিন্ন রোগের টিকা ছিল প্রিভেনটিভ চিকিৎসার অন্তর্গত। এছাড়া যেহেতু স্বাস্থ্যখাত অনেককিছুর সাথে সমন্বিত একটি বিষয়, তাই স্বাস্থ্যের সাথে পরিবার পরিকল্পনা এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়কে একীভূত করা হয়েছিল।
          স্বাস্থ্যখাতে জরুরি ভিত্তিতে কিছু ক্রাশ প্রোগ্রাম নিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। ১৯৭২ সালে ৪৫০ জন ছাত্রীকে রির্বাচন করে দ্রুত নার্সিং ট্রেনিং সেন্টারে পাঠানো হলো। একটিমাত্র নার্সিং ট্রেনিং ইনস্টিউট ছিল ঢাকাতে। জরুরি ভিত্তিতে রাজশাহীতে খোলা হলো আরেকটি ট্রেনিং সেন্টার। ডাক্তার-সংখ্যা তো রাতারাতি বাড়ানো সম্ভব নয়। একজন ছাত্রের এমবিবিএস কোর্স সম্পন্ন করার জন্য ছয় বৎসর সময় লাগে। তাই অন্তত জনগণের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার জন্য কিউবার দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে একবছর মেয়াদি কোর্সের মাধ্যমে প্যারামেডিক তৈরির ব্যবস্থা নেওয়া হলো।
          বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে পরিকল্পনা কমিশন এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এমনভাবে পরিকল্পনা প্রস্তুত করেছিল, যাতে করে দেশের যেকোনো অঞ্চলের প্রতিটি মানুষ স্বাস্থ্যসেবা নেটওয়ার্কের আওতায় আসতে পারে। বেসিক হেলথ ওয়ার্কার বা মৌলিক স্বাস্থ্যকর্মী নামে একটি পদ সৃষ্টি করা হয়। এরাই জনগণের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত স্বাস্থ্যসেবক। লেখক তার বইতে তুলে ধরেছেন মৌলিক স্বাস্থ্যকর্মীদের কাজের বিবরণ—‘৪০০ মানুষের স্বাস্থ্যের দেখভালের দায়িত্বে থাকবেন একজন মৌলিক স্বাস্থ্যকর্মী। তাঁরা সিডিউল অনুযায়ী মাসে অন্তত একবার প্রতিটি বাড়ি পরিদর্শন করবেন। পরিদর্শনকালে তাঁরা টিকাদান কর্মসূচি (গুটি বসন্ত, কলেরা, টাইফয়েড এবং যক্ষ্মা)-তে প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করবেন, প্রাথমিক স্বাস্থ্যশিক্ষা (সঠিক পয়ঃনিষ্কাশন, পানীয় জল বিশুদ্ধকরণ, পরিবার পরিকল্পনা) সম্বন্ধে জনগণকে অবহিত করবেন, তাঁরা ম্যালেরিয়া শনাক্ত করার জন্য রোগীদের রক্ত ও সম্ভাব্য যক্ষ্মা আক্রান্তদের কফের নমুনা সংগ্রহ করে রুরাল হেলথ সেন্টারের ল্যাবরেটরিতে জমা দেবেন। তাঁরা ম্যালেরিয়া, যক্ষ্মা ও কুষ্ঠরোগীদের ঔষধ রোগীদের বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসবেন। তাঁরা ম্যালেরিয়া নির্মূল অভিযানে সম্পৃক্ত থাকবেন এবং মহামারিকালে সরকার গৃহীত বিবিধ কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত হবেন। তাঁরা পারিবারিক স্বাস্থ্যকার্ড ও পরিবার পরিকল্পনা গ্রহীতাদের কার্ড যথাযথভাবে পূরণ এবং সংরক্ষণ করবেন—পরবর্তীকালে সেখান থেকে পরিসংখ্যানের জন্য তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা যাবে।’ [পৃষ্ঠা ৩৬]
          এই ধরনের পরিকল্পনাকে বলা যায় গণমুখী স্বাস্থ্য পরিকল্পনা। শিক্ষার মতো স্বাস্থ্যও কারো সুযোগ নয়, বরং অধিকার। এই ধারণাতেই বিশ্বাসী এবং প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলেন বঙ্গবন্ধু। সেজন্য স্বাস্থ্যখাতে যেসব পরিকল্পনা তিনি গ্রহণ করেছিলেন সেগুলির বর্ণনা পাওয়া যাবে ডা. হারিসুল হকের লেখা এই গ্রন্থে।
          বঙ্গবন্ধু সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়তে চেয়েছিলেন। কারণ, তাঁর বিশ্বাস ছিল একমাত্র সমাজতন্ত্রেই সকল মানুষের মুক্তি সম্ভব। দারিদ্র্য থেকে মুক্তি, অশিক্ষা থেকে মুক্তি, স্বাস্থ্যহীনতা থেকে মুক্তি। সেই লক্ষ্যেই এই ধরনের স্বাস্থ্য পরিকল্পনা। সমাজতন্ত্র গড়ে না উঠলেও বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে অন্তত একটি কল্যাণরাষ্ট্র পেতে যাচ্ছিল বাংলাদেশের মানুষ। 
          এখন পৃথিবীতে স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং স্বাস্থ্য ভাবনায় অনেক পরিবর্তন এসেছে। ঔষধ, রোগনির্ণয়, জরুরি স্বাস্থ্যসেবা, জটিল স্বাস্থ্যসেবায় যুক্ত হয়েছে অনেক নতুন নতুন আবিষ্কার। সেগুলি বয়ে এনেছে মানুষের রোগমুক্তি এবং দীর্ঘ জীবনের আশ্বাস। কিন্তু মুক্তবাজার পুঁজিবাদ এখন কেবল ধনীদের জন্যই নিশ্চিত করেছে উপযুক্ত স্বাস্থ্যসেবা। দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠী এখন আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত। বিশাল বিশাল সরকারি স্বাস্থ্য অবকাঠামো গড়ে উঠেছে। তবু সেখানে চিকিৎসা পায় দেশের মাত্র শতকরা ৩০ ভাগ মানুষ। বাকি ৭০ ভাগ মানুষকে স্বাস্থ্যসেবা কিনতে হয় বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক, নার্সিং হোম থেকে। মুক্তবাজার পুঁজিবাদের নিয়ম অনুসারে স্বাস্থ্যখাতে গড়ে উঠেছে প্রতিযোগিতা। তবে সেই প্রতিযোগিতা রোগীদের জন্য সহায়ক হয়নি। হয়েছে উদ্যোক্তা এবং দালাল শ্রেণির জন্য। টাকার অঙ্কে স্বাস্থ্যখাতে সরকারি বরাদ্দ বেড়েছে। তবে অন্যখাতের তুলনায় বেদনাদায়করূপে কম। বঙ্গবন্ধুর সময়ে যেখানে বাজেটের প্রায় ৫% বরাদ্দ ছিল স্বাস্থ্যখাতে, এখন সেখানে বরাদ্দ ২%-এরও কম। বিশ্বব্যাংকের নির্দেশনায় সরকারকে জনগণের স্বাস্থ্য প্রতিদিন বেশি বেশি করে ছেড়ে দিতে হচ্ছে বেসরকারি খাতে। এই প্রবণতা বঙ্গবন্ধুর চিন্তা এবং আদর্শের সাথে সাংঘর্ষিক।
          আমরা কৃতজ্ঞ ডা. হারিসুল হকের কাছে এমন একটি গ্রন্থ প্রণয়নের জন্য। তার এই গ্রন্থের মাধ্যমে আমরা অন্তত এটুকু বুঝতে পারছি যে স্বাস্থ্যখাতে আমাদের কোনদিকে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু, আর এখন আমরা হাঁটছি তাঁর নির্দেশিত পথের বিপরীত দিকে। বঙ্গবন্ধুর প্রতি সত্যিকারের শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের একমাত্র উপায় হচ্ছে বর্তমানের ভুলযাত্রা থেকে বিরত হয়ে তাঁর আদর্শের পথকে অনুসরণ করা।

বঙ্গবন্ধুর স্বাস্থ্য ভাবনা। অধ্যাপক ডা. হারিসুল হক। প্রকাশক : কবিতাসংক্রান্তি, ঢাকা। প্রচ্ছদ : ধ্রুব এষ। পৃষ্ঠা : ৮৮। মূল্য :  ৩০০ টাকা।

 

/জেডএস/

সম্পর্কিত

সাহিত্যতত্ত্ব : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা

সাহিত্যতত্ত্ব : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা

লিডসে এলিয়টের 'ওয়েস্টল্যান্ড' ও নজরুলের 'বিদ্রোহী' কবিতার শতবর্ষ

লিডসে এলিয়টের 'ওয়েস্টল্যান্ড' ও নজরুলের 'বিদ্রোহী' কবিতার শতবর্ষ

অন্নজল ও অন্যান্য কবিতা  

অন্নজল ও অন্যান্য কবিতা  

একদিন দিনে চাঁদ ফুটবে

একদিন দিনে চাঁদ ফুটবে

অন্নজল ও অন্যান্য কবিতা  

আপডেট : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২:৩৯

অন্নজল

গনগনে রোদ ঠেলে এসে ফকির দাস বটের নিচে বসে।
ঘষা চশমার সামনে হলুদ প্রজাপতি নাচে দাঁতরাঙা ফুলে। 
মাঠে পাকা ধান। পাখি ওড়ে হরেক কিসিম।
ফকির দেখে আর ভাবে, আহা কী রঙ কী রঙ! 
এ বছর ভালো ভিখ মিলবে গো!
বলেই জিভ কাটে, কিরে দেয়, চোখ বুঁজে আকাশে তাকায় জোড় হাতে, মোনাজাতে।
কী যে ভেবে ফেলল সে; এসব ভাবতে নেই!
ভাবলেই মেঘ জমে, ধানের দাম পড়ে যায়, দেনদারি হয় চাষি, দেশে ওঠে রোগের বালাই।

সেও তো চাষিই ছিল একদিন।
এইসব ভেবেটেবে চুপচাপ ঝোলা থেকে ছেঁড়া পুঁটলিটা বের করে আনে।
খুলে ফেলে বিচিকলা দুটো সরিয়ে রাখে, থাক।
কাল খাওয়া যাবে। আজ সে নুন ঘষে নেবে রুটির কানায়।
হরি হে, দিন দিয়ো, দেখো তুমি খোদা। এই বলে সে মুখে অন্ন দেয়। 
অন্নই তো হরি। অন্নই তো মালিক গো! সে দিন না দিলে কেমনে চলবে তার?
খাওয়া দেখে বটের তলায় সাঁৎ সাঁৎ করে শালিক নামে দুটো।
ওটা শালিক না রোদ? ফকির ঘষা কাচে ঠাওর পায় না। 
রুটি চিবোয় আর ভাবে, ভেবে যায়।
আজ ধুনিপাড়ায় কার বাড়ি যেন ভোজ আছে না? 
বিকেলে যেতে হবে। সেও তো দেশেরই লোক, দুটো এঁটোকাঁটা পাবে না কি আর?
ধুলোর ঘূর্ণি কুটো নিয়ে ঘোরে। ঘুরতে ঘুরতে উপরে উঠে যায়।
ফকির গামছা পাতে। একটু জিরোতে তো হবে। কত যে রাস্তা বাকি!


ফড়িং

একটা ফড়িং জলের ওপর মুখ দেখবে বলে থমকে দাঁড়ালো।
কী দেখতে চাইল সে? কতটা ব্যথার ভারে স্থির হয়ে থাকে জীবনের মুখ? 
অথবা ফেলে আসা উড়ানের পথ
স্মৃতির পরম জলে দাগ রেখে গেছে কিনা এইসব?
ঘরে এখন অন্ধকার, বিদ্যুৎ নেই
ঝড়ের সময়ে ভাঙা জানালাটা খোলা যাবে না।
অথচ এই অন্ধকারেই তো দেখা যায় সব–
পুকুরের জল, থমকে দাঁড়ানো ফড়িং, 
স্মৃতির শালুকপাতায় টলমল ব্যথার মিনার।

/জেডএস/

সম্পর্কিত

একদিন দিনে চাঁদ ফুটবে

একদিন দিনে চাঁদ ফুটবে

সুমোহিনী ভেনাস

সুমোহিনী ভেনাস

আমি মুখ খুলতে চাই না : নাদিয়া আঞ্জুমান

আমি মুখ খুলতে চাই না : নাদিয়া আঞ্জুমান

পৃথিবী

পৃথিবী

একদিন দিনে চাঁদ ফুটবে

আপডেট : ২১ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৪:৫৭

একদিন দিনে চাঁদ ফুটবে

ছোটরা বড়দের কাজ করলে
আর বড়রাও ছোটদের ভূমিকায় থাকলে
বিষয়টা মজার।

বেটিদের পোশাক বেটা পরলে
আর পুরুষদের ড্রেস নারী পরলে হাস্যকর।

একদিন দিনে চাঁদ ফুটবে এবং রাতে সূর্য উঠবে।


তিনটি মেয়ের জামা-কাপড়

তিনটি মেয়ে ঝর্নাজলে
মনের পাখা মেলছে,
নগ্নস্নানে কী আনন্দে
জলের সাথে খেলছে।

বনপরিদের ভাগ্নি যেন
জলপরিদের কন্যা,
ঝর্না জলে জল সাঁতারে
ছড়ায় সুখের বন্যা।

হঠাৎ একটি হেলিকপ্টার
ভটভট করে এলো,
মেয়ে তিনটির স্বাধীনতা
করল এলোমেলো।

হেলিকপ্টার গুলি ছোড়ে
হারায় তারা দিশে,
একটি মেয়ে গুলিবিদ্ধ
রক্তজলে মিশে।

বাকি দুজন বন্দি হলো
সেই শিকারির খাঁচায়,
তিনটি মেয়ের জামা-কাপড়
পড়ে থাকে মাচায়।


পরাজয়

আজ কানাডায় নির্বাচন।
কোথাও ‘আমার ভাই/ তোমার ভাই, আমার নেতা/ তোমার নেতা…’নেই
কোথাও স্লোগান, মিটিং, মিছিল, পোস্টার নেই,
মাইকিং নেই।
কিন্তু শরৎ-হেমন্তের সন্ধিক্ষণে
কোথায় যেন কি হচ্ছে!

আজ কানাডার নির্বাচন।
আজ আমি খুব নীরবে হেরে গেলাম তোমার কাছে!


দেশ বিভাগের গান

আমি তুমি যুক্তাক্ষর
একই সাথে মুক্তাক্ষর।

আমরা থাকি ভালোবাসার বন্ধনে।

আমি তুমি পানি-জল
মা-জননী নির্মল—

মায়ের মুগ্ধ আঁচল থেকে গন্ধ নে!

আমি তুমি এক-দুই
দুই দেশের এক ভূঁই,

নিজ দেশটা পরবাসী, ক্রন্দনে।

/জেডএস/

সম্পর্কিত

অন্নজল ও অন্যান্য কবিতা  

অন্নজল ও অন্যান্য কবিতা  

সুমোহিনী ভেনাস

সুমোহিনী ভেনাস

আমি মুখ খুলতে চাই না : নাদিয়া আঞ্জুমান

আমি মুখ খুলতে চাই না : নাদিয়া আঞ্জুমান

পৃথিবী

পৃথিবী

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

শনিবার একুশের সংকলনের ‘কবি-অভিষেক’

শনিবার একুশের সংকলনের ‘কবি-অভিষেক’

অবশেষে বইমেলা

অবশেষে বইমেলা

আজ কবি শামীম রেজার সুবর্ণজয়ন্তী

আজ কবি শামীম রেজার সুবর্ণজয়ন্তী

তরুণ লিখিয়ের খোঁজে জলধি

তরুণ লিখিয়ের খোঁজে জলধি

গ্রন্থীর ‘হানড্রেড পোয়েটস্ এরাউন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড ফর লাভ’-এর সমাপ্তি পর্বে উচ্ছ্বসিত প্রতিক্রিয়া

গ্রন্থীর ‘হানড্রেড পোয়েটস্ এরাউন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড ফর লাভ’-এর সমাপ্তি পর্বে উচ্ছ্বসিত প্রতিক্রিয়া

সাহিত্যে ২০২০’র নোবেল কে পাচ্ছেন?

সাহিত্যে ২০২০’র নোবেল কে পাচ্ছেন?

সর্বশেষ

‘বিদ্যালয়ে এসে করোনা আক্রান্তের প্রমাণ পাওয়া যায়নি’

‘বিদ্যালয়ে এসে করোনা আক্রান্তের প্রমাণ পাওয়া যায়নি’

ঢাকায় ‘জলবায়ু অবরোধ আন্দোলন’ কর্মসূচি

ঢাকায় ‘জলবায়ু অবরোধ আন্দোলন’ কর্মসূচি

জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি

জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি

সহশিল্পীর কারণে তারা ছবিগুলো করতে চাননি

সহশিল্পীর কারণে তারা ছবিগুলো করতে চাননি

হংকংয়ের বিপক্ষে খেলবে বাংলাদেশ

হংকংয়ের বিপক্ষে খেলবে বাংলাদেশ

© 2021 Bangla Tribune